আশরাফ রোকনের কবিতাগুচ্ছ

আশরাফ রোকনের কবিতাগুচ্ছ

🌱

জীবনের অর্থ 

নিঃশঙ্ক আমি জানি না কখন পারবো হতে, নির্জলা সহজ হয়ে ওঠবে আকাশ আমার হবে রোদের উজ্জ্বল ফোয়ারা! মেঘেরা হবে অনুগত বন্ধু আমারই,যখন চাইবো বৃষ্টির হবে না অদুখ* অার তখন মাটির উপর রাখা রুক্ষ্মশুষ্ক হাতগুলি ভ’রে ওঠবে কৃষকের ফুলেফলে। চমক দিয়ে জেগে ওঠবে অজপাড়াগাঁ,শ্বাশতরা গেয়ে ওঠবে পুনর্জন্মের গান!পালাকীর্তনের অবাধ হারমোনিয়ামের সুরে জেগে ওঠবে তারপর একে একে আষাঢ়িয়া হাওড়ের বিশাল জলরাশি জুড়ে ঢেউয়ের সাথে মাছেদের নৃত্যের মতো সাবলীল মনে হবে কখন এখানে জানি না জীবন,জীবনের হবে কী যে এক গভীর অর্থ!

 

পতন 

একটা সিঁড়ি রোজ স্বপ্নের দরোজার

পার হ’তে গিয়ে একা ক্লান্ত বহুবার,

পেরোতে পেরোতে সন্ধ্যাঝড়ের শুরু

দিশাহীন তারপর আঁধারে বিলীন

ছায়ার মতোই ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়

সময়;যেনো একটা সাবানের গোলা

রোজ একটু একটু ক্ষয় হয়ে শেষ,

হয়তো-বা জীবন তারও অধিক নয় :

 

যার শুরু হয়েছিলো রক্তের গভীরে

আর যার পরিণতি রক্তহীনতায়,

একটা ফ্যাকাশে ঘাসের জমিনজুড়ে

যে পড়ে রয় সে কেউ নয়; মনে হয়

অযাচিত বাঞ্ছাগুলির গূঢ় পতন

অদূরে সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতেই!

 

আনন্দের কাছে যাই 

নিরানন্দে ঢেকে আছে সব

চলো আনন্দের কাছে যাই,

চির দুঃখের রজনী এখানে

শেষ হবে না ভেবে কী লাভ! 

 

ক্রন্দনের শব্দ পার হয়ে

মেঘে মেঘে তাজ্জব মেশিন

গর্জে ওঠে দেখো দূরাকাশে

চারদিক একশোদিকেই :

 

অকাল গ্রীষ্মে দেয়ার ডাক

অন্ধকারে ঢেকে যায় সূর্য,

দুপুরকে মনে হয় রাত 

ছেঁড়া পঙক্তিই কবিতার :

এক নিরানন্দের কুসুম! 

 

দুঃসহনীয় তখনই

পৃথিবীর সব সংগীত

স্তব্ধ, পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ;

যখন উঠন্ত বৃক্ষপত্রে 

বাতাসেরা কুঠার চালায়

আছড়ে প’ড়েই দিশেহারা :

 

চলো আনন্দের কাছে যাই।

 

দেয়াল 

চিরকাল একটা দেয়াল

দীর্ঘ ছায়া ফেলে রাখে মনে হয় 

চলার পথের মাঝখানে আমাদের :

উঁচু মাথা নিচু ক’রে দেয়

দাঁড়ায়ে এখানে আড়াল ক’রে প্রত্যহ

অভিমানাহত স্মৃতির দুপুর

জানলা ও প্রণয়দুয়ার! 

 

ফলে,তাকিয়ে দেখা হয় না 

দেয়ালের ওপারে তোমার মুখ

বিকেলে কনে দেখা আলোয় :

অলক্ষ্যে কোথায় কোন সূর্য

ছুটে বেড়ায় কখন তোমার আকাশে!

 

সম্বিৎ 

সমুদ্র থেকেই উঠে আসা 

সব চেতনা এখানে বুঝবে না

আঁখিতে কতোটা সংশয়

অপসৃয়মান অশ্রু নয়, 

রক্তই ঝরছে অবিশ্রান্ত

যেনো বা হারপুণেই গাঁথা

এই পৃথিবীর সর্বশেষ

তিমিমাছের কঙ্কাল আর

জলের নশ্বর আত্মা আমি

জন্ম নিয়ে কাঁদছি এখানে 

আর ফিরে না আসা সম্বিৎ !

 

কান্নাহাসি

কান্নাহাসি পিঠাপিঠি দু’সতীন 

একই বৃক্ষের দুটি ডালে

সহসাই উড়ে এসে বসা

একজোড়া কালো ফিঙে পাখি,

একটি কাছে এলেই পরে

আরেকটি যায় দূরে স’রে। 

 

কান্নাহাসি মনে হয় একই নদীর দুই কূল :

এ কূল যখন ভাঙনের গান গায়,

ও কূল তখন গ’ড়ার স্বপ্নে বিভোর।

 

কান্নাহাসি একটি শঙ্খফুঁ, আর যার

দুটি স্বর দুই ধরনের সুরে বাঁধা ;

শুরু থেকে শেষাবধি কোন

আত্মবন্ধনের আবাহন!

 

বাতাসের ধর্ম 

বাতাসের ধর্ম হলো কারো দৃষ্টি থেকে

সারাক্ষণ আড়াল হওয়া,

নিজে নিজে অবিরত নিজের মধ্যেই

লুকিয়ে পড়ার এক মহত অভ্যাস বাতাসের :

 

হয়তো-বা তাই মনে হয় চিরদিন

বাতাসের সমুদ্রে ডুবে থেকেও এখানে

একবারও যায় নি রাখা বাতাসের চোখে চোখ,

অস্থির তার মুখের লাবণ্যে তাকিয়ে অনিমেষ

হয় নি দেখা অদেখা কোনো বাতাসের রূপরেখা :

 

যে বাতাস প্রত্যহ এখানে আমাদের

নিঃশ্বাসে ধ’রে রাখে জীবনের ঘ্রাণ!

 

বিচ্ছিন্ন 

বিচ্ছিন্ন প্রত্যেকবার ভাবনার পালক খসে গিয়েই

চলৎশক্তিহীন,এখানে শূন্য বোধের ডানা;

উড়ে যেতে পারে না সময় 

হয়তো-বা তাই দিগন্তকিনারে 

কোনো সফলতা পায় না সূর্য আর

একটি কল্পনাও দেখতে পায় না অালোর মুখ

অবিস্মরণীয় এখানে যা হারিয়ে গিয়েই

কখনও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় কখনোই

ধূলির শরীরে বিচ্ছিন্ন মিশে রয় যে

অজস্র কাল, কালের প্রবাহের নিচে

যুগ যুগান্তের অকৃত্রিম ফসিলগুলিও

বিচ্ছিন্নতাবোধে কেঁদে ওঠে :

স্বপ্রণোদিত অন্তঃসলিলা কোনো

মানুষের চলার পথে মাটির নিচে

বয়ে চলে চিরকাল ধ’রে বুকে নিয়ে 

বিচ্ছিন্নতার ছিন্নবিচ্ছিন্ন স্রোতোরূপ!

 

আলেক লতা 

কখনো পেলে আর ছাড়াছাড়ি নেই, হৃৎপিণ্ডের ভিতর চাপা দিয়ে রেখে দিতাম কখনও তা হলে কোনোদিন ভোলাও সম্ভব হতো না আর যে হলুদ অলোক সঞ্চরণ ভেবে মুগ্ধ বার বার, শুভ্র বান ডেকে ওঠলো যেনো-বা রাত এক অন্ধকারের নদীর মতোই রেখে দিতাম বালি খুঁড়ে জাগিয়ে রাখতাম জল এখানে তৃষা জীবনের মিটতে দিতাম না আর পুষ্পের নিরাভরণ ঝ’রে পড়ার বেদনার সঙ্গ ল’য়ে জুটতাম না দিনের জন্মের মুহূর্তে যখন ফিঙেদেরও স্বাগতমী শুনে ঘুম এসে চোখের উপর শুরু করেছিলো নৃত্য,আশাবরী রাগের তমিস্রায় ঢুলু ঢুলু রেখে দিতাম ইথারে জড়ানো আগের পৃথিবীর মানুষের সংখ্যাতীত ধ্বনিমালার প্রতিধ্বনিসমুহই ধ’রে রাখতাম, যে রকম ভাবে কৃষকেরা ধ’রে রাখে তাদের ফসলীভূমির জো!আর যতোক্ষণ জেগে থাকতাম ডালিম ফলের রঙ দিয়ে একটা শ্যাওলাধরা উঠোনের মতো ধ’রে রাখতাম শৈশবের নিষ্পাপ পদচিহ্নগুলি,মানুষ তোমার! শাইলের কাদার মতো যে মায়াবী,পঞ্চরসের কলাবতী এঁকেবেঁকে নির্মাণ করেছো স্বতোপ্রভ উচ্ছ্বসিত আষ্টেপৃষ্ঠে  জড়িয়ে সোনার রঙের প্রণয়সিক্ত কারোর আবীর ছড়ানো আকাশে সন্ধ্যার আবহমান নির্জনতার বিমূর্ত মুরতি চরণ জড়িয়ে ধরবো, যেভাবে মেঠোপথে ঝোপের গা জড়িয়ে ধ’রে বেঁচে থাকে আলেক লতা!

 

মেঘশিশু 

ছোট্ট,নিতান্তই অপরিসর প্রায়াবদ্ধ খোপখিড়কি,

খড়ের জানালামাত্র কোথায় পাবো ভুবনমোহিনী অতো

আলো,বাতাসের স্বচ্ছ  গতিবেগ, পেলব পরশ ;

বোধের প্রাচীরগাত্রে কামিনীর সৌরভের ছায়ামুগ্ধ

রাত আর একাকীত্বে ধীরে, চুপে লাল হয়ে ডুবে যাওয়া

আধখানা চাঁদের মুখ, ভুরু থেকে বিচ্ছুরিত জোছনাফলকের

দোলায়িত অনুরাগের সংগীত! আর হবো এখানে ক’বে

আকাশের কোলে দুলে ওঠা কোনো মেঘশিশুই আমি,

সমুদ্রের বুকে ক্ষুদ্র অতি ডিঙার মাঝির হাতে ধ’রে

বাইনে বাইনে উঠা নোনা জলের বুদ্বুদ আর

বিদ্রোহী তরঙ্গমালার যুদ্ধে কোন দিন জানি না তো

পার হয়ে অথৈ পাড়ে উঠে যাবো ভাবি 

সেখানে দূর সবুজক্ষেত্রের পরিসরে!

 

ক্লীব 

সকালের বারান্দায় একটা অকালের সূর্য ছাড়া কী আর ক্লীব!যার আলো আছে,অথচ সে আলোর গভীরতায় কোনও রাত্রির ছায়াকে আদৌ নিমজ্জন করা সম্ভব নয়,এ-ছাড়া এমন খাঁচাবন্দী আলোর পরিধিতে কি ক’রে চিহ্নায়ন করা সম্ভব এখানে কেন্দ্রীয় বিন্দুগুলির প্রস্থচ্ছেদ কি ক’রে আঁকা যায় যখন কেউ কখনও তার রঙের কল্পনা হারিয়ে বর্ণচোরা হয় প্রকৃত হারিয়ে প্রকৃতি, পুড়ে-জ্বলে খাক হয় বাসনাকুসুম; বিক্ষত তিল তিল গ’ড়ে ওঠা তারপর অাঁধারে বিশৃঙ্খল আত্মভুবনের বিলয়দৃশ্যে সদা মৃত্যুপ্রহরের সানাই রোদনশীল,বৃষ্টির মতো সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা অগণন পত্রহরিতের নিষ্কলুষ মুক্তির পথে ধূপের সৌগন্ধ ওড়ে,পাখিদের বিদায়ী ডানা ঝাপটানোর মোহে অন্ধ নিরন্তর মোক্ষম হয়ে ওঠে তখন পথ,বিবর্ণ কালো আয়নার ভাঙে না ঘুম, চিরঘুম ঘুমায় যে; আর সে-ই যায়, যার প্রকৃত যাওয়া নেই!

 

আলোকধ্বনি 

অলক্ষ্যের মুগ্ধ জাদুকর গ’ড়ে কোন বিপন্ন অস্থিময়তা তার অলৌকিক কণ্ঠের সুরই ইথারে কান পেতে শোনা হয় নৈঃশব্দ্যে মহাজগতের কোন সংগীতের তানে সৃষ্টি তারপর পুণ্যের মৃদু কোমল অনুরাগে বেঁচে থাকে যে

স্বপ্নের মিনারে বৃষ্টিভেজা এসে কামিনীর সৌরভ, সে সে-ইতো একটা অদৃশ্যের জোড়া জোড়া বিশ্বাসী দৃষ্টির উজ্জ্বল প্রচ্ছদ,কল্পনাই বাহন মাত্র 

সে সৌন্দর্যের অবলোকনের, জাদুকরের আনত আঁখিতে হয়তো-বা যে জেগে থাকা সারাক্ষণ জগতের অদেখা বিস্ময়ের স্তোত্র,সেখানে বাতাস মনে হয় সোনালি,ছায়াহীন অবিশ্রান্ত আলোর ফোয়ারা ছুটে, আর হয়তো-বা দৃঢ় সন্ন্যাস রঙের জলের পুকুরে সাঁতার কাটে সেথা সোনার কৈ,সোনার মাগুর;সমুদ্রও আছে গোটা কতক কেশের গভীরে লুকানো রঙধনু খোঁপায়! শূন্যতায় উড্ডীন কোন মঞ্চ সমীপে আসীন ভালোবাসি অলক্ষ্যের নির্জন হাতগুলি, হাতের রেখাগুলির তলে গোপনে জ্বলে ওঠা রক্তীয় শিখাগুচ্ছের বিস্ফারিত আলোকধ্বনি!

 

সুতাবুড়ি ও তেলেঙ্গা 

হিজলের গাছ পেরিয়ে গিয়ে সামান্য সামনে একদিন যে খেলুড়ে বাতাসের দেখা হয়েছিলো হাওড়ে আর যে বাতাস ঢেউ তুলে হারাতো পলকে চোখের পাতা ফেলবার নিঃশ্বাস নেবার সময়টুকুরও দিতো না অবকাশ,অতি স্বল্পায়ু যেনো সময় সে বাতাসের,আর এ সময়েই জ্যৈষ্ঠের গা পোড়া গরমে তির্ তির্ বয়ে চলা নতুন জলের উপর ছায়া ফেলে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই দুপুরের পরে সূর্যের ক্রান্তিবলয় জুড়ে যে টুকু পৃথিবীর প্রবাহ,সে-ই হয়তো-বা সবটুকু এখানে প্রাত্যহিকী হয়ে ওঠেছিলো আমাদের হাওড়পাড়ের শৈশবের শ্বাশত সোনারূপা ,যখন রোদের সাথে খেলতে খেলতে উড়তো তেলেঙ্গা,খড় বেঁধে সুতোয় চালিয়ে দিয়ে উপরে মেঘের কান্না শুনতাম আর পূবালী বাতাসে সুদূরের কোন কার্পাসডাঙ্গা থেকেই মনে হয় উড়ে আসতো দলে দলে সুতাবুড়ি! যখন একটার পর একটা একটানা সুতাবুড়ি সার বেঁধে উড়ে আসতো হাওড়ের উপরের আকাশে তখন মেলা জ’মে যেতো সুতাবুড়ির!মনে হতো অসযখ্য সাদা ঝালরে খচিত আকাশ! ম লম্বা পাটখড়ির মাথায় সুতাবুড়ি পেঁচিয়ে নিতে কতো দুপুর যে মাটি হতো এ গাছের ডালে,ও গাছের কাণ্ডে বিশেষত হিজলের ডালেই বেশি আটকাতো এসে সুতাবুড়ি! আর পৃথিবীর খাটোতম প্রজাজাতির হিজলগুলোইতো আসলে হাওড়ের আদিতম বৃক্ষবাসিন্দা! হাওড়ের কেন্দ্রে উবু হয়ে ধ্যানী বুদ্ধু গাছ এ হিজল!এ ছাড়া ছড়েছিটেগুলো হাওড়ের জলে,নয়তো কারো বাড়ির টিনের চালে,বড় গাছে, উঠানে আছড়ে পড়তো! আমাদের বাড়ির বড় ছাতিয়ান গাছের মাথায় নিশানের মতো উড়তে দেখেছি সুতাবুড়ি!ভেন্নাগাছেও বসতো কিছু!কিছু ঝুলতো বাড়ন্ত লকলকে পাটখেতের মাথায়! মনে পড়ে গেছে সুতাবুড়ি মাথায় পেঁচিয়ে মনে মনে কতোবার যে একটা মাথার মাপের একটা সাদা গোল টুপি বানাবার চেষ্টা ক’রে  ব্যর্থ হতাম যখন এত্তো বড়, খুব লম্বা সাপের মতো কয়েকটা সুতাবুড়ি যখন একসঙ্গে করলে টুপিতো দূরে থাক টুপির লেইস পর্যন্ত স্বপ্নে আটকে আছে বোধ করি উদাসিন,

নির্মল,স্বচ্ছতম উপলব্ধির শৈশব! মনে পড়ে ধূ ধূ বহুদূরে অজানায় সুতোবুড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে আকাশে হারিয়ে যেতো তেলেঙ্গার সাথে সাথেই আমাদেরও শিশুমন! ঘোমটা ছেড়ে পড়তো এসে জলের উপর,আটকে পড়তো যেরকম কোনো কোনো ওড়নাবতীর ওড়না আটকে গিয়ে কষ্ঠে নীলকণ্ঠ হয়,অথবা সে তিলে ঘুঘুর গলার তিলকমালার তিলগুলোর গোল আবদ্ধ চক্রের ন্যায় নিবিষ্ট জড়িয়ে রয় সে রকমই মনে হয় ভেসে আসছে আজো পরম্পরা পাশাপাশি সে -ই

তেলেঙ্গা আর সুতাবুড়ির আকাশপাড়ির শশব্যস্ততাসমুহের অতীতের অমূল্য দৃশ্যের আখ্যান,স্মৃতিমঞ্জরি ঘিরে যা আজও জাগিয়ে রাখে এখানে আমাকে,জীবাশ্মবিদ্যার ন্যায় কতো যুগ আহা! সুতাবুড়ির সাথে দেখা নেই!

 

রাতের পুরদালান

রাতের শরীরে কতো যে কুহক, নিভৃতির পাখিদের সীমাহীন কান্নার শ্লোক জমা হয় রাতের কোঠরে;অন্ধকারের সান্নিধ্যে ছায়ারা সমাসীন ভেঙে ভেঙে পড়ে দেখো একেকটা রাতের পুরদালান : বিশ্বেস না হলে তাকাও চোখের দিকে আমার,যে আমি রাতের পৃষ্ঠে হয়েছি সওয়ার এখানে আর যা আসলে কোনো প্রাচীন ভাঙা ইমারতের ইটসুরকিচুনে গড়ে ওঠা,তা না হলে এতো কান্না কোথা থেকে আসে অতো রাতের গর্ভে কি ভাবে সৃষ্টি হয় দিনের তরল সূর্য তখন আমাদের জাগবার আগে কেনো চেয়েছি খুঁজে পেতে নিরাবয়ব কালের চিহ্ন ক’রে রেখে দিতেই একটা সবুজ চাঁদ,নিশীথের ঘোরে ঘুমের মধ্যে জেগে জেগেই একা!

 

অন্ধকার 

অনুভব করি অন্ধকার

কোনও এলোকেশী রমণী

ঘরে এসে যে এলোপাতাড়ি

শুরু করে দিয়েছে তাণ্ডব,

 

আলোর গায়ে আছড়ে প’ড়ে

মেঝে,সিঁড়ি,কক্ষ যত্রতত্র :

ভেঙেছে ফুলদানি,আয়না

দোলনা ও কাচের বৈয়াম,

 

উল্টে ফেলেছে দেয়াল ঘড়ি :

তাইতো হারিয়েছে এখানে

আমাদের সুবর্ণ সময় 

মনে হয় ছিটকে গিয়েই

লাগে দূর কালের কপালে! 

 

হিসেব ঠিক নেই সে কারণে

আলোকিত সময়ের বুকে 

জ’মে ওঠে আঁধারের রাজ্য!

 

পুরনো নিমের নিচে

আচমকা বাতাস এসে থমকে দাঁড়ালো পুরনো নিমের নিচে

দুপুরের পুকুরঘাটে উবু হয়েই পড়লো যখন রোদ

নারকেলের পাতার ছায়া কাঁপতে কাঁপতে স্থির হলো জল :

আকাশের দিকে উঠে গেলো চোখ আমারও

গভীর অভিনিবেশে রইলো তাকিয়ে

মেঘেরাই নীল দৃষ্টি মে’লে পুরনো নিমের নিচে!

 

ক্ষুরকম্ম করি! 

দুরু দুরু বুকে সারাক্ষণ

নিজের সাথেই নিজে যুঝি,

যা করার তাই করি :

উপরে নিচে পাশের বিপাশের সব

কালো ডালপালা ছেঁটেচেঁছে দূর করি

সকল সন্দেহ,ভয়; নিজের আকাশটাই ঝেড়েমুছে 

করি মেঘমুক্ত,নিষ্কলুষ!

যেনো আমি কোনো অকম্মা শুধু শুধু

নিষ্কম্মা বেহুদা এক ক্ষুরকম্ম করি!

 

গন্তব্যরেখা 

ভাবি নেমে যাবো তোমার পথটাতেই

যে পথটা আসলে অবিস্মরণীয় আলোকে ভরা! 

 

কাঁটাঘেরা নীলপথটার গায়ে আছড়ে পড়ছে

দেখো আমার অপরিসীম ঘন অন্ধকার, 

ব্যর্থতাসমুহের গায়ের অশেষ ধুলি; ক্রমশ

ঝাপসা হচ্ছে পথ,পথের সীমারেখা হারায় সুদূর! 

 

তোমার পথের পানে তাইতো তাকিয়ে

নির্ণিমেষ কান পেতে রাখি শূন্যতায় :

কখন শুনতে পাবো মোরগের বাক,

প্রত্যুষের দ্বার খু’লে আসবে কখন

সহসা তোমার পথের প’রেই নেমে 

সতেজ ভঙ্গির হাওয়ারা দলে দলে! 

 

পাখিদের গান ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই

নেমে এলে আকাশ হ’তে সূর্যের বারতা এখানে

যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠবে তোমার গন্তব্যরেখা,

ভাবি,নেমে যাবো তোমার পথটাতেই।

 

শৈশবের উঠোন  

ভাবি এখন নিশ্চয় বৃষ্টি হচ্ছে শৈশবের উঠােনে,

ঢালালে ভেসে যাচ্ছে ভেজা খড়,ধানের চুঁছা;

আর ঢলের বড় ফোঁটাগুলির বুকের মধ্যে

শিশুদের ওঁয়া ওঁয়া কান্নার শব্দ,

মনে হয় কানে আঙ্গুল দিয়ে শুনছি দাঁড়িয়ে পূবের বারান্দায়;

কচুঝোপে লাফিয়ে পড়া গঁথা ব্যাঙের অবিশ্রান্ত ডাকাডাকি

মেঘের ডাকের সাথে পাল্লা দিয়েই ঠাডা পড়ছে,

মনে হয় এখন বিজলী চমকাচ্ছে;

ছাতিয়ান গাছের মাথায় বসে ডাকছে কড়ুয়া!

 

পথকাব্য 

পথ ভুলে গেলেও আমাকে, কখনো আমি ভুলি না পথ ; যে পথ দিয়ে চলে এসেছি আবারও ফিরে যেতে হবে ভেবেই ভালোবেসে মনে রেখেছি যতনে কতো যে পথ ফিরে আসতে আসতে আবার ভুলেও গিয়েছি কতক পথ,পথের গল্পকথা! দিনের পথে হেঁটে মনে রেখেছি যে রাতের পথের স্মৃতি, রাতের পথে এসে দিনের সে স্মৃতি হারালেও জানি পথ কখনো হারাবে না! আর কিছু পথ অাছে ফিরে আসতে আসতেই ভুল প’ড়তে থাকে অনায়াসে

যে-রকম ঝড়ের সব স্মৃতি মনে ধ’রে রাখতে পারে না 

পথের ধারের অন্যমনস্ক ছাতাওয়ালা চটকাগাছ,

যে-রকম স্মৃতির অধিক আরও স্মৃতি থাকে,আকাশে হারানোর বেদনা থাকে নক্ষত্রদের, থাকে কিছু উদাসীন পাখিদের নীড় হারানোর মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতাও; থাকে অলকের রঙের সন্ধ্যায় ভুল ক’রে ভু’লে যাওয়া পথের ছুটে চলার ইতিবৃত্ত যে সময়,

সময়ের অপারে গিয়ে আরও একটা নতুন পথের প্রেমে পড়া

এখানে, কোনোদিন ভুলি না পথ;ভুলেও কখনো পথ 

পুরনো হয় না ব’লেই আমার মতো,আমাদেরই মতো!

 

আত্মবিস্মৃত  

প্রকৃত হারিয়ে পরিচয় নিজের,এখানে দিশেহারা,বিহ্বল; অলৌকিকের খপ্পরে প’ড়ে সর্বস্বান্ত!শাসকের রুদ্র কামনায় মানুষের বদলে তৈরি পুতুল নিয়ে খেলায় মত্ত ভুলে গিয়েই আর্যভট্টের যুগ সে-ই কবে! সত্য এটাই যে সত্যের পথ থেকে ছিটকে পড়ার পর গ্রহপতনের মতো পুরো বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেলে তারপর গোত্রে বিভক্ত করা হলো আমাদের প্রত্যেকেরে!পেঁচার মাংস খে’লে যেমন শুনেছি মানুষের মতিভ্রম হয়,তেমনি ধর্মের বেদীতে বলী দেয়া হলো প্রাচ্যের মনুষ্যত্ব! ফুলের আড়ালে কাঁটার মতো নিবেদনের অশ্রুর পাশে গড়িয়ে পড়ে গেলো নিচে মানবসুতোয় গাঁথা উপনিষদের স্তোত্রমালা! আমরা জ্ঞান হারালাম স্বজ্ঞানে। জেগে জেগে, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে হারিয়ে গিয়ে নয়, সত্যকে উপলব্ধি ও পরিমাপের যোগ্যতা হারিয়ে হলাম আত্মবিস্মৃত!

 

চন্দ্রহাস

আমি হয়তো-বা লাওয়াহোরের সে হিন্দু যুবকই ,যে কোনোদিন পড়ালেখা করার খুব বেশি সুযোগ না পেলেও জানার অদম্য আগ্রহের পরাকাষ্ঠা হয়েছিলো,যখন গজনীর সুলতান মাহমুদ-র আনুকূল্যে সে যুগে ভারতবর্ষে আসা খারিজমের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী,আলেম আলবেরুনী-র সংস্পর্শ পেয়ে জ্ব’লে ওঠা এক মুঠো মেধার বারুদ,কুসংস্কার কুপমুণ্ডুকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক বিরল ঝড় তোলে যে সমাজের দৃষ্টিতে পাগল ব’নে গিয়েছিলো আর যে ছিলো গৃহবন্দী জেনেছিলো ব’লে আপন জাতির নিঃশেষিত হবার ইতিহাস, আর তাইতো পাঠ ক’রেছিলো ব’লেই হয়তো-বা জ্ঞানবিজ্ঞানের দৃ্ষ্টি যার বেড়ে গিয়ে প্রকৃত রূপ পেয়েছিলো! দীক্ষা পেয়েছিলো জীবনের শিক্ষা পেয়েছিলো! আপন জাতিগত,হামবড়া,অলসতা বিসর্জন দিয়ে গড়ে ওঠা কৃত্রিমতার জাল থেকে কী  ক’রে খুঁড়ে তুলতে হয় আপন বিলুপ্ত ঐতিহ্য, অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয় হারিয়ে যাওয়া সে-ই প্রাচীন  আর্যভট্ট,মিহিরবরাহ,ব্রহ্মদত্ত, কঙ্কের যুগ,হয়তো-বা সে প্রেরণাতেই বুকে পুষে ভোগ করছিলো পাগলাগারদের শাস্তি! পুরোতের নির্লজ্জ পায়ে নত হতে দেবে না ব’লেই নিজেকে প্রত্যহ গঞ্জনার ধোঁয়া তোলে ওরা ( আত্মগর্বী আলেমগণ)তাদের চর্বিতচর্বন বিদ্যের ভূষিতে তুষ্ট করতে চেয়েছিলো তাকে,যেনো অশ্বই কোনো সে খাদ্যাভাবে! যারা ভাবে বিপ্লব একটা সহজ ব্যাপার তারা ভুল করে না!কঠিন ভেবে যারা ভুল ক’রে প্রতিনিয়ত তাদের শিক্ষা দেবো বলেই ভাবছি কোনো শেকড়ের সংগীত,যে মূলত একজন শিক্ষানবিশ অালবেরুনীর ঘরে;ধর্ম নয় এখানে কোনো জ্ঞানমাত্রই ছিলো মোক্ষম সাধনা যার!

 

কৃতজ্ঞতা : সত্যেন সেন।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Mon Jun 8 , 2020
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়   🌱   ১। যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভাল হইবে না। লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে।    ২। টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরােপে এখন অনেক লােক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায় ; লেখাও ভাল […]
Shares