লুফুন কাম্বাং চাই | চিলাপাতা সংলাপ |ডায়নাকাফে | কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য

লুফুন কাম্বাং চাই | চিলাপাতা সংলাপ |ডায়নাকাফে | কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য

🌱

২০১০-এ ‘লুফুন কাম্বাং চাই। বাংলা ভাষায় বাংলা হরফে লেখা কৃষ্ণপ্রিয়’র প্রথম কবিতার বই। প্রকাশিত হয়েছিল, জলপাইগুড়ির পানপাড়াগার কবিতা জংশন থেকে। অধিকাংশ বাঙালি পাঠক বইয়ের নামেই প্রথম হোঁচট খেয়েছিলেন | লুফুন কাম্বাং …। বছরে হয়তাে একজন হঠাৎ বললেন, ‘জাত কবিতা’। ব্যাস, এইটুকু। 

 

অধিকাংশ বাঙালি কবিতাপ্রেমীভদ্রমণ্ডলীর কিছু এলোও না গেলেও না। কারণ বাংলা ভাষায় নির্মিত হলেও সেখানে তাে আর বাংলার তথাকথিত সমাজের কোনও গন্ধ নেই। সেখানে ছিল, উত্তরবঙ্গের বোড়ো জনজাতির এন্ডিবুড় এবং তার রাতের স্বপ্নাদেশ। বাংলা কবিতার বই অথচ সেখানে পাতায় পাতায় ঠিকরে পড়ছে সবুজ-সাভান্না গরুমারা জঙ্গলের মহাকালের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। 

 

একে তো এক সাংঘাতিক পাওয়ারফুল তিব্বতি মহাকাল! তার আবার মূর্তি-জলঢাকা-কুচি ডায়নার জলে ভেজা গরুমারার জঙ্গল! এরপর আবার ভুটান সীমান্তের মাকড়াপাড়ার আকাশের তারা। কোন মাকড়াপাড়া? কোথায়? তারপর একে একে তাদিং পাহাড়ের সাইঞ্জা ও ঈশপার জোড়াঢোল, কুচবিহারের পইলকা মেলা আর প্রভাতী স্নান কিংবা ধরা যাক, নিশিগঞ্জের মুষুরিয়া বৈদ্যর জাগ্রত জড়িবুটি ইত্যাদি ইত্যাদি। 

 

ভিক্টোরিয়ার হৃদয় নিয়ে, জন্ম নিয়ে, চমৎকার মৃত্যু নিয়ে, একাকীত্ব নিয়ে ভালােই তাে ছিল বাংলা কবিতা। ফলে পাড়ার মাঠে খেলা ছাড়া লুফুন কাম্বাং চাই’-এর কীইবা গতি! শুধু মহাশ্বেতা দেবী আর দেবেশ রায় বইটিকে তাঁদের বালিশের তলায় রাখলেন। ওঁদের পাশে ভয়ে ভয়ে বইটি আগলে রাখলেন জলপাইগুড়ির বিজয়, শিলিগুড়ির তপন রায় এবং কবির কতিপয় সখাসখিকুল। 

 

সেই ‘লুফুন-কাম্বাং চাই’ কিঞ্চিৎ পরিমার্জনা করে আর আরও কিছু অগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে অতঃপর ২০১৭ শুরু হতে না হতেই, শিবের গাজন সাঙ্গ হতে না হতেই, বৈশাখ পড়তে না পড়তেই কৃষ্ণপ্রিয়-র গােপন ডার্করুম থেকে বেরিয়ে এল বাংলা কবিতার এক নয়া খরবায়ু – ডায়না কাফে’। ডায়না কাফে-তে কৃষ্ণপ্রিয় এবার উপহার দিলেন ‘মিস চিলাপাতা’, ‘চাপড়ামারি হল্ট’, ‘পদ্মপুরাণ প্লাস’, ‘সনতসাহেব’, ‘আদম’, ডায়না ফাস্ট প্যাসেঞ্জার’ মার্কা বেশ কিছু আপাত-অস্পৃশ্য বাংলা কবিতা। কবি এখানে ঘন খুনিয়া বনের জংলি বাদামবাগানে ফোটা অতি-বেগুনি সব কথা বলা বুনােফুলের প্রতিবেশী, আগের মতােই আলােক-সন্ধানী এক খ্যাপা বাউদিয়া। এখানে নেওড়াভ্যালির মাঠে কৃষ্ণুপ্রিয়-র যুদ্ধ হয় বৃশ্চিক রাশির এক বেদগর্ভা জাদুকরের সঙ্গে। যুদ্ধ হয়, গােপন এক বনবাংলার অনন্ত পাণ্ডুলিপির সঙ্গে। কবি এখানে হায়হায়পাথারের রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর সঙ্গে গান গায়, ডান্স করে । নাচতে নাচতেই কৃষ্ণুপ্রিয় গাজলডােবার সব লকগেট খুলে দেয় আর ভাবে, করম রাজার ব্রত একদিন বাংলার জাতীয় সঙ্গীত হবে, কবিতার হাইওয়ে হবে। বাংলা আধুনিক কবিতায় সম্ভবত এই প্রথম মাটি খুঁড়ে বেরােল টিয়ামারি ঘাটের টারজান!

 

———————————————

 

ডায়নাকাফে

একটি হৃদয় আছে ভােরের চাপরামারির মত ঘন নীল কুয়াশায় ঢাকা

তাকে সব ডায়না নামে ডাকে জলের যে কত নাম, টাইটেল!

হৃদয় অপ্রকাশিত, তার মত ঈশ্বর নির্মিত সেতু নেই মানুষের

তার মত আদিগন্ত উত্তর-দক্ষিণ মিষ্টি দুপুরের নীরবতা। 

সংঘর্ষ-নির্মাণ জগৎ-জিজ্ঞাসা নেই মানুষের 

পূর্ণ শতবর্ষ বিস্তৃত তার নিজের রক্তজলভেজা সপ্তর্ষিমণ্ডল 

তাহারই ভাস্কর্যে ভিজে আছি… সেই জল সেই ভালবাসা

 

একটি ডায়না নদী, যেন তার রক্ত আছে মাংস আছে ইউরিয়া আছে 

যেন তিনি ক্যারন বাগিচার গান্ধারি স্মৃতি স্কুলে অআকখ পড়েছেন 

যেন তিনি এক্ষুনি পাথরের জেল ভেঙে 

নাথুয়ার অনন্ত চম্প্রমারির সুপুরির ছায়াবনে শ্যাম্পেন ছড়াবেন 

যেন তিনি দূরের ধ্রুবতারা ছুঁয়েছেন বারবার 

যেন তিনি বেদেরই এক আদি নদী 

প্রাচীন কার্পাস বন ভেঙে হেঁটে আসছেন একা যে

তিনি আদিম মেসোপটেমিয়া উদাসীন…

 

একটি ডায়না নদী, লীশ নয় ঘীশ নয়, জীবন্ত মাছেদের খেলাঘর 

আজ তার কালো নুনিয়ার ক্ষেতে কোনো ধান নেই

ডায়না তো নদী নয়, তাই কথা বলি, কী খবর?

যেরকম ধানসিড়ি লােরেটোর উঁচু ক্লাসে পৃথা…

 

এবছর কাফের জন্ম হবে ডায়নার কিনারায় বিশ্রাম বিনোদন হবে 

এ বছর বাংলার অটো সিগন্যালে সিগন্যালে 

ডায়নাই গাইবেন প্রতিমা বড়ুয়ার গােয়ালপাড়ার সব গান 

এ বছর মানুষের রক্তের শর্করা, শীতের হিমোগ্লোবিন মাপা হবে ডায়নায়

 

ডায়না তো শুধু এক সাদা-কালো নদী নয় 

পাথরে খোদিত এক রঙিন হৃদয়ের পলিমাটি 

এ মাটির পলিটিক্স যৌনজীবন নিয়ে কবিতা লিখবে বলে

বুধবারে দমনপুর হাটে যায় কেউ কেউ 

ক্যালেন্ডার পিঠে নিয়ে সেজেগুজে চিলাপাতা যায় কেউ কেউ 

কিন্তু এদের কারো কাছে মঘা দেওয়ানী সেই আদিমুন্ডারির বইখাতা নেই 

এদের কারো কাছে বনচুকামারির সেই চ্যাম্পিয়ন রাখালের নাম নেই

 

শিকাগো পাহাড় থেকে যে এক ফালি রোদ নেমে আসে

বাংলা অনার্স থেকে লক্ষ্মী বালিকারা যেই চাপাতলীর মাঠে যায়

ক্যারন প্রদেশের বাসন্তী চাঁদপাড়া চায়ের বাগান থেকে 

শূন্য-দৃশ্য এক নাটকের থিয়েটার থেকে যেই ভূমিকম্প আসে

তখন জন্ম নেয় নদী

 

ডায়না ও সেই এক আশ্চর্য শিলালিপি বাগুরুম্বার আকাশের তারা

তাহারই ভাস্কর্যে ভিজে থাকা …

তারই এক অনন্ত কাফের অন্ধকারে থাকা…

 

মিস চিলাপাতা 

(কবি শ্রী বিজয় দে-কে)

 

হেলেনকে দেখেছেন? হেলেন?

সত্তর দশকের আমাদের সকলের মিস চিলাপাতা হ্যাঁ, মিস চিলাপাতা … নাইন্টিন সেভেনটি ওয়ান …

প্রাচীন গোয়ালপাড়ার জলে গুল্মলতাপাতায় ভিজে ভিজে 

একাকী বৈকুণ্ঠপুর পার হয়ে একদিন 

পায়ে পায়ে ভুটকির হাট থেকে সন্ন্যাসীকাটার হ্রদের কিনারায় এসে 

সেই নারী প্রথমেই বলছিল, আই লাভ ইউ বলেছিল আঠারো হাজার ফুট ক্যাম্প থেকে আমি

প্রাচীন সড়ক ধরে করলা ভ্যালির দিকে ভেসে যাচ্ছি একা একা 

বলছিল, কি নামে ডাকবো তোমায়

 

হেলেনকে চিনে নিন । অবিকল চোট্টি মুণ্ডা, বাংলার টেরােড্যাকটিল

 

এই পান-তাম্বুল এই ফাটা ভুটকির 

ফেরিওয়ালার ঝুলির গহবরে গহ্বরে লুকায়ে জড়ায়ে আছে

সেই নারী মিস চিলাপাতা 

হেলেনই তো পুনর্জন্ম নিয়েছেন আন্দুতে-বানিয়ায় ঈ

রাভার ঘরে দুরন্ত চকতে চকতে জন্মেই চলেছেন বার বার

 

এবারও ভাদ্র-করমের ছুটি হবে

থেমে যাবে আমাদের তিনশাের মতাে সব চায়ের বাগান

আন্দু নদীর স্রোতে ভেসে যাবে করম রাজার ব্রত

 

চলাে কাম সেপ্টেম্বর

হেলেন চিনে নিন আর লাস্ট ক’টা দিন

প্রাইভেট ডায়নার নক্ষত্রের কিনারায় ঘাসে ঘাসে

রঙিন ডাকটিকিটের ছবি থেকে অনেক দূরের এক

দেশি নুনিয়ার বনে বনে হেলেন চিনে নিন

 

লাস্ট সিন

হেলেনকে চিনে নিন 

তিন বিঘা পুকুরের মাদারিহাটের গ্রামে 

তার এক আবক্ষ মূর্তি দাঁড়ায়ে আছে যেন দালি টানটান

কতো পেট্রোলের পাম্প-ধারা কত কত জাতীয় সড়ক 

অনন্ত অখণ্ড অতল এক নারী কত আলো কত অন্ধকার 

কঠিন শরীর তার কত প্রশ্ন প্রশ্নের কত উত্তর

 

অক্ষরপ্রবাহের সেই আদি দময়ন্তীপালা থেকে কত দূরে তুমি কমরেড?

আমাদের চিলাপাতা আমাদের হেলেনের মিষ্টি নুনিয়ার উদ্যানে 

মহারাজ আসছেন আসছেন নৃপেন্দ্র নারায়ণ

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শাহজাহান কবীর স্যারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি | সরোজ মোস্তফা

Wed May 27 , 2020
শাহজাহান কবীর স্যারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি | সরোজ মোস্তফা 🌱 দার্শনিক স্কুল না থাকায় মিথে কিংবা কিংবদন্তির পরিচর্যায় আমাদের  পূর্বপুরুষেরা  নির্জনে কয়েক পুরুষ বাঁচেন। লক্ষ্যে কিংবা অলক্ষ্যে গ্রাম কিংবা শহরের নির্জন গলিতে কোন শিষ্য-প্রশিষ্যরা বলতে থাকেন গুরুর পাঠ ও ব্যক্তিত্ব। গুরুকে তারা হারিয়ে যেতে দেন না। একলব্যের মতো প্রমূর্তি গড়তে গড়তে তারা […]
Shares