চূর্ণচিন্তন | ধারাবাহিক গদ্য ৩ | মতীন্দ্র সরকার

চূর্ণচিন্তন | ধারাবাহিক গদ্য ৩

মতীন্দ্র সরকার

🌱

এক

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নিত্য ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে সহকার শব্দ ব্যবহারের একটি প্রবণতা বর্তমা্ন সে জন্য বলা হয়ঃ কতা(কথা)-টতা, খাওয়াটাওয়া, খেলাটেলা, খইটই, দইটই, গানটান,গর(ঘর)-টর, চডাটডা, ছেলেটেলে, জলটল, ঝালটাল, পানটান,পড়াটরা, ফাকিটাকি, বইটই, বালাটালা, মনটন, রঙটং, শালাটালা, ইত্যাদি। এভাবেই আমরা বহুবচনাত্মক শব্দ সর্বদা ব্যবহার করে থাকি। শুদ্ধ উচ্চারণ বলে যে সকল পদ্ধতি আমরা তথাকথিত শিক্ষিত বা ভদ্রলোকগণ ব্যবহার করে থাকি তার মাঝে রক্ষণশীলতার একটি প্রবণতা বর্তমান। এর প্রয়োজন আছে সমাজকে ধরে রাখার জন্য। পরিবর্তন যত কম হবে, পুনরাবৃত্তি যত বেশি হবে সমাজ চালানো তত সুবিধা। সে জন্যই আমরা বলে থাকি এটাই আমাদের ঐতিহ্য বা ট্র্যেডিশান। আচারআচরণে নিত্যদিন যদি আমরা ঐতিহ্যকে ধরে রাখি তবেই সমাজে চলা সুবিধাজনক। পরিবর্তমান আচার আচরণকে আমরা পছন্দ করিনা বলেই যন্ত্র, যা পরিবর্তনের উপায় তা যন্ত্রণা হয়ে উঠে। কিন্তু পরিবর্তন হবেই। নিত্যদিন আমরা আমাদের অজান্তেই পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছি। এটাই প্রগতি। প্রগতি বিশ্বব্রহ্মান্ডের নিয়ম। কিন্তু প্রগতিকে সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশই সচেতন ভাবে গ্রহণ করে থাকে। সমাজের বৃহত্তর অংশ বলতে থাকেঃ যেভাবে চলছে চলুকনা। কিছু মানুষ মনে করে বর্তমানের চেয়ে অতীত কালটাই ভাল ছিলো। তাকে ফিরিয়ে আনতে পারলেই কল্যাণ। কিন্তু সেটা যে কোন দিনেই সম্ভব হবেনা তা বিদ্বানবুদ্ধিমানপ্রগতিশীলগণই উপলব্ধি করে থাকেন।

 

দুই

মূর্খের হৃদয়ে আছে শান্তি নেই আনন্দের কণা
দায়িত্ব কর্তব্য বোধ তোলেনা কালো ফণা।
মূর্খ তাই পরিতৃপ্ত।
সেই সুখ পরিহার করে
মানুষ এসেছে আজ বন্যতার অনেক উপরে।।
(আসাদ চৌধুরী)
কবির বক্তব্যে, যাদের চিন্তাচেতনা বিজ্ঞানভিত্তিক নয়, তাদের কথাই বলা হয়েছে। বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে যাদের চিন্তাচেতনা অগ্রসর হয় তারাই দার্শনিক, অর্থাৎ দর্শনে সক্ষম। তারাই সত্যকে দেখতে পান। মিথ্যাকে আশ্রয় করে যে দর্শন তা ভ্রান্ত দর্শন। সেটাকেই বলা হয়ে থাকে ভাববাদী দর্শন। ভাববাদী দর্শনে অন্ধত্বকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। এর ভিত্তি যুক্তি বা বিজ্ঞান নয়, বিশ্বাস। বলা চলে অন্ধ বিশ্বাস। যারা নির্বিচারে কোন কিছুকে মেনে নেয়, তারাই ভাববাদী দর্শনকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার মাঝে প্রাগ্রসরমানতা নেই , আছে অনুবর্তন

 

তিন

মানুষ যখন হাত দিয়ে কিছু করতে শুরু করল সেটাই কালকে অগ্রসর করে কল হয়ে উঠল। তা থেকেই কলি কাল। অর্থাৎ কলের কাল। কলিকাল যেমন কলের কাল বা যন্ত্রের কাল, তেমনি যারা অগ্রমানতাকে পছন্দ করেনা তাদের কাছে সেটাই হয়ে উঠল যন্ত্রণার কাল। (অর্থাৎ যন্ত্র নাএর কাল) কলা বিদ্যার উদ্ভব এই কল থেকেই। সেখানেও কর বা হস্ত বর্তমান। মানুষ যা করে তাই কলা বা সংস্কৃতি। এভাবেই চৌষট্টি কলার উদ্ভব। ইংরেজী ভাষায় ব্যবহৃত Art শব্দ Artificial এরই খণ্ডিত রূপ শৈল্পিক ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে মানুষ যেমন কালের পৃষ্ঠায় নিজেকে স্থাপন করেছে, তেমনি সভ্যতাকেও এগিয়ে নিয়ে চলেছে। মানুষের সবচেয়ে বড় এবং প্রাথমিক শিল্প বা সংস্কৃতি হল কথা। বল বা শক্তি প্রয়োগ করেই মানুষ কথা বলে তাই সেটা হল বল থেকে বলা। একে অন্যের কথা শুনে শুনেই ভাব বিনিময় আর সভ্যতার অগ্রমানতা। মুখে উচ্চারণ করারই অপর নাম পড়া। পড়া আমরা কানে শুনি বলেই পড়াশোনা। কালান্তরে লেখাপড়া

 

চার

মানব সমাজে প্রতিটি মানুষই সর্বদা অপরের জন্য কাজ করে থাকে। নিজের জন্য কেবল মাত্র, খাবারটি আপন মুখে তোলে দেয়। প্রতিটি ব্যক্তি কথা বলে অপরকে জ্ঞাপন করার জন্য। প্রতিটি ব্যক্তি দিনরাত্রি পরিশ্রম করে চলে অন্যকে উপকৃত করার জন্য। ব্যক্তির পরিশ্রমের অন্ত নেই। অর্থপ্রাপ্তি একটি ফাঁকির ব্যাপার। মানসম্মান লাভ, মান্যগণ্য হওয়া এক ধরনের নির্বোধ আত্মতৃপ্তি। আত্মতৃপ্তি এক ধরনের অহংকার। অন্যকে দেখানোর জন্যই নিজের সাজসজ্জা। ব্যক্তি যখন মনে করে আমার আভিজাত্য, বংশমর্যাদা, ধনদৌলত, এর জন্য আমি ধন্যএটি কোন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রত্যয় নয়। সমাজের লাভ হয়, সমাজ আমার সেবার জন্যই সামনে অগ্রসরমান ,বোধ যার আছে তিনিই মহাপুরুষ। তিনি অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও আত্মোপলব্ধির পথেই অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎকে দেখতে পান।

 

পাঁচ

যথার্থ শিক্ষা ভিন্ন সামাজিক দুর্নীতি দূর করা যাবেনা। শিক্ষার সঙ্গে এটাও সংযুক্ত করতে হবে যে লাভ আর লোভের আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্তিমানুষকে অপকৃষ্টতায় সংযুক্ত করে। প্রতিটি মানুষ যেমন সমাজ থেকে তার প্রয়োজনীয় সকল কিছু পায়, তেমনি সে যে ক্রিয়াকর্ম করে তাও সমাজের জন্যই। সম্পর্কে তাকে শিক্ষার মাধ্যমেই সচেতন করতে হবে। কেবল মাত্র লাভ আর লোভের হাতছানি শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে মানুষ করা যাবেনা। মানুষকে যথার্থ বিদ্বানবুদ্ধিমান না বানালে সমাজ থেকে দুর্নীতি অপরাধ বিদূরিত হবেনা। আমাদের আর্থ ব্যবস্থাই সকল অন্যায় দুর্নীতির মূল কারণ।

 

ছয়

পৃথিবীতে মানবসভ্যতার একটা পর্যায়ে এসে মতামতের প্রাধান্যের কারণে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সে দ্বন্দ্ব প্রবলতর আকারে বর্তমান কালে প্রবহমান। বিশ্বাসকে ভিত্তি করে মানুষ সম্প্রদায় তৈরী করেছে। দেশান্তর কালান্তরের কারণে এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস প্রথাগত পার্থক্য তৈরী হয়েছে। বিবর্তনের কারণে বিজ্ঞান দর্শনের বদৌলতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীতে বদল ঘটেছে কিছু কিছু মানুষ বিজ্ঞান ভিত্তিক নতুন নতুন সত্যকে দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরেছে। অন্যেরা, স্বার্থবাদী রক্ষণশীল মতবাদের ধারকবাহকগণ প্রগতিশীল মানুষের নতুন মতকে উপেক্ষা করছে সেসব চিন্তার ধারকবাহকগণকে প্রতিনিয়ত উৎপীড়ন করছে তথাকথিত বিচারের নামে হত্যা করছে। বিচার তো কোন কালেই নতুন মত বা চিন্তাকে সমর্থন করেনা। কিছু কিছু লিখিত পুস্তক তো কিছুদিন আগেও নানা কথা বলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রকৃতির ধর্মই হল পরিবর্তন অগ্রগামিতা। যারা রক্ষণশীল তারা পরিবর্তনে বিশ্বাস করেনা , পুরাতনকে ফিরিয়ে আনতে চায়।যা কোন দিনেই হবার নয়।

 

সাত

আমাদের আর্থব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে শহর সমূহের উদ্ভব। গ্রামের একান্নবর্তী পরিবার বর্তমানে ভেঙে ছোট হয়ে গেছে শহরগুলোতে। প্রত্যেকেরই স্বাতন্ত্র্য চিন্তাচেতনা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আর পুরানো প্রথাপদ্ধতি মেনে চলতে পারছেনা। ফলে পর্যায়ে কিছুটা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইচ্ছাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। কিংবা অন্যের সুখসুবিধাকে অস্বীকার করে নিজেরটাই চালাতে চাইছে। ফলে জীবনযাত্রার শৃঙ্খলা আর আগের মত থাকছেনা। বাংলাদেশের একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙনের কাল এসেছে ইংরেজ শাসনের সূচনা কাল থেকে। এর আর্থ ব্যবস্থা হল ধনতান্ত্রিক। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল কথা হল ব্যবসা। এখানে সবাই ক্রেতা এবং বিক্রেতা। ফলে সবাই চায় তার শ্রম বা পণ্য অধিক মূল্যে বিক্রয় করতে। ফলে বাজার ব্যবস্থায় একটি অস্থিরতা বিরাজ করতে থাকে। মূল্য বেড়েই চলে। শ্রমমূল্য বা চাকুরির মূল্য বাড়িয়ে সরকার এর মোকাবেলা করতে চায় বা ঠেকা দিতে চায়।

 

নয়

আমরা সমৃদ্ধ হই দেখাশোনা, জানাশোনা, পড়াশোনা,বক্তৃতাবিবৃতি লেখাপড়ার মাধ্যমে। আমরা প্রকৃতিকে দেখি সমাজের বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে শোনে জানি। তখনই আমাদের বিদ্যা লাভ হয়। জ্ঞান বিদ্যার মাধ্যমেই সমাজের সম্মিলন সম্প্রসারণ। জ্ঞান থেকেই বিজ্ঞান, আর বিদ্যা তো দানের পথে প্রাপ্তি। এর সব গুলিই সামাজিক। মানুষ সামাজিক জীব বলেই ভাষার পথ ধরে একেঅন্যে সম্মিলন, তার ফলেই জ্ঞানের সম্প্রসারণ আর সমাজের প্রগতি বা অগ্রগতি। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষ একে অন্যের সহায়তায় তথা সমাজিক সহযোগিতায় সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। চলার পথে যেমন নানা বাধা আসে, তেমনি সামাজিক ক্রিয়াকর্মে নানা অপকৃষ্টতা দেখা দেয়। আমরা সম্মিলিত ভাবে তার প্রতিবাদ করি বলেই অন্যায় অবিচারের অবসান হয়। বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তির কল্যাণে দেশদেশান্তরের মানুষের সঙ্গে সম্মিলনের পথ খুলে যাচ্ছে। আমরা পারস্পরিক সহযোগিতায় নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে পৃথিবীর মানুষ রূপে মানুষ হয়ে উঠছি।

 

দশ

বিদায়শব্দটির উদ্ভব আরবিআলবিদাথেকে। সংস্কৃতের আধারে শবদটিকে স্থাপন করলে এর অর্থ দাঁড়ায়বিগত হয়েছে দায় যার অর্থাৎ এতদিন তিনি যেসব কর্তব্য সম্পাদন করছিলেন এখন আর তার সে দায় নেই।দায়শব্দের মূলেও তো রয়েছে’, তার অর্থদান করা অর্থাৎ যিনি তার শ্রম দান করে এতকাল মানুষের বা স্বজনের বা আত্মজনের কল্যাণ করছিলেন এবার তা থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুক্তি ঘটল। আমরা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে কাউকে যখন বিদায় দেই তখন এভাবেই তাকে সম্ভাষণ করি। মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় এর পরিবর্তে যে শব্দটি ছিলো তা হলোঃমেলানি’, অর্থাৎ মেলে দেয়া বা সম্প্রসারিত করা। আমরা যখন কাউকে বিদায় দেই তখন তাকে সম্প্রসারিত করার প্রয়াস চালাই।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

লেখক ও তার সমাজ | স্বকৃত নোমান

Tue May 26 , 2020
লেখক ও তার সমাজ | স্বকৃত নোমান 🌱 একজন কবি একজন স্রষ্টা। একইসঙ্গে তিনি একজন ব্যক্তিও। ব্যক্তিমানুষ ও স্রষ্টামানুষ কি আলাদা? ব্যক্তিমানুষটি যদি চোর, ডাকাত, গুন্ডা, বদমাশ, লম্পট, ধর্ষক হয়, তাতে কি তার সৃষ্টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়? আমি বলি, হ্যাঁ, করা যায়। কিন্তু আপনি বলবেন, না করা যায় না। কারণ […]
Shares