চূর্ণচিন্তন | ধারাবাহিক গদ্য ২ 🌱 মতীন্দ্র সরকার

চূর্ণচিন্তন

ধারাবাহিক গদ্য ২

🌱

মতীন্দ্র সরকার

এক

ভালবাসা, ভালবাসগৃহ বললে অন্যথা হয় না। এরই অন্যতর অর্থ, অন্যজনকে অথবা বস্তুকে, কিংবা অঞ্চল বা এলাকাকে নিজের করে পাওয়ার প্রয়াস। আমরা অন্যকে বন্ধুত্বের বা বন্ধনের প্রয়াসে আবদ্ধ করতে চাই। মানুষ আমরা বসনে, ভূষণে, প্রসাধনে, কথাবার্তায় অপরকে বিমুগ্ধ করে আমার প্রতি আকর্ষণ করি। আকর্ষণেই বন্ধুত্ব বা বন্ধন তৈরী হয়। এটাকেই আমরা বলি ভালবাসা। ভালবাসা নিঃস্বার্থ নয়, অন্যতর স্বার্থ এর সঙ্গে বর্তমান। গাছে যখন ফুল ফুটে, গন্ধে ভরে উঠে, কিংবা রঙের মাধুর্যে অপরকে মুগ্ধ করে, তখনও তার লক্ষ্য একটাই, অপরকে(কীটপতঙ্গ) আকর্ষণ করে বংশ বৃদ্ধির আয়োজন করা। পশুপাখীর দেহে যখন যৌবন আসে , অপরকে আকর্ষণ করার মত সৌন্দর্যে ভরে উঠে তখনো তার অন্তর্নিহিত অর্থ ( যা প্রকৃতির লক্ষ্য) বংশ বৃদ্ধি করা। মানুষ আমরা প্রতিনিয়ত অপরকে বিমুগ্ধ করতে চাই। কখনো স্নেহমমতাভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করি, কখনো প্রয়োজন সাধনের নিমিত্ত অপরের প্রকৃষ্ট শংসা (প্রশংসা) লাভে ধন্য (ধনের দ্বারা পরিপূর্ণ) হই। এরও লক্ষ একটাই। আমরা কখনই আমার অপকৃষ্টতাকে প্রকাশ করতে চাইনা। অন্যের চোখে আমার কৌসিত্বকে গোপন করে সৌন্দর্যকে প্রকাশ করি এরই জন্য বসনভূষণশিল্প সাধনা। আমরা প্রাণী মাত্রই বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য্ গ্রহণ করি। বসতি আর বসন নিজেকে সুরক্ষার জন্য। প্রকৃতিও তাই করে থাকে। মানুষের ভাষা আর ইচ্ছাঅনিচ্ছা সমাজ থেকেই আহরিত। আমরা ভাষার সাহায্যেই চিন্তা করি আর স্বপ্ন দেখি। আমাদের চারপাশে যে অজস্র বস্তুরাজী ক্রিয়া কর্মের ফসল সবই সামাজিক ভালবাসায় ধৃত।

দুই

প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্টক্রিয়াকর্মের বাইরে যারা অনায়াস নৈপুণ্যে কৃতিত্ব প্রদর্শন করে থাকে তাদের কাজের মূল্যায়ন করাটা যেমন দুরূহ তেমনি না করাটা সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নৈতিক অপরাধ বলে চিহ্নিত হতে পারে। সমাজমানসের বহি:প্রকাশ ঘটে থাকে কতিপয় স্বত:স্ফূর্ত মানসের ক্রিয়াকর্মে। কাজগুলো সকলের দ্বারা সম্ভব হয় না। কোটিতে গুটি, কয়েক জনই ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে বা এর সঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকে। যদিও তাদের ক্রিয়া কর্মের পশ্চাতে লক্ষকোটি জনতার মানস ক্রিয়াশীল, তবুও তারা, একমাত্র তারাই বিশেষ বিশেষ প্রবণতার কারণে বা নির্লোভ প্রয়াসে অপূর্ব সৌন্দর্যময় বস্তুর সৃজন করে থাকে। যা সমাজের সকলের জন্য কল্যাণের জনক।। যারা সকল কৃতিকর্মে রত থেকে সফল তারা ধন্য। সফল না হলেও যারা এর মূল্যকে অনুধাবন করতে পারে তারা অসাধারণ। বাঁধা পথের ক্রিয়াকর্মে যারা সাফল্য লাভ করে তাদের পুরস্কার দিতে সমাজ কুণ্ঠিত হয় না। অর্থ আর সম্মানে সমাজ তাদের ভূষিত করে। কিন্তু যারা বিরল পথের পথিক তাদের সংবর্ধনা জ্ঞাপনের লোক বড় বেশি পাওয়া যায় না।

তিন

মানুষ নিজের মুখশ্রী কখনো দেখতে পায়না। দেখতে হয় দর্পণে। তেমনি কারো নিজের দোষ বা গুণ প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়্ এটাও অনুভব করতে হয় অন্যের অনুভব থেকে। মানুষ কখনো তার নিজের মন্দ বা সমালোচনা শুনতে নারাজ। প্রশংসা শুনতে মানুষ মাত্রই ভালোবাসে , যদিও নির্ভেজাল বা নিরাবরণ প্রশংসা খুব কমই পাওয়া যায়। যারা প্রশংসা করেন অন্যকে খুশী করার জন্য তারা অতিশোক্তিই করেন। আর যারা নিন্দা করেন, তারাও তাই করে থাকেন। ব্যপারটিতে কোন না কোন রাগবিরাগ জড়িত হয়ে থাকে। রাগবিরাগের ঊর্ধে উঠে কারো মূল্যায়ন করতে পারাটা সুকঠিন। কিন্তু তা অসম্ভব নয়। স্থিতধী ব্যক্তির পক্ষে কোন মানুষের মূল্যায়ন করা অনেক বেশি সঠিকতার পর্যায়ে পড়ে। স্থিতধী ব্যক্তি মোহমুক্ত মানুষ। লোভ বা নিন্দা প্রশংসায় কিংবা ভীতিতে যিনি বিচলিত হন না তাকেই হয়ত বা স্থিতধী বলা চলে। এমন ধরনের মানুষকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হলেও তার কাছাকাছি জনকে খুঁজে নিতে পারা অসম্ভব নয়। কিংবা কতিপয় ভালো নির্ভেজাল বুদ্ধিমান মানুষের মতামতকে ব্যাপারে প্রাধান্য দিতে পারা উত্তম।

চার

আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রে দুটি জগৎ : একটি জানার, অপরটি মানার। মানার জগৎটিই বৃহত্তর। আমরা যে ভাষা শিক্ষা করি সেটি মানার মাঝে সীমাবদ্ধ। এটি এমন কেন, এটি সঙ্গত কিনা সে প্রশ্ন আমরা করিনা। আমরা মেনে নেই। যা কানে শুনতে পাচ্ছি চোখে দেখতে পাচ্ছি তাই মেনে নেই। মেনে নেয়ার মাঝেই তৈরী হয় আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি। বিজ্ঞান আসে যুক্তিতর্কের পথ ধরে। সেখানে আছে বিচার বিশ্লেষণ , সত্যাসত্য নির্ণয়। কাল থেকে কালান্তরের পথে তা গড়ে উঠে। ব্যক্তিগত ভাবে একটি মানুষের জীবনে যেমন প্রশিক্ষণের কাল শেষ হয়ে আসে, বিশ্বাসের মেনে নেয়ার জগতের ক্ষেত্র সংকীর্ণ হয়ে আসে, কিন্তু জানার শেষ হয় না, মানারও শেষ হয় না। বয়স্ক মানুষ বা বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন সমৃদ্ধ মানুষ সব কিছু মেনে নেয়না, বিচার করে মেনে নেয়। এটাই বিজ্ঞান। কিন্ত ভিত্তি হল নির্বিচারে মানা জানা। এটাকেই আমরা বলতে পারি পরিবর্তনশীলতা। চিন্তার জগতে পরিবর্তনশীলতার আবির্ভাব সভ্যতার উন্নয়নের যুগে। সভ্যতা যতই এগিয়ে চলেছে মানুষ ততই বিচার করে চানতে মানতে শুরু করেছে। বিচার বিশ্লেষণের পথ ধরে যখনই মানুষ অগ্রসর হতে শুরু করে সেটাই বিশেষ জ্ঞানের বা বিজ্ঞানের কাল। মানুষকে মানুষের সমাজকে যে দুই ভাগে ভাগ করা হয় তা অসভ্যতা সভ্যতার কাল। অসভ্যতা কেবলই মেনে নেয়া, সভ্যতার কালে এসে মানুষ বিজ্ঞানের বা বিচারের পথ ধরে মেনে নিতে শুরু করে।

পাঁচ

এককালে আরণ্যক যুগে সমাজের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকগণ নিয়ম প্রবর্তন করতেন এবং তাতেই সমাজ পরিচালিত হতো। মানুষ নিয়ম মেনে চলত বলে অপেক্ষাকৃত ভাল নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারত। সেটাকেই ভারতীয় পরিভাষায় বলা হয় ব্রাহ্মণের যুগ। অর্থাৎ যারা ব্রহ্মজ্ঞানী, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তথা সমকালীন পরিপার্শ্বকে জানত তারাই নির্দেশকের দায়িত্ব পেতো। তারপর প্রযুক্তির ক্রমোন্নতির ফলে সমাজ বদলে গিয়ে এলো রাজাদের যুগ। তারা অস্ত্রের সাহায্যে তথা গায়ের জোরে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতো। সে যুগে আরো উন্নততর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। এর দলপতিগণ অস্ত্রধারী লোকদের সমবেত করে সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতো। তাদেরকে অস্ত্রচালনায় হুকুম মানায় অভ্যস্ত করে তোলা হতো। এমন ভাবে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো যেন তারা হুকুম বা আদশ ছাড়া কিছু করতে না পারে। যারা কেবলমাত্র মানবে, জানবেনা কিছুই, সমাজের শাসকগোষ্ঠীর তাদেরকেই প্রয়োজন। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রমিক শ্রেণীকে রাখা হতো নির্বোধ করে। তারা যদি বিদ্যা শ্রবণ করতো তবে তাদের কানে শিশা জাতীয় পদার্থ ঢেলে দেয়া হতো। বিদ্যা বা জ্ঞানের কথা বললে তাদের জিহ্বা কেটে নেয়া হতো। অর্থাৎ যারা কাজ করবে তাদেরকে দক্ষ হতে হবে, বিদ্বানবুদ্ধিমান হলে চলবেনা। সব কিছু মানতে হবে, জানলে হবেনা। এদেরকে ব্যক্তিস্বার্থে একদল মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে সম্পদ আহরণ করতো। ফরাসী বিপ্লবের কালে এসে রাজার পরিবর্তে ধনীব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাজ্য চলছে। একেই বলা হয়গণতন্ত্র অর্থাৎ ধনবানদের শাসন।

ছয়

সন্তোষই সকল সুখের মূল”—কথাটি আমরা বালক বয়স থেকেই ক্রমাগত শুনে এসেছি। সর্বসাধারণের একজন হিসাবে আরও বহু কাল যে তা শুনতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ কথা যারা প্রচার করেন তারা সমাজের দশজন। দশজন হিসাবে মানুষের যে অস্তিত্ব তাতে সমানুপাত সকলের জন্য কাম্য। সমাজ কামনা করে মাপমত মানুষযার বদৌলতে সর্বত্র নিস্তরঙ্গ ভাব সর্বদা বিরাজমান থাকবে। কিন্তু মাপের চেয়ে বড় মানুষ সমাজে জন্ম গ্রহণ করলে শান্তসমাহিত সমাজ হ্রদের বুকে তরঙ্গ উঠে অসন্তোষের কারণ দেখা দেয়। কাজেই মাত্রতিরিক্ত মানুষকে সহ্য করা মাপের মানুষদের পক্ষে অসম্ভব। তারা তার অস্তিত্বকে নানা ভাবে বিপর্যস্ত করে সমাজ কাঠামোকে ঠিক রাখতে চায়। পারে কি? কখনো কখনো, সকল সময়ে নয়। কাজেই আপ্তবাক্যের শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে বিধি আর নিষেধের প্রাচীর তোলে, সবাইকে নিজের অবস্থা নিয়ে সুখী থাকতে বলে, সন্তুষ্ট হতে বলে। কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু ক্রমাগত পাল্টায় বলে তাল মিলিয়ে সবাই সমভাবে সুখী হয় না। কেউ বেশি সুখ পেলে অন্যের সুখে টান পড়ে। সন্তোষ সকল সুখের মূল বলে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না। উপপ্লবের সৃস্টি হয়। তা ছাড়া একথাটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে সন্তোষ সুখের মূল হলেও প্রগতির কারণ নয়। স্মরণাতীত কাল থেকে কথা সত্য যে অস্থিরতা বা কোন কিছুকে নিয়ে সুখী নাথাকার ফলেই মানুষ সভ্যতা গড়ে তুলতে পেরেছে। মানুষের ক্রমাগত অস্থিরতা আর খুঁত খুঁতে মনমানসিকতাই নতুন থেকে নতুনতরের সন্ধানে মানুষকে নিয়োজিত রেখেছে। মানুষ কোন সময়েই তার বর্তমান অবস্থায় সুখী নাথেকে নতুনতর ভাব,নতুনতর কথা,নতুনতর কায়দা কানুন আবিষ্কার করে চলেছে। মানুষ যত বেশি সভ্যতার পথে অগ্রসরহবে তার প্রয়োজন তত বেশি বেড়ে উঠে তাকে অস্থির করে তুলবে। এভাবেই মানবসভ্যতা ক্রমাগ্রসরমান।

সাত

অনুকূল পরিবেশে বাস করতে চাওয়া জীবধর্ম। প্রাণী উদ্ভিদ উভয়েই তা করে থাকে। অনেক সময় সুবিধাসুযোগ থাকলেও কেন যেন পূর্ববর্তী পরিবেশে ফিরে যেতে মন চায়। এটাও জীবধর্মেরই অন্তর্গত। কারণ পরিচিত পরিবেশ তো জীবধর্মের অনুকূল। প্রাণীকূল প্রকৃতির নির্দেশে পরিচালিত হয়। ঋতুভেদে বাসস্থান ত্যাগ করে। আবার ফিরে আসে। হংস বা অনুরূপ কিছু কিছু পাখি দেশান্তরী হয়ে থাকে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। তাদের দেশ সমস্ত পৃথিবী। মানুষ আদিম অবস্থায় তা ছিলো না , কিন্তু পরিবেশের সংগে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা তার সকলের চেয়ে বেশি। অরণ্যে, পর্বতে, মরুতে, তুষারেপ্রবল উষ্ণতায় আর প্রবল শৈত্যে মানুষ বাস করে প্রমাণ করেছে যে সে টিকে থাকার মত উপযুক্ত প্রাণী। বর্তমান কালে মানুষ যে সঙ্কটের মুখোমুখী হয়েছে তা তার অধিকারে পাওয়া অমিত শক্তির সঙ্কট। শক্তিকে সে কেমন করে কাজে লাগাবে সেপ্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যেহেতু মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী তাই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে তার অনেক দিন লাগবে না। ব্যক্তিগত লোভকে জয় করেই মানুষ সঙ্কট কাটিয়ে উঠবে।

আট

প্রতিটি মানুষের মুখাবয়ব যেমন আলাদা , তেমনি ব্যক্তি মানুষের স্বভাব। স্বভাব মানে হল নিজের ভাব। এটি একান্ত ভাবেই তার নিজের বলে অন্যের থেকে আলাদা। কিন্তু মানুষ যেহতু সামাজিক জীব তাই সমাজ থেকে তাকে গ্রহণ করে সামাজিক মানুষ হয়ে উঠতে হয়, সেটা প্রভাবজাত। যেমন মানুষের ভাষা। সেটা তাকে সমাজ থেকে শিখে নিয়েই অগ্রসর হতে হয়। সমাজ তাকে মানুষ করে। প্রকৃতি তাকে প্রাণী হিসাবে জন্ম দেয়। কিন্তু সমাজে বাস করেও নিজ্স্ব বৈশিষ্ট্যে সে স্বাতন্ত্র্য মণ্ডিত। তার কণ্ঠস্বর, আচারআচরণ, ভাললাগামন্দলাগা—- এর মাঝে সমাজকে অতিক্রম করে তার রুচিবোধ বা স্বভাব প্রতিফলিত হয়। একজন ব্যক্তিমানুষ যে যে বৈশিষ্ট্যে অনন্যসাধারণ বা স্বতন্ত্র সেটাই তার স্বভাব। মানুষকে চিনতে গেলে তাকে তার স্বাতন্ত্র্য দিয়েই তাকে চিনতে হয়। সমাজে বাস করেও সামাজিক আচার আচরণকে ধারণ করেও সে যখন তার নিজের মত করেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা তার বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব। স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যের বদৌলতেই প্রতিটি মানুষ সমাজে বাস করেও আলাদা। ভাষার মাধ্যমে বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামাজিক ক্রিয়াকর্ম আহৃত হলেও আপন বৈশিষ্ট্যে সে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হয়। এটাই সমাজ অগ্রগতির বা পরিবর্তনের মূল কথা। স্বভাব প্রভাব মিলেই ব্যক্তিমানুষ, সামাজিক মানুষ হয়ে উঠে সমাজের পরিবর্তনকে সহায়তা দান করে। সামাজিক মানুষ হয়ে উঠার জন্য প্রভাব বা প্রশিক্ষণ মানুষকে পরিবর্তিত সমাজের মানুষ রূপে গড়ে তোলে এবং সেখানেই আমি হয়ে উঠি আমরা।

নয়

জীব জগতে একমাত্র মানুষই পরিকল্পিত ভাবে উৎপাদন করে সে উৎপাদনের জন্য হাতিয়ার প্রয়োজন। হাতের সম্প্রসারিত রূপই হাতিয়ার। হাতিয়ার প্রয়োগ করতে গেলে পরিকল্পনার প্রয়োজন তাতেই প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে উৎপাদন সম্ভব হয়। উৎপাদনের মূলে আছে হাতিয়ার তথা যন্ত্র। তা থেকেই উন্নততর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। বর্তমান যুগ যে কলের যুগ তার মূল কথা হল হাতিয়ার। চিন্তার সঙ্গে হাত বা হাতিয়ার যুক্ত হয়েই উৎপাদন। সে উৎপাদনকে পারস্পরিক সহায়তায় মানবকল্যাণ বা সামাজিক কল্যাণ। তারই বদৌলতে অর্থনীতি আর রাজনীতি। আত্মস্বার্থে নিমগ্ন মানুষই সমাজে বিভেদ তৈরী করে মানুষকে মূর্খ রেখে শাসন আর শোষণ করে চলেছে। কখনো সে শোষণ চলে অন্ধবিশ্বাসের নাম, কখনো বা অস্ত্রের পথ ধরে। কিন্তু মানুষকে মূর্খ রাখাই হল মানুষকে শোষণ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।

দশ

( কর (হাত ) থেকে করা, তা থেকেই কলা (শিল্প ) মানুষ করে বলেই তা কলা বা শিল্প। করার ভিতর দিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন সাধিত হয়ে চলেছে বলে এক শ্রেণীর মানুষ কলার পরিণতিতেই কলিকালকে প্রত্যক্ষ করছে। অন্য দিকে কলই কালকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কল যুগ পরিবর্তনকে দ্রুততর করে বলেই কলিকাল বা কলের কাল মন্দ। কলের কাল হল Age of Technology. কল মানব জীবনকে দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত করে চলেছে এবং মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে এসেছে। থেকেই কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। কারো কারো দৃষ্টিতে যন্ত্র থেকেই যন্ত্রণার উদ্ভব। এটাও তো কলেরই অন্য নাম। এরা পরিবর্তনকে ভয় পায়। প্রগতিকে যে কোন ভাবে ঠেকাতে পারলেই , কিংবা বিলম্বিত করতে পারলেই এরা নিজেদেরকে কৃতিত্বের অধিকারী বলে মনে করে। তাই তাদের কাছে কলিকাল যেমন অবাঞ্ছিত , তেমনি তা যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আমরা জানি মানবপ্রগতি কল আর যন্ত্রেরই অবদান।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ধ্রুবপুত্র | অমর মিত্র

Tue May 26 , 2020
ধ্রুবপুত্র | অমর মিত্র 🌱 আমার উপন্যাস ধ্রুবপুত্র-র সময় ছিল ২০০০ বছর আগের ভারতবর্ষ। পটভূমি প্রাচীন উজ্জয়িনী নগর। এই উপন্যাস ছিল এক নগরের কাহিনি যা বহু বছর ধরে অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে। উপন্যাসটিতে উল্লেখিত ছিল রেশম পথ, পুরুষপুর (পেশোয়ার, বর্তমানে পাকিস্তান), গান্ধার দেশ (আফগানিস্তান), হিন্দুকুশ পর্বতমালা, বাহ্লিক দেশ (বালখ), গ্রিক উপনিবেশ, অক্সাস […]
Shares