পৃথিবীটা কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন মাহবুব কবির | আবদুর রাজ্জাক 

পৃথিবীটা কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন মাহবুব কবির | আবদুর রাজ্জাক 

🌱

কবি মাহবুব কবিরকে ভালোবাসি। তিনি খুব স্টাইলিস্ট মানুষ।  ছোট বেলা থেকেই দেখছি,  উনার হাঁটার একটা নিজস্বতা রয়েছে।   প্রথম দেখাতেই স্পষ্ট হয় উনার স্বাতন্ত্র্য। মনে হয়  মানুষটা ডান দিকে একটু কাত হয়ে  পৃথিবীর সব ওজন কাঁধে নিয়ে যেন হেঁটে চলেছেন। লম্বা চুল আর গলায় পুতির মালা। হাতে ব্রেসলেট। ব্যগি জিন্সের পেন্ট আর লেদারের জুতো। এক অনন্য স্টাইলে তিনি তাকে রচনা করেছেন যেন।

 

শৈশবের নয়নতারায় তাঁকে তখনও কবি হিসেবে চিনতে শুরু করিনি। তবে এটা ঠিক বুঝতে পারতাম, আলাদা জীবনাচরণে তিনি তার নিজস্বতা ফুটিয়ে তুলতে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। ভালো লাগতো উনার ব্যক্তিত্ব। গণ্ডিবদ্ধ রুটিনে তিনি তার জীবনকে কখনও বাঁধেননি। জীবনের কিছু বেদনা ও অতৃপ্তি তাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। সেই দাহযাত্রার ভাষা ও কণ্ঠস্বর আমরা শুনি তার কবিতায়।

পাঠ্য পুস্তকে যেসব কবিতা আমরা নব্বই এর দশকে পড়েছি সেই কবিতার ভাষা ও গঠন প্রক্রিয়াই আমাদের কাছে আদর্শ কবিতার উদাহরণ রূপে ধরা দিয়েছে। তাঁর ছোটভাই তপন আমার বন্ধু। তার কাছ থেকে জানা গেল মাহবুব কবির একজন কবি। স্টাইলে মুগ্ধ হওয়া মানুষটিকে কবি হিসেবে জেনে তার সম্পর্কে জানার কৌতুহল আরও বেড়ে গেল। এর অনেক পরে  “কৈ ও মেঘের কবিতা” বইটি আমার হাতে আসে। বইটি এক বৈঠকেই পড়ে শেষ করেছিলাম। আমার সামান্য পাঠে তখন মাইকেল মধুসুদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীম উদ্দীন, কাজী নজরুলের ইসলাম ও পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতার কাব্যভাষা  আদর্শ হয়ে ছিলো। কিন্তু এই কাব্য গ্রন্থের কবিতা আমার কাছে অন্যরূপে ধরা দিলো। এই কবিতার ভাষা আর পূর্বপাঠের কবিদের ভাষার সাথে মেলে না। 

এর আগেই সিকদার আমিনুল হকের কবিতার সাথে হয়ে আমার কাব্য ভাবনার নতুন একটা পরিসরে প্রবেশ করেছিলো। এর পর মাহবুব কবির এর কবিতার ভাষা আমার কাছে অনন্য টনিক হিসেবে ধরা দিলো। মনকে সতেজ করে দেওয়া এক সকালের ভৈরবী। একজন কবিকে তার স্বতন্ত্র কাব্যভাষা রপ্ত করে নিজেকে চেনাতে হয়। নিজস্বতা না থাকলে সেই কবিকে কেউ মনে রাখে না। তিনি তার অগ্রজ কবিদের ভাষাকে সচেতনভাবেই জানতেন। জেনে বুঝেই তিনি তার চলার পথ তৈরি করেছেন। 

“আমি প্রতিদিন নতুন নতুন পৃথিবীর

সাক্ষাৎ পেতে ভালোবাসি। 

আমি জানি অতীত মানে পুরনো নয়;

সে প্রতিদিন অষ্টদশি রমণী, প্রতিদিন

বিবাহবার্ষিকী, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা।

 

পৃথিবী রজঃস্বলা চিরকাল,

আমি এর সাথে খেলা করবো এখন।”

(পৃথিবী, কৈ ও মেঘের কবিতা, ১৯৯৬)

 

কবি মাহবুব কবির হাওরাঞ্চলের জল ও মাটির সুগন্ধে বেড়ে ওঠা মানুষ। তার কবিতায় সরল ও সুবোধ একটি প্রাঞ্জল রূপ আছে। জীবনের পরিণত পর্বে এসে তিনি তাঁর ঐতিহ্যের গভীর উপলব্ধি দিয়ে বুনন করেন তার কবিতা। সেই উপলব্ধি অসাধারণ ও তুলনাহীন। জীবন যাপনের সেই মুগ্ধতা নিয়ে তার কবিতা স্বকীয় ধারার আলাদা উচ্চারণ নিয়ে মাথা উচু করে বিশেষ বলেই জানান দেয়। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার দোষ থেকে তিনি মুক্ত। 

 

“দিগন্তে গিয়ে দেখলাম 

দিগন্ত নেই, 

পড়ে আছে দু’টি যমজ ছায়া।

অতঃপর দিগন্তে গিয়ে দেখলাম

দিগন্ত নেই, 

পড়ে আছে দিগন্তাক্রান্ত প্রাগৈতিহাসিক রাত্রি।

রাতের অতলান্তে গিয়ে দেখলাম, 

দিগন্ত বসে আছে 

কেউক্রাডাঙের চূড়ায়।

তার টোটেম নৃত্যের তালে তালে 

দুলছিলো তার সূর্যবরণ চুল।” 

(দিগন্ত, কৈ ও মেঘের কবিতা, ১৯৯৬)

 

জীবন ও জীবীকার টানে নয় মূলত সাহিত্যের প্রতি গভীর টান থেকে তিনি ঢাকার কঠিন জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। জন্মভূমির মায়া ভুলে তিনি ঢাকায় তার সাহিত্য বলয় তৈরিতে মশগুল আছেন । ১৯৯৬-১৯৯৭ সালের দিকে মাহবুব কবিরের সাথে নেত্রকোণায় আমার কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন হয়। সম্ভবত ১৯৯৯ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর তিনি আবার নিয়মিত নেত্রকোণায় থাকতে শুরু করেন। কবিকে কেন্দ্র করে তখন নেত্রকোণা পাবলিক লাইব্রেরি চত্ত্বরে সান্ধ্য আড্ডা হতো। প্রাণবন্ত সে সাহিত্যের আড্ডায় তরুণদের মধ্যে একটা নতুন চৈতন্য তৈরি হয়। বাংলা সাহিত্যের গতি প্রকৃতি ও বিশ্ব সাহিত্যের নানা বিষয়াদি ছিলো এই আড্ডার বিষয়। তিনি অসংখ্য তরুণ কবিকে অনুপ্রাণিত করেছেন। একজন দায়িত্বশীল অগ্রজের মতই তিনি তরুণদের সামনের এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। 

কবি মাহবুব কবির তাঁর সময়ের অন্যতম প্রধান কবি। তার সাবলিল কাব্যভাষা, মিতভাষী ব্যক্তিত্বের অপূর্বতায় সবাই কবিকে পছন্দ করেন। প্রকৃত কবিকে দশক দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর কাব্যভাষায় ভূমির সংস্কৃতিকেই অনুভব করা যায়। ভূমির গান লিখতে লিখতে সারলিক এই কবিতা শাশ্বত কালের বোধে প্রবেশ করে। 

মাহবুব কবিরের কবিতায় সমাজের বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ণ একটা চমৎকার স্যাটেয়ার তৈরি করে। একটা সচেতন চিন্তার অভিঘাত তৈরি করে। যেন প্রচিলিত সমাজের ভেতরে নিজেকে সপে দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারে তার কোন ইচ্ছে নেই। তবে সমাজের এই নখরামিগুলোকে নিপুন উপায়ে তিনি তুলে আনেন অদ্ভুত দলিল হিসেবে। সেখানে প্রচলিত সমাজের ক্ষত চিহ্নগুলো পরিষ্কাররূপে উঠে আসে। সমাজের সীমানাকে জেনেই কবি  সুর তৈরি করেন। সময়ের দারুন পর্যবেক্ষণ আমরা দেখতে পাই তার কবিতায়। 

“প্রকৃতির সবুজ দর্শনে আমার চোখের অসুখ সেরে যায় 

মস্তিষ্কে আরাম বোধ করি।

কিন্তু আমি যে শহরে, যে পাড়ায় থাকি-

সেখানে ঘাস নেই, বৃক্ষ নেই।

তাই আমি কাঁচা বাজারে গিয়ে সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকি” 

(চক্ষুরোগে ভুগছি, বেসরকারি কবিতা, ২০১২)

“অনেক বছর ধরে আছি ইনসোমেনিয়ায়।

আর তুমি রিকশায় যেতে যেতে ঘুমিয়ে পড়ো, 

কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ো,

সংগম করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ো।

আর আমার পাশ দিয়ে অবিরাম ছুটে চলেছে একটি অতনু ঘোড়া

ধূলি উড়িয়ে কোথায় চলেছে সে?

 

কী অদ্ভুত জার্নি আমাদের- হে সড়ক, হে ছায়ামূর্তি!”

(আমাদের জার্নি, মিন ও মেশিন, ২০১৮)

 

জীবিকায় সাংবাদিক কিন্তু আপাদমস্তক কবি। বিশ্ব কবিতার রন্ধন শালায় তিনি বসবাস করছেন। অগ্রজের রিলে রেসের কাঠি নিয়ে ছুটে চলেছেন আগামীর কাছে। বাংলা সাহিত্য তথা বাংলা কবিতা তার হাতে হাত রেখে অনেক দূর যাবে- এতটা আমরা আশা করতেই পারি। তাঁর কলমের ধার দিনকে দিন বাড়তেই থাকুক। জন্মবার্ষিকীতে কবিকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

গদ্য-আলেখ্য গুচ্ছ | মাসুদ খান

Tue Jun 2 , 2020
গদ্য-আলেখ্য গুচ্ছ | মাসুদ খান 🌱 প্রকৃতি-১ এই গ্রহে প্রাণ বাঁচে প্রাণাহার করে। জীবকোষ বাঁচে, বিকশিত হয়, জীবকোষ খেয়েই। প্রতিদিন অন্য জীব-জীবাংশ গ্রাস করেই বাঁচতে হয় জীবকে। প্ল্যাংক্টন ও শ্যাওলা খাবে ছোট মাছ, ছোট মাছকে খাবে মাঝারি, মাঝারিকে বড়, আর ছোট-বড়-মাঝারি সবাইকে খাবে মহাকায় মাছ। আর ইচ্ছে করলে সবকিছুই গ্রাস […]
Shares