আমার নজরুল | জাহিদুর রহিম 

আমার নজরুল | জাহিদুর রহিম

🌱

এক 

“তোমার ঐ ছোঁয়াটুকুর আনন্দেই আমি আমার সকল জ্বালা সকল ব্যথা-বেদনা মান-অপমানের কথা ভুলে গেলুম। মনে হল, তুমি আমার-তুমি আমার-একা আমার! হায় রে শাশ্বত ভিখিরি! চিরতৃষাতুর দীন অন্তর আমার। কত অল্প নিয়েই না তুই তোর বুকের পূর্ণতা দিয়ে তাকে ভরিয়ে তুলতে চাস, তবু তোর আপনজনকে আর পেলিনে”  

এই যে শেষের পেলিনার যে হাহাকার এটাই নজরুলের উদ্দাম জীবনের শেষ পরিণতি। কেবল ছুটেছেন সারাটিজীবন। মুয়াজ্জিন থেকে লেটো গানের দল, খাবার হোটেল থেকে পত্রিকা অফিস, যুদ্ধের ময়দান থেকে জেলখানা, কবিতার পাতা থেকে সিনেমার পর্দা, আর সবশেষে এক নিস্তরঙ্গ নীরবতা। চাতক পাখির মতো তিনি ও তো খুঁজে চলেছিলেন তাঁর আপনজনদের। জীবিত কালে কি তাঁদের দেখা তিনি পেয়েছিলেন? 

কাজী নজরুল ইসলাম কবি। কবিতাই তাঁর শিল্পসিদ্ধির মূলে। তাও আবার বহুকর্ষিত কোনো সাহিত্যচর্চা নয়। যেন এক অপরিমিত আবেগঘনত্ব, সঙ্গে এক উচাটন মন এবং তা-ই তাঁর সাহিত্যের আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে বিকিরিত করছে। বহু পুরাতন ও ব্যবহৃত কথাটিই পুনরায় বলতে হয়, আবেগের উচ্চতাই তাঁকে যেন ‘স্বভাব কবি’তে রূপান্তরিত করেছে। এখানে ‘স্বভাব কবি’ আমি কেবল প্রকাশের স্বতঃস্ফূর্তটার অর্থেই ব্যবহার করছি। 

কিন্তু শুধু কবিত্ব নয়, কথাসাহিত্যেও নজরুল একই বিভায় উচ্চকিত। এই ‘অপরিমিত আবেগের ঘনত্ব’ তাঁর শৈল্পিক প্রণালীকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে হয়তবা। তবে আমার মনে হয় নজরুলের আবেগ সবচেয়ে সুন্দর সংযোগ ঘটিয়েছে তাঁর গানে, সেখানে ‘আবেগ আর বেগ’ সমান্তরাল।    

উপমহাদেশের স্বাধীনতা যখন ভূলুণ্ঠিত, অপমানে গ্লানিতে ঘৃণায় জাতি যখন নিমজ্জিত তখন ‘শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’যারা শান্তিকামী মানুষ তাদের মাথার ওপরে ইংরেজ-শ্বেত শয়তান আর এ দেশেরই পদলেহী দালালরা অশান্তি ও রক্তের প্লাবন নামিয়ে দিয়েছে। নজরুল ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন শান্তিকামী, সেই সাথে ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বনকারী উচ্চকণ্ঠ মানুষ। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেনো তৃণ সম দহে’ রবীন্দ্রনাথের এ বাণীর প্রকৃত রূপায়ণ ঘটেছে নজরুল ইসলামের কবিসত্তায়। ‘জাগো অনশন বন্দী ওঠ রে যত, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত জাগো’-এই আন্তর্জাতিক মানবপ্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত নজরুল।  

সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের স্বপ্ন সম্ভাবনা নজরুলের কবিমানসকে করে তুলেছিল আলোক-উদ্ভাসিত। তাই রোমান্টিক অনুভবেদ্যতায় তিনি বৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক সমাজের পরিবর্তে কল্পনা করেছেন শোষণমুক্ত সুষম সমাজের। অসত্য অমঙ্গল অকল্যাণের রাহুগ্রাস থেকে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছেন স্বদেশের মাটি আর মানুষকে। যুদ্ধোত্তর বিরুদ্ধ প্রতিবেশে দাঁড়িয়েও তিনি গেয়েছেন জীবনের জয়গান, উচ্চারণ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য বিদ্রোহের সূর্যসম্ভব বানী।

 

দুই 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে পৃথিবীব্যাপী হতাশা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিবেশেই বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের  আবির্ভাব। তার কবি-মানসের শিকড় প্রোথিত ছিল নবজাগ্রত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসমৃত্তিকায়। রাজনীতি সচেতনতা ও জনমূল-সংলগ্নতা নজরুলের কবি চৈতন্যে এনেছিল নতুন মাত্রা।  

আমরা দেখি, নজরুলের সাহিত্য রচনার কাল ১৯১৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত (বাংলা ১৩২৬ থেকে ১৩৪৯)। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালে। অর্থাৎ বিশ শতকের প্রথম চার দশকের মধ্যেই নজরুলের মানস গঠন ও বিকাশ। তাঁর সাহিত্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে প্রথম মহাযুদ্ধের নানা দিক। যুদ্ধের উত্তেজনাকে তিনি অনুভব করেছিলেন ভীষণভাবে। স্বপ্ন দেখেছিলেন নবজাগরণের। এ সময়ে নজরুলের দৃষ্টিপথে উদিত হয়েছে ১৯০৫ সালে আয়ারল্যান্ডের ‘সিনফিন’ আন্দোলন উদ্ভূত প্রবল গণ-উত্থান, ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব এবং ১৯১৯ সালে বা তার কিছু আগ থেকেই সূচিত তুরস্কে কামাল পাশা, মিসরে জগলুল পাশা, মরক্কোয় গাজী আবদুল করিম প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্বের জাগরণমূলক বিবিধ আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ। উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতায় নজরুল প্রকাশ করেছেন প্রথম মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা, সমাজের অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য প্রভৃতি।  

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে লিখেছেন ‘ভায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রবন্ধ। ১৯২০ সালের খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন ও রুশ বলশেভিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পটভূমিতে রচিত হয়েছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস। নজরুল একই সঙ্গে আলোড়িত হন মোস্তফা কামাল পাশার দ্বারা। কেননা তুরস্কই প্রথম মুসলিমপ্রধান দেশ, যে দেশ থেকে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ, পর্দাপ্রথা বিলোপ ও মোল্লাতন্ত্র দূরীভূত হয়েছিল। আর এ সব কিছুর উদ্যোক্তা ছিলেন মোস্তফা কামাল পাশা। তাঁর স্মরণেই রচনা করেছেন ‘কামাল পাশা’ কবিতা। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল ব্রিটিশদের প্রতি বিপ্লবীদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। এটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। এতে সক্রিয় ছিলেন বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেন। নারী বিপ্লবী প্রীতিলতাও ধরা পড়ে গিয়ে সায়ানাইড মুখে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এ সময় রচিত হয় নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাস। 

১৯৩৭ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় লীগ- কংগ্রেসের মতবিরোধ নানা কারণে প্রবল হয়ে ওঠা সত্ত্বেও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিই তখন দেশের মুক্তি আন্দোলনের পথের দিশারি ছিল। ঠিক এ সময়ই শুরু হয়ে যায় সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির রক্তচক্ষু ও শ্যেনদৃষ্টির আগ্রাসনে প্রচণ্ড তোলপাড়। ১৯৩১ সালে চীনে কুওমিংতাং ও কমিউনিস্টদের মধ্যে দেখা দেয় বিরোধ। ফলে জাপান চীনের অভ্যন্তরীণ গোলযোগজনিত দুর্বলতার সুযোগে মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। ১৯৩২ সালে জার্মানিতে নাৎসি দলের উত্থান ঘটে এবং সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় হিটলারের আধিপত্য। ১৯৩৬ সালে মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট ইতালি, আফ্রিকার আবিসিনিয়া আক্রমণ করে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। আর তখনই ঘটে বিশ্বে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান। একই বছর স্পেনে ফ্রাঙ্কো সেখানকার প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ১৯৩৭ সালে জাপান চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়। এসবের মধ্য দিয়েই ১৯৩৯ সালে বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডঙ্কা। আর এ ডঙ্কারই প্রতিধ্বনি ধ্বনিত হয় নজরুল ইসলামের কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সাহিত্যে। 

 

তিন  

বাংলা গানের আদি ও মৌলিক সুর হচ্ছে লোকসুর। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা গান লোকসুরভিত্তিক। কীর্তন, বাউল, শ্যামাসঙ্গীত, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া বাংলার প্রধান প্রধান লোকসুরের নিদর্শন। বাংলা গানে রাগের ব্যবহার স্বতঃস্ফূর্ত নয়, আরোপিত; বাংলার বাইরে থেকে আগত এবং নগরকেন্দ্রিক। আধুনিক বাংলা গানের বিকাশ যেহেতু  কলকাতা নগরভিত্তিক, সে কারণেই এ গানে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন রাগাশ্রয়ী সুরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কিন্তু তাই বলে লোকসুর কোনো সময় উপেক্ষিত হয়নি। শুধু উত্তর বা পশ্চিম ভারতের নয়, উপমহাদেশের বাইরের সুরও আধুনিক বাংলা গানে বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য গৃহীত হয়েছে। আধুনিক বাংলা গানের বিষয়, সুর ও আঙ্গিকের যে বৈচিত্র্য, তা বাংলার ভেতর ও বাইরের উপাদানের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। নজরুলসঙ্গীত হচ্ছে বাংলা গানের অণুবিশ্ব; এতে বাংলা সঙ্গীতের সমস্ত ধারার মিলন ঘটেছে।

নজরুল নিজের সঙ্গীত সম্পর্কে বলতে গিয়ে  বলেছেন, ‘সাহিত্যে কতটুকু দিতে পেরেছি জানি না, তবে সঙ্গীতে যা দিয়েছি তা অসীম’। বস্তুত নজরুলের শিল্প জগতের শ্রেষ্ঠ রূপ আমরা পাই তাঁর সংগীত ভেতরেই। নজরুলের কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পিজীবনের সূত্রপাত লেটোদল থেকে; এখানেই তাঁর কবিতা, গান ও নাটক রচনার শুরু; হিন্দুপুরাণ ও  রাঢ়বাংরাঢ় লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও ঘটে এ লেটো দলেই। ত্রিশাল-দরিরামপুর স্কুলজীবনে নজরুল ময়মনসিংহ অঞ্চলের তথা পূর্ববাংলার লোকসঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হন। সৈনিকজীবনে সামরিক ব্যান্ডের দৌলতে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও ফারসি কবিতার সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে গজলের রসবোদ্ধা হন। নজরুল আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে প্রবেশ করেন কলকাতায় বিশের দশকের শুরুতে এবং নিয়মিত গান রচনা শুরু করেন ১৯২৪ সাল থেকে অসহযোগ, খিলাফত, সন্ত্রাসবাদী বিপ্লব প্রভৃতি ইংরেজ সরকারবিরোধী আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়।

১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নজরুল বেশ কিছু উদ্দীপনামূলক গান রচনা করেন, কালানুক্রমিকভাবে যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘ঘোররে ঘোর আমার সাধের চরকা ঘোর’, ‘শিকল পরা ছল মোদের ঐ শিকল পরা ছল’, ‘কারার ঐ লৌহ কবাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, ‘ওঠরে চাষি জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল’, ‘ধ্বংস পথের যাত্রীদল ধর হাতুড়ি’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘আমরা শক্তি আমরা বল’, ‘জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত’ প্রভৃতি। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নজরুলের সঙ্গীত-প্রতিভার প্রথম স্ফূরণ ঘটে উদ্দীপনামূলক গানে। গানগুলিতে তিনি মূলত স্বদেশী সুর ও ঢং ব্যবহার করলেও তাতে দৃঢ় বলিষ্ঠতা সংযোজন করেন।

১৯২৬ সালের শেষ দিকে তিনি  গজল রচনা শুরু করেন এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত প্রায় একটানা বহু উৎকৃষ্ট গজল গান রচনা করেন। নজরুলের গজলের বিষয়বস্তু প্রেম, তবে প্রকৃতি মিশ্রিত। সেগুলির বাণী প্রায়শ উৎকৃষ্ট কবিতা, সুর অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাগাশ্রিত এবং আঙ্গিকের দিক থেকে প্রায়  উর্দু  গজলেরমতোই। তাতে আগাগোড়া তালের প্রয়োগ নেই, কিছু অংশ তাল  ছাড়া মুক্ত ছন্দ ও আলাপের রীতিতে রচিত এবং বাকি অংশ তালের কাঠামোতে গ্রথিত।

নজরুল গজল গানের সুরেই প্রথম রাগের ব্যবহার করেন, যা ক্রমশ বিচিত্র ও ব্যাপক হয়। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গজল হলো: ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’ (ভীমপলশ্রী), ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ (ভৈরবী), ‘দুরন্ত বায়ু পুরবইয়া’ (কাফি-সিন্ধু), ‘এত জল ও কাজল চোখে’ (মান্দ), ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে’ (পিলু), ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে’ (গারা-ভৈরবী), ‘কেন কাঁদে এ পরাণ’ (মিশ্র বেহাগ-খাম্বাজ), ‘চেয়ো না সুনয়না’ (বাগেশ্রী পিলু), ‘বসিয়া নদীকূলে’ (কালাংড়া) ইত্যাদি। নজরুলের প্রথম দিককার গজলগুলির অধিকাংশই কৃষ্ণনগরে রচিত। সে সময় নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। নজরুলের গজলগুলি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে দিলীপকুমারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

দিলিপকুমার রায়  ছিলেন রাগসঙ্গীতে পারদর্শী, তাই তাঁর কণ্ঠে রাগাশ্রিত সুরে নজরুলের গজলগুলি রচয়িতার কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করে। শুধু গজল নয়, নজরুলের সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী স্বদেশী গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ বা ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ দিলীপ রায় তাঁর সহশিল্পীদের নিয়ে প্রথম পরিবেশন করেন ১৯২২ সালের ২২ মে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীতরূপে। ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম নজরুলের গান রেকর্ড হলেও (শিল্পী: হরেন্দ্রনাথ দত্ত, গীত: ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’) এবং ১৯২৬ সাল থেকে নজরুল গজল রচনা করলেও ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের আগে তিনি প্রত্যক্ষ বা নিয়মিতভাবে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। নজরুলের ১৯২৬-২৭ সালে রচিত গজলগুলি পরবর্তীকালে কে মল্লিক, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, রাধারাণী প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ড হয়।

নজরুল ওস্তাদদের সংস্পর্শে এসেছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এবং কলকাতা বেতারে সংশ্লিষ্ট হওয়ার পরে, কিন্তু তার আগেই যে তিনি রাগসঙ্গীতে ব্যুৎপন্ন ছিলেন, সে পরিচয় পাওয়া যায় ১৯২৬-২৮ সালের মধ্যে রচিত তাঁর গজল ও গান থেকে। তাঁর বুলবুল (১৯২৮), চোখের চাতক (১৯২৯) এবং চন্দ্রবিন্দু (১৯৩০) গীতি-সংকলনের অধিকাংশ গানের সুরই রাগনির্ভর। বুলবুল-এর গানগুলি গজল আঙ্গিকে হলেও চোখের চাতক এবং চন্দ্রবিন্দু-র গানগুলি গজল ছাড়াও অন্যান্য আঙ্গিকের। বোঝা যায় যে ১৯৩০ সালের মধ্যেই নজরুল তাঁর বিভিন্ন আঙ্গিকের গানের সুরে রাগ-রাগিণী ও তালের ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

নজরুলের বিচিত্র আঙ্গিকের গানের সুরকে রাগভিত্তিক করার পরিচয় তাঁর নজরুলগীতিকা (১৯৩০) গ্রন্থে সংকলিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে। এর গানগুলির যে শ্রেণিবিন্যাস নজরুল নিজেই করেছেন, তা হলো: ওমর খৈয়াম গীতি, দীওয়ান-ই-হাফিজ গীতি,  দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক স্বদেশী গান,  ঠুমরী, গজল,  টপ্পা, কীর্তন, বাউল-ভাটিয়ালি,  ধ্রুপদ, হাসির গান ও  খেয়াল। এসব আঙ্গিকের গানে তিনি কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি আর হাসির গান ছাড়া অন্য সকল শ্রেণির গানের সুরকে একক, মিশ্র, কখনোবা অপ্রচলিত রাগাশ্রয়ী করেছেন। 

আবদুল আজিজ আল আমান সম্পাদিত অপ্রকাশিত নজরুল (প্রথম খন্ড) গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, নজরুল মার্গসঙ্গীত নিয়েও গভীর অধ্যয়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ১৯৩২-৩৪ সালে নজরুলের ছয়টি গীতি-সংকলন প্রকাশিত হয়: সুরসাকী, জুলফিকার, বনগীতি, গুলবাগিচা, গীতিশতদল ও গানের মালা। এ সংকলনগুলিরও অধিকাংশ গানের সুর রাগাশ্রিত। অন্যগুলি হচ্ছে বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, কাজরী, স্বদেশী ইত্যাদি। নজরুলের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে বুলবুল (১৯২৮) ইত্যাদি যে দশটি গীতি-সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সংকলিত মোট ৭৬৫টি গানের সুর বিভিন্ন রাগ অবলম্বনে রচিত; অর্থাৎ নজরুলসঙ্গীতের ভিত্তিমূল হচ্ছে রাগসঙ্গীত। তাতে বৈচিত্র্য এনেছে লোকসুর, বিশেষত স্বদেশী, বাউল-ভাটিয়ালি, কীর্তন, ঝুমুর, কাজরী এবং কখনও কখনও বিদেশি সুর।

১৯৩০-৩১ সাল থেকে নজরুল নতুন এক ধারার সংগীত রচনায় মনোনিবেশ করেন। এ সময়ে তিনি হিন্দু ভক্তিমূলক এবং ইসলামি গান রচনা শুরু করেন। হিন্দু ভক্তিগীতির মধ্যে তিনি প্রথম রচনা করেন ‘জাগো জাগো শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী’, ‘তিমির বিদারী অলখ বিহারী’, ‘জাগো হে রুদ্র জাগো রুদ্রাণী’ ইত্যাদি। ইসলামি গানের মধ্যে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘মোহররমের চাঁদ এল ঐ’, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ প্রভৃতি। 

নজরুল প্রায় এক হাজার ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করেন, যার মধ্যে হিন্দু ঐতিহ্যের শ্যামাসঙ্গীত,  ভজন, কীর্তন এবং ইসলামি ঐতিহ্যের হামদ্, নাত, নামায, রোজা,  হজ্জ, যাকাত, ঈদ, মর্সিয়া প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ের গান রয়েছে। এসব গানের রচনা ত্রিশের দশকের শেষ অবধি অব্যাহত ছিল।

১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ত্রিশের দশকের শেষ অবধি তিনি যেসব আধুনিক গান রচনা করেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: ‘মোর আহত পাখীর সম’, ‘বিদায়-সন্ধ্যা আসিল ঐ’, ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ-পথে’, ‘পাষাণের ভাঙালে ঘুম’, ‘পথ চলিতে যদি চকিতে’, ‘শুক্নো পাতার নূপুর পায়ে’, ‘ধীরে যায় ফিরে ফিরে চায়’, ‘আধো আধো বোল’, ‘দূর দ্বীপ-বাসিনী’, ‘মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে’, ‘যবে সন্ধ্যা বেলায় প্রিয় তুলসী তলায়’ ইত্যাদি। এসব গানের মাধ্যমে নজরুল আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

একই সময়ে রচিত লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যভিত্তিক গানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: ‘আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল’, ‘আমার গহীন জলের নদী’, ‘ও কূল ভাঙা নদীরে’, ‘কুচ বরণ কন্যারে’, ‘পদ্মদীঘির ধারে ঐ’, ‘পদ্মার ঢেউরে’ প্রভৃতি। লোক-ঐতিহ্যভিত্তিক গানের মধ্যে নজরুলের ঝুমুর গানগুলি এক অপূর্ব সৃষ্টি। এ সময়ে তিনি বেশ কিছু হাসির গানও রচনা করেন।

নজরুলের সঙ্গীত-জীবনের শেষ পর্যায় হচ্ছে রাগভিত্তিক গান সৃষ্টির পর্ব; এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এ ক্ষেত্রে তিনি রাগভিত্তিক গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নব নব সৃষ্টিতে মৌলিক সঙ্গীত-প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। নজরুল বিশুদ্ধ রাগ অবলম্বনে কিছু হিন্দুস্থানি বন্দিশের ওপর বাংলা কথা বসিয়ে বাংলা খেয়াল রচনার সূত্রপাত করেন, যেমন জয়জয়ন্তীতে ‘দূর বেণু কুঞ্জে’, মেঘ-এ ‘গগনে সঘনে চমকিছে দামিনী’, বাহারে ‘পিউ পিউ বোলে’ প্রভৃতি। এ গানগুলি কলকাতা বেতারের হারামণি, নবরাগ মালিকা, মেল-মিলন, যাম যোজনার কড়ি মাধ্যম, প্রহর পরিচায়িকা নামক অনুষ্ঠানসমূহে পরিবেশিত হতো।

বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর মিশ্রণে নতুন রাগ-রাগিণী সৃষ্টির ক্ষেত্রে সঙ্গীতশাস্ত্র সম্পর্কে নজরুলের ছিল সূক্ষ্ম জ্ঞান ও রসবোধ। তাই সমকালীন অধিকাংশ গানের সুরে এ বিষয়টির অভাব লক্ষ করে তিনি ‘বেণুকা’ ও ‘দোলনচাঁপা’ নামে দুটি রাগিণী সৃষ্টি করেন। তাঁর মতে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে যে অভিনব রসের সৃষ্টি হতে পারে তা আধুনিক সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। হিন্দি ভাষা ছাড়া খেয়াল, ধ্রুপদ ইত্যাদি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত রচিত হতে পারে না এ ধারণা নজরুল মিথ্যা প্রমাণিত করেন বাংলায় বিভিন্ন রাগ-রাগিণীভিত্তিক গান রচনা করে।

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, নজরুল তার সীমিত কর্মজীবনে প্রায় ৪,০০০ (চার হাজার)-এর মতো গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এককভাবে এত বেশিসংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। নজরুলের গানের বড় একটি অংশ তারই নিজের সুরারোপিত। নজরুলের জীবদ্দশায় তার গানের কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছে— গানের মালা, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, বুলবুল, চন্দ্রবিন্দু, রাঙা-জবা, মহুয়ার গান, সন্ধ্যা ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে আরো গান গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে গান লিখতেন, এ কারণে অনুমান করা হয় প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে বহুগান হারিয়ে গেছে। 

বাংলাদেশ নামক দেশের জন্মের সাথেও জড়িয়ে আছে নজরুল সংগীত। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্রের পাশাপাশি নজরুলের অনুপ্রেরণাদায়ী দেশের বা বিদ্রোহের গানের ছিল অসাধারণ ভূমিকা, পৃথিবীর ইতিহাসেই এ এক বিরল ঘটনা। পরাধীন এক জাতির মনে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে শিকলের নাগপাশ ছিন্ন করে অবরুদ্ধ চেতনাকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় খুঁজে পাওয়া যায় নজরুলের সাহিত্য ও সঙ্গীতে। নজরুল আলোক মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন নব জাগরণের জাজ্ব্যল্যমান রাজটিকা। ১৯৭২ সালের ১৩ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের রণ-সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন করা হয় ‘চল চল চল’ গানটি।

 

চার 

নজরুল এর নাম ও বিদ্রোহ একসাথে মিলে গেছে। যেমন গিয়েছে বিদ্রোহী কবিতা। নজরুলের ছিল এক প্রতিরোধচেতনা আর সেই প্রতিরোধচেতনা ছিল সৃষ্টিশীল, ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে স্বদেশের মুক্তিকামনায় আকুল। তিরিশি অবক্ষয় হতাশা কিংবা নৈরাশ্যবাদিতা-যৌনতা কোনক্রমেই তার কবিমানসকে আচ্ছন্ন করেনি। তার বিদ্রোহ সৃষ্টিশীল বলেই তিনি ধ্বংসের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন নতুন সৃষ্টির আশ্বাস। অসুন্দরের মৃত্যুকামনা করে তিনি বরণ করেছেন চিরসুন্দরকে:  

“ধ্বংস দেখে ভয় তোর?-প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।
তাই সে এমন কেশে-বেশে
প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে’-
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর”

উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব আত্মসমীক্ষার কথা বলে, বলে আত্মশক্তি উদ্বোধনের কথা। গোটা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিই তো আত্মসমীক্ষা ও আত্মশক্তি উদ্বোধনের এক অনুপম শিল্পপ্রতিমা। বস্তুত, প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন মানুষের আত্মতা ও আত্মশক্তির বিশালতা।

ঔপনিবেশিক শক্তিকে প্রতিরোধের বাসনা থেকে সৃষ্টিশীল প্রতিভা, শক্তি সংগ্রহের জন্য, অবগাহন করেন মিথ-পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্য-রূপকথা-উপকথার জগতে। সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার জাদুস্পর্শে সংরক্ত সমকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে মিথ-পুরাণ ইতিহাস-ঐতিহ্য লাভ করে পুনর্জন্ম। পুরাণ ইতিহাস ঐতিহ্য ও মিথিক অনুষঙ্গ কবির চেতনায় সঞ্চার করে অসীম অতল অতুল শক্তির উপলব্ধি। এই শক্তিই কবিকে বর্তমান অবরুদ্ধ অবস্থা ভাঙার সাহস জোগায়- তাকে করে তোলে দ্রোহী-প্রতিবাদী-প্রতিরোধী এবং প্রত্যাঘাতপ্রবণ। মিথ কবিকে করে তোলে স্বপ্নমুখী-সে স্বপ্ন ব্যক্তিক নয়, সামষ্টিক। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় বিল ময়ার্সের সঙ্গে কথোপকথনকালে জোসেফ ক্যাম্বলের অভিমত- ‘স্বপ্ন আমাদের সচেতন জীবনের ভরসা-গভীর, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; আর মিথ আমাদের সমাজের স্বপ্ন। মিথ হলো গণস্বপ্ন, পক্ষান্তরে স্বপ্ন হচ্ছে ব্যক্তিগত মিথ’ ।

নজরুল-কাব্যের কেন্দ্রীয় ভাব দ্রোহ ও প্রতিরোধ, আর এই দ্রোহ ও প্রতিরোধ আকাঙ্ক্ষার সপক্ষে শক্তি সঞ্চয়ের বাসনায় নজরুলের ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণস্মরণ। ঔপনিবেশিক শোষণ এবং যুদ্ধোত্তর অবক্ষয় বিপর্যয় ও শূণ্যতার পটভূমিতে জীবনের পরমার্থ আবিষ্কারে নজরুল সচেতভাবে স্মরণ করেছেন ঐতিহাসিক-পৌরাণিক নানা চরিত্র ও অনুষঙ্গ। তার কবিতায় ইতিহাস-ঐতিহ্য মিথ-পুরাণ ব্যবহার-বৈচিত্র্যে হয়ে উঠেছে শিল্পমণ্ডিত, তা বিকিরণ করেছেন নতুন ব্যঞ্জনা নবতর মাত্রা। অর্জুন, দুর্বাসা, ভীম, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বিষ্ণু, পরশুরাম, বলরাম, ভৃগু, প্রহ্লাদ, চণ্ডী, দুর্গা, শিব প্রভৃতি পৌরাণিক চরিত্র এবং পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসপুঞ্জ কিংবা মধ্যযুগীয় সাহিত্য-ঐতিহ্য অথবা ইয়োরোপীয় অর্ফিয়াস প্লুটো ইত্যাদি নজরুল-কবিতায় নির্মান করেছে মিথ-পুরাণ ও ঐতিহ্যের এক অতি চৈতন্যলৌকিক বলয় । মিথ ও পুরাণের বহুমাত্রিক ব্যবহারে নজরুলের কবিচৈতন্যে সামূহিক নির্জ্ঞান ও ব্যক্তিগত উপলব্ধির মেলবন্ধন  ঘটেছে।

বাংলা কবিতায় নজরুলের বিশিষ্টতা এই যে, ভারতীয় মিথ-পুরাণ এবং পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য ব্যবহারে তিনি অর্জন করেছেন অনন্য সাফল্য। নান্দনিক ঐকান্তিকতায় এবং জৈবসমগ্র ঐক্যসূত্রে দুই ভিন্ন উৎসের শিল্প-উপাদান নজরুল-কবিতায় সৃষ্টি করেছে মূর্ছনার ঐকতান। এ সূত্রে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নজরুলের ঐতিহ্যিক-উত্তরাধিকার প্রসঙ্গটি। উত্তরাধিকারের ব্যাপকতায় কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ঋব্ধিশালী । নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়, তাই ভারতীয় উত্তরাধিকারকে তিনি আপন উত্তরাধিকার হিসেবেই জেনেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে ধর্মসূত্রে তিনি ছিলেন পশ্চিম এশীয় তথা ইসলামের অতীত গৌরব এবং ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তিনি সচেতনভাবে উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন কবিসত্তায়। তাই একই কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তিনি সার্থকভাবে মেলাতে পেরেছেন পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য- যে হাতে লিখেছেন শ্যামাসঙ্গীত-শাক্তপদ, সেই হাত দিয়েই লিখতে পেরেছেন গজল আর ইসলামি গান। উভয় ঐতিহ্য থেকে শক্তি ও প্রেরণা চয়ন করে নজরুল তা ব্যবহার করতে চেয়েছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-যুদ্ধে।

 

পাঁচ  

নজরুলের কাব্য-সত্তা যেমন অসাধারণ তাঁর গদ্য রচনাও তেমনি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সাধারণত তাঁর কাব্য সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা হলেও, তাঁর গদ্য রচনা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে খুবই কম। কিন্তু নজরুলের গদ্য রচনা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। বিপুলত্বে ও বৈচিত্র্যে তাঁর গদ্য রচনা অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। তাঁর গদ্য রচনার মধ্যে রয়েছে- প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, অভিভাষণ, চিঠিপত্র ও তাঁর সম্পাদিত বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ-নিবন্ধ ইত্যাদি। তাঁর গদ্যের ভাষাও তাঁর নিজস্ব ও বহুলাংশে স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত । 

নজরুলের গদ্য কাব্যধর্মী, আবেগময়, অলংকারবহুল ও কখনো কখনো আঞ্চলিক কথ্য ভাষার ব্যবহারে সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসেরও বিশেষ আবেদন রয়েছে। কারণ তা জীবনরসে জারিত। তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা ও ব্যথাদীর্ণ করুণ অভিব্যক্তিতে পূর্ণ। নজরুলের নাটকেরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নাটকের বিষয় বহু বিচিত্র। তাঁর নাটকের সংখ্যা নিরূপণ কঠিন, কারণ অধিকাংশ নাটকই হারিয়ে গেছে। তবে তার সংখ্যা শতাধিক বলে অনেকের ধারণা। পৌরাণিক বিষয়, ইতিহাস, সামাজিক কাহিনী, প্রেম ও জীবনের বিচিত্র রূপরসের বর্ণনা রয়েছে তাঁর নাটকে। গানের ক্ষেত্রে তিনি যেমন লিখেছেন, সূর করেছেন এবং নিজে গেয়েছেন, তেমনি নাটকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন, পরিচালনা করেছেন, মঞ্চস্থ করেছেন, নাটকের গান লিখেছেন, গেয়েছেন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে তিনি তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নাট্যকার হিসাবে নজরুলের আলোচনা তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর সমকালে তিনি যে বিপুল অবদান রেখেছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি যেমন ব্যাপক বিষয় নিয়ে এসেছেন, তেমনি নাটক রচনার ক্ষেত্রেও তিনি একাধারে প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের আদলে ও হিন্দু পুরাণ কাহিনী অবলম্বনে নাটক রচনা করেছেন, আবার যাত্রা, পালা, লেটো ইত্যাদি লোকজ রীতি অবলম্বনে অসংখ্য পালাগান রচনা করেছেন, অন্যদিকে সামাজিক বিষয় অবলম্বনে মঞ্চ নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। শুধু রচনাই নয়, মঞ্চায়ন, পরিচালনা, সংগীত পরিচালনা ইত্যাদি সকল কাজেই তিনি অবদান রেখেছেন। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিচিত্রমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

নজরুলের অভিভাষণ ও চিঠিপত্রও উৎকৃষ্ট সাহিত্য পদবাচ্য। একদিকে, সেগুলোতে যেমন তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি তাতে তাঁর সমকালীন সমাজ-রাজনীতি-ধর্ম-প্রথা-সংস্কার ও ব্যক্তি অনুভুতির বিচিত্র অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটেছে। তাই বাংলা গদ্য সাহিত্যে নজরুলের অবদান যেমন বিপুল, তেমনি বৈচিত্র্যে-বৈভবে ও বৈশিষ্ট্যে অপরূপ। অতএব, সমগ্র নজরুলের পরিচিতি জানার জন্য তাঁর গদ্য সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ন একান্ত অপরিহার্য।

গল্পে কাজী নজরুল নতুন কোনো ফর্মের সূচনা করেননি। সেটা হয়ত তাঁর কাম্যও ছিল না। তিনি কথাকার হয়ে জন্মাননি। যে-উন্মূল বাসনা একজন কবিকে গদ্য লিখতে অনুরুদ্ধ করে, গল্প তারই অভিপ্রায়। কথাকার নজরুলের আবির্ভাব সাহিত্যের একটি বিশেষ উর্বর সময়ে। রবীন্দ্রনাথের মধ্যদিয়ে বাংলা ছোটগল্প ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি বেয়ে উর্ধ্বমুখি আকাশে ধাবমান। বুদ্ধির ক্ষিপ্রতা নিয়ে আবির্ভুত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩৮), প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) কিংবা সমাজ সচেতন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও ইতোমধ্যে কথাশিল্প নামক সৌধের একেকটি স্তম্ভররূপে প্রতিষ্ঠিত। সে-সঙ্গে ‘ভারতী’ পত্রিকার লেখকগোষ্ঠী তো শিল্পের নানা অলিগলি সন্ধান করে ফিরছেন। সমকালীন কথাশিল্প যাঁদের সরসতায় গৌরবান্বিত সে-ই তারাশঙ্কর, বিভূতি, মানিক এঁরাও আছেন। এ-পরিবেশেই ধূমকেতুর মত উল্কা-বিস্ফোরণের মত এক কথাকারকে পাওয়া গেল যিনি আপন কবিত্বের ঘনঘোর বরষায় সিক্ত করছেন কথাশিল্পের আঙিনা। 

কখনো উত্তম পুরুষের বয়ানে নিরন্তর আবেগী বৃষ্টিপাত, কখনো সমাজসচেতন ও সমাজবিদ্বিষ্ট মনোভাব, কখনো আঞ্চলিক শব্দ ও আবহের গূঢ় বাস্তবায়ন আবার কখনো অধরা প্রেমের বিরহকাতর অসহ্যতার সুক্তি দিয়ে আঁকা হয়ে আছে নজরুলের গল্পভূবন। ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’, ‘রাক্ষুসী’, ‘সালেক’, রাজবন্দীর চিঠি’, ‘ব্যথার দান’, ‘হেনা’, ‘মেহের নিগার’, ‘অতৃপ্ত প্রেম’, ‘বাদল বরিষণে’, ‘ঘুমের ঘোরে’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘স্বামীহারা’, ‘পদ্মগোখরো’, ‘শিউলিমালা’, ‘বনের পাপিয়া’ প্রতিটি গল্পেই কাজী নজরুলের উক্ত বিষয়সমূহের সন্ধান মেলে।

 

ছয় 

এক সময় ছিল যখন সৌন্দর্য-সৃষ্টি ও আনন্দ দানই ছিল শিল্প সাহিত্যের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এমন সাহিত্যকে বলা হতো নন্দনতাত্ত্বিক সাহিত্য। পরবর্তীকালে কার্ল মার্কসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, ফ্রয়েডের মনোবিকলনবাদ ও জৈবিক চেতনা আধুনিক লেখক সমাজের মনোজগতকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। বর্তমান লেখকবৃন্দ নন্দনতাত্ত্বিকতাকে একেবারে পরিহার না করলেও রূঢ় বাস্তবতাকে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারেন না। এরই ফলে সুন্দরের সাথে অসুন্দরের, সুনীতির সাথে দুর্নীতি, দয়ার্দ্রতার সাথে নিষ্ঠুরতা সাহিত্যে উঠে আসে সমান গুরুত্ব নিয়ে। এই সাথে উঠে আসে নরনারীর জৈবিক তাড়না ও নানা টানাপোড়েন। এসবতো জীবনেরই অবশ্যম্ভাবী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। আসল কথা এই যে, অর্থ ও জৈবিক তাড়না মানুষের অন্য প্রায় সকল চেতনার নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক। ঔপন্যাসিকদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা দেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে। ফ্রয়েড ও মার্কসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী এই প্রবণতা দানা বাঁধে। বাংলাদেশে মার্কসবাদ তথা সমাজবাদের প্রবক্তা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোজাফ্ফর আহমদ। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুর উপর পড়ে বন্ধুর প্রভাব। কাব্যে সাম্যবাদী কবিতাগুচ্ছ ও আরো অনেক কবিতায় এ প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।

নিম্নবর্গ বা প্রান্তজনের উত্থানবাসনা উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাস নজরুল ছিলেন প্রান্তবাসী, তার অবস্থান ছিল নিম্নবর্গে। নিম্নবর্গের প্রতি ভালোবাসা, প্রান্তজনের প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার থেকে নজরুল কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ছোটগল্প উপন্যাস প্রবন্ধ। উৎপীড়িত বা প্রান্তজনের মুক্তির জন্যই নজরুল বিদ্রোহ করেছেন। এই বিদ্রোহ বা প্রতিরোধ-যুদ্ধে নজরুল পুরুষের পাশাপাশি নারী-শক্তিকেও আহ্বান করেছেন। ‘বারাঙ্গনা’, ‘নারী’-এসব কবিতায় পাওয়া যায় এই প্রত্যয়-নজরুল নারীকে প্রাকৃতিক লৈঙ্গিক পরিচয়ে না দেখে, দেখেছেন সামাজিক জেন্ডার দৃষ্টিকোণে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নিম্নবর্গ তথা প্রান্তজনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন – ‘Can the subaltern speak’? 

নজরুলের কবিতা ও কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গ কথা বলেছে, প্রতিবাদ করেছেন, বিদ্রোহ করেছে। ‘ব্যথার দান’ গল্পের গুলশান, ‘রাক্ষুসী’ গল্পের বিন্দি, ‘পদ্মগোখরো’ গল্পের জোহরা, কুহেলিকা উপন্যাসের জাহাঙ্গীরের মা, কিংবা জয়তী ও চম্পা, বাঁধনহারা-র আয়েশা, মৃত্যুক্ষুধা-র প্যাকালের মা কিংবা মেজ বউ নিম্নবর্গ বা প্রান্তজনের লক্ষণরেখা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে আলোকিত পৃথিবীতে। জাহাঙ্গীর কিংবা আনসারের মুখেও আমরা শুনি ওই প্রান্তজনের গলা-ফাটানো উত্থান-কথা। অতএব, সামসময়িক সাহিত্যের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে, নজরুলের কথাসাহিত্যের এই মর্ম উপলব্ধি করে গায়ত্রীর জিজ্ঞাসার উত্তরে আমরা বলতে পারি – ‘Yes, the subaltern can also speak’ ।

 

সাত 

শ্রীকুমার বন্দোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’ বা বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস বিষয়ক প্রধান গ্রন্থগুলোতে যেহেতু কাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখ নেই, তাই তিনি ঔপন্যাসিক পদবাচ্য নন এমন ধারনায় বাংলা ভাষার  উপন্যাসগুলোর আলোচনার কোন সুত্রেই নজরুলের উল্লেখ নেই। এটা খুব পরিতাপের বিষয়। অথচ শুধু বাঁধনহারার দিকেই যদি নজর দিই দেখা যায় এতকালের যে প্রচলন অর্থাৎ একটি সুস্পষ্ট গল্প কাঠামোকে উপন্যাসে উপস্থাপন করা, তার ধারও নজরুল ধারেন নি। নজরুল বাংলা গদ্য লেখার সচেতন ধারাকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।

আর সেক্ষেত্রে ‘বাঁধন হারা’কে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-এর কাঁদো নদী কাঁদো, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর অন্তঃশীলা (১৯৩৫), আবর্ত (১৯৩৭) ও মোহনা (১৯৪৩) ত্রয়ী উপন্যাস এবং সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী (১৯৪৬) এবং ঢোড়াইচরিত মানস (১৯৪৯-১৯৫১)-এর পূর্বসুরী বলতেই পারি আমরা। এসব উপন্যাস লেখার আগে উপন্যাসের চরিত্রের আত্মিক এবং বিবরণকারীর বাহিরিক যে জটিলতা তা বাংলা সাহিত্যে ইতিপূর্বে এত তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। 

নজরুলের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’। এটি প্রকাশ হয় ১৯৩০ সালে। তত দিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। এ উপমহাদেশে চলছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, যার অংশ হিসেবে চলছে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন। রাশিয়ার ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পথ ধরে ১৯২১ সালে নজরুল ইসলামের উপস্থিতিতেই মুজফফর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয়ে গেছে ভারতের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল। লোকমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ আর ‘ভাঙার গান’ কবিতা। প্রকাশ হয়ে গেছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসর্গ করে ফেলেছেন নজরুলকে ‘বসন্ত’ নাটক। অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে জেলজীবনের। আর এসবের কিছুটা আঁচও যেন রয়েছে মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসে।
উপন্যাসটি এগিয়েছে এমন এক বিশাল সময়কে নিয়ে, যেখানে ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের বহু মুসলমান, বহু হিন্দু গ্রহণ করছিল খ্রিস্টান ধর্ম। এ ধর্মান্তরিত হওয়ার পেছনে যত না কাজ করেছে যিশুপ্রীতি, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুধা আর দারিদ্র্য। কেননা ওই সময় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে আর যা-ই হোক, পেটের ক্ষুধার যন্ত্রণা মেটানোর দায়িত্ব নিত মিশনারি।
এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কলম্বাসের আমেরিকা প্রবেশের কাহিনী, যেখানে কলম্বাস প্রবেশ করেছিলেন বাইবেল আর তলোয়ার হাতে। এরপর সেখানকার নিরীহ আদিবাসীদের বানানো হয়েছিল দাস এবং যদি তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না করত, তাদের হত্যা করা হতো নির্মমভাবে।
সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারে ধর্মের প্রচার আর প্রসারের পরবর্তী এক বিকল্প রূপ যেন দরিদ্র দেশগুলোতে মিশনারিগুলোর সাদা চোখে ভালো কর্মকাণ্ডগুলো। তারই এক কৌশলী ও ভিন্ন রূপ কি দারিদ্র্যকে সামনে রেখে ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতীয়দের খ্রিস্টধর্মের দিকে এগিয়ে দেওয়া? এ ক্ষেত্রে অবশ্য ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য মিশনারির কোনো জোরজবরদস্তি থাকত না, থাকত প্রলোভন ও বাস্তব পরিস্থিতি তৈরির ব্যবস্থা।
আজকের এ সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হবে, বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কথাও। যেখানে প্রথমে আক্রমণ চালানো হয়, পরে আক্রমণকারী দেশ থেকেই পাঠানো হয় মানবসেবাদায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। এ যেন এক আশ্চর্য ঔপনিবেশিক কৌশল। আর এই ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধেই যেন ঔপনিবেশিক কাঠামোতে বেড়ে ওঠা একদল দরিদ্র মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরেছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটি!

১৯২৭-১৯৩০- এসময়ের মধ্যে উপন্যাসটি রচিত এবং সওগাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মুদ্রিত হয় (অগ্রহায়ণ ১৩৩৪-১৩৩৬ ফাল্গুন)। উপন্যাসটি নজরুলের বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত। ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত নজরুল কৃষ্ণনগরে বাস করতেন। এ নগরের চাঁদসড়কের ধারে বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা একতলা বাংলো প্যাটার্নের একটি বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা ছিল। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের পটভূমি উক্ত বাড়ি, ওমান কাথলি পাড়া এবং কলতলার পারিপার্শ্বিককে কেন্দ্র করে রচিত। উপন্যাসের প্রথমাংশ কৃষ্ণনগরে এবং শেষাংশ কলকাতায় রচিত। কৃষ্ণনগরে অবস্থানকালে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট এবং দুঃসাধ্য কৃচ্ছ্রসাধন ছিল নজরুলের নিত্য জীবনযাত্রার অঙ্গ। তাই দারিদ্রের চিত্র, সাম্য ও বিপ্লবীচেতনা এ উপন্যাসের রূপকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর বহুল পঠিত ‘দ্রারিদ্র’ কবিতাটিও এ সময়ের রচনা। 

পড়া শেষ করলেই আমার মনে হয় উপন্যাসটি যে সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা যেন খেই হারিয়ে ফেলে। উপন্যাসটি শেষ হয় দুটি চিঠির মধ্য দিয়ে, যেখানে উপন্যাসটি এগোচ্ছিল একটি সময়ের নির্মমতাকে, জীবনচিত্রকে তুলে ধরে, সেখানে তা যেন শেষ পর্যন্ত একটি রোমান্টিক আবহে গিয়ে ইতি টানে! ফলে প্রশ্ন জাগে মনে, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ কি পারত না বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য উপন্যাসগুলোর একটি হতে যার সব সম্ভাবনার ইঙ্গিতই তো ছিল উপন্যাসটিতে। কিংবা এ উপন্যাসটি যে বিষয় নিয়ে লিখিত হয়েছে, ওই একই বিষয় ও সমাজচিত্রকে সামনে রেখে কি সম্ভব নয় নতুন কোনো সফল উপন্যাস লেখা!  মনে রাখতে হবে আমাদের উপন্যাসটি রচনার কাল। কেননা শরৎচন্দ্রকে বাদ দিলে তখন পর্যন্ত কথাসাহিত্যের মাঠে শক্ত ভিত তৈরি হয়ে ওঠেনি।  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মহান ঔপন্যাসিকদের তখনও প্রদীপের আলোর বাইরে। সেই ১৯৩০ সালে বসে ধর্ম, সমসাময়িক রাজনীতি কিংবা নারী-পুরুষের আদিম ও মানবিক সম্পর্ক তুলে ধরে এভাবে উপন্যাস লেখা যেন কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল।

 

শেষাংশ 

নজরুলের সমসাময়িককালে অন্যান্য কবি সাহিত্যিক যারা ছিলেন তারা প্রায়ই নজরুলের বিস্ময়কর প্রতিভার নানা দিক সমালোচনা করতেন। নজরুল নিজেও এ ব্যাপারগুলো স্বীকার করতেন। নজরুলের উক্তি— ‘রবীন্দ্রনাথ আমাকে প্রায়ই বলতেন, দেখ উন্মাদ তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে। তুই প্রস্তুত হ।’ নজরুল ঠিক সেরকম ট্র্যাজেডিতে পড়েছিলেন বরীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরেই। 

একথা অনস্বীকার্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ করেছেন অসত্য অন্যায় অকল্যাণ ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে-সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে। সন্দেহ নেই, তার বিদ্রোহ মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও কল্যাণবোধ থেকে উৎসারিত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আমিত্ব বা ব্যক্তিসত্তার মুক্তিপ্রত্যাশী। নবজাগরণের ফলে ধর্মশাসিত শৃঙ্খল-পরা মানুষের মুক্তি ঘটেছে, মুক্তি ঘটেছে মানুষের অবরুদ্ধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি’ এই নবজাগ্রত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের শিল্প-নির্মিতি। মহাকাশ ছাপিয়ে, ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে নজরুল হয়েছেন বিশ্ববিস্তারী- আমিত্বের অহঙ্কারে নিজেকে উন্মোচিত করেছেন এই প্রত্যয়দীপ্ত চরণগুচ্ছে:

আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত্য।
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে বলা চলে ব্যক্তির আমিত্বকে সর্বজনীন আমি করে ধর্মমুক্তি বা আত্মমুক্তির ইতিহাসে একাই ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের মতো ঘটনা। কবিতায় উল্লেখিত তিনজন দেবতার স্তুতি পাওয়া যায় এক ঋকের দ্যুলোক বা স্বর্গের দেবতা সূর্য, অন্তরীক্ষ বা গোলকের দেবতা বায়ু এবং ভূলোকের দেবতা অগ্নিথ। এই যে ভূলোক, দ্যুলোক ও গোলকব্যাপী দেবতাদের জয়জয়কার, ভারতীয় দর্শন যার শৃঙ্খল থেকে মানুষকে পরিত্রাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা সেই দায়িত্ব যেন একাই পালন করেছে।

আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকি, জাতিসত্তা বির্নিমাণে নজরুলের ভূমিকা অনন্যসাধারণ। ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে, মুসলিম নবজাগরণে, নিরন্ন-বুভুক্ষ-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নজরুলের গান-কবিতা আমাদেরকে সর্বদা অনুপ্রাণিত-উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই মাত্র ৩০ বছর বয়সেই ১৯২৯ সালে পরাধীনতার যুগে কলকাতায় এলবার্ট হলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের এক যৌথ অনুষ্ঠানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সেন তাঁকে ভবিষ্যৎ ‘স্বাধীন ভারতের জাতীয় কবি’ হিসাবে ঘোষণা দেন। কিন্তু ভারত স্বাধীন হলেও স্বাধীন ভারতে নজরুলকে বোধগম্য কারণেই জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়নি। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে যথার্থই বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এটা যেমন যৌক্তিক তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এরদ্বারা অধঃপতিত বাঙালি সমাজের প্রতি তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি অথবা তাঁর প্রতি বাঙালি মুসলমানের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। 

কাজী নজরুল ইসলাম প্রতিটি মানুষকে পূর্ণ এক আমি’র সীমার মধ্যে ব্যাপ্ত করতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এক মানুষকে আরেক মানুষের সংগে মিলিয়ে ‘আমরা’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন। এ আমি’র পথ প্রদর্শক হচ্ছে ‘সত্য’। যা মিথ্যার ভয়কে জয় করতে সাহায্য করে। নজরুল ইসলাম অবিনয়কে মেনে নিতে পারেন কিন্তু অন্যায়কে সহ্য করেন না। কবি মনে করেন, সুষ্পষ্টভাবে নিজের বিশ্বাস আর সত্যকে প্রকাশ করতে না জানলে তৈরি হয় পরনির্ভরশীলতা। আর আহত হয় ব্যক্তিত্ব। কবির কাছে এ ভগ্ন আত্ম বিশ্বাসের গ্লানি গ্রহণযোগ্য নয়। এর পরিবর্তে তিনি প্রয়োজনে দাম্ভিক হতে রাজি আছেন। কিন্তু ভণ্ডামি করতে রাজি নন। মুনষ্যত্ববোধে জাগ্রত হতে পারলেই ধর্মের সত্য উস্মোচিত হবে। সম্ভব হবে গোটা মানব সমাজেকে ঐক্যবদ্ধ করা, আর এ ঐক্যবদ্ধের মূলশক্তি হলো সম্প্রীতি।

পরম আশাবাদী নজরুল স্বদেশের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন; ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করার আহবান জানিয়েছেন। উপনিবেশকে আঁকড়ে রাখার মানসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সুচতুর কৌশলে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল ভারতবর্ষে। ভারতের দুই বৃহৎ ধর্ম-সম্প্রদয়ায় পরস্পর বিভেদে জড়িয়ে পড়েছে বারবার। এর পাশ্চাতে ছিল একাধিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধন। এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ নজরুলকে ব্যথিত করেছে। তাই তিনি সচেতনভাবে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক-নিরপেক্ষ সম্প্রীতি প্রত্যাশা করেছেন। সত্য-সুন্দর-কল্যাণের পুজারি নজরুল চেয়েছেন সম্প্রদায়ের উর্ধে মানুষের মুক্তি।  সাম্যবাদী চিন্তা তার মানসলোকে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ মানবসত্তার জন্ম দিয়েছে— হিন্দু ও মুসলমান বৈপরীত্যের দ্যোতক না হয়ে তার চেতনায় হতে পেরেছে জাতিসত্তার পরিপূরক দুই শক্তি। 

নজরুল স্বাধীনতার কবি, মুক্তির কবি, প্রেমের কবি, সম্প্রীতির কবি। আজ এই বিক্ষুব্ধ সময়ে যখন মানুষের মাঝে নোংরা রাজনীতির জন্য ছড়ানো হচ্ছে হিংসা আর ঘৃণা, মানবতার অন্তহীন কান্না শুনতে কান পাততে হয় না, ঘুমের মাঝেও সেগুলো অবিরাম তীব্র ভাবে শোনা যায়, এমন দিনগুলোতে নজরুল যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর গান, কবিতা আর গদ্যের রহস্যের দুয়ার খুলে আমাদের নতুন সম্ভবনার সামনে হাজির করবেন হয়ত কোন নজরুল প্রেমিক গবেষক।  নজরুলের আবেগবহুল সাহিত্য আর সাম্য আচ্ছন্ন চেতনা আমাদের চৈতন্যলোককে ভিজে দিয়ে যাবে প্রতিক্ষণ। আর বঞ্চনা ও অপ্রেমের হলাহল পূর্ণ এ-বিশ্বে নজরুলের দ্রোহ ও প্রেমের আগুন আমাদের পুড়াতেই থাকবে সববেলায়। এভাবে ভিজে ভিজে আর পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনার আল্পনায় বাঙ্গালী তাঁর জাতিসত্ত্বাকে খুঁজে ফিরবে চিরকাল।       

 

দোহাইঃ 

১। কাজী নজরুল ইসলাম, মৃত্যুক্ষধা, নজরুল রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), নতুন সংস্করণের প্রথম পুণর্মদ্রণ, ১৯৯৬, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২। সোহারাব হোসেন, ‘ঔপন্যাসিক নজরুল: নতুন যুগ-সৃষ্টির প্রয়াস’, পশ্চিমবঙ্গ (কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবর্ষ স্মরণ), ১৪০৬, কলকাতা।
৩।রফিকুল ইসলাম, ‘নজরুলের কথাসাহিত্য’, সচিত্র বাংলাদেশ (নজরুল সংখ্যা), ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪০২, ঢাকা, ।
৪। মিজানুর রহমান খান, ‘নজরুলের ছোটগল্প: বিষয় ও শৈলিবিচার’, নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা (নজরুল জন্মশতবর্ষ সংখ্যা), ১৯৯৯, ঢাকা। 

৫। নজরুল সাহিত্য তৎকালীন বিশ্ব : ড. রিটা আশরাফ।

৬। বিদ্রোহী আর মৃত্যুক্ষুধার নজরুলঃ ফেরদৌস মাহমুদ।

৭। নজরুলের উপন্যাস : উপন্যাসের নজরুল, আবদুল হালিম ।

৮। মৃত্যুক্ষুধা : নজরুল সাহিত্যের ভিন্ন মেজাজ, ড. অরিজিৎ ভট্টাচার ।

৯। কথাসাহিত্যে নজরুলের কৃতিত্ব,  সুব্রত কুমার দাস। 

১০। উত্তর-ঔপনিবেশিকতায় নজরুলসাহিত্য,  বিশ্বজিৎ ঘোষ।  

১১। কাজী নজরুলের গল্পঃ একটি আবেগঝরা অধ্যায়, খোরশেদ আলম।  

জাহিদুর রহিম

জন্ম: ১৭ ডিসেম্বর ১৯৮৬ ঈসায়ী সনে

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা: জনস্বাস্থ্যে স্নাতোকোত্তর। পড়েছেন উন্নয়ন অধ্যয়ন।
অবসরের সঙ্গী আড্ডা, ভ্রমণ, বই পড়া, গান শোনা।
প্রিয় বিষয়: ইতিহাস, রাজনীতি, স্মৃতিকথা।
লেখালেখি: কবিতা, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, অনুবাদ ইত্যাদি।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা- সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ (২০১৫), হেমলক সন্ধ্যার গান (২০১৯)
প্রবন্ধ- কথারা আমার মন (২০১৮), ক্ষণকালের আভাস হতে (২০২০)
অনুবাদ: দ্য প্রফেট
ই-মেইল: [email protected]

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সুন্দরবনে সংক্রান্তি : বনবিবি জহুরানামা | ইমরান উজ-জামান

Tue Jun 16 , 2020
সুন্দরবনে সংক্রান্তি : বনবিবি জহুরানামা | ইমরান উজ-জামান 🌱 খুলনার দাকোপ এর সুন্দরবন সংলগ্ন ইউনিয়ন বানিশান্তা। বানিশান্তার একটি গ্রাম ঢাংমারী। প্রকৃতির মাঝে মানুষগুলো বাঁচে প্রকৃতি বন্ধনার মধ্যদিয়ে। পৌষ মাসের শেষদিন গেরস্থ বাড়ির উঠানে ধান রাখার মুরোইলের সামনে ফুল দিয়ে পূজা দেয়া হয়েছে। আঙ্গিনায় রাখা নতুন ধানের স্তুপের সামনে চালের গুড়া […]
Shares