কবিতাগুচ্ছ | বিজয় আহমেদ 

কবিতাগুচ্ছ | বিজয় আহমেদ 

🌱

দুলদুল

আমি তোর কোলে রাখি মাথা চোখ বুঁজে

আমার চুলেতে বিলি দাও গো মা কেটে

মাটির দেহের পরে চলেছে রেডিও

ফাটা তামা ত্বকে কত জিকিরেরা রটে। 

 

আমার চোখেতে তুমি মাখাও কাজল

কলিজারে কেটে করো সম ভাগে ফানা 

আমি তো জমিন এই অভাগা দেশের 

মাগো, কাটো ডানা-জীব, করো চির-কানা।

 

আমি তো পাখির পেটে তাজা তাজা বীজ 

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাই বেহেশত-দোযখে

আমি জন্মি নাই আহা বাড়ি নাই কভু 

আমাকে তোমার আসমানেই রাখো প্রভু।

 

আমি তোর কোলে মাথা রেখেছি নিভৃতে 

জামগাছে হাগে গায় দুয়েকটা পাখি

শাইঢুলি থেকে আসে নীল বাতাসেরা 

পশুর শরীর থেকে শান্ত সুবাসেরা।

 

কান পেতে ধরে রাখি বাতাসের বীজ

হোসেনের তেজী ঘোড়া পতপত ওড়েছে

আমি তো তোমার কোলে রেখেছি গো মাথা

আমার চুলেতে দাও মাগো বিলি কেটে

পুরো বাংলা জুড়ে মাতা ছড়াও আঁচল

শিয়রে কোরান নিয়ে যাই যেন মরে। 

আর শাইঢুলি থেকে বাতাসেরা এসে

পালক ওড়াক কিছু হাঁস ভালোবেসে। 

জামগাছে হেগে দিক দুয়েকটা পাখি

মাগো তোর কোলে চোখ বুঁজে মাথা রাখি।

 

অবসরে এই, মাগো চুলে দাও বিলি কেটে আর

সিঁথি তোলা শেষে ‘রে দুলদুল’ বলে ডাকো তো আবার।

 

আমি

আমিও তো কাটা ধান মাগো তোর অবারিত খেতে 

সোনাদানা রূপে গেঁথে আছি কালা কৃষকের বুকে

আমার তো নাই হাড়, দাঁত, কাঁধ ভাবো অস্থি কোনো 

নিদারুণ যমুনার জল, আমি গলাকাটা মাছ, পথে ফোটা ফুল যেন।

 

আমি তোর বুকে স্তন, আর দুগ্ধ স্তনের আকারে

ঊরুতে জাগিয়া উঠি মাগো তীব্র শোলের প্রকারে।

আমি নিরঞ্জন-লাল, সদ্য কাটা কলিজার মতো

জমিনের বুকে আমি সর্বকালে নামাজেই রত। 

 

আমি তরমুজ শিশু, নদী স্রোত ধরে , ভেসে যাই

একা আটকুঁড়া কোনো চিরদুখী পিতার নিকটে

কোথাও ডাকে নি ফুল প্রাণ ধরে বাতাসের ভারে

অথচ বাতাসে ভাসে জিন পরি অজানা শকটে।

 

বোশেখের সূর্য ধরে আছি বুকে এমন অবুঝ

বাছুরের নীল চোখে ফোটা আমি ঘাসের সবুজ। 

জানি আমি কাটা ধান পড়ে আছি তোমার জমিনে

এসো হে বণিক ভ্রাতা, সরকার নাও মোরে কিনে।

 

মেঘ ডাকা কালে, বাতাসের গানে জেগেছে মোকাম 

চিরকাল নত পিঠ বোরাকের, নবীজির কাছে।

কাটা ধান-বুক, করে ধুক ফুক মরে চিরকাল ধরে

ধরেছে জিকির নদীতলে পীর-দরবেশ-মাছে।

 

যদিবা সোনালী রঙ, চক্রাবক্রা অজানা আক্রোশে

পড়িছে ছড়ায়া তবু জেনে রাখো আমি কাটা ধান

চির কৃষকের বুকে থাকি কালা কৃষকের ব্যাটা 

কাটো রক্ত নালী কান পেতে শোনো ফজর আযান। 

 

আমার তো নাই হাড়, দাঁত, কাঁধ ভাবো অস্থি কোনো 

নিদারুণ যমুনার জল, আমি গলাকাটা মাছ, পথে ফোটা ফুল যেন

 

 

ময়মনসিংহ 

আবার কোথায় ময়মনসিংহ বলো নিপুন বজ্রের

মতো ঝলসে ওঠে— পুনরায় যাবে ডুবে–যেন মাছ

অতিরিক্ত কোনো সন্ধ্যাকালে আহা, ভেসে আছে বিলে 

সে কী বোয়াল না মহাশোল কোনো, এই নিয়ে কিছু

জ্যান্ত জনপদ, উড়ন্ত পরির পিঠে চড়ে ভেসে 

যাবে, ঘুমমধ্যে, কিছুটা শিমুল তুলোর নরমে।

যদিও খালের পাশ থেকে গন্ধ–গু আর মুতের 

শেয়ালের পদচ্ছাপ থেকে তার শিকারের চোখ

আর আত্মা, আধফোটা চাঁদ ও যুবতীদের স্তন

কেচ্ছার মতন মেঘরূপে, ঢুকে যাবে অভিশাপে।

 

কিছুটা পাপের পর আমি যদি ভেসে থাকি আলো

পাশে কিশোরগঞ্জ, স্বাতীতারা বেশে দেখাবে কি ভয়?

জানি নরসুন্দা আহা গেছে খোঁড়া পায়ে উর্ধ্বমুখী

আমার বোরোর খেত, অন্ধ নারী আর মাতৃমুখ

জ্বরে তপ্ত ঠোঁটে তোর জীব সহ ভয়াল চুম্বন

কভু রাখি নাই মনে প্রভু, আমি এমন পাপিষ্ঠ।

 

শুধু দল্লীবিলে মৃত ঢোড়াসাপ ও কাকিলা মাছ

জমজ বোনের মত পুষ্প যেন ভেসে গেছে স্বর্গে। 

কার স্তন হায় আমাকে শরীর বলে ডেকেছিল

আর কোথায়-বা আমি, বড়শিতে গেঁথে যেতে যেতে

নারীকে পরির রূপে ভেবে, পেয়ে–অবমুক্ত কোনো

পক্ষির মতন, ফেরেশতা বুকেতে খুজেছি আশ্রয়।

 

অনেক স্টেশন ধরো ছিলো মাঝে, আহা ময়মনসিংহে

কেউ যায় নাই কভু। কারো কলিজায় শালা লাগে 

নাই টান, যেন কেউ বলে নাই কথা এ ভাষায় 

গর্ভে মাতা তবে তুমি কাকে ধরেছিলে, ভ্রুণ রূপে?

যদি কাটি বুক যেহেতু পুরুষ জানো স্তনহীন

মায়া কি রয়েছে কোনো দলা বেধে কাদা বলো সোনা?

উৎক্ষিপ্ত যানের মতন নভোমন্ডলে হারাবার

পর, ধুয়া-ধূলা, ভস্মীভূত রশ্মি–এতিম রাখাল

রূপে পড়ে ছিল। মরে ছিল আহা উর্বর জমিনে…

 

কোনো শালা বাসে নাই ভালো জানি প্রেমিকার মত

আমিও যেমন, ডুবি নাই ময়মনসিংহে, স্তবগানে?

কিছুটা সুবাস ভাসে ফুল আর ফলে, তেলবীজে

অরূপ অষুধে। সূর্যমুখী, তুমি কার মেয়েছেলে?

বিলের গভীরে যে পেত্নী খেয়েছে আমাকে সযত্নে 

তার পরিচয় ভুলি নাই আর। যদিও জানি না নাম তার!

 

কিছুটা জমজ আমিও। ভুলেছি গ্রহ, উপগ্রহ

যা যা ময়মনসিংহে। যা যা শারীরিক। প্রেমময় সোনা

বিলের শাপলার কাছে তাবিজের যত গুপ্তকথা

বলে মরে যাব। শালা মরে যাব। যেহেতু কলিজা

শাদা। প্রেম নাই কোনো। টান জাগে নাই অবিরাম। 

যেহেতু রক্তের কনা ডাকে নাই মর্সিয়া কান্নায়।

 

আবার যদি গো কোথাও জাগিছে সোনা ময়মনসিংহ 

 

ভিক্ষা

এই তো দুনিয়া মেশিনের; মেঘ গুমড়ে গুমড়ে

উঠে। তপ্ত জিব ও মহিলাদের সঙ্গীত অর্গান

জেগে থাকে। এই গ্রামের পরেও বকড়ি শিশু আমি

গৌরীপুর শেষে বাইপাসে দাঁড়িয়ে যাবো। ট্রেনে ট্রেনে

ডাকাতি, হত্যার পর আমি ভিক্ষা শুরু করি। আর

নার্সের খোঁপায় মুখ দেই গুঁজে। কোথাও একটা

নান্দাইল আছে–থির থির করে হালকা দোলে শুধু

হাওয়ায় হাওয়ায়। বাথানের থেকে খুব বেশি দূরে

ছড়ায় না গান। বকড়ি শিশু বলে ডাকো, খেতে, সোনা। 

 

ট্রেন থেমে যাবে স্টেশনের পাশে অখ্যাত বাজারে। 

ভিক্ষা দাও দ্রুত। এরপর পালাবো। মহিষের কাঁধে

আছে কোনো নান্দাইল জানি স্থীর। হাওয়ায় হাওয়ায়

থির থির করে হালকা দোলে শুধু মেয়েরা, পরিরা…

ডাকাতি ও হত্যা শেষে আমি ভিক্ষা করি, জেনে রাখো।

 

 

কালাবাউশ

আমি তোর খাল জলে ভাসা কালাবাউশ রে সোনা

আচমকা ঢুকে গেছি সীমানায় নিয়ম না মেনে

এখন আমাকে কোলে তোলে নাও। বুকেতে জড়াও

সোনালী আচিল কেটে তবজির কোটরে লুকাও।

 

এই যে রাখাল, চীর যুবা হুহু বাতাসের বীজ 

আমি মাতা আমি পিতা ধান কৌম রক্ত খুন শিস।

আমাকেও আধফোটা চাঁদ ডাকে, হীরাপক্ষি বলে

যদি যাই সাত সমুদ্দুর আর তেরো নদী ফেলে

চাঁদ যদি গলাকেটে মোরে রেখে দেয় কাঁধে-কাঁখে

তবে তুমি কাজলের মতো দু-চোখে মাখবে কাকে?

 

আমার পিঠেতে ডানা পূর্ণিমায় জন্মে সাবলীল

কুহু কুহু সখা ডাকো আমাকেও জিন আবাবিল।

কিছু অলৌকিক মহিষের ছানা, এসো হত্যা করে

বাথানের কাছ ঘেঁষে যেই নদী যমুনার পরে।

 

আমার তো নাম নাই কোনো ভূমি জুড়ে থাকা পশু

তুই মা বাংলা আমি তোর স্তনে মুখ দেয়া শিশু

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

প্রেম, নক্ষত্র ইত্যাদি চুমকি | পিয়াস মজিদ

Sat Jun 6 , 2020
প্রেম, নক্ষত্র ইত্যাদি চুমকি | পিয়াস মজিদ 🌱 ‘প্রাণের পারাবার’ বলে ভাবি। বিচ্ছেদের বান ডাকলে শরীরেই সংযোগের সাঁকো, নদীশ্রী। আমরা তাকে ‘প্রেমপাখি’ নাম দিয়ে থাকি।   ২. ঘ্রাণনিরপেক্ষ তবু পাই সুবাস; কোনো এক খোঁপার।   ৩. উপমাও তোমার অনুগত ‘পাথর’ লিখতে গেলে পান্নায় পরিণত।   ৪. তুমি সহস্র সুদূরে, আমার […]