মাটির খোঁজে, মাটির মানুষ | ইমরান উজ-জামান

মাটির খোঁজে, মাটির মানুষ |

ইমরান উজ-জামান

🌱

এক

পুনর্ভবা-আত্রাই এর বুকে মাটির তৈজসপত্র বোঝাই পালতোলা নৌকায় ভেসে চলেছে নওগাঁ’র কুমারেরা। মাটির তৈরি থালা, বাসন, হাড়ি, পাতিল, ঘটি-বাটি, বদনাসহ নানা তৈজসপত্র সমতটের নানা বসতিতে পৌছে দিতে হবে। একই উদ্যেশে ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই আর বংশাই নদীতে বজরা ভাসিয়েছেন জামালপুরের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও শেরপুরের নালিতাবাড়ীর পালপাড়ায় ও দিনমান চলছে মাটির হাড়িকুড়ি তৈরির কাজ। মানিকগঞ্জ, নড়াইল, বরিশালের স্বরুপকাঠি, ঢাকার ধামরাই, বিক্রমপুর ও সাভারের মৃৎশিল্পীদের দম ফেলার ফুসরত নাই। গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীতে নোঙ্গর করে মোকাম করছেন যশোরের কুমারেরা। এই সমতটের সর্বত্র ভাত ও তরকারী রান্নায় ব্যবহৃত হয় মাটির হাড়ি। পানি রাখতে মাটির কলস, মুড়ি ভাজতে মাটির বড় হাড়ি। ভাতের পাত, তরকারীর বাটি থেকে লবনদানি মাটির কোসন। টাট্টিখানায় ব্যবহারের বদনাটিও মাটির। গরুর খাবার দেওয়ার জন্য চারি, মুরগীর কুড়া দেয়ার জন্য আউত্তা। শস্য ঘরে তুলতে বাঁশের ও বেতের আগৈল, পাটের বস্তা, পায়ে কাঠের খড়ম ব্যবহৃত হয়। এই চিত্রটা গত শতকের বাংলাদেশের। 

আর আজকের চিত্র! ঘরের হাড়ি থেকে শুরু করে সকল তৈজসপত্র প্লাস্টিকের। আমাদের চিরচেনা নিজেদের কাঁচামালে নিজেদের কারিকরদের তৈরি পন্য বাদ দিয়ে মানুষ ঝুকে পড়েছে সিনথেটিকের প্রতি। দামে কম, টেকসই ও চকমকা বাহ্যিকতার কারনে সহজেই সিনথেটিক সামগ্রী মানুষের দৃষ্টি কারে। আর সহজলভ্যতার কারনে এর ব্যবহার ব্যাপকতায় রূপ লাভ করেছে।        

অপরদিকে মাটি এবং দেশীয় কাঁচামালে তৈরি পন্যের বাজার ছোট হতে হতে এখন আর অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না। অ লবেদে দৈ এর হাড়ি, গাছের চারা রোপনের টোপা, পয়নিস্কাশনের চাক, তন্দুর রুটির চুল্লিতে সীমিত। এছাড়া বিভিন্ন পূজাকে কেন্দ্র করে কুমারদের কিছু কাজের সুযোগ হয়। যেমন দূর্গাপূজা, কালিপূজাসহ অন্যান্য পূজায় প্রতিমা তৈরি। লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীর সরা, মনসা পূজায় মনসার ঘট মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। এখানে লক্ষনীয় মনসার ঘট আর লক্ষ্মীসরা অথবা প্রতিমার গায়ে রঙ্গের আচর শুধু মৃদশিল্প নয় আমাদের অংকন শিল্পের প্রাচীন রুপ ও বটে। এছাড়া টেপা পুতুল, শিশুদের জন্য মাটির নানা রকমের খেলনা যার প্রচলন ক্ষুদ্র আকারে হলেও এখনো আছে। 

দুই

দেশের প্রতিটা হাসপাতালে আজ রোগীর ভীর। রোগ-শোক-ঝড়া বাড়ছে দিন দিন। এর কারনটা কি? আগে তো এমন ছিল না। রোগ ছিল হাতে গোনা কয়েকটা। ব্যপারটা একটু বিশ্লেষন করে দেখা যাক। 

খবরে প্রকাশ সপ্তাহে আমাদের দেহে ৫ গ্রাম প্লাস্টিক প্রবেশ করছে। বা আমরা খাবারের সঙ্গে ৫ গ্রাম প্লাস্টিক গ্রহণ করছি। আমরা সর্বভূক, যা খুশি খেতেই পারি। তবে ব্যাপারটা শাক-পাতা খাওয়ার মতো এতটুকুতেই শেষ হয়ে গেলে কোন সমস্যা ছিল না। অন্যান্য খাবারের মতো প্লাস্টিক আর সিনথেটিক অতটা সু-পাচ্য নয়। এই প্লাস্টিক খাওয়ার প্রভাব অনেক গভীরে। বিস্তারিত না বললেও এখানে এতটুকু বলা যায় সিনথেটিক অন্য উপাদানের মতো শরীরের কোষে মিশে না, একমাত্র মল এর সঙ্গে বের হয়ে গেলেই রক্ষা। এছাড়া অন্যান্য রেচন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক অংশ নেয় না, কাজেই আমাদের দেহের কোন একটা কোষে প্লাস্টিক প্রবেশ করলে, তখন শরীরে নানা বিপত্তির সৃষ্টি করে। কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্থ করে, যার পরিনতি টিউমার, ক্যানসার। এমনকি ক্যানসারের মতো সমস্যা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এই সব সিনথেটিক। আর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন পাকস্থলিতে গ্যাস সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে সিনথেটিক বা প্লাস্টিক।    

তিন

আজকে মৃৎশিল্পের কথাই বলবো। মৃৎশিল্প আজ মৃত না হলেও জড়ায় জীর্ণ। যারা কুমার পরিচয়টা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় নাম লিখিয়েছেন তারা ভাল আছেন। এতে করে প্রাচীন এবং নিজেদের কাঁচামালের উপর নির্ভশীল একটি পেশা বিলীনের পথে। শত বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাপ-দাদার পেশার মান বা ধারাবাহিকতা রক্ষায় বড় যাতনে চালিয়ে যাচ্ছেন এই পেশা। 

পঞ্চঘরের নির্মল পাল, নেত্রকোনার প্রমিলা বালা, রাজশাহীর সুশান্ত কুমার পাল, কুড়িগ্রামের অচিন্ত কুমার পাল, জামালপুরের পুন্যি বালা, ময়মনসিংহের নিরালা বালা, টাঙ্গাইলের রূপলাল কুমার, মানিকগঞ্জের নীলিমা বালা, দোহারের অনিকেত কুমার পাল, যশোরের নিম কুমার পাল, রাজবাড়ীর বিশ্বজিত পাল, ঢাকার বিপদহরি পাল, বিক্রমপুরের সোনাতন পাল, হাইমচরের নিরাঞ্জন পাল। বললে এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। এই তালিকা বলার কারণ একটা আছে। যারা বলেন আমাদের লোকসংস্কৃতি হাড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য বলি আমাদের লোক সংস্কৃতি হাড়িয়ে যাচ্ছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে রূপান্তর হচ্ছে মাত্র। 

সেই বাংলাদেশ সৃষ্টির গোড়ার দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি শুমারী করেছিলেন। সেখানে মৃৎশিল্পও ছিল। অনেক গবেষক নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে না গিয়ে, এতদিন পরেও সেই সময়ের তথ্য উপাত্ত থেকে লোকশিল্পের আলোচনায় বিভিন্ন ভুক্তি ব্যবহার করে থাকেন। কাজেই ঐ সব ভূক্তি যথাযথ বা বাস্তবসম্মত হয় না। 

কাজেই লোকসংস্কৃতির শুমারী করা এই সময়ে খুব জরুরী। মাঠ পর্যায়ে লোক শিল্প তথা মাটির পন্যের ব্যবহার বাড়াতে হলে এই পন্যের ব্যবহার উপযোগী উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ নিশ্চিত কল্পে এর সঠিক তথ্য প্রয়োজন। আর আমরা সেই গত শতকের ন্যায়, প্রত্যেকে মাটি এবং আমাদের নিজেদের কাঁচামালে তৈরি অন্যান্য পন্য ব্যবহারে মনোনিবেশ করতে পারি। এর মাধ্যমে তিনটি কর্ম সাধিত হবে। 

প্রথমত; কাঁচামাল আমদানী না করে, আমাদের নিজেদের কাঁচামালে তৈরি পন্যের ব্যবহারের ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে। 

দ্বিতীয়ত; ঐ সব পন্য তৈরির কারিগড়েরা তাদের পন্যের সঠিক মূল্য পাবে এবং শিল্পটির প্রসার ঘটবে। 

তৃতীয়ত; সিনথেটিক পন্যের ব্যবহার কমবে অনেকটাই, কঠিন দূরারোগ্য থেকে রক্ষা পাবে মানুষ। 

এসব বিষয় সাধারণ এবং ছাত্রাবস্থা থেকে সকলকে অবহিত করতে পারলে, খুব কাজে দেবে। এর জন্য নানা পথ অবলম্বন করা যায়। এর প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে বছরের গোড়ার দিকে ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার এর উদ্যোগে নটরডেম কলেজে একটা ‘ফোকলোর অলিম্পিয়াড হয়েছিল, আমিও ছিলাম।      

পরে শিল্পী আমিনুল ইসলাম লিটুর সঙ্গে পরামর্শক্রমে এর একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রক্রিয়া চিন্তা থেকে ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন পরামর্শ দেন এই আয়োজনের বিষয়ে। তিনি উপজেলা-জেলা-বিভাগীয় পর্যায় থেকে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই প্রক্রিয়ায় কর্ম সম্পাদন করে, কেন্দ্র এসে শেষ হবে। আর এর নাম হবে ‘ফোকলোর অলিম্পিয়াড-এর পরিবর্তে ‘সংস্কৃতি চর্চা’। 

বিষয়টা হবে এমন-

বয়সানুক্রমে অঞ্চলবেদে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রথমে গ্রুমিং এ নেয়া হবে। একটি প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের অঞ্চল এবং জাতীয় লোকসংস্কৃতি বিষয়ে ধারনা পাবে শিক্ষার্থীরা। যা তারা চর্চা করবে, আলোচনায়, আড্ডায় এসব বিষয় প্রসার লাভ করবে। চিন্তা-কথা-কাজে দেশীয় লোকজ শিল্পের ধারক প্রজন্ম তৈরি হবে। সূচিত হবে নতুন এবং একান্তই নিজেদের একটি সমাজ। 

তার আগে একটি কথা দেশের ১৭ কোটি মানুষের অর্ধেক সারে আট কোটি মানুষও যদি মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করেন। তাহলে কিন্তু আর ভাবতে হয় না। অনেকে বলেন, মাটির তৈজসপত্র ভঙ্গুর। সেই তুলনায় সিনথেটিক, প্লাস্টিকের পন্য বেশি টেকসই ও খরচ কম। একটা কিনলে জীবন পার। তাদের জন্য, একটা ছোট্ট হিসাব- আপনি একটি মাটির বাসন কিনলেন। বছরে যদি তিনটা ভাঙ্গে তাহলে তিনটার দাম পরবে তিন ত্রিশে নব্বই টাকা। আর একটা প্লাস্টিকের প্লেট এর দাম পরবে ত্রিশ টাকা কিন্তু চলবে আপনি ফেলে না দেয়া পর্যন্ত। 

তবে স্বাস্থ্য রক্ষায় মাটির বাসনটিই কিন্তু বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। ঘষা-মাজায় এই মাটির প্লেটের কোন অংশ ক্ষয় হয়ে যদি পেটে চলে যায়, সেটা পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যাবে। কিন্তু প্লাস্টিক এর বেলায় ঘটবে তার উল্টো ঘটনা। আল্লাহ না করুন, বড় কোন রোগ না হলেও। প্লাস্টিকের কারনে আক্রান্ত ছোট কোন রোগে অন্তত বছরে তিনবার ডাক্তারের কাছে যেতে হলেও আপনার ডাক্তার আর ঔষধ মিলে ৩গুনে ১হাজার সমান ৩ হাজার টাকা চলে যেতে পারে। আর তিনটি প্লেট ভেঙ্গে যাওয়ার পরও মাটির প্লেটে খরচ সেই ৯০ টাকা।  

এই মুহুর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলুন। মাটির মানুষ মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করবেন। আর না ভেবে আজকে রাতেই আপনার খানার পাত হোক মাটি। আপনি বেঁচে যান রোগ-শোক থেকে। আর মৃৎশিল্পীরা তাদের শিল্প নিয়ে মাথা তুলে দাড়াক। তাহলে শুরু হলো যুদ্ধ-আন্দোলন। এই আন্দোলনের নাম কি দেবো ? এর নাম হোক ‘মাটি’।  

                                      

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কবিতাগুচ্ছ | এনামূল হক পলাশ

Fri May 29 , 2020
কবিতাগুচ্ছ | এনামূল হক পলাশ   🌱   গিমাই শাকের ফুলগুলো   জীবনের ধ্যান ক্ষেতে যে আইল আছে  তার ঠিক কোণায় গিমাই শাকের ফুলগুলো বলে দিবে একটি যৌথ সময়ের না বলা কথা।   বোবাদের শত্রু নাই জেনেছিলাম বহু আগে,  একথা জেনেও কচু পাতার রক্ত দিয়ে সাজিয়েছি বর্ণগাঁথা অক্ষরের বাগান।    […]