আমি মাসুদ-অন্তঃপ্রাণই বটে, কৃতজ্ঞ | মিজান মল্লিক

আমি মাসুদ-অন্তঃপ্রাণই বটে, কৃতজ্ঞ | মিজান মল্লিক

🌱

তখন জীবনানন্দ দাশের কবিতার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসছি। ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছি নতুন নতুন বলয়ে। এমন একটি বলয়ের স্রষ্টা মাসুদ খান। প্রথমে আচ্ছন্ন হই তাঁর কবিতায়, পরে ব্যক্তিত্বে। আব্বা-আম্মার বাইরে তাঁর মতো এমন সহৃদয় স্নেহ আমি খুব কম মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি। মুগ্ধ হয়েছি জ্ঞান লাভের প্রতি তাঁর অনুরাগ, নিষ্ঠা আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ দেখে।

তখন আমি থাকি মেসে, মিরপুর এক নম্বরে। সকালে ও সন্ধ্যায় টিউশনি করি। শুক্রবার ছুটি। মাসুদ খান সরকারি কর্মকর্তা। তখন তাঁর বাস ওয়্যারলেস গেটে, সরকারি কোয়ার্টারে। প্রায় প্রতি শুক্রবার সকালে ওই বাসায় যাই। চা-নাশতা খাই। ড্রইংরুমে সোফায় বা কার্পেটের ওপর বসে তিনি রণজিৎ দাশ কিংবা অন্য কারও বই থেকে তাঁর পছন্দের কবিতা পড়ে শোনান; নিজস্ব একটা ভঙ্গিতে। সাময়িকীর পাতা থেকে পড়েন। আইএলটিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পড়েন ইংরেজি। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ফরাসি ভাষা শিক্ষার ক্লাস করছিলেন। কোথায় যেন আবার এমবিএ করছিলেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাসায় চলে অনুশীলন। আমি তখন চুপ মেরে বসে থাকি, বিস্ময় মানি। পড়াশোনা করার এত শক্তি তাঁর কোথা থেকে আসে!

দুপুরের খাবারের টেবিল প্রস্তুত। আহ!, বাটিতে বাটিতে সাজানো সুস্বাদু সব তরকারি। মাছ-মাংসের কয়েক পদ। ডাল-সবজি। আমার জন্য এ ছিল রীতিমতো রাজভোগ। আবার ড্রইংরুমে গিয়ে পড়াশোনা। এক ফাঁকে তিনি ভেতরের রুমে যেতেন। অল্প সময় ঘুমাতেন কিংবা শুয়ে থাকতেন। ফিরে এসে আবার কিছু পড়তেন কিংবা শিল্প-সাহিত্যের কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। এর ফাঁকে এক গ্লাস দুধ, সঙ্গে আম কিংবা কলা খেতে হতো। একটু বিরতি দিয়ে আসত দুধ-চা, সঙ্গে টা থাকত। সন্ধ্যার আগে আগে বেরিয়ে পড়তাম। কোনো কোনো দিন তিনিও বেরুতেন। শাহবাগ, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, কাক (সেখানে তখন সলিমুল্লাহ খান নানা বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন) কিংবা কোনো সংস্কৃতিপ্রেমীর বাসায় কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডায়।

একদিন মনে হলো, আমিও ইংরেজি ভাষার চর্চা করব। একটা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হব। কিন্তু টাকা নাই। মাসুদ ভাই লুঙ্গির কোঁচড় থেকে আট হাজার টাকা বের করে দিলেন। লজ্জায় আর শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। দিন যায়, আর্থিক ঋণের বোঝা বাড়ে।

টের পাই, ব্যক্তি ও কবি মাসুদ খান আমার কাছে হয়ে ওঠেন একজন পরম মানুষ। জ্ঞান ও সৌন্দর্যচর্চার অনুপ্রেরণা, একজন পরোক্ষ শিক্ষক। তাঁর যেকোনো কবিতা পড়ি, আমার ভালো লাগে, মন্ত্রমুগ্ধ হই। কঠিনভাবে প্রভাবিত। আমার এই দশা বুঝতে পেরে মজনু ভাই (কবি মজনু শাহ) একদিন রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘তুমি তো দেখছি মাসুদ-অন্তঃপ্রাণ হে।’

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মাহমুদ সীমান্তের একগুচ্ছ কবিতা

Fri May 29 , 2020
মাহমুদ সীমান্তের একগুচ্ছ কবিতা 🌱 মিথ্যালোক চোখ দেখে বহির্লোক। অন্তর দেখে অন্যলোক।   তুমি যা দেখছ, তা— নিজের জন্যে নয় তোমার মধ্যে যে দেখে, তাও— নিজের জন্যে নয়।   একদিন সব মিথ্যা হয়ে যায়। মিথ্যা একটি বুলেট থেকেও শক্তিশালি।   অতীত অতীত হিসাব তুমি কেন ভুলে যাও? তোমার যে অনাগত […]
Shares