জলসায়রের পলি | মামুন খান

🌿নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের নিম্নভূমি নিয়ে যে ভাটি অঞ্চল গঠিত তা এক সময় জলসায়র পরগনা নামে পরিচিত ছিল। এই পরগনার রাজধানী ছিল নেত্রকোণার বর্তমান খালিয়াজুড়ি অঞ্চল।

 

বাংলার বহু লোককবি, বাউল ও মরমী সাধক এই অঞ্চলে  জন্মেছেন। মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতীর পীঠস্থান, ভিন্নমাত্রার  শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির লীলাভূমি সমৃদ্ধ অঞ্চল নেত্রকোণা। এই নেত্রকোণার মদন উপজেলার নায়েকপুর গ্রামেই ১৯৭৮ সালের ২৫ আগস্ট জন্মেছেন কবি মামুন খান।

 

এ অঞ্চলের মাটি যেমন শষ্যের জন্যই ঊর্বর ঠিক তেমনি মনন ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও রত্নপ্রসবা। মামুন খানের কাব্যচর্চার পেছনে এই অঞ্চলের মাটি, জলবায়ু ও হাওরাঞ্চলের ভিন্ন সংস্কৃতির নিবিড় প্রভাব ও ভূমিকা রয়েছে। 

 

কবি মামুন খানের কবিতার বই জল ও জলপাই (২০০৮), বাইরে দুপুর ভিতরে ভৈরবী (২০১১) ও সম্মিলিত কবিতার বই- হট্টিটিগুছ (২০০০) সালে প্রকাশিত হয় । সর্বশেষ ২০২০ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে “জলসায়রের পলি”।

 

বাংলা সাহিত্যে পাঠ নেয়া কবি মামুন খান তার অন্তরের ডাকেই এই কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছেন  “জলসায়রের পলি”। ধ্রুব এষ-এঁর আঁকা চমৎকার প্রচ্ছদ সমৃদ্ধ বইটি কবি তার পুত্র পরম খানকে উৎসর্গ করেছেন। বইটিতে মোট বায়ান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে।

 

🌱আসুন আমরা জলসায়রের পলি থেকে কয়েকটি কবিতা পাঠ করি:

 

💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫💫

 

জলসায়রের পলি

 

জলা তলা শনি চানতারা ডিঙ্গাপুতা 

জালিয়ার হাওরের নামে 

কৈজানি কংশ বাংলা বয়রালা ঘোড়াউত্রা ও ধনু গাঙের নামে 

বৈচাজুড়ি খালের নামে 

ভেঁওরি বিলের নামে 

বাইয়াগ ও বাড়িপিছ ভাঙা আফালের নামে 

আগাম জলে পচে যাওয়া 

ফল ফসল ও ফসালির নাম 

মজে যাওয়া গলই ও আলকাতরারঙা ধীমান ধীবরের নামে কুডুরা মেড়া বরুণ ও হিজলের নামে 

আদিগন্ত সবুজরঙা ফাল্গুনমাঠের নামে 

উকিল জালাল শরৎ রশিদ ও রাধারমনের নামে 

তােমাকে বন্দনা করছি, জলসায়র

 

তােমার লক্ষ লক্ষ পলি ও পললের ভঁজে 

এই সামান্য জীবাশ্মের জন্য একবিন্দু রাখিয়াে ঠাই। 

তুমি না দিলে ঠাই এই ব্রহ্মাণ্ডে কে আছে, আমাকে নেবার!

 

পেট পােড়ার ঘ্রাণ

 

আমি যতটা না

আমার হাওরগুলি 

গাঙগুলি 

মুছে যাওয়া শৈশবের মানচিত্রগুলি 

অনেক বেশি মিস করে আমাকে।

 

তাদের পেটপােড়ার ঘ্রাণ শুকতে শুকতে 

নিজের নাগরিক শবদেহ বইতে বইতে

অনেক বেশি সুখী মানুষের বেশ ধরতে ধরতে 

আমার প্রতারক আমাকে নিয়ে হাঁটছি

 

শুধু শীতে শিমফুল ফোটানাে মায়ের 

সেই হাতটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।

 

প্রকৃতির বড়ভাই

 

আমি এবং মামুন খান- আমরা প্রকৃতির বড়ভাই 

নিজের পায়ের নিচে লুকিয়ে নিজেকে 

তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে জীবন 

নিজেদেরকেই মামা বলে ডাকি

 

আম্মা না তাতে খুব রাগ করেন। বলেন- 

বেত্তমিজ কোথাকার, তুই আমার কোন দিনের ভাই?

 

আমি হাসি। আমরা হাসি। আমাদের 

হাসিতে খলখল করে কাঁপে সরিষার মাঠ।

 

উচিতপুরের হাওয়া

 

আমি তাে ক্ষুদ্রতা। পুরাতন। 

জগন্ময় মিত্রের গান। 

আমি শুধু সাদাকালাে। শুধুই সাদাকালাে।

 

আমার শরীর জুড়ে উচিতপুরের হাওয়া 

শ্যাওলা ও উকিল মুন্সীর ঘ্রাণ। 

আমার মন মজে যাওয়া গলা ও মাস্তুলের মতাে 

ছড়িয়ে আছে হাওরের জলে ও কাদায়-

 

সুয়েজখালবাহিত ফেনায় গােসল করিয়ে 

আমাকে সুগন্ধ করতে চায় বন্ধুরা। 

ওরা ভুলে যায়- কয়লা ধুইলে যায় না ময়লা!

 

জলসায়রের গোয়ার

 

দূরে, দিগন্তের আরও দূর ঢালু থেকে 

ক্ষীণ বজ্ররেখার নিরীহ আলাে মাঝে মাঝে 

উঁকি দিয়ে জানান দিচ্ছে 

হালকা, মাঝারি, ভারি- যাই হােক 

বৃষ্টি এই পৃথিবীর কোথাও হচ্ছেই এখন-

 

আসবেই 

এই ঝিমমারা পত্রালিরা জানে 

আল বেঁধে আসা ধানচাষা আব্দুল জলিল জানে 

ভােরের আগেই পিঠ-পেট ডুবিয়ে চুবিয়ে 

পল্যাভাঙা একটা ঢল নামবেই নামবে

 

আমি জলসায়রের গোঁয়ার 

ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব দেশে দাঁড়িয়ে 

গাকে উদাম করে দিয়ে অপেক্ষায় আছি তার-

 

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ | আবদুর রাজ্জাক

Sat May 23 , 2020
মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ   এ নয় শুধু মোহময় আপ্লুত চিত্ত প্রসন্নের নিতান্ত আবেগীয় গলন। এ হলো আপন কবিতা ভূমির কর্ষণ। বিকাশের পথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অভিজ্ঞানে সমৃদ্ধ লতার দেহসৌষ্ঠব। যা পৃথিবীর ভাঁজ খুলে মানুষের চিন্তার জড়তায় মেলে ধরে নতুনতা।   কবি আবদুর রাজ্জাকের “মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ” সময়ের বৈরিতা ও নির্মাণের […]
Shares