মাহমুদ সীমান্তের একগুচ্ছ কবিতা

মাহমুদ সীমান্তের একগুচ্ছ কবিতা

🌱

মিথ্যালোক

চোখ দেখে বহির্লোক।

অন্তর দেখে অন্যলোক।

 

তুমি যা দেখছ, তা—

নিজের জন্যে নয়

তোমার মধ্যে যে দেখে, তাও—

নিজের জন্যে নয়।

 

একদিন সব মিথ্যা হয়ে যায়।

মিথ্যা একটি বুলেট থেকেও শক্তিশালি।

 

অতীত

অতীত হিসাব তুমি কেন ভুলে যাও?

তোমার যে অনাগত দিন

তাকে ভাবো,

কেন সেও পুষে আনে বেদনার রঙ!

 

প্রতিবার ফলের আহার শেষে

তোমার জিহ্বায়…

যেরকম থেকে যায় স্মৃতি

তেমনই যতনে রেখো তারে

হোক না সে যত পুরাতন!

 

একদিন ঠিকঠাক জেনে যাবে তার

গভীর রহস্য, গূঢ় সফলতা

তোমার নিকটে বেজে ওঠা ধ্বনি

                            নির্মানের কলা।

 

অতীত অমৃত ফল, আয়নার চিত্রঘর

তার মুখোমুখি দাঁড়ালেই

দেখবে তোমার সব ভূত-ভবিষ্যত।

 

পথের ঘটনা

মৃত্যুর পরেও যদি

আমাকে হাঁটতে দেখ কিংবা

হাসিখুশি কোনো সমাবেশে অন্তর্লিন

অথবা ধরেই নাও

জীবনের নাম শুধু ক্ষয়ে যাওয়া

যেতে যেতে ছোট হতে হতে

একবার অনুভূত হলো এক সমাধি প্রবর

পুনরায় মনে হলো তুমি আছো কাছেই কোথাও

সকালের শিশির যেমন ঘাসে ঘাসে।

 

রুপালি স্বপ্নে তো থাকে, ভাঙন কেবল

শতাব্দি পেরিয়ে যায়, জীবনের চক্রবাক

মনে করো, ওটা এক পথের ঘটনা।

 

বৃষ্টি

বৃষ্টিতে নিজেকে দেখে আমি তো হতাশ!

আগে এক ধারণায় বৃষ্টিকে ডাকিনি কখনো

কারণ সে চঞ্চলা ময়ূরি

বৃষ্টিতে পেখম যদি মেলে

এক ঝটকায় ভেজাবেই

শিশিরের আমেজ শরীরে নিয়ে

অসময়ে মাঠে-ময়দানে, বন লতাদের কথা ভেবে

ভেবে যতসব আকুলতা হবে

তোমার কি ভালো লাগবে তা?

তার চেয়ে চলো আজ অঝোর বৃষ্টিতে

পাশাপাশি থাকি দুজনেই

বৃষ্টিই প্রাণের সব, দেখ—

ব্যথার এমন স্বচ্ছ প্রকাশনা আর

কোথায় না খোঁজো…

প্রয়োজনে একটু কাঁদতে চাও বলে।

প্রকৃতির কান্না বৃষ্টি, সকলে দেখে না

এটা একটি ধারণামাত্র, নিয়মের

সমুদ্র যা বুকে নিয়ে বিশাল হয়েছে

আকাশ তা দুঃখতেই ফিরিয়ে দিয়েছে চিরকাল।

বৃষ্টির অপর নাম দুঃখ

দুঃখ ছাড়া দিগন্তের সবুজ কোথায় মিলে বলো!

দেখতে চাইলে সাথে নিয়ে যেও আমাকে

সমুদ্রে, পাহাড়ে কিংবা আকাশের নিলিমায়

প্রতিটি ফোঁটার নাম দেব দুঃখ, দুজনে।

 

দুরকম

দিনের আলোতে আয়নায়

রাতের আঁধারে পানশালায়

দুরকম নিজেকে পেলাম।

 

যুদ্ধ, ভয়, অশ্রুজল কত কি যে গেল!

দুরকম তোমার মন পেলাম না আমি।

 

একমনে কী করছো তুমি?

 

পথ খুলে বসে আছি

সকালের অপেক্ষা বিকেলে, পথে, মাঠের সবুজে

প্রতিদিন নিজেকে হারায়…

আমার পথের মায়া, চেয়ে থাকি দূরে

সবুজের কোমল পরশ লাগে গায়।

 

প্রতিদিন অচেনা মানুষ

আসা-যাওয়া পথের সম্পর্কে

পরিচিতজন কোন দেখা মেলে যদি

আনন্দি আমার চোখ! লুটোপুটি খায়

ভোরের কুয়াশাভেজা, শিউরে, শরীর কাঁপে কখনো সখনো।

 

শীতল পরশ আর বকুলের ঘ্রাণে

আত্মীয়তা মানুষের, কাছাকাছি টানে।

 

পথ, তুমি হয়ে যাও বকুলের বন

পথিকের পায়ে পায়ে সকালের শিউলির শোভা

শিউলিতলায় আজ শীতলতা খুব প্রয়োজন।

 

আমার ব্যাকুল মন আপন মানুষ খুঁজে খুঁজে দিশেহারা

পথ থেকে বিশাল আকাশ, আর তুমি

আছোই তো দিগন্তের নীলে, মহাযোগ শূন্যতায়।

 

পথ খুলে বসে আছি সবুজের আঙিনায়…

আমার সবুজে কারো পদচ্ছাপ নেই।

 

রুটি

ক্ষুধার পৃথিবী আজো গদ্যময়, তুমি ভাবছ না

চাঁদ, ফুল, প্রজাপতি আর জংলি ফুলের সম্প্রীতি

তোমাকে এমন করে মায়ায় জড়ালো!

 

তুমি ভাবলে না

মানুষ, কেমন হলে সামাজিক হয়

যেন পুঁথিগত জ্ঞানমাত্র ধরে নেয়া…

ক্ষুধিত আত্মায় কোন জৈবিকতা নেই।

 

একটি রুটির জন্যে একজন পাগল, পাগল প্রায় হাটে

একটি রুটির জন্যে ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, দিশেহারা মাতা

একটি রুটির জন্যে টেলিফোন-তারে বসা কাক…

কা-কা স্বরে সারাদিন উজাড় করেছে

একটি রুটির জন্যে চলন্ত ট্রেনের নিচে লাফ দিল একটি কুকুর

একটি রুটির জন্যে বকুল ফুলের মালা নিয়ে

সারাদিন ঘুরে ঘরে ফিরে বনলতা

একটি রুটির জন্যে একটি কবিতা…

আর রাধাচূড়া ফুল জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে

উদ্যানের শীতল ছায়ায়।

 

কিছুই ভাবলে না তুমি…

চাঁদ, ফুল, প্রজাপতি আর জংলি ফুলের সম্প্রীতি

তোমাকে এমন করে মায়ায় জড়ালো!

 

উৎসর্গ: নাসিমা ভাবি ও সাইফুল ভাই-কে

 

ভালোবাসা তুমি কার জন্যে

ভালোবাসা তুমি কার জন্যে রাখো জমা?

 

মানুষ কী মানুষকে ভালোবাসে না!

যে যে পথে নিজেকে পথিক ভেবে বহুদূর যায়

তার সাথে পা মিলিয়ে অজানায় কেউ…

কেউ যেন সমুখে হাঁটে না

কিংবা নাই কোন স্বপ্নবিক্রেতার ঘর।

 

উদ্দেশ্যবিহীন আজ সকল প্রেমিক

একটি বকুল সন্ধ্যা, কল্পিত তোমার আয়নায়

তুমিই থাকো না ছবি হয়ে।

 

এ কি শুধু সৌরম-লের শোভা? পুড়ছে হৃদয়

ভালোবাসা তুমি কার জন্যে রাখো জমা?

মানুষ কী মানুষকে ভালোবাসে না!

 

মেহেদী এবং তুমি

মেহেদী পরেছি হাতে

তুমি দেখো, ছোট এই পাতাদের করুণ মগ্নতা।

 

একটি আঙুল ধরে শরীরের সাথে মিশে গিয়ে

সবুজের, সেকি রক্তলাল!

তাকিয়ে দেখছি বারবার।

 

বয়স পেরিয়ে তুমি আঠারোর পর

হয়ত বলতে পারো, এ তো ছোট ছোট পাতাদের

কান্নারত বায়োগ্রাফি!

কাঁদবে তুমিও…

এমন সময় থেকে নিজেকে আড়াল করে সকল মানুষ।

অব্যক্ত সরল কথাগুলি

দিগি¦দিক পালিয়ে বেড়ায়।

 

ফলে দেখ, আপাত বাইরে তুমি যেরকম থাকো

দুঃখবোধ জড়িয়ে রাখছে সারাক্ষণ

মেহেদী এবং তুমি, তোমাদের মাঝখানে এই দুঃখবোধ

দুরকম, মানুষেরা দেখে

উচ্ছ্বসিত রক্তলাল, লুকো-চাপা অপর ভাষায়

তুমি যা দেখতে পাও না কোনদিন।

 

আমি জানি, দুঃখ নিয়ে তুমি

আমার কাছেই আসো চিরকাল।

 

সংগীত যে পারে

সংগীত যে পারে! তুমি জানো

ঢেলে দেয় মায়া

মায়া! যেন নিরব মাটির প্রাণ, যতোবার ভাবো

মুক্তি নাই, মেলবেই ডানা

তুমি উড়ে যেতে পারো স্বপ্নীল সকাশে।

 

কে না জানে সংগীতের অসীম ক্ষমতা

সুরের মূর্ছনা পেয়ে ঘুমাও যদিও

ভাবো একবার

সে কি নয় হন্তারক কোনো?

 

ধরো কেউ, বেদনায় ডেকেছে তোমাকে

বিদূষক কান্না পেয়ে নিজেকে হারাও

এমনকি মরে যেতে পারো।

 

সংগীত, হোক তা আনন্দের

কিংবা কোন বেদনার ধারা

বরাবর চেনা যায় তাকে

সে তো এক মোহময়ী ঘুমের স্বদেশ।

 

মাহমুদ সীমান্ত

জন্ম: ৫ অক্টোবর ১৯৭৯, পাটপট্টি ব্রীজমোড়, ১৮৮/৯ কাটলি (উত্তর), নেত্রকোণা। সম্পাদনা: হাওড়, সাহিত্যকণ্ঠ। সমন্বিত কাব্যগ্রন্থ: হট্টিটিগুচ্ছ, প্রকাশিতব্য: পাতার জীবনী, নকশিকাঁথায় কয়েকটি দৃশ্যসুতো, জ্ঞানকাতরতা,  গল্পগ্রন্থ: সেরিগ্রাফ, প্রবন্ধগ্রন্থ: উদ্ভাবনী সাহিত্য।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

রাজীব আর্জুনির কবিতাগুচ্ছ

Sat May 30 , 2020
রাজীব আর্জুনির কবিতাগুচ্ছ   🌱   বাস স্টেশন  শরীর একটা বাস স্টেশন।  অনেক ভেঁপু অনেক মুখ  অনেক অনেক  শস্য দানার ঘর্মাক্ত সময়!   সময়ের  মতো গতিময়  বাসের স্টেশন!  বাসটি কোন দিকে যায় অনেকে  মুখের মতো বাস্তব কিন্তু জানেনা  সে গল্পের কাহিনী  ?     কাহিনী কি – জানে শাবিহ মাহমুদ ?  কাহিনী […]
Shares