কবিতা | করোনা সিরিজ থেকে | সাজ্জাদ সাঈফ

কবিতা | করোনা সিরিজ থেকে | সাজ্জাদ সাঈফ

🌱

গোল

(কবি শামীম রেজা, প্রিয়ভাজনেষু)

*

তারপর মরে-ঝরেগেলে, আকাশ-টানানোফুলে

পতঙ্গ-টাচ,বিনিয়েএসে,বসবে কবর-ধারে?

 

সমরাস্ত্রের ওজন ঘাড়ে, বিভূতি পাঠাবে মেঘ?

নাকি পৃথিবীর ক্ষুধা, পৃথিবীর দ্বিধা হেসে, চুপচাপ রবে, শরণার্থীর জিঞ্জিরে? 

অথবা শালুক জমে, নীল-নাগরিক মনে, হবে না গিমিক ছড়া?

 

একটা জীবন বেয়ে 

কতোভাবে গান গেয়ে

সময় সাঁতরে হেঁটে

কত শত ঘুণে কাটে

ঘুমের ঝিমুনি দাঁতে

একটা জীবন খেঁটে!

 

আজকে না হয় তুমি

কার বা কাদের মনের মত করে, এইধারা জীবন-ব্যামোকে

কাটিয়েগিয়েছো বলো!

 

বলো তুমি তার বা তাদের বাড়ানো বলে, মিসকরো নাইগোল?

 

কাছেইফারাও
*
আমাদের স্বপ্নের মুখ তালাবদ্ধ
প্রত্যাশার গলা ধরে ছোবল দিতেছে সাপ;


দূর কোনো গ্রামে ঢুকেপড়া অতিথিপাখির
বিপন্নতার মতো, ফ্যালফ্যাল করে আছে আমাদের চোখ!

 

আর জবানে জখম নিয়ে করতালিসমেত আমরা
হেসে উঠি মাঝেমধ্যে, যেহেতু প্রায়ই আমাদের

নগর-জীবন বাউন্সিপিচ; আমাদের বেঁচেথাকাটা

পোশাকি- প্রতিশ্রুতিরাহেঁয়ালি!

 

এরভিতর গভীররাতে শুনি

বীণার উজ্জয়িনী ও ফাতিহা কিরাত যেনো 

শাদা কবুতর কোনো মেঘলা জাদুর!

 

ডুমুর ধরেছে ডালে, লেবুগাছ কাছে পেয়ে
কাঠবিড়ালী, মগডালে উঠেগেলো একা!

 

বাক-ভণিতা পেরিয়ে আসি, সঞ্জিবনী হাওয়ার কাছে;

 

মৃতপ্রায় নদীটির সাথে দেখা, মৃতপ্রায় আছিয়ার সাথে দেখা;

কাছেই ফারাও, কাছেই কড়াই, ফুটন্ততেল!

 

বয়াতি

(কবি জুয়েল মাজহারকে উৎসর্গ)

 

সমস্ত গানের ভিতর

এক এক করে ঢুকে যাচ্ছে রাস্তার হর্ন-

 

আর, যেদিকটাতে ঘাস ও বিচালির ঘরদোর

যেদিকে সামার গিয়ে, দম নিতেছে বসে

সেই পাথারে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বপ্ন, খুলে ফেলছে হেডফোন!

 

কেননা, এখানে হাওয়া নিজেই নিরন্ন বয়াতি

যার কাছে ভাটিয়ালি আর পল্লীর সরবতা এসে 

বুক খুলে দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্ষত ও স্রোতের নিদান!

 

সমস্ত জলবায়ু তাকিয়ে রয়েছে

দক্ষিণেরজানালা খুলে, তুমি কিতরঙ্গ-মিথচাও? নাকিঐশ্বর্যের কৃপা?

 

নাকি, পৃথিবীকে সুপার শপে হাঁটতে দেখে ফন্দি আটছো কোনো? 

হাওয়ারভিতরবাধ দিয়ে, সমস্ত রঙ-পেন্সিল তুমি কেড়ে নেবে নাকি, গ্রামের? 

 

আত্মপক্ষাঘাত

(কবি রুদ্র হককে)

*

ঘুরে-ফিরে আসে অন্ধত্বের স্মৃতি, অহমিকা-ঢেউ লেগে ভাসমান তরী-

যেনো বুক থেকে ছুটে আসা বিরান হাওয়ার তোড়ে, ঝাউপাতা নড়ে গিয়ে 

আড়ালকরছে চাঁদ!

 

এইখান থেকে বেরোতে পারি না আমি, দিল-দরোজার সামনে থেকে; 

কান পাতলেই নিস্কৃতিহীন রাত-জাগরণ ডাকে, পৃথিবীর দিক থেকে ডাকে 

স্মৃতিরপশলা!

 

জ্বর ঘিরে থাকা অথৈ পুষ্পকাল

শিশিরে স্নিগ্ধ করে, ত্রিদিক শূন্য করে-

সব যেনো বালুঝড়ে ঢাকা, ফিরে আসে পিতার ভ্রূ-কুটি;

 

আর, যতসব মিথ্যাকে মগজ থেকে এনে, দাঁড় করে রাখো সত্যের মতো

সরু ও সবাক ধমনীতে!যতো হাসি-করতালি, কান্নাকে শুকানো

রিং-টোনেবাজে, ততোদূর নিরাময় নাকি?

 

ঘুমাক সকলে, এই ভেবে পাথর ভরেছো বুকে?

 

শেষমেশ দেখো, ভুলে থাকা ভাণের ধাক্কা লেগে

সারে নাকি আত্মপক্ষাঘাত? 

 

জন্মদিনের কবিতা

*

এই জন্ম ও জন্ম-জারক রাত্রি

টেনে ধরে আছে শেষতম নক্ষত্রকে;

ঢেউ খুলে দেখে নিলো কেউ, দেউড়ি নদীর-

 

এ-রকম কোনো এক রাতে, মাকে ডেকেছিলো

হাওয়া-নিরক্ষর; পণ করে যেনো খামচে ধরেছি আমি, জরায়ু-ধমনীমায়ের।

 

এই জন্ম ও জন্মবিধৌত স্বপ্নকে ডেকে

হৃদয়ে চেয়ার পেতে বসতে দিয়েছেন বাবা-

 

আমি নির্বোধ, থমথমে; যেনো কোনো ঝড়ে বিষুবতলায়, জমছে আয়ুর মেঘ!

বাবা ডাকছেন, জন্মকে একটি একটি করে স্মৃতি বুঝিয়ে দিয়ে; 

 

বাবা ডাকছেন, বুকের ভিতর হতে

আলপথ বের করে, ছুড়ে দিচ্ছেন এইদিকে, এই দিকটায় আমি; 

 

এই ত্রিদিক মেঘের ভিতর মা’কে

দেখি নাই হাস্যোজ্জ্বল, দেখি নাই কতকাল!

 

চলে তো যাবোই

(কবি জাহিদুর রহিমকে)

যাবার কথা হিলহিলিয়ে, যেনো শনপাপড়িরবাকশোভর্তি লাল- 

এইদিকে কেউকেউ মুখ ঘুরিয়ে কান্না লুকায় নাকি?                                                            

 

গাল বেয়ে নামে রোদ, ফিরে যায় বাগানে আবার-

কোথাকার জল আমি, কোথায় নেমে, গড়িয়ে গিয়েছি ভেসে!


কেনো বলোতবেআধাআধি বাঁচা? করুণাগাত্রে হাত?

চলে তো যাবোই, চোখ তুলে দেখতে পাবে না স্মৃতি?

চাপকল-পাড়, রেডক্লিফ-পেন, ঘুণধরে গিয়ে 

আলগা লাগছে আকাশ?

 

ধরো, তোমাদের প্রজন্মের দিকে এসে, দেয়ালে হেলান দিয়ে, ধার করছি আগুন;

অন্ন ও কাধের চাদর, তা’ও; এতোসব মায়া ও মোলায়েম ধানের গোছা, এমনিতে যেতে দেবে?

 

এরই ভিতর,দৃশ্যজুড়ে ক্ষত ও খরার বিরাম!

এতোসব আধাআধি বাঁচার গ্রামার, নিঃস্বতা, কাছে এসে হাত চেপে ধরে!

 

সবকিছুকেইচিহ্ন-বন্দী রেখে যাবো ভাবি, জানো?

সব চিহ্নের ক্যালিওগ্রাফি, নিত্য কালেমা-সহ;

নামের ফলকে, লিখে রেখে আমি, কোথাকার জল

কোথায় গড়াবো, বিরাম-বিহীন, আজান শোনাবে গ্রহ?

 

কবির কথাঃ

করোনা সিরিজ অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলা দিনলিপি জাতীয় কিছু নয় চলমান বৈশ্বিক করোনামারীতে, নিছক লেখাখেলা আর সব লেখাগুলার মতো। এখানে মালার্মে কথিতভাব নয়, কবিতার নির্মাণ হয় শব্দ দিয়েইএবং তার ঠিক বিপরীতে জার্মান কবি বার্নার্ড হেইনরিচ উইলহেম ভন ক্লাইস্ট কথিতযেমন ক্ষিদের ভাবনা আমাদের খাবার প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক তেমনই কাব্যচিন্তা কবিতার সৃষ্টি করে। আর সেই কাব্যচিন্তার ভিত্তি পরিপার্শ্বিক ঘটনার বিষয়।’ —বক্তব্যদ্বয়ের মাঝখানে হেঁটে, ঘুরে ফিরে আমার কথাগুলা ভাষার স্নেহ আরজ করে যা পেলো সেইসবই তুলে আনা আরকি।

এই সমস্ত লেখায় ব্যবহৃত নতুন কিছু শব্দবন্ধ সিনট্যাক্স এর স্বত্ব সংরক্ষিত। কাজবাজে ব্যস্ত দিনকালে রাত জাগরণ ছাড়া আসলে লেখা বা শিল্প নিয়া কাজকামের(পাঠ/পরাপাঠ/পর্যবেক্ষণ/চিত্রবিচিত্র অনুধাবনের নিমিত্তে আবশ্যক চিত্রনাট্য দেখাদেখি) সময় মেলে না বিধায় এদের(লেখাগুলার) নৈপথ্য সত্যিই বিধুর তবে ক্লিষ্ট নয়। করোনা সিরিজ বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতায় কি রকম কাজ তার হিসাব আমার কাছে নাই, আমার কর্তব্যও নয়। আমি প্রথম পাঠক এদের, যেভাবে আর সব লেখক। সময়কাল তীব্র যন্ত্রণায় গোঙরাচ্ছে, এর বেশি আর কিছু বলা গেলো না এই দফা। প্রার্থনা শুভ কামনা বাংলা ভাষাভাষী আত্মগত সকলের জন্য।]

 

লেখক পরিচিতি :

সাজ্জাদ সাঈফ কবি। জন্ম ১৯৮৪ সালে
যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়াতে। চিকিৎসা বিদ্যায় গ্রাজুয়েশন, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাবলিক হেলথ বিভাগে পোস্ট গ্রাজুয়েশন (থিসিস পার্ট অন অ্যাডিকশন সাইকোসিস এন্ড ইটস ডিজিজ প্রোসেস ইভ্যালুয়েশন ইন এসপেক্ট অফ মেন্টাল হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার সেন্টারস ইন বগুড়া সদর এরিয়া)

 

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: ‘কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা’ (২০১৭), ‘মায়ার মলাট’ (২০১৯), ‘ভাষার সিবিচে’ (২০১৯, ভারত), ‘বহুদিন ব্যাকফুটে এসে’ (২০২০)

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

লুফুন কাম্বাং চাই | চিলাপাতা সংলাপ |ডায়নাকাফে | কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য

Wed May 27 , 2020
লুফুন কাম্বাং চাই | চিলাপাতা সংলাপ |ডায়নাকাফে | কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য 🌱 ২০১০-এ ‘লুফুন কাম্বাং চাই। বাংলা ভাষায় বাংলা হরফে লেখা কৃষ্ণপ্রিয়’র প্রথম কবিতার বই। প্রকাশিত হয়েছিল, জলপাইগুড়ির পানপাড়াগার কবিতা জংশন থেকে। অধিকাংশ বাঙালি পাঠক বইয়ের নামেই প্রথম হোঁচট খেয়েছিলেন | লুফুন কাম্বাং …। বছরে হয়তাে একজন হঠাৎ বললেন, ‘জাত কবিতা’। […]
Shares