কবিতাগুচ্ছ | এনামূল হক পলাশ

কবিতাগুচ্ছ | এনামূল হক পলাশ

 

🌱

 

গিমাই শাকের ফুলগুলো

 

জীবনের ধ্যান ক্ষেতে যে আইল আছে 

তার ঠিক কোণায় গিমাই শাকের ফুলগুলো

বলে দিবে একটি যৌথ সময়ের না বলা কথা।

 

বোবাদের শত্রু নাই জেনেছিলাম বহু আগে, 

একথা জেনেও কচু পাতার রক্ত দিয়ে

সাজিয়েছি বর্ণগাঁথা অক্ষরের বাগান। 

 

দেখো শিমুল, আমাদের জিহ্বা নেই অথচ

সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে  বুক, 

এক‌টি কামারশালার হুশ হাশ হাপর।

 

আমরা কথা কইনা, বুক ভরা নিশ্বাস চাই বলে 

জলের উপরে বাঁশ দিয়ে টং বানিয়ে রেখেছি,

শুয়ে শুয়ে চেয়ে থাকবো সূর্যের দিকে। 

 

পৃথিবীর সবার জন্য একটি ভাষা নির্মাণ করে

চলো আমরা পালিয়ে যাই অন্ধকার পেরিয়ে।

নির্জন দুপুরে মান্দার গাছের তলে বসে থেকে 

চলো ইশারায় কথা বলি,  বোবাধর্ম পালন করি।

 

পদক

 

সারাজীবন ছিলেন তিনি

আকাশে উড্ডীন,

মাটিতে নামতেই সুহৃদ কইলেন,

আসো ভাই সাইজ উদ্দিন –

চিয়ার্স চিয়ার্স জরিনা –

আমরা

নিজেরে ছাড়া কাউরেই করি না।

 

পদক কইলো

যা ভাবছো তা আমি না,

সাইজ উদ্দিন ভাই –

আমি কারও হাঙ্গা করা বউ না।

 

আধুনিক সংসার

 

খালের স্রোতে হাঁটু পানিতে নাইমা

চালুনে খেও দিয়া মলা-পুঁটি ধরতেছি।

তুমি পেছনে পুরোনো চুকরা হাতে খাড়াইয়া

মারা মাছ ভরতে থাকো ভরতে থাকো।

আমি মাছ মারা নিয়া ব্যস্ত,

তুমি মাছ ভরা নিয়া ব্যস্ত।

মাছের ভারে পুরোনো চুকরার তলা

ভেঙে গেছে আগোচরে কেউ কইতেই পারি না।

 

সমকালীন শিল্প

 

প্রেম যৌনতা আর নন্দনতত্ত্ব নিয়া

শিল্প করতে করতে শহীদ হয়ে যাচ্ছ,

শরীরের ভাঁজে ভাঁজে শিল্পের

রস নামে কলকল বুদবুদ।

আমি তোমার শরীর স্পর্শ করি

জল ঢালি অবিরাম প্রেমের বাতাস,

অথচ কেমন শুকিয়ে আছ মেদহীন

ছোপ ছোপ তাজা রক্ত শরীর।

যেহেতু আগেই বেচে দিয়েছ মাথা

সেহেতু শরীরই তোমার শিল্পচর্চার মাধ্যম।

তুমি শহীদ হয়ে যাচ্ছ প্রিয় শরীর

তোমার ঘাড়ের উপরে মাথা নাই।

তুমি বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছ ইশ্বরী পাটনী

তোমার নৌকায় দেবী অন্নপূর্ণা নাই।

 

বন্ধুত্বের পাঠ

 

যাকে তুমি বিক্রি করে দিতে পারো

এমনকি জবাইও করতে পারো

সে তোমার বন্ধু।

যার মাধ্যমে তুমি বিক্রি হয়ে যেতে পারো

এমনকি জবাইও হয়ে যেতে পারো প্রকাশ্যে

সে তোমার বন্ধু।

 

সে ই তোমার বন্ধু

যে গোপনে পিঠ বরাবর

চালায়না ছুরি মুখোশে লুকিয়ে মুখ।

 

সে তোমাকে গোপনে ধারণ করে

মা – বাবা – স্ত্রী – সন্তানের অগোচরে।

তুমিও তার গোপন করো ধারণ

বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রেখে বুক।

 

বন্ধুত্বের কোনো পিঠ নাই,

আছে শুধু বুক নামের এক বিশাল আকাশ

যেখানে তুমি যা খুশি তা ই ছুঁড়ে মারতে পারো

যেখানে অনন্তকাল তুমি বিচরণ করতে পারো।

 

বন্ধুত্ব মানে অনন্ত এক আকাশ

যেখান থেকে শ্বাস নিয়ে বাঁচো।

 

নিমন্ত্রণ 

 

পারলে একদিন যেও আমাদের বাড়ি, 

বাড়ির পেছনে সুপারি গাছের সারি।

তারও পেছনে আছে মরা এক নদী, 

কালের ইতিহাস জানাতে চায় নিরবধি। 

সামনের পুকুর পাড়ে শিমুল গাছের ফুল, 

উত্তরের খালপাড়ে আছে অজস্র জারুল। 

বর্ষায় ছড়িয়ে পড়ে কদম ফুলের ঘ্রাণ, 

রাতে হাসনাহেনার সুবাসে জুড়ায় প্রাণ। 

পূর্ব দিকের চোখ পর্যন্ত খেলা করে ধান, 

আর কিছুদূর গেলে আছে এগরার বাগান।

বাগানের পর ছোট ছোট ডোবা আর বিল, 

যেইখানে ছোট বড় মাছ করে কিলবিল।

হিজল করচ দুভাই মিলে থাকেন দাঁড়িয়ে 

লিলুয়া বাতাসে বালকবেলা যায় হারিয়ে। 

এদিক ওদিক শালিক শ্যামা পানকৌড়ি উড়ে, 

বক চেয়ে দেখে অতিথি পাখি আর সরালি ঘুরে। 

এইসব ডুবে গিয়ে যা হয় তার নাম হাওর,

এইখানে বানিজ্য করতো চাঁদ সওদাগর।

 

লাবন্য দাশ এন্ড কোং

 

মানুষকে ব্যর্থ করে দিয়ে

কবে থেকে হয়েছিলো

এই কোম্পানির প্রচলন

গবেষণার অভাবে জানা যায়নি।

পর সমাচার এই যে,

আমরা সকলেই দমে দমে

লাবন্য দাশ এন্ড কোং রে মানি।

 

আমরা ভাটিয়ালের লোক

জরিনার বিশুদ্ধ প্রেমিক

বাঁশ বাগানে খাড়াইয়া থাকা লাশ,

ঘরে থাকে চিরচেনা লাবন্য দাশ।

 

সারাদিন বয়ে যাই জগতের ভার,

হচ্ছেনা ঠিকঠাক করা সংসার।

আমাদের ঘরের খুঁটি গুলা বাঁশ,

ঘরের ভেতরে থাকেন লাবন্য দাশ।

 

পৃথিবী একটা পানশালা

 

কেউ কেউ পৃথিবীর আফিমে

ডুবতে ডুবতে শ্বাসকষ্টে আছেন।

পান করতে করতে

ব্ল্যাক আউট হয়ে যান।

 

পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীর পেয়ালায়

হরদম বিলাসের সুধা ঢালেন।

পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীর কল্কিতে

বিত্তের সিদ্ধি ভরে টানেন।

 

পৃথিবীর ভগ্নিপতিগণ টাল হয়ে ঘুরেন

পানশালায় ঘুরে ঘুরে রক্তপান করেন।

 

পৃথিবী একটা শালা

পৃথিবী একটা নিকটাত্মীয়

পৃথিবী একটা পানশালা।

 

কুপি বাতি

 

হৃদয়ে জমিয়ে রাখা তেল পুড়িয়ে

নিজেকে নিঃস্ব করে জ্বলো আগুন।

আলো হয়ে ঢুকে যাও জগতের

আরাধনা অন্ধকার গৃহের কোণায়।

জগতের প্রতিটি জীবন তোমার

প্রতিচ্ছবি হয়ে নিভে যাবে একদিন।

বেঁচে থাকার কালে আলো ছড়ানোর

ধ্যানে মগ্ন হতে পারাই তোমার জীবন।

তোমাকে উপেক্ষা করে যে প্রগতি

তার জন্য আমাদের নেই কোনো প্রণতি।

 

অধিগ্রহণ

 

শস্য শ্যামল ভূমিতে উদাস দূপুরে

কোদাল লাঙ্গল নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন

আমাদের প্রতিজন আদিম পিতা।

সেই থেকে জলা জঙ্গল তুলে চট্টনে চট্টনে

বংশ পরম্পরায় বুনে গেছেন ক্ষুধা,

কত শত গান গাওয়া হয়ে গেছে আনমনে।

মৃত্যুর পর মৃত্যু এসে বাড়িয়েছে কবরের সারি

আইলের সাথে আইল জোড়া লেগে

শ্যামলে হলুদে ভাগ হয়েছে খুশির ছড়াছড়ি।

আমাদের এইসব ভাগ বাটোয়ারা প্রথাগত,

রক্তে অজানা থেকে গেছে মালিকানা ধারণা

পরম্পরার চাষবাস পেয়ে গেছি জন্মগত।

 

চাষ করি মাটি – জল চাষ করি প্রথা

পবিত্র মাটির জমিন আমাদের পিতা।

কী এক ভয়ানক দিন এসে গেছে জীবনে

বৃক্ষ মাটি হাওয়া জল যাবে পরাধীনে।

পোঁড়ামাটি পাথর ধাতবের নিথর জমিনে

নয়া এক পৃথিবী গড়ে উঠবে অধিগ্রহণে।

খত গুলো মিলে গেলে টাকা যাবো পেয়ে

উড়বে টাকার পাতা সবুজের বিনিময়ে।

এমন হতেই পারে অমিলের দোলাচলে

স্বপ্নের দিন বিনামূল্যে যাবে পথ ভুলে।

 

আমি কালের কৃষক, জলা জংলায়

জাগিয়ে তুলেছি শস্য শ্যামল ধারা,

কাগজের অভাব দেখিয়ে দেখিয়ে

মাটির স্বপ্ন কেড়ে নিতে চাও তোমরা।

যদি পারো আমাকেও অধিগ্রহণ করে নিও,

পারলে মানুষ অধিগ্রহণের আইন করে নিও।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

আমি মাসুদ-অন্তঃপ্রাণই বটে, কৃতজ্ঞ | মিজান মল্লিক

Fri May 29 , 2020
আমি মাসুদ-অন্তঃপ্রাণই বটে, কৃতজ্ঞ | মিজান মল্লিক 🌱 তখন জীবনানন্দ দাশের কবিতার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসছি। ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছি নতুন নতুন বলয়ে। এমন একটি বলয়ের স্রষ্টা মাসুদ খান। প্রথমে আচ্ছন্ন হই তাঁর কবিতায়, পরে ব্যক্তিত্বে। আব্বা-আম্মার বাইরে তাঁর মতো এমন সহৃদয় স্নেহ আমি খুব কম মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি। […]
Shares