অস্ত দিনের কবিয়াল এবং সেন্টু রায় | সরোজ মোস্তফা

অস্ত দিনের কবিয়াল এবং সেন্টু রায় | সরোজ মোস্তফা

🌱

মগড়ার তীরে খুব চুপচাপ নিভৃত কামিনি হয়ে বসবাস করেন তথ্যচিত্র নির্মাতা সেন্টু রায়। তিনি গায়ক, নাট্যনির্দেশক, সংগঠক এবং সংস্কৃতিকর্মী।বাংলাদেশ উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু পদ-পদবীর জন্য একদিনও সংস্কৃতি কিংবা সংগঠন করেননি । তিনি মনে করেন সংস্কৃতি একটা সাধনা। আত্মবিকাশ ও পরিশুদ্ধ সমাজ গঠনের সাধনা। যে জীবনটা আমরা যাপন করি সেই জীবনটাই আমাদের সংস্কৃতি।

মফস্বল শহরের ছোট ছোট সামাজিক নিত্যতার ভেতরে হারিয়ে যায়নি উনার অন্তর। বিশ্বজ্ঞানের আয়োজন ও পরিসরে খুব তাজা একটা জীবনবোধে বসবাস করেন তিনি। গণসংগীতকে ভীষণ পছন্দ করেন। গণসংগীত গাওয়ার জন্য কণ্ঠের ভেতরে যে সাহস ও জোয়ার থাকা লাগে; সেই তাগড়া সাহস ও জোয়ারে বসবাস করেন তিনি। স্বার্থবাদে ম্লান হয়ে যায়নি উনার হৃদয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার পবিত্র মন নিয়ে জনপদের ইতিহাস শোনাতে চাইছেন এই তিনি। জীবন নিয়ে আমাদের ধারণাটাই আমরা প্রকাশ করতে চাই। সেন্টু রায়ের প্রকাশ মাধ্যম তথ্য-চিত্র। প্রজন্মের স্বার্থে ইতিহাস ও মনন ধর্মী এই নির্মাণ মূলত বয়ানধর্মী। বয়ানে বয়ারে উঠে এসেছে জনপদের রাজনীতি, লড়াই ও বেঁচে থাকা।

দর্শনের ছাত্র তিনি। দর্শন মানেই চিন্তার সূত্র ও ইতিহাস। সে ইতিহাসেই স্নাত হয়েছে উনার অবিছিন্ন কর্ম ও প্রয়াস। ইতিহাস না জানতে জানতে, না পড়তে পড়তে মানুষেরা হয়তো গোধূলিরঙিন দুনিয়ায় হারিয়ে যাবেন। সংস্কৃতি ও দর্শনের ফুলভর্তি সাইকেল নিয়ে, ইতিহাস ও তথ্যচিত্রের সাইকেল নিয়ে একটা প্রজন্মের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তথ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি প্রজন্মের সাথে প্রজন্মের একটা সেতু তৈরি করতে চাইছেন। জীবন ও ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞ না থাকলে এই মর-জীবনের চক্ষু তৈরি হয় না। চক্ষু তৈরি না হলে কিছু দেখাও যায় না। দেখা ও দেখানোর একটা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে ফিল্ম। ফিল্মের একটা ফেন্টাসির জগৎও আছে; সেই জগতে ওয়াসিম-জসিম এবং ভিলেন জাম্বু খুব মারপিট করে। সেন্টু রায় সেই ফেন্টাসির জগতে পা দেননি। সময়ের ঘটনা ও অবিচল পুরুষের কর্ম ও দর্শনই তাঁর তথ্যচিত্রের বিষয়। সেই অর্থে উঁনার কোন ‘এইম ইন লাইফ’ ছিলো না; কিংবা রবীন্দ্রনাথের সেই উক্তির মতো ‘শুধু অকারণ পুলকে/ ক্ষণিকের গান/ গারে আজি প্রাণ / ক্ষণিক দিনের আলোকে’ এই কথা বলতে বলতে পথে নামেননি। একটা সচেতন অভিপ্রায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের নায়কদের কথা বলে যাচ্ছেন তিনি। দায় ও দায়িত্বের এই আয়োজনে একাই সংস্থান করছেন উনার অভিপ্রায়।

আত্মপ্রচারের এই পৃথিবীতে এখন সর্বত্র ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। নিজেকে প্রচারের আয়োজন থেকে শতহাত দূরে রেখে তিনি শুধু তথ্য-ফিল্ম এবং বক্তব্যটা প্রচার করছেন। শাহ্ আব্দুল করিম বিশ্বাস করতেন পৃথিবীটা একদিন বাউলের হয়ে যাবে। সেন্টু রায় বিশ্বাস করেন, পৃথিবীটা একদিন মানুষের হয়ে যাবে। দলাদলীর সংকীর্ণতা; ধর্মীয় হিংসা ও হিংস্রতা থেকে মুক্তি নেবে মানব-মানবী। তিনি তাই মানুষকে মানুষের ইতিহাস শোনাতেই তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। শুধু নির্মাণ করে চুপ করে বসে থাকেন না; এই ছবি প্রচার করেন। দরদি ও মরমি স্বরে সবাইকে খুব আপন করে নিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভাট থেকে ফিল্মে এমএ এবং এমফিল করেছেন। একটা প্রস্তুতি ও আয়োজনের সবটুকু বিদ্যা নিয়ে উঁনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন সময়েই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে ‘টিয়ার্স অব ফায়ার’ নির্মা্ণ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের টিয়াপাখি ইতোমধ্যেই বিটিভিতে বলেছে ‘তুই রাজাকার’! ‘তুই রাজাকার ‘!। বাংলাদেশের গণহত্যা যে কতোটা ভয়াবহ এবং এই হত্যার যে বিচারই হওয়া উচিৎ সেটাই  এই তথ্যচিত্রের বিষয়। এরপর ফিলিস্তিন সংকট নিয়েই তৈরি করেছেন ‘রাইট টু রিটার্ন’ ।

বলছিলাম, সেন্টু রায় ছবি প্রচার করেন। ইতিহাসের ভেতরেই থাকে ইতিহাসের খলনায়ক। ইতিহাসটা তিনি  এমনভাবে দেখান এবং প্রচার করেন সেই সব হারামজাদাদের মুখ তখন স্পষ্ট হয়ে যায়। শহীদজননী জাহানারা ইমামের জীবন ও তথ্য নিয়ে নির্মিত হওয়া ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ নামের  তথ্যচিত্র তারই স্বাক্ষর।  মুক্তিযুদ্ধে দুজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করেছেন আলতাফ মাহমুদ ও জহির রায়হান নামে দুটি তথ্যচিত্র।

আজকে উনার বিশেষ একটি তথ্যচিত্র নিয়ে কথা বলতে চাই। নেত্রকোণার আমতলায় উঁনার পূর্ব পুরুষের ভিটা। বলতে গেলে আমতলার লোচন কর্মকারই ছিলেন এই অঞ্চলের কবিগানের আদি পুরুষ। পাশেই বাংলা গ্রাম। সেই গ্রামের বিজয় নারায়ণ আচাযই এই অঞ্চলের কবিগানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রথম লিখেছেন। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই গান আজ বিলুপ্ত। কবিগান ও এই গানের শেষ পুরুষ বাংলার কবিয়াল মদন সরকার। সেই মদন সরকারে জীবন ভিত্তিক তথ্যচিত্র ‘অস্ত দিনের কবিয়াল’। এই তথ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে নির্মাতা আমাদের নেত্রকোণা অঞ্চলের কবিগানের ধারা ও ঐতিহ্যকেই তুলে ধরেছেন।

ডকুমেন্টারির নাম ‘অস্ত দিনের কবিয়াল’। অধ্যাপক যতীন সরকার এই তথ্যচিত্রের একজন ইতিহাস কথক। কবিগান কি? কেমন ছিলো কবিগান? এর রূপ ও প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। তথ্যচিত্রে আশীতিপর মদন সরকার বারবার এসেছে। উঁনার ক্ষয়ীষ্ণু ও নির্জীব চেহারায় স্পষ্ট হচ্ছে এই অঞ্চলের কবিগানের বাস্তবতা। আসর না চাইলে, সমাজ না চাইলে, কবিয়ালের জন্ম হয় না কিংবা কবিয়াল বাঁচে না। মদন সরকারের চেহারায় সেন্টু রায় যেন ভাঙনের সেই রূপটিকেই প্রকাশ করছেন।

এই ডকুমেন্টেশনে তিনজন কবিয়ালকে নিয়ে এসেছেন তিনি। দুইজন মদন সরকারের শিষ্য নারায়ণ সরকার এবং আব্দুর রহমান। অন্যজন আবুল সরকারের শিষ্য বাবুল সরকার। মূলত বাবুল সরকার এবং নারায়ণ সরকারের তর্ক-বিতর্কের ভেতর দিয়েই মদন সরকারের জীবনভিত্তিক নেত্রকোণার কবিগানের রূপটি তুলে ধরেছেন তিনি। গান গাইতে গাইতে কবিয়ালরা আক্ষেপ করছেন-
‘বহুদিনে ভাগ্যগুণে কবি গান গাই
বর্তমানে দেখ নয়নে আরতো কবিয়াল নাই।
কতো শতো গায়ক ছিলো সব গেল মইরা
এখন আমরা গান গাইতেছি তিন জনেরে লইয়া’। পুরো তথ্যচিত্রে এই  আক্ষেপই যেন নিংড়ে দিয়েছেন সেন্টু রায়।

কবিয়ালরা কীভাবে বন্দনা গাইতেন; কী ভাবে শুরু হতো আসর তারই একটি বয়ান আছে আব্দুর রহমান বয়াতির কণ্ঠে:

‘ধীরে ধীরে পয়ার ধরে বাজাইয়া দেন ভাই
কবি গানটা কেমন ছিলো আমি বলে যাই।
প্রথমেতে আসরেতে উইঠ্ঠ্যা কবি গানে
টপ্পা দিয়া প্রশ্ন করে সকল সরকার গনে।
এর পরেতে বন্দনাতে সরস্বতীর পায়
সকল সরকার গনেই শুনি স্তুতি বাক্য গায়’।

তথ্যচিত্রের বর্ণনাতেও একটা বিষাদ থাকে। বেহালায় সুনীল কর্মকার সেই বিষাদটাই বাজিয়ে গেছেন। বিজয় নারায়ণ আচায মনে করতেন কলকাতার কবিগান থেকে এই অঞ্চলের কবিগান ভিন্ন; এই অঞ্চলের কবিগান অনেক প্রাচীন। সেই সত্যের সূত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে অধ্যাপক যতীন সরকার বলছেন কী ভাবে ম্লান হয়ে এসেছে কবগানের ধারা।

আমরাও তথ্যচিত্র দেখতে দেখতে অনুভব করছি কেন মদন সরকার নেত্রকোণার শেষ কবিয়াল। একটা ছবিকে শেষ করতে হয়। সুনীল কর্মকারের বিষাদের সুরে সুরে শেষ হচ্ছে অস্ত দিনের কবিয়াল। কিন্তু যে কোন ছবিতে দৃশ্যের ভেতরে ফিল্ম মেকারের একটা দর্শন উচ্চারিত হয়। এই তথ্যচিত্রেও সেন্টুরায় একটা ম্যাসেস দিয়েছেন কিংবা একটা কথা প্রচার করেছেন। সেই কথাটা হচ্ছে- ‘এই অঞ্চলের কবিগান আজ অন্তিম শয্যায়; শিয়রে বসে আছি সেই অপেক্ষায় আবার কবে মুখরিত হবে কবিগান ছন্দে কথায়’।নতুন দিনের কবিয়াল হয়তো আসবেন। তাগড়া, আশাবাদী সেন্টুরায়ের মতো আমরাও এই কথা বিশ্বাস করি।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

আমার নজরুল | জাহিদুর রহিম 

Sun Jun 14 , 2020
আমার নজরুল | জাহিদুর রহিম 🌱 এক  “তোমার ঐ ছোঁয়াটুকুর আনন্দেই আমি আমার সকল জ্বালা সকল ব্যথা-বেদনা মান-অপমানের কথা ভুলে গেলুম। মনে হল, তুমি আমার-তুমি আমার-একা আমার! হায় রে শাশ্বত ভিখিরি! চিরতৃষাতুর দীন অন্তর আমার। কত অল্প নিয়েই না তুই তোর বুকের পূর্ণতা দিয়ে তাকে ভরিয়ে তুলতে চাস, তবু তোর আপনজনকে […]
Shares