মাহবুব কবির | কবিতা যাকে পরাজিত হতে দেয় না | শিমুল মিলকী

মাহবুব কবির | কবিতা যাকে পরাজিত হতে দেয় না | শিমুল মিলকী

🌱

আপন কবিতা ঘাটে নতুন জলের আগমনে করচ আর হিজলের সাথে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন কবি মাহবুব কবির। ছায়াহীন কায়া হয়ে প্রতিটা ঢেউ গুনে যান একা। রোদের পায়ে হেঁটে হেঁটে খাতায় তুলে দেন জলদ অভিজ্ঞান।

বৃক্ষের দেহ কিংবা পাখির দেহ মূলত তারই দেহ বলে জানেন। তার কবিতা শুধুই সবুজ বললে ভুল হবে। তার কবিতা নিজের চিরচেনা হাতকেই আবিস্কার করে বারবার। তখন তালুতেই ধরা দেয় সব গ্রহ, নক্ষত্র, ব্রহ্মাণ্ডের হিসেব। 

তার কবিতা পড়তে পড়তে পাঠকের মন নিজেকেই পড়তে শুরু করে। জাক দেয়া সভ্যতাকে তুলে আনার তৃষ্ণা জাগায়। ঘাড়ে এসে পড়ে পূর্বপুরুষের লালচে তামাটে শ্বাস। তখন বোধে নতুন বৃক্ষ জন্মায়। এই বৃক্ষের অক্সিজেন আধুনিকতাবাদের ধারনাকে নাড়িয়ে দেয়। সামনে চলে আসে মরচে পড়া নদীর ইতিহাস।

তিনি সাধুদের জঙ্গলে জ্বলতে থাকা বাঁক-ভঙ্গিমা, ছান্দসিক সৌষ্ঠবের কলা-ক্রিয়ার গজফিতা আর কাঠিন্যতায় একান্ত নিজের ঢংগে সরলতা ঢেলে দেন। তখন সময় ভেঙ্গে পরে। শুরু হয় নতুন সময়। নির্মেদ শব্দের দুলুনিতে গাইতে শুরু করে পরান পাখি। বাক্যে শুরু হয় মাদকশূন্য মাতাল আবহ। মেলতে শুরু করে চিন্তাসূত্রের ডানা।

‘কবিতা হলাে ওই বিড়াল, আমিষলােভী চোর। আমি তাকে থলেবন্দি করে নদীর ওপারে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসে ভাবি /সে আর ফিরে আসতে পারবে না, কক্ষনো না। কিন্তু হায়, ফের দেখি ওই মার্জার /আমার আমিষের আশেপাশে ঘুরে /মহান তস্কর সে পৃথিবীতে পৃথিবীতে।…হে মার্জার, উনুনের গায়ে গা লাগিয়ে /যত ইচ্ছে আগুন তাপাও, ভয় নেই /আমিও ঘন লােমে ঢাকা /ওত পেতে আছি/মৎস্য, দুগ্ধের লােভে।’        

বেড়াল | কৈ ও মেঘের কবিতা | মাহবুব কবির

‘আমার স্বপ্ন মেঘ, মেঘ আমার নারী।’ আর মেঘের ডাকে কৈ-এর বিলাস, প্রকৃতিরই শাশ্বত রূপ। তাই কবি ‘পৃথিবী রজস্বলা চিরকাল’ জেনে এর সঙ্গে খেলা করতে নেমে পড়েন। তার কবিতা তখন পাহাড়ে সবুজ আঁচল হয়ে পড়ে থাকে। পিতামহের লাঙল হয়ে মাঠ চষে। প্রাগৈতিহাসিক গন্ধ ছড়িয়ে মহামূল্য প্রত্ন হয়ে ধরা দেয়।

মাহবুব কবিরের চলনে আগাগোড়া এক। দেহে কোথাও কোন জট পাকানো নেই। কোন তাড়াহুড়ো নেই। প্রবাহে কোন বাঁধ নেই। আছে বিস্ময়। আছে তাজা গন্ধ, উস্কে দেয়া চিন্তা। তার মধ্যে কোন বিদ্যার ঢেকুর নেই। হামবড়া ভাব নেই। এটাই তার স্টাইল। এতেই তার হয়ে ওঠে কবিতা। তাইতো তার কবিতা আমাদের সব চাওয়া-না চাওয়া আর প্রচলিত যুক্তি-বুদ্ধির খাটুনি থামিয়ে আশ্চর্যরকমভাবে অন্দরে ঢুকে পড়ে। চৈতন্যে ক্রমাগত নাড়া দিতে থাকে। 

মৃদুভাষী মাহবুব কবির প্রকৃতি, প্রেম ও সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন। সত্যভাষী হতে ভালোবাসেন। তিনি জীবনের উত্থান-পতনে, দুঃখ আর ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়াতে কবিতাকেই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে নিয়েছেন। 

দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে /আর /শুনতে হবে অবিভাজিত গান।…/ কেননা /…মেয়েটি গান করছে দেয়ালের ওপারে /গান তার দেয়ালে এসে টক্কর খেয়ে খেয়ে খণ্ড-বিখণ্ড, ভূপতিত /দু-এক টুকরো ছিটকে আসে এদিকে /দাপাদাপি করে জবাই করা কবুতর / এ বড় মর্মান্তিক…/…দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে, /শুনতে হবে অবিভাজিত গান।         দেয়াল | কৈ ও মেঘের কবিতা

কবি তার শৈল্পিক ভাবনা পরিশ্রুত করে শব্দের অমোঘ বন্ধনে, ভাবের নিবিড়তা দিয়ে কবিতায় অনিবার্য সত্যের উদ্ভাস ঘটান। মানুষের গরল পৃথিবীতে ঘাড় কাত করে, ভ্রুকুটি উঁচিয়ে বনমানুষকেই তিনি অধিক সত্য বলে মানেন। ভূমিদস্যু থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য, একটা অভয় পৃথিবীর জন্য কবিতা লেখেন। তাই তার মাঝে কোন কবিকৃতির উগ্রতা নেই। 

যদিও মাহবুব কবির মাথায় রঙিন ক্যাপ পড়েন। সাথে ব্র্যান্ডের শার্ট, জিন্স প্যান্ট, গায়ের চামড়ার মতো ব্রাউন শো। হাতে বেসলেট, সিগারেট। সাদা মেঘের মতো জুটিবাঁধা চুল। কখনো ইংল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায় যেনো তার জুলফি। আর এই ফ্যাশন ক্রিয়ার ভেতরে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে থাকেন তিনি। কখনো শুধু তার দেহই হাটে  আমাদের সাথে, কখনো হাটে তার পোশাক। কখনো তার দেহ-পোশাক দুটোই উধাও হয়ে শুধু তার কবিতাই যেনো হেটে চলে আমাদের সাথে। বিরতিহীনভাবে মিটিয়ে চলে আমাদের তৃষ্ণা। 

আমরা দেখি তাকে বাইসন ম্যামথের পেছনে ছুটতে ছুটতে রজস্বলা পৃথিবীকে ভালবাসতে। দেখি ঋতুমতী মেঘের পেছনে ছুটতে। তাই দিগন্তে তার জন্য ছায়া পড়ে থাকে। কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় উঠে তার কবিতা নতুন গন্ধ ছড়ায়। 

মাহবুব কবির নেত্রকোণার দক্ষিণ নাগড়ায় ২ জুন ১৯৬৮ জন্মেছেন। সেই থেকে জীবনের রোদ পোহাতে পোহাতে মুখোশহীন জীবন তার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। আজ তাই অন্তরাত্মা খুলে খুলে বের করে আনছেন এক একটা জ্যান্ত কবিতা।

প্রায় ২০০ বছর আগে /মুর্শিদাবাদ থেকে এসে /ভাটিবাংলার কদমশ্রী ধামে বসতি করেছি।…পরে প্রায় ১০০ বছর আগে নেত্রকোণার / নাগড়া মৌজা মগড়ার তীরে /নৌকা ভেড়াই /…এখন স্ত্রী-কন্যা নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে দিন / ভাবি, ফিরে যাব কি না /মুর্শিদাবাদে/…ভাবি, ফিরে কি যাওয়া যায় /এসব তাকে তামাদি, সমাহিত /ভাবি, লাখ লাখ বছর ধরে /এ-মেরু ও-মেরু করে চলেছি-/প্রতারক প্রেমিক, গুপ্তচর এক।    গুপ্তচর | বেসরকারি কবিতা

যেকোনো শিল্পসৃষ্টি এক অবিরত নিবিষ্ট প্রাণময় প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ায় কবিকে কঠিন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যেতে হয়। বর্তমানে কবি একটি গণমাধ্যমে চাকুরি করছেন। এতো এতো ভয়াল সংবাদের চাবুক সামলে কিভাবে কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখছেন কেই বা তা জানে। বহুকাল তাকে দেখেছি বড় কাগজকে এড়িয়ে চলতে। দেখেছি বিবাহ জীবনকে ভয় পেতে। পাছে কবিতা জীবন হারিয়ে যায় সেই ভয়ে দেখেছি নিরবে জলমগ্ন থাকতে। 

কবিতা তাকে বহুভাবে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আবার কবিতাই তাকে সংসারে ফিরিয়ে দিয়েছে। কবিতার সাথে সমান্তরালভাবে মানিয়ে এবং মেনে নিতে হয়েছে তাকে। আর এসব নিয়ে তার অনুচ্চস্বর আর সংকোচবোধ চিরকালীন। 

একসময় কবি ফুটবলে দুর্দান্ত লাথি দিতেন। পৃথিবীকে গড়িয়ে যেতে দেখতেন। আর সেই গড়ানোই আজ কবিতার কোর্টে এসে শেষমেষ গোল হয়ে গেলো। 

তার সেই সময়ের সূর্যবরণ সৌন্দর্যে  পাখিকুল  ছিলো অস্থির। তাদের ফুরুত-ফারুত উড়াউড়ি এখনও তাকে কতটা স্বস্তি দেয় জানা নেই।  নদীকুলে কতটা জোয়ার বয় জানা নেই। তবে আমরাও কবির চির তারুন্যকে হৃদয়ে ফিক্স করে রাখতে চাই। দেখতে চাই বিরামহীনভাবে তার বুকে ভাসছে শব্দ-সুরের নৌকো।  

জলের স্বভাবে /তােমাকে ভালােবেসে- /লিখছি ভাষার অগ্নি-ছাই।…তুমি দূরদেশে /ভাষায় তোমার মুখ ভাসে- /অক্ষরে শব্দে তোমাকে সাজাই।…ধু ধু সাদা পাতায়-/শুধু কালো রক্ত বয়ে যায়-/রক্ত বয়ে যায়।          তোমাকে | আয়নার দিকে

কবিপত্নী সুলতানা ও কন্যা ব্রাহ্মি। অসম্ভব সুন্দর তাদের সংসার। নাগরিক সব অস্থিরতা ছাপিয়ে মদনের সব হাওর তাদের জন্য বরাদ্দ আছে। কবি এখানে বুক অবধি ডুবে আছেন। সাথে, জলপোকা, ভাটিয়ালি পাখি আর সর্পবন্ধুরা তাকে আরও ঋদ্ধ করছে। 

তার প্রকাশিত কবিতার বই •কৈ ও মেঘের কবিতা [১৯৯৬] •ফুলচাষি মালি যাই বলো [২০০৯] •বেসরকারি কবিতা [২০১২] •আয়নার দিকে [২০১৫]

  • সম্পাদিত গ্রন্থ নব্বইয়ের কবিতা [১৯৯৯] উকিল মুন্সির গান [২০১৩] • ছোটকাগজ: অক্ষর
  • লােক সাহিত্য পুরস্কার [২০১২] তার জন্য নিশ্চয়ই উৎসাহব্যঞ্জক।

আজ কবি মাহবুব কবিরের জন্মদিন। তাকে নিরন্তর শুভেচ্ছা। পুনঃ পুনঃ তার দীর্ঘ কবিতা জীবন কামনা করি। সাথে কবির অকপট উচ্চারণে আবারও আশ্বস্ত হই, আন্দোলিত হই: 

   “অহরহ মৃত্যুর মাঝেও কবিতা আমাকে পরাজিত হতে দেয় না, পরাজয় শেখায় না। এ জন্য কবিতা ভালোবাসি, লিখি।”

 

 

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নতুন কবিতাগুচ্ছ | মাহবুব কবির

Tue Jun 2 , 2020
কবি মাহবুব কবিরের জন্মদিনে আবারও তার কবিতা পড়ি। কবিকে ভালোবাসি, কবিতাকে ভালোবাসি।  নতুন কবিতাগুচ্ছ  মাহবুব কবির  🌱 মানুষ মানুষ আবার হলো গুহাবাসী আজ শূন্যতায় রাস্তায় কুকুরগুলি কাঁদছে মানুষ আবার হলো গুহাবাসী আজ শূন্যতায় উদ্যানে বৃক্ষ-ফুল-ফল কাঁদছে মানুষ আবার হলো গুহাবাসী আজ শূন্যতায় উড়ে উড়ে পাখিরা কাঁদছে ফাঁকা রাস্তা কাঁদছে রেললাইন […]
Shares