স্পর্শক্ষয় ও আমাদের দিনকাল | কাজী নাসির মামুন

স্পর্শক্ষয় ও আমাদের দিনকাল

কাজী নাসির মামুন

🌱

জীবনঘাতী করোনা আমাদের ঘরমুখী করেছে। অফুরন্ত অবসর। ফলে, ঘোরবদ্ধ হওয়া আমার জন্য স্বাভাবিক ছিলো । এই কবিতাগুলো সেই ঘোরের ফল। বলা যায়, একটা দীর্ঘকবিতার টুকরো কিছু অংশ এখানে দেওয়া গেলো। শিরোনাম পরে অবশ্য পরির্বতন হতে পারে। এখন নাম দেওয়া গেলো ‘স্পর্শক্ষয় ও আমাদের দিনকাল‘।

১.
পৃথিবী মুহূর্তকাল; সময় মন্থনে
মানুষ বুদ্বুদ মাত্র। অথচ দাম্ভিক।
মাছি মারে, লঙ্ঘিত সীমায়
সে দেখে না পিঁপড়ের খুন;
পাখির হনন তার আনন্দ-অভ্যাস।
অনন্ত সুরের ছায়া লুপ্ত বলে
আজ হাহাকার; আজ বধির বৃক্ষের
নিচে ঠাঁই নাই; একা হতে হতে
নিজের বিবরে ঢুকে গেলে
তরঙ্গবঞ্চিত নদী ডাকে
আমরা পারি না সাড়া দিতে।
মৃত্যুর নিজস্ব কড়িকাঠে
নিজের আগুন নিয়ে নিজেরা লুকাই।

২.
হৃদয়ে করোনাকাল; জড়িয়ে ধরার
প্লাবন স্মৃতিকে ভুলে ভেসে যাই
স্পর্শের অনেক
দূরে,  সাবান একটা
নদীর কিনার ; ওইখানে হাত ধুই।
চুম্বন বিনষ্ট পাতা, ঝরে গেছে।
পরাস্ত প্রান্তরে একা আছি।
ভাবছি এটাই
ঘর; বউকে আমার
মনে পড়ে, মনে পড়ে নিহিত খণ্ডন
সব ছেলে পুলে। আহা, কই তোরা, কই?
মায়া লাগে।  মায়া হলো
মেঘের দূরত্বে
থাকা
একটা শলিক।

৩.
আমি কতদিন জীবন নামক পরিধির
প্রান্ত খুঁজে খুঁজে
শালিক বনের বাঁশপাতা
বিকল্প ভেবেছি।
বাঁশপাতা একটা সবুজ চাকু, সেই রঙে
আচ্ছন্ন বাতাস ঝির ঝির
কম্পনে জেগেছে;
বলেছে, জীবন্ত রেখা, তুমি
বৃত্তের ঘূর্ণনে বেঁচে থাকো, পরিধির সব বিন্দু
কেন্দ্রের নিজস্ব পাখি; ডানায় লালিত
কত মেঘ, ঝঞ্ঝা, বজ্রনিনাদ সফল
শ্রমের বিদ্যুতে জীবন রাঙায়।
রঙ খুঁজো, রঙে রঙে সয়লাব
আত্মার সকল ফুলে
ভ্রমর বসবে মধু নিতে।
ওটা মৃত্যু। ওকে গন্ধ দাও!
শুধু গন্ধ দাও!

৪.
জগতের সকল প্রলেপ মধুময়।
তাকে ঘিরে শৃগাল-চতুর সব ক্ষমতার নাম।
বৃক্ষের আদৃত লোকালয় মুছে দিয়ে
কেবল গড়তে চায় পরান্ন-প্রাসাদ।
বুকে যার পাতার লানত
নদীর বিপক্ষে তার উদ্ধত সংঘাত।
পাখির লাশের পাশে
শুয়ে আছে পরাহত গান।
ব্যর্থ সুরারোপে
আমাদের মদের গেলাস
বিরূপ হাসির এক লাঞ্ছিত বিদ্রূপে
যত্রতত্র ফেলে গেছে অভিন্ন উদ্বেগ।
ইতিহাস বিবর্ণ পাতার দেশে নতুন অতীত।
পত্রস্থ সংগ্রামে চিরকাল বুকে নিয়ে
মৃত্যুর ধকল, শেষ হয় বিভেদের চারুপাঠ।
দেশ থেকে দেশান্তরে সুড়ঙ্গের বিরূপতা নিয়ে
মানুষ ছড়িয়ে দেয় নিজের বিকার।

৫.
দূরে র’বো?  নীল গাঙে অভিমান আকাশ-মলিন?
কবে বাড়ে, বলো মেঘ, পৃথিবীতে আমাদের ঋণ?
পল্লবিত অবসর, বিছানায় হাওয়াদের গাছ
বউ-পাখি ডালে নেই, রাঁধে একা-থাকা মাছ।
আমিও একাই থাকি, শুয়ে বসে একাকীত্ব খাই
সবাই আলাদা ঘড়ি, সময়ের অসুখ চিবাই।
অগনিত ছুঁয়ে থাকা মেঘ-জমা শালিক-ডানায়
স্পর্শ কি মায়া-ভূঁত? পলে পলে বিভেদ ছড়ায়?
দূরত্ব আপন হলো, মর্মময় প্রেমের সকাল
কড়া রোদ আমি চাই, চুমু দেবো দুপুরের গাল।
ছায়া চায় সূর্য-কেলি, আলোদের ঝিলিক-শরীর
দোহাই কিরণ-মাঝি, এনে দাও নিকটতা-ভিড়।
গুম গুম প্রেম জমে, জমা হয় মানুষের হাত
মনের গহীনে জমে হ্যান্ডশেক, মায়ার আঁতাত।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কবিতার কথা | জীবনানন্দ দাশ

Sat May 23 , 2020
☘️ সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকীরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা […]
Shares