রাজা সরকার’র এক গুচ্ছ কবিতা

প্রস্তর যুগ  

বাকরুদ্ধ সময় নিয়ে লোফালুফি খেলছি। শিলনোড়ার ঘর্ষণে গুঁড়িয়ে দিচ্ছি পরিসর।   শাবকের কান্না আর শুনি না। উল্লাসের গাঢ় প্রত্যয় মিশে যাচ্ছে ঘামে। নীল ঘাম ।   মুছে নিচ্ছি রুমালে। পাথরের আঘাতে চৌচির আয়না, তার সামনে আর্তকে বসিয়ে রেখেছি খুরের উপর। রসিকতা এখন ভালো  লাগে। ভালো লাগে নিমফুল, ভালো লাগে কান্নাজাত মাংসের ঘ্রাণ।

শরীর বিক্রি হয়ে গেছে অনেককাল আগে। রূপকথার  ভেতর শুয়ে থাকতে দেখা  গেছে তোমায়, তাও অনেককাল আগে। এখনও অন্ধকারের কিছু বাকি। এখনও প্রলম্বিত সময়ের শাঁস থেকে গড়িয়ে নামছে  প্রসাধন। আকাঙ্ক্ষার চোখ থেকে ঝরছে ভাষা, এক পাথরের ভাষা।   হায়, এখন আর তোমাকে নিয়ে পালানোরও কেউ নেই।

অতি-সত্য আজ বাতাসে উড়ছে। বাতাসে উড়ছে চুল, উড়ছে বিজিত ওড়নার  নিশান।  সাম্রাজ্যের লীলাভূমির এই বাতাস তবু যেন খুঁজছে তোমাকে  । ভালোবাসার সকল  পরীক্ষা বিফল হয়েছে। চুম্বনের আশ্রয় অবিশ্বাস্য হয়ে গেছে। এখন আর কোনো  সমস্যা নেই । এ-সব এই নতুন সময়ের অর্জন। পাথরের কাছে কেউ পরাজিত কি  না,–এ প্রশ্ন আজ অবান্তর। প্রস্তর যুগই যে এখন শেষ কথা।

পথের ধুলো থেকে কিছুটা তোমার তুলে নিলাম। কিছুটা অরণ্যের আনাচকানাচ  থেকে। কিছুটা অন্ধের মত তোমার খণ্ডবিখণ্ড তুলে নিলাম দেশ-দেশান্তর থেকে। আশ্চর্য!  প্রতিবারই তোমার ভেতর শুধু বীজধানের গন্ধ !

অহমিকার স্থাপত্যগুলো পড়ে রইলো, থাক, চলো একবার স্বরবর্ণের কাছে যাই ।  আমাদের বিবরণ তো খুব সামান্য, যেমন তুমি হাসলে মিথ্যে এ-ঘরে একদিন জ্বলে উঠতো  আগুন। কিংবা তুমি কাঁদলে খুলে যেত আদিম  লিপিরহস্যের ঘনস্বর।

বিস্মরণের আগে একবার ঋণ-রক্তের ওই বেদীটির দিকে তাকাও। তাকাও  একবার ঝলসানো সাগরের  দিকে। আমাদের  খর চোখে আর কোনোদিনই জন্মাবে না জল।   নদীর জলে মুখ দেখে বোঝা গেছে এ মুখ অবিশ্বাস্য। শান্তি- স্নানের পর কি সমাধিফলকে  আর  নাম লেখার প্রয়োজন আছে?

কেউ কেউ তোমার জন্য কামনা করেছিলেন মৃত্যু । কেউ কেউ তোমার জন্য রচনা  করেছিলেন এপিটাফ। আঁশটে এক জীবন, ওইতো শুয়ে আছে করিডোরে সমুদ্রফেরত বাতাস ঘিরে আছে তাকে, কে তাকে  ডিঙ্গিয়ে যাবে,  কে  তাকে    ডেকে বলবে, এইতো এসে গেছি আমি।  সর্বনামের ছায়া থেকে বিমুক্ত আমি, আমাকে  এবার চিনতে পারছো তো?

ভয়েরই একমাত্র জন্মান্তর আছে। দেহকোষের ছায়ার মত ভয়, কতদূর থেকে যে  সে সঙ্গ নিয়েছে জানিনা , কতদূর যে যাবে তাও অজানা। জীবন বলতে যা বোঝায় তা কি এই ভয়েরই সমষ্টি, না অন্য কিছু, তাও জানি না।

অরণ্য থেকে অরণ্যে তার পলায়ন আছে, আছে জনপদের প্রান্ত থেকে প্রান্তরে তার পায়ের ছাপ।ভয়ের  ছায়াতেই জন্ম যার,পলায়নের শক্তিই তার কাছে বিপ্লব আজ। জীবনের  সামান্য সুষমাটুকু তার যে-বুকে  আটকানো, সে-টুকুই সে রাখতে চায়, আর কিছু না।

 

লবণ

এক সময় লবণের খোঁজে বাতাস খুব দিশেহারা থাকে। এইসব সময়ে বাতাসের   ভাবভঙ্গি সবার জানার কথা নয়। কোনো কালেই নয়। অথচ কেউ কেউ জানে।  এবং  কীভাবে জানে, সেটাও সকলের জানার কথা নয়।

এভাবেই হঠাৎ একদিন তোমার শরীরে আবিষ্কার হয় লবণ। আবিষ্কার হয় নিঃস্বতার উপন্যাস। শরীরে লবণের স্বাদ যে নিঃস্বতা দিয়েই তৈরি হয়, তা তুমি  জেনেছো অনেক পরে, অনেক অসহবাসের কাছে।

সেই সময় তুমি সেতু বাঁধছিলে শরীরের সঙ্গে শরীরের । শরীর ছাড়া কোনো   পৃথিবী  তোমার কল্পনাতেও ছিলো না তখন। অথচ ঘামের মূল্য একদিন লেখা  হতে থাকলো শরীরেই । তুমি কি সেদিন কোনো ভাষার সন্ধান  পেয়েছিলে শরীরে?

 

ঈশ্বর

ঈশ্বর চান তাই আমি প্রসাধিত হই । এর উপর কোনো কথা নেই। প্রসাধনী বাণিজ্যের হাওয়াকল নিয়ে তাই কোনো কথা চলে না। বিজ্ঞাপন লালিত নখাগ্র থেকে কেশাগ্র আমার ব্রহ্মাণ্ড। আমি কি ছাই জানি যে এগুলো কোনোটাই আমার  নয়!

জন্মের সময় ঈশ্বর বলে দিয়েছিলেন যে আমি যেন রঞ্জনী হয়ে উঠতে পারি,আমি যেন অঞ্জনী হয়ে উঠতে পারি, এমনকি সেটা মৃত্যুর সময়েও,—-প্রসাধন ছাড়া  আমাকে কল্পনা করা বৃথা, যেমন অন্ধকার ছাড়া অন্ধকার, যেমন বৃথা এই লবণাক্ত মাংস ছাড়া ঈশ্বর ।

 

তোমার বাড়ি আর খুঁজে পাওয়া যায় না 

আড়ে বহরে তুমি বেড়েই চলেছো। মানুষ হলে কথাটা কেউ কেউ অশ্লীল বলত। কিন্তু যেহেতু তুমি শহর, তাই এই বাড়াবাড়িটা উন্নয়নের প্রতীক।উন্নয়ন উন্নয়নকে ডাকে– -অহংকার ডাকে বিস্মরণ। তুমি তাই অচেনা হয়েই চলেছো। তোমার বাড়ি আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

ক্রমে অচেনা হতে হতে তুমি আর কত বিন্দু বিসর্গের জন্ম দেবে কে জানে ! লজ্জা  তোমার  বরাবরই কম, তবে এবার দেখলাম তা একেবারেই কাটিয়ে ফেলেছো, রেখেছো শুধু চোখের ছায়ায় ধূসর সেই কাজলরেখাটি। তোমাকে তাই চিনতে  খানিক কষ্ট হয় বৈকি।

শহরের জন্ম মৃত্যু বিবাহ সবই আছে। আছে স্ত্রী সন্তান সংসারও। নেই শুধু স্মৃতিকোষ কিংবা নগ্ন পায়ের  কোনো বাল্যকাল। শহরের ঈশ্বর-বিশ্বাস নেই, কিন্তু ঈশ্বর আছে। শহরের প্রাসাদ ও প্রসাধন আছে, খরা বন্যা দাঙ্গা আছে। আছে বাৎসরিক কিছু মাদারীকা খেল । শুধু হারিয়ে যাওয়াগুলো নিয়ে শহরের কোনো পঙক্তি নেই, কিংবা গান !

 

ত্রিপুরা

হ্যাঁ, বাস্তবিক মাথার কাছে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে একরাত শুয়েছিলাম কৈলাশহরে।সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম মানুষ  নয়, একমাত্র পাখিরাই নীরবে সীমান্তের মান্যতা উপেক্ষা করে করছিল এপার ওপার । এটাই নিয়ম, এটাই  সভ্যতা। সভ্যতার নিমফল।

এটাই আধুনিকতা, অতিনির্মাণের শিহরণ জাগানো সীমানা । গাছের আবছায়ায় বি এস এফ, পিঠে ঝোলানো এ কে সাতচল্লিশ । বাস্তবিক এক সাতচল্লিশের ছবি । দূর থেকে দেখি। কাছে ঘেঁসতে দেয় না। দূর থেকে দেখে দেখে আমাদের চোখ ঝুলে পড়ে। তবু আমরা কেউ কেউ তাকিয়ে থাকি চাতকের মত।

চারদিকে চূড়ান্ত এক কায়ক্লেশ, বাস্তবতার রোদ। আমরা ক’জন সীমান্ত পাশে রেখে হাঁটছি।  এখানে হাঁটা নিষেধ, তবে ওড়া নিষেধ নয়। তবু হাঁটছি, কারণ আমাদের পাখা নেই। আমাদের পাখা নেই কেন, আমরা ক্ষেত্রফলের অংক জানিনা কেন—এসব নিয়ে ভাবছি, আর দেখছি সর্পিল  সীমারেখাটি  কুন্ডুলী পাকিয়ে জড়িয়ে  রেখেছে জল, জল ভরা এক একটি কমলা সাগর।

আখাউড়া দিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য আমরা হাঁটছিলাম।আমরা বি এস এফ কে বলেছিলাম অবৈধ পারাপারের জন্য আমাদের কী ধরণের শাস্তি হতে পারে?উত্তরে চওড়া চোয়াল বলে উঠলো হেসে—গোলি  মারেগা। আমরাও বললাম হেসে—ঠিক হ্যাঁয়, গুলি যেন পায়ে  করা হয়।

 

জীবনে এমন বুরবাক আদমি দেখেনি বলে তারা আমাদের মাথা বরাবর গুলি চালাল।আমরা ভাবলাম ভালই হলো। পায়ে গুলি করলে আমাদের হাঁটতে অসুবিধে হত। এখন অসুবিধে হচ্ছে না। কিন্তু রাস্তায় এত ভাঙ্গা খুলি আর ঘিলু দেখব বলে  ভাবিনি। কিন্তু একটু এগোতেই দেখলাম অজস্র মরসুমি ফুল আমাদের উপর ঝরে পড়ছে। আমরা একটি লাল টকটকে রাস্তা ধরে হাঁটছি। যত এগোচ্ছি আমাদের  জুতো জামা ক্রমশঃ লাল হয়ে উঠছে। আমাদের কি লাল রঙের ঘাম হচ্ছে?

দেখতে দেখতে অনায়াসে চলে গেলাম র‍্যাডক্লিফ সাহেবের বাংলোয়। তিনি খাঁটি সিলেটি ডায়লেক্টে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। যার মর্মার্থ—-আপনাদের আসতে কোনো কষ্ট হয়নি তো—

 

ত্রিপুরা

ত্রিপুরা একটি কাঁটাতার ঘেরা ভূখণ্ড। সম্পূর্ণ নয়, তার তিন দিকে কাঁটাতার, যা হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় । বসবাসকারীদের মধ্যে ভাল সংখ্যক কবি ও আস্ত একটি সিপাহীজলা আছে, যা সংরক্ষিত। তবে সর্বত্রই ছন্দ আছে। তাই মূলত ছন্দে তাঁরা কবিতা লেখেন। মনে হল অক্ষর, মাত্রা বা পয়ারের মত  একটি ছন্দের নাম কাঁটাতার হতেই পারতো। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তা হয় নি। বরং ভাল থাকার কতগুলো ছন্দ আছে। যেমন কবিরা বলে থাকেন এখানে সব ছন্দের সেরা ছন্দটি  আসলে গোপন ছন্দ। আগরতলা সেরকমই এক কবিদের শহর। সেখানে গেলে ছন্দের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ছন্দ আসলেই কবিদের জিনিস। তার জন্য  মেহগনি খাট, কল্‌কা পাড়ের শাড়ি, চিকন গহনা, এসব-ই লাগে । কিন্তু গোমতীর ঘোলা জলে মুখ দেখা যায় না বলে খানিক আক্ষেপ থাকে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কবি রাজা সরকারের জীবন ও কবিতা | শিমুল মিলকী

Sat May 23 , 2020
কবি রাজা সরকারের জীবন ও কবিতা নিয়ে মূলত আলোচনা থাকলেও এর সাথে নেত্রকোণাকে জড়িয়ে আলোচনা করতেই হচ্ছে। কেননা, কবির জীবনের স্থানিক ও কাল-পরিচয়ের মধ্যে কবিতারও একধরনের পরিচয় আভাসিত হয়। কবির জীবনপঞ্জিকা ঘেঁটে কিছুটা সেই আলামত পাওয়া যায়। রাজা সরকার তাঁর আত্মজীবনীমুলক গ্রন্থ আঁতুড়ঘর-এ বলেন- “রাতে স্বপ্ন দেখি বালক বয়স। স্বপ্ন […]
Shares