মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ | আবদুর রাজ্জাক

মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ

 

এ নয় শুধু মোহময় আপ্লুত চিত্ত প্রসন্নের নিতান্ত আবেগীয় গলন। এ হলো আপন কবিতা ভূমির কর্ষণ। বিকাশের পথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অভিজ্ঞানে সমৃদ্ধ লতার দেহসৌষ্ঠব। যা পৃথিবীর ভাঁজ খুলে মানুষের চিন্তার জড়তায় মেলে ধরে নতুনতা।

 

কবি আবদুর রাজ্জাকের “মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ” সময়ের বৈরিতা ও নির্মাণের কথা বলে। মেকি সভ্যতার সাজানো তাসের ঘর ভেঙে দিয়ে প্রকৃতির সরলতায় বাঁচতে উৎসাহ দেয়। এক নিমেষেই মানুষের অহং মৃত্তিকা তলে কাবু হয়ে যায়।

 

কবিতা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে অনেকেই যেখানে শুধু গুঞ্জনে প্রোডাকশন নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ গ্রন্থখানি একটানে লতার গহীনে ব্রহ্মাণ্ডকে দেখাতে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে সমকালীন দেহ অনাদর পায়না ঠিক। বহুরৈখিক চালচিত্রের ভেতর ঠিকই বেয়ে উঠতে থাকে নিজস্ব রূপরেখা। আবদুর রাজ্জাকের কবিতা ভূমির গৌরব এখানেই। কবি এখানে কৃত্রিম সংকট মুছনে সুপারনোভা সৃষ্টি করেছেন।

 

মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ কবিতা গ্রন্থটি কবি আব্দুর রাজ্জাক তার সকল প্রিয়জনকে উৎসর্গ করেছেন। সচিত্র প্রকাশনীর প্রকাশক খন্দকার মনিরুল ইসলাম কত যত্ন করে ২০১০ সালের একুশে বই মেলায় প্রকাশ করেন। শিল্পী তৌহিন হাসানের প্রচ্ছদে এই কবিতা গ্রন্থটিতে আটচল্লিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে। ফ্ল্যাপে কবি মাহবুব কবির এই গ্রন্থের কবিতাগুলোর চলন নিয়ে কথা বলেছেন।

 

কবি আবদুর রাজ্জাক ৪ মে ১৯৭৮ সালে টাংগাইল তার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এই কবি বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। সেইসাথে মৃত্তিকায় অগুনতি কবিতার বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

 

“মৃত্তিকা ও লতার বিকাশ” কবিতা গ্রন্থ থেকে-

 

অন্তরলােক

 

কতদূর গেলে আরাে দূর যেতে ইচ্ছে করে

যে যায় না যে যেতে চায় না সে বােঝে না

এ গমনের মানে

 

যে যায় সে আরাে দূর যেতে চায়

কি খুঁজে পায়

প্রশ্ন তােমার আমার

 

যে যায় না সে কি দেখে আলাে আঁধার

যে যায় সে আরাে দূর যেতে চায়

সে হারায়, মানুষ তবু তাকে খুঁজে পায়।

 

 

স্বপ্ন খনন

 

শক্ত প্রলেপে ঢাকা তার মুখ দেখি না

সে শুনে এসেছে প্রাচীনতা এখানেই আছে

খনন কার্যের আয়ােজনে পুলকিত হই

সে শুধু সামান্য ছুয়ে দেখতে চেয়েছিলাে

ভালাে লাগে

কি ভেবে আমিও নামি খননে

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন আমার জমতে জমতে

জমাট বাধতে থাকে।

 

 

যতি

 

বাড়ি যাবাে ভাবছিলাম, দেখি

ভাপা পিঠার মাঝে গুড় পুরে দেবার

মত তুমি

অবিকল আগের মত রসালাে ব্যঞ্জনাময়।

 

শক্ত দেয়ালের ওপাশে রস জাগানিয়ে কথা

নিভৃতে কৃষ্ণবেশ ভাললাগে

বিশুদ্ধ প্রতিমা দেখেছি অনেক

নিভৃতে সরস রসে অবাক আমি

বনেদি কলসের ভেতর সাজানাে কর্মহীন ভাবছি

বাড়ি যাওয়া হবে না আজ।

 

 

মৃত্তিকা লতা

 

কাকে রেখেছে পাছে কাকে কাছে

কে বীজ বুনে দিয়ে তাকিয়ে থেকেছে

উঠেছে সবুজ ফুলে ফলে বেড়েছে

চাওনি কিছুই

যদিও দেখেছো তাকে চেতনা বিভূঁই

মানুষ বাঁচে তার কাছে

একদিন ফুরায় কথা

থাকে যুগ পরম্পরা মৃত্তিকা লতা।

 

 

পাটাতনের কারিগর

 

দেখে পারাপার হচ্ছে মানুষ একফোটা জল নেই

মাটির মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ভাবছো একদিন আমাকে

বড় প্রয়োজন হবে তাের- তাই ঘর-দোর ফেলে বসে থাকো

শুকনাে বালুতে দু’পা মেখে।

 

বহুদিন পর এ পথে একলা ছুটে গেছে বংশীবাদক

এখানে ঘাসের ডগায় তার প্রভাবে ফুটেছে বেগুনি ফুল

তাই তুলে এনে প্রতিরাতে গাঁথো নাভিমূলে।

 

সে ক্রোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে আকাশের সাথে পালা দিয়ে

কি করে হয়েছে দাস পাটাতনের কারিগর

দূরে শুকনাে গাছেদের ছায়া করেছে প্রতিশোধ উল্লাস খাড়ের দাবায় মুড়িয়ে রাতভর

সে গল্প সে শুনিয়েছে মরা নদী কাঠপােড়া পােয়াতির শরীরে।

 

কি করে তাকিয়ে আছাে পাটাতনে নৌকো আর ভাসলো না জলে।

 

 

জ্যোৎস্নাকে তোমাকে একদিন

 

কি করে এসব হয়

আগুনের একবিন্দুও পরেনি চোখে

দেখিনি অলস জ্যোৎস্নাকে।

 

জানিনা কি করে ভাঙ্গে সময়

জানিনা জ্যোৎস্নার সাথে তােমার কি মিল হয়।

 

তবু বলি জ্যোৎস্নাকে, তােমাকে।

 

মাটির ভাঁজের ওপরে কালাে কালাে রেখা

লতা-গুলাে সেজে আছে

আরাে কিছুদিন পর তাকে দেয়া যাবে তুলে

প্রণয়ের ভুলে

সাজানাে কথাটি থাকবে না সাজানাে

দেখবে সেখানে কাঁকড় ছড়ানাে

তবুও বলবে চাঁদ

আদরে মেখেছাে কথা

সুর তুলে বলাে তাকে টেনে জ্যোৎস্নাকে।

 

 

 

পাখি

 

পাখিটা বাসা হারালাে

সে হৃদয় হারালাে না।

 

চোখ বুজে দেখি নানা রঙ

নানা আকার

বুকের ভেতর ডাকে

পাখি আমার।

 

ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে

পাখিদের ডাক শুনি

পাখিটা বাসা হারালাে

সে হৃদয় হারালাে না।

 

 

 

অভিজ্ঞান

 

জলে পরেছে ছবি, বৃদ্ধ হচ্ছে চোখ

আমূল বিদ্ধ করে দেখছাে জলজ ভাবনা

তার সাথে কামের কি সম্পর্ক!

 

প্রতিরাতে পাও অথচ প্রতিভােরে

নিরর্থ খোঁজ

বিষন্ন পাখির পালক

আহত আত্মার ভিতর পাঠ

উদ্ধারহীন ক্ষত।

 

 

ছুটছে

 

সবাই কেমন উড়ছে, বাতাসে ভাসছে ডাল

বসছে না কেও, হাত ছুঁয়ে না ছুঁয়ে

কিংবা ইশারায় দম নিয়ে ছুটছে সবাই।

 

ভেতরে জীবন্ত সঙ্গমদৃশ্য এঁকে

রক্তের হােলিতে চিৎকার করে

ছুটছে সবাই

বন্দনা গীতে কিংবা বিষাদ সংগীতে

ক্লান্তি নেই উন্মাদ হয়ে

ছুটছে ছুটছে কেও বসছে না।

 

 

ভূমি

 

এই আবাদ ভূমির শেষ দেখে অতঃপর থামবে

সব নগ্ন নৃত্য ফেলে তোমরা মাঝে মাঝে বিশেষণে মাতবে রুগ্ন মাথাসমেত।

চলে যাবে বাতাসে ভেসে তােমার সৃষ্টীর খোঁজে

তিনি উপরে থাকেন।

আমি থাকি আমার মুখপানে চেয়ে

কি বলে আমাকে আমার আত্মা

কি বলে বিশ্বসংসারের অজাত ফুল

আমিও আবার মেলে দেই ডানা আপন আকাশে

যেখানে আমাকে দেখি আমার মনের বিদ্যালয়ে

ধুলোমাখা হয়ে খেলতে বসেছে।

এই আবাদভূমি চিনে তবে যাবে

অসদৃশ কথাগুলাে রেখে দেবো

আমার নতুন ও পুরােনাে আত্মার কাছে।

 

 

সত্য

 

যেখানে সত্য, সত্য নয় বার বার আস্ফালনের দগ্ধপত্র মৃত্তিকার কাছাকাছি এসে দেখলে এর অন্তস্থ জবুথুবু বিস্ময়ে মােহে চেয়ে আছে যা সত্য নয় অথচ সত্য।

বন্ধুটি চলে যাবে তাই নির্বাক আকাঙ্ক্ষা তার কাছে

শাসনের ছল করে নির্মাণ কৌশল খােঁজে

কিংবা হিমায়িত স্বর্গ সত্য পত্র দাহ করে

প্রকৃত ভালবেসে।

 

সত্য উদাস পথিক প্রেম খুঁজে মরে চেনা গলিতে,

চেনা পথে, চেনা মাঠে, অথচ এখানে কেও কেও

সেদিন পেয়েছিল তারে।

 

 

ভাসি জলস্রোতে

 

ভাসি জলস্রোতে অজ্ঞানতা মানি, সমীহ করি

ফোটা ফোটা জল কেমন তপ্ত করে বিস্ময় জাগে

সােনালী ডানায় স্বপ্ন ভর করে

বসে যাই ধাঁধা খণ্ডনের জটিলতায়

এই দংশন পাজর ভেদ করে বেরিয়ে গেলে দেখি

সংজ্ঞা চিৎকার আর কিছু ছবি ভেসে ওঠে বাতাসে

হঠাৎ ঢেউয়ে শূন্যে মেলে দেই কণ্ঠ

কত দূর পৌছায়

দূরগামী পাখিদের দল সান্ধ্য হাওয়া ভাল জানে।

 

নদীকে মনে পরে তার ফুটফুটে কন্যা এক শীতের রাতে

এ মগজ ফুটো করে কষে পেছনে মেরেছিলাে

তখন যা দেখি তার অর্ধেক আমি আর অর্ধেক মানবী

সে এখন সংজ্ঞা চিৎকার সান্ধ্য হাওয়ায় ভর করা কত কল্পনা

শরীর ভাসে জলস্রোতে একেকটা অংশে কত অবাধ্যতা।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

রাজা সরকার’র এক গুচ্ছ কবিতা

Sat May 23 , 2020
প্রস্তর যুগ   ১ বাকরুদ্ধ সময় নিয়ে লোফালুফি খেলছি। শিলনোড়ার ঘর্ষণে গুঁড়িয়ে দিচ্ছি পরিসর।   শাবকের কান্না আর শুনি না। উল্লাসের গাঢ় প্রত্যয় মিশে যাচ্ছে ঘামে। নীল ঘাম ।   মুছে নিচ্ছি রুমালে। পাথরের আঘাতে চৌচির আয়না, তার সামনে আর্তকে বসিয়ে রেখেছি খুরের উপর। রসিকতা এখন ভালো  লাগে। ভালো লাগে নিমফুল, ভালো […]
Shares