গদ্য-আলেখ্য গুচ্ছ | মাসুদ খান

গদ্য-আলেখ্য গুচ্ছ | মাসুদ খান

🌱

প্রকৃতি-১

এই গ্রহে প্রাণ বাঁচে প্রাণাহার করে। জীবকোষ বাঁচে, বিকশিত হয়, জীবকোষ খেয়েই। প্রতিদিন অন্য জীব-জীবাংশ গ্রাস করেই বাঁচতে হয় জীবকে। প্ল্যাংক্টন ও শ্যাওলা খাবে ছোট মাছ, ছোট মাছকে খাবে মাঝারি, মাঝারিকে বড়, আর ছোট-বড়-মাঝারি সবাইকে খাবে মহাকায় মাছ। আর ইচ্ছে করলে সবকিছুই গ্রাস করতে পারবে মানুষ। এই যে খাদ্যচক্র, এই যে স্তরবিন্যাস, এটাই প্রকৃতির বিধি। খাদ্যশেকলের উঁচু-স্তরে-থাকা বাঘকে তাই ভোর থেকে রাত অবধি ধেয়ে যেতে হয় স্তরান্তরে-থাকা হরিণের ঘ্রাণ অনুসরণ করে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য হরিণকেও ছুটতে হয় বাঘের আগে-আগে, আর প্রাণধারণের জন্য খেতে হয় তৃণগুল্ম।   

কিন্তু যদি এমন হতো, জীবদেহ যদি পারত কার্বন ও অন্যান্য জড়বস্তু সরাসরি আহার ও আত্তীকরণ করতে, তাহলে কি থাকত এই নির্মম জীবসংহারী খাদ্যচক্র, প্রাণসোপানের এই নিষ্করুণ স্তরপরম্পরা?  

জীবকোষের উদ্ভব ও বিকাশের জন্য মা প্রকৃতি কেন যে বেছে নিয়েছিল এমনই এক উপায়বিধি যা নির্ধারণ করে দিয়েছে এই ধ্রুব সত্যটিকে যে, জীব-জীবাংশ খেয়েই বাঁচতে হবে জীবকে– সে এক রহস্যই বটে।

গ্রহের প্রাণীদের ভেতরে এই যে আগ্রাসী, জীবঘাতী নির্মমতা, এ কি তবে প্রকৃতিনির্ধারিত! প্রকৃতির একেবারে মর্মে নিহিত কি এই নির্মমতা! 

প্রকৃতি এমনই, হায়ারার্কিপন্থি; তার আছে নিজস্ব নির্বাচন আর সে সমর্থন করে যোগ্যতমের উদ্বর্তন।  

অবশ্য সময়ই প্রতিনিয়ত মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে চলেছে এই স্তরবিন্যাস।  

 

প্রকৃতি-২ 

প্রকৃতি এমনই। একদিকে প্রাণপালিনী, অন্যদিকে প্রাণবিনাশিনী। প্রাণহরণের মাধ্যমেই হবে প্রাণের পালন– এ-ই তার বিধান। একদিকে সে নিয়ত পরিবর্তনশীল, অন্যদিকে স্থিতিস্থাপক ও অভিযোজনসহায়। 

প্রকৃতিশাস্ত্রের এক অনুচ্ছেদে প্রেমযোগ, অন্যটাতে বলপ্রয়োগ। এক পাতায় চিত্রিত প্রকৃতি-মায়ের মমতাময়ী রূপ, অন্য পাতায় লেখা তার নির্মমতার কথা।

প্রকৃতির বিধিবিধান কেনই-বা এরকম, যেরকম দেখছি আমরা? হতে তো পারত অন্য কিছু– মহাকর্ষের বদলে মহাবিকর্ষ বা মহানিরপেক্ষ, পরিবর্তনশীলতার বদলে চিরস্থবিরতা! কিংবা যোগ্যতমের উদ্বর্তন না হয়ে অযোগ্যের বা যোগ্য-অযোগ্য নির্বিশেষে সকলের উদ্বর্তন! 

সমস্ত বিশ্বব্যাপারের মূলে যে চারটি আদি মৌলিক বল, মহাবিস্ফোরণের পরপরই যাদের জন্ম স্থান আর কালের জমজ হিসেবে, কেন তারা সংখ্যায় চার, আর কেনই-বা ওরকম তাদের বৈশিষ্ট্য! কিংবা সেই বিস্ফোরণমুহূর্তে নিঃস্থান-নিষ্কাল-নিঃশক্তি-নিষ্পদার্থক এক শূন্যতা, এক পরম শূন্যতা, কেন দ্বিভাজিত হলো পজিটিভ ও নেগেটিভ এনার্জিতে, কণা থাকলে কেন থাকে প্রতিকণা, ক্রিয়া হলে কেন হয় প্রতিক্রিয়া সমান সমান!      

প্রকৃতির কোন গভীর, জটিল আবেগ কাজ করেছে এসবের পেছনে– অজ্ঞেয়ই কি থেকে যাবে সব? 

প্রকৃতির বিধানগুলি কী কী এবং কীরকম, এ যাবৎ তা-ই আবিষ্কার করে আসছে বিজ্ঞান। কিন্তু কেন তারা সেরকম, তা অনেকটাই অজ্ঞাত। 

ভবিষ্যতের বিজ্ঞান হয়তো আবিষ্কার ও সূত্রবদ্ধ করতে থাকবে প্রকৃতির সেই প্যাশনাল, ইমোশনাল ট্রুথগুলিকেও।                  

    

মা ও পালক মা 

আর কত সন্তানের ভার সামলাতে পারে একা এক মা! কোত্থেকে, কীভাবেই-বা জোটাবে এত-এত পোষ্যের আহার, বাসস্থান, শক্তি, জ্বালানি, গ্যাসোলিন! তার ওপর সন্তানদের এত অত্যাচার, আজগবি সব আবদার– কাঁহাতক আর সহ্য হয় মায়ের!  ক্রমে জ্বর বেড়ে যায় তার, পুড়তে থাকে শরীর। নিরুপায় মা তাই মাঝে-মধ্যে ভীষণ চটে গিয়ে প্রহার করে সন্তানদের, বাঁধিয়ে দেয় হুলুস্থুল দুর্যোগ দুর্বিপাক। 

মা যদি আর না-ই নিতে পারে এত পোষ্যের ভরণপোষণ দায়ভার, পোষ্যরাই-বা কী করবে! তাই তারাও খুঁজছে পাওয়া যায় কিনা কোনো পালকমাতার সন্ধান। শোনা যায়, আছে একজন, দূরে, নিঃসন্তান। তবে বেশ রুক্ষ ও রুদ্র প্রকৃতির, বদরাগী। এবং চরমভাবাপন্ন। 

কিন্তু একবার যদি তার কাছে যেতে পারে, অন্তত কিছু সন্তান, ফেলে তো আর দিতে পারবে না; ক্ষমাঘেন্না করে নিশ্চয়ই আশ্রয় দেবে কোলে। 

তখন সন্তানদের প্রথম কাজ হবে ফল্গু জাগিয়ে তোলা বাৎসল্যরসের, জাগিয়ে তোলা হরিৎ-শ্যামল মায়া, পালক মায়ের রুক্ষ দেহে ও মনে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

চিরকালেই চমৎকার চ্যাপলিন | অঞ্জন আচার্য

Tue Jun 2 , 2020
চিরকালেই চমৎকার চ্যাপলিন | অঞ্জন আচার্য 🌱 সেই ভবঘুরে মানুষটি— যার পরনে বগি ট্রাউজার্স, খুলে পড়বে বলে কোমরে দড়ি, মাথায় ক্ষুদ্রকায় বাউলার টুপি, গায়ে অতি আঁটসাঁট একটা কোট, পায়ে অতিকায় জুতো— উলটো করে পরা যদি খুলে যায়।  আর নাকের নিচে টুথব্রাশের আঁশের মতো এক চিমটি মোচ। আর হাতে আছে সর্বকর্মক্ষম […]