আমি স্বপ্নের দিকে যাচ্ছিলাম | লোকমান হেকিম

আমি স্বপ্নের দিকে যাচ্ছিলাম | লোকমান হেকিম

 

আমি স্বপ্নের দিকে যাচ্ছিলাম।

স্বপ্ন একটি রিটেইল সুপারশপ।

করোনা ভাইরাসের এই মহাবিপর্কালে প্রত্যেকেই যখন নিজেকে স্বেচ্ছাবন্দী করে রাখছে, তখন কিছু সময়ের জন্য বাইরে বেরোতে পারাটা বিপদের হাতছানির চেয়েও মুক্তির স্নিগ্ধ মাধুর্যে ভরা। আমি তা উপেক্ষা করতে পারিনি।

বাসা থেকে সুপারশপটির দুরত্ব মাত্র অর্ধ কিলোমিটার। কিন্তু যে মানুষটি প্রায় সন্ন্যাসীর মতো নগর ছাড়িয়ে নগরের পথে পথে সারাক্ষণ মনে মনে হাঁটে তার জন্য এই দুরত্ব  স্বেচ্ছাবন্দীর এগারদিনের মধ্যে হরিদ্বারের আমন্ত্রণের চেয়ে কম কিছু নয়।

রাস্তায় রিকশা নেই। টিপু সুলতান রোড ধরে তাই কিছুক্ষণ হাঁটার পর  সোজা র‌্যাংকিন স্ট্রিটের দিকে ঢুকে পড়লাম। ওয়ারির এই রাস্তাটি আমাকে প্রায়ই বুদ্ধদেব বসুর কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

বুদ্ধদেব বসু।

২১৮, রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতা।

না।

তার আগে ৪৭, পুরানা পল্টন, ঢাকা।

তারও আগে গেন্ডারিয়া আর এই র‌্যাংকিন স্ট্রিট। কবি নজরুলের সাথে বুদ্ধদেব বসুর বিরল সাক্ষাতের কিছু ছিল এখানেই। প্রতিভা বসুর জীবনের জলছবি এঁকেছেন এখানকার স্মৃতি রোমন্থন করেই।

 

আমিও এই ওয়ারিতে আছি আর এই সৌভাগ্যজনক দূর্রঘটনা আমাকে মনে করিয়ে দেয়  যে, আত্মম্ভরী হওয়ার  ক্ষেত্রে আমি নই, এইসব ঐতিহাসিক উপাদানই দায়ী আর এরা আমার উপর অকারণেই ক্রিয়াশীল।

 

বেশ, স্বপ্ন নামের সুপারশপের কাছাকাছি চলে এসেছি আর আমার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার অন্যদিকে পালিয়ে  গেল।

এখন আমাকে মেফিস্টোফিলিসের মতো সুপারশপে ঢুঁকতে হবে আর বেরিয়ে আসতে হবে করোনা ভাইরাসকে  কোন ধরনের সুযোগ না দিয়েই।

কিন্তু তা প্রায় অসম্ভব। লক ডাউনের এই অপ-প্রভাবে সুপারশপটিতে উপছে পড়া ভীড়। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, মানুষের প্রয়োজনের লড়াইটা লক্ষ্য করতে করতে একসময় একটি ট্রলি নিয়ে শপটির ভিতরে নিজেকে আবিষ্কার করলাম।

একটা লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছেন গিন্নি। আমি মাঝ বরাবর কেটে তা  ছোট করে আনলাম। তারপর দু একটি শেল্ফ ঘুরে ঘুরে লিস্টের বাকি টুকরোটাও ফেলে দিলাম। এখন স্মৃতিই ভরসা।

 

আমি তো রামায়ণের চারণকবিদের উত্তরাধিকারী। স্মৃতির উপর নির্রভর করে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার আমিও একজন! তাই, স্মৃতি ও শ্রুতি দুই ই আমার আত্মার কোণে আবাস গেড়েছে।

 

ট্রলি নিয়ে এলোমেলো ঘুরছি। কখন যে একজন সেলস এসিস্ট্যান্ট পাশে এসে দাঁড়ালেন বুঝতে পারিনি। আমি পাশ ফিরে তাকাতেই মৃদু হাসি উপহার দিলেন। বৈকালিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে শেল্ফ খুঁজছি। বুঝতে পারছি তিনি ফিরে আসছেন।

ডিমেনশিয়া। তিনি প্রাচীন পৃথিবীর প্রায় সব মহাপুরুষের বিশ্বস্থ বন্ধু ছিলেন।

অবশ্য তিনি আমার ঠিক বন্ধু হয়ে উঠেননি এখনো। তবে, মাঝে মাঝেই দেখা দেন।

 

এখন আমার চারপাশে তিনজন। আমি ১। আমি ২। এবং আমার প্রিয় সেলস ম্যাডাম।

 

চায়নিজ জিনিস একেবারেই  কেনা যাবে না। ওরাই উহান ভাইরাস ছড়িয়ে পৃথিবীর  কোটি  কোটি মানুষের ভাগ্য পতনের জন্য দায়ী। ওদের ক্ষমা নেই।

: এটি একটি দূর্ঘটনাও হতে পারে। চায়নিজরা কি অতীতে মোঙ্গলদের অত্যাচার সহ্য করেনি?

আমরা তো মোঙ্গলদের ক্ষমা করছি না।

: মোঙ্গলরাও তাতারদের দ্বারা বিতাড়িত হয়নি কি?

তাতারদের আমরা ঘৃণা করি।

: তাতারদের পারসিকরা কি করেছিলো?

পারসিকরা দেবদূত তা তো বলিনি।

: ওরা পারসিদের বিতাড়িত করেছে নিজ মাতৃভূমি থেকে। ভারত মাতা নিজ আঙ্গিনায় স্থাপন করেছে তাদের।

বাহ! ভারতীয় আর্যদের অনার্যদের প্রতি , বুদ্ধদের প্রতি ঘৃণা  ভুলে গেছেন?

: না, হুক , শুন, মোঘল আর সর্বশেষ ব্রিটিশদের কাছে তাদের পরাজয় ইতিহাসের দায় কিছুটা শোধ করেছে, বর্তমান ঘৃণাবাহী ভারত ভবিষ্যতেও শোধ করবে।

হুম। সেই দিক থেকে ব্রিটিশ বা এংলো স্যক্সনরাতো জার্মান বর্বর উপজাতিদের কাছে কম মার খায়নি।

: এবং ভিসিগথরা গলদের কাছে বা জর্মনরা ফরাসীদের কাছে।

ফরাসী, ইংরেজ, জর্মন নেতৃত্ব পুনরায় আরবেদের কাছে।

: আরবদের অপরাধের দায় এখনো শোধ হয়নি। অবশ্য  ওরা অটোমান তথা তাতার, মোঙ্গল হুন সম্মিলিত শক্তির কাছে, পরে ব্রিটিশ, জায়োনিস্টদের কাছে কমতো অপমানিত হয়নি?

হ্যাঁ। সবকিছু চক্রাকারে ফিরে ফিরে আসছে। অটোমানরা আবার ইউরোপীয় শক্তির একাংশের কাছে পরাজিত হয়েছে।

: আর এই শক্তিগুলো কখনো ক্রিসেন্ট, কখনো ক্রস, কখনো স্বস্তিকা, কখনো চক্র, পদ্ম , ডেভিডের স্টার ইত্যাদি বহন করে নিয়ে গেছে আর পথে পথে মানুষের মৃতদেহ আকাশের দিকে তাকিয়ে কেবল রাতের নক্ষত্রের কাছে অভিযোগ দিয়েছে । কারণ, তাদের কালে তারা দিনের সূর্য দেখতে পায়নি।

 

উহ! শরীর ঘামছে। আবার চলে যাচ্ছে যাযাবর ডিমনেশিয়া। আবার ১, ২ মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ট্রলি শূন্য। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। স্মিত মুখ। খুব করুন মমতা নিয়ে জানতে চাইছে শরীর খারাপ করছে কি না?

পূরবী, আজ কিছু কিনব না। বাসায় চলে যাচ্ছি।

আপনার বাসা  কোথায় স্যার?

বিস্মিতভাব নিয়ে জানতে চাইলো সেলস এসিস্ট্যান্ট।

 

স্যার শব্দটা ভীষণ এলোমেলো লাগলো এখানে। একটা ঠিকানাও  তো মনে পড়ছে না। শেষে কোন এক বইয়ের পাতা থেকে এলোমেলোভাবে বললাম,

আমি বুদ্ধদেব। ২৫, র‌্যাংকিন স্ট্রিট। অবশ্য আমরা খুব শীঘ্রই ওদিকে চলে যাচ্ছি।

:কোথায়?

৪৭, পুরানা পল্টন।

 

ওর বিস্মিত মুখ গোধূলিরঅবসন্ন  ম্লান রঙ ধারণ করলো বলে মনে হলো। মুখটি আকাশের দিকে উড়ে গেলো।

কোনদিন বৃষ্টি হলেই, আর ব্যাঙ ডাকলেই সে নেমে আসবে। বুদ্ধদেব-পুরবী নেমে আসবে।

আমিও বাইরে যাব।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

স্পর্শক্ষয় ও আমাদের দিনকাল | কাজী নাসির মামুন

Sat May 23 , 2020
স্পর্শক্ষয় ও আমাদের দিনকাল কাজী নাসির মামুন 🌱 জীবনঘাতী করোনা আমাদের ঘরমুখী করেছে। অফুরন্ত অবসর। ফলে, ঘোরবদ্ধ হওয়া আমার জন্য স্বাভাবিক ছিলো । এই কবিতাগুলো সেই ঘোরের ফল। বলা যায়, একটা দীর্ঘকবিতার টুকরো কিছু অংশ এখানে দেওয়া গেলো। শিরোনাম পরে অবশ্য পরির্বতন হতে পারে। এখন নাম দেওয়া গেলো ‘স্পর্শক্ষয় ও […]
Shares