সুন্দরবনে সংক্রান্তি : বনবিবি জহুরানামা | ইমরান উজ-জামান

সুন্দরবনে সংক্রান্তি : বনবিবি জহুরানামা | ইমরান উজ-জামান

🌱

খুলনার দাকোপ এর সুন্দরবন সংলগ্ন ইউনিয়ন বানিশান্তা। বানিশান্তার একটি গ্রাম ঢাংমারী। প্রকৃতির মাঝে মানুষগুলো বাঁচে প্রকৃতি বন্ধনার মধ্যদিয়ে। পৌষ মাসের শেষদিন গেরস্থ বাড়ির উঠানে ধান রাখার মুরোইলের সামনে ফুল দিয়ে পূজা দেয়া হয়েছে। আঙ্গিনায় রাখা নতুন ধানের স্তুপের সামনে চালের গুড়া পানিতে মিশিয়ে আলপনা আঁকা হয়েছে। অসাধারন শিল্প শৈলির সেসব নকশা। দিনভর চালের গুড়া তৈরির পর বিকেলে প্রতিটি বাড়িতেই চলে আলপনা তৈরির কাজ। চালের গুড়া দিয়ে আলপনার রং তৈরি করা হয়। চালের গুড়া পানির সাথে মিশিয়ে হাত দিয়ে বাড়ির উঠানে নানা রকম নকশা করা হয়। কখনো ফুল আবার অন্য নকশাও আলপনা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। সেখানে ঘটে রাখা হয়েছে আমপাতা ও জবা ফুল। বাড়ির সবাই মিলে আলপনা তৈরির পর সন্ধ্যায় চলে পিঠা তৈরি। খোলা হলো পিঠা বানানোর মাটির হাড়ি। খোলা দিয়ে পোড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিন। তিনদিন ধরে পিঠা তৈরির উৎসব চলে।  

সংক্রান্তির দিনে সকালে পিঠা-পুলি, পায়েস, দই-চিড়া, তিলু-কদমা আর নকুল-বাতাসার পাশাপাশি বিভিন্ন ফলমূলের আয়োজন ও হয়েছে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও আত্মীয়সহ প্রতিবেশীর বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। সকাল থেকেই বাড়িতে বাড়িতে চলছে পিঠা তৈরির প্রস্তুতি। 

সংক্রান্তি বিষয়ে একটু বলতে হয়। দুই অয়নে এক বছর হয়। পনের দিন-রাতে এক পক্ষ, দুই পক্ষে এক মাস, ছয় মাসে এক অয়ন আর দুই অয়নে এক বছর হয়। মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় এই ছয় মাস উত্তরায়ন কাল এবং শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ ও পৌষ এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন কাল। সেজন্য আষাঢ়ের সংক্রান্তিতে দক্ষিণায়ণ এবং পৌষ সংক্রান্তিতে উত্তরায়ণ শুরু হয়। যে সময় অয়ন ভেদে সূর্যেরও দিক পরিবর্তন হয়। উত্তরায়ণে সূর্য দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে প্রসারিত হয়। 

সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন করা। সূর্যাদির এক রাশি হতে অন্য রাশিতে সঞ্চার বা গমন করাকে সংক্রান্তি বলা হয়। বাংলা পঞ্জিকা মতে প্রতি মাসের শেষ দিন সংক্রান্তি। পৌষ মাসের শেষ দিন পৌষসংক্রান্তি নামে পরিচিত। পৌষসংক্রান্তি মূলত নতুন ফসলের উৎসব এই দিনটি ‘পৌষ পার্বণ’ নামে উদযাপিত হয়। মকরসংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।  পুরানে বলে, সেকালে ধানই ছিল ধন। ধানের দেবী আর ধনের দেবী ছিল অভিন্ন; ধান্যলক্ষ্মীই ছিল ধনলক্ষ্মী।

সংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি একটা ফসলী উৎসব, যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয়। ভারবর্ষে এই উৎসবের অ লবেদে নানান বৈশিষ্ট্য চোখে পরে। এছারা মেয়াদও আলাদা হয়ে থাকে, কোথাও চারদিন পর্যন্তও উৎসব চলে। বাংলায় পৌষ সংক্রান্তি, তামিলনাড়ুতে পোঙ্গল, গুজরাতে উত্তরায়ণ, অসমে ভোগালি বিহু, কর্নাটকে মকর সংক্রমণ, কাশ্মীরে শায়েন-ক্রান্তি এমন নানা নামে এই একই উৎসব পালন করা হয়। 

পরের দিন, পহেলা মাঘ এর দৃশ্য ঢাংমারীতে অন্যরকম। সব মানুষ বনের দিকে ধাবিত হয়। কারন আজ বনবিবি পূজা। বনবিবি বন্ধনা করতে হয় বনের মাঝে গিয়ে। 

সকাল থেকেই ঢাংমারী গ্রামে সাজ সাজ রব। ট্রাক্টর দিয়ে বানানো গাড়িতে করে ছেলে-মেয়েরা এদিক ঐদিক যাচ্ছে। যাওয়া মানে গ্রামের এই মাথা থেকে ঐ মাথা। গ্রামের পাশ ঘেষে আছে বেড়িবাঁধ এই বাধই তাদের সম্বল। সড়কের দুই পার্শ্বে কিছুক্ষণ পর  পর অসংখ্যা অস্থায়ী মন্ডপ সাজানো হচ্ছে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই গ্রামের মানুষ পূজার তৈয়ারি শুরু করেছে। প্রতি বাড়িতে চলছে পায়েস রান্না কাজ। এছারা প্রতিটা মন্ডপেই চাল, চিনি, দুধ নিয়ে হাজির হচ্ছে ভক্তকুল। 

প্রতিমা বানায় অনেকে। যেমন খুলনা চারুকলার সমীর দেওয়ান চৌধুরী বাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজ করছে এখনো। চলছে বনবিবির ঠোটে লাল রং মাখার কাজ। একটু পরেই আনা হবে মন্ডপে। মন্ডপগুলো সাজানো হচ্ছে গোলপাতা আর কেওরা পাতা দিয়ে। প্রতিটা মন্ডপের পার্শ্বে আলীরঘর নামে একটা ছোট বেদি তৈরি করা হচ্ছে। গিয়ে বসলাম গ্রামের শেষ মাথার মন্ডপে। এক সময় একে একে প্রতিমা এনে স্থাপন করা হলো মন্ডপে। 

বেলা শুরু হলেই স্থাপিত মন্ডপে শুরু হয় পুঁথি পাঠ। এর পর পূজার সাথে সাথে দেয়া হয় অঞ্জলি। মন্ত্রপাঠ, প্রসাদ বিতরণ ও মন্ডপে মন্ডপে প্রসাধ বিতরণ করা হয়। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মনোবাসনা পূর্ণ করতে প্রত্যাশা করেন। এছাড়াও দিনভর এ বনবিবি পূজা উপলক্ষে মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, মিষ্টি, ধুপ, ধুনো, খেলনা, চা বিস্কুট, শাখার দোকানসহ নানা ধরনের দোকান দিয়ে গ্রামীণ মেলা বসে সর্বত্র। হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত গ্রামের মূলসড়ক বা বেড়িবাঁধ। পূজা উপলক্ষে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ও নদীতে নৌ ভ্রমণে বের হন।

 

বিসমিল্লাহ বলিয়া মুখে ধরিনু কথন 

পয়দা করিনু যিনি তামাম আলম,

বড় মেহেরবান তিনি বান্দারো উপরে

তার ছানি কেবা আছে দুনিয়ার পরে।।

জীবজন্তু পয়দা কৈল রকম রকম

সবার প্রধান সেই করিল আদম,

কেহ দিবা নিশি পরে আতলস পরিয়া

ছায়ের করিয়া ফেরে চৌদলে চড়িয়া।।

———–

এক দেল হইয়া নাম লইয়া আল্লার

শোন কেচ্ছা বন বিবী জহুরা নামার,

বোন বিবি সা জংগলি ভাই ও বহিন

যেরূপে হইল পয়দা শোনহ মোমিন।।

এবরাহিম নামে এক আছিল ফকির

এক্কার বাসিন্দা করে আল্লার জিকির,

জওয়ানি উম্মরে করে ছিল সাদি কাম

কবিলা তাহার ছিল ফুল বিবি নাম।।

গৃহবাস করে সুখে খোসাল অন্তরে,

বেটা বেটি পয়দা না হইল তার ঘরে।।

———

বলে মেহাম্মদ মুনশী জনাবে সবার

ভুরসুট কানপুরে বসতি আমার,

ছেজদা শোকর মেরা দরগায়ে খোদার

খায়ের করিল আল্লাহ এ বাতে আমার।।

আমিকিছু নাহি জানি সায়েরি করিতে

এলেম না আছে মোর আলেফ বে পড়িতে,

ঐদিও লিখিনু কেচ্ছা খায়েস দোস্তের।।

দিন দুনিয়াতে আল্লা করেন খায়ের  

আল্লা পাক আমায় যদি তরান হাসরে,

আমি অতি গোনাগার খোদার দরবারে।।

হামেসা দরগার এয়ছা করি মোনাজাত

হাসরেতে পাই যেনো নবীর সাক্ষাত,

দখল না আছে মেরা এই এলমেতে

তারিয়া লইবে আপনার বুজুর্গিতে।।  

 

এই হলো

বনবিবি জহুরানামা

বা ধেনামৌলে ও দুঃখের পালা

 

পুরো পালা পড়তে শশী ভূষনের চার ঘন্টা লাগে। এই সময়ে তার আশপাশে চলে নানা কর্মযজ্ঞ। এক পার্শ্বে গাছের তিনটা লাঠি বিশেষ ভাবে পুতে তৈরি হয় চুলা। সেই চুলায় মাটির হাড়িতে রান্না হয় পায়েস। বড় – ছোট সকলে গোল হয়ে বসে পাঁচালি শুনছে। মন্ডপে আছে বনবিবি, শাহ জঙ্গলি, ধনা, মনা, গাজী কালু, দুঃখে ও দক্ষিণ রায়ের প্রতিমা। এই গ্রামের মানুষ তো বটেই দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে পূজায় অংশগ্রহণ করতে। প্রতি বাড়ির সামনে গোলপাতা দিয়ে বানানো হয়েছে গেট। ভক্তকুল সঙ্গে করে নিয়ে আসা প্রসাদ ও টাকা পয়সা রাখছেন বনবিবি আর গাজীর প্রতিমার সামনে।  

 

এক সময় পায়েস রান্না শেষ হয়। সেই পায়েস বনবিবিকে নৈবদ্য দিয়ে তবেই অন্যরা খেতে পারেন। 

লক্ষনীয় একটা বিষয় সারা গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় নৌকায় নদী পার হয়ে বনে যাওয়ার প্রবণতা। স্থানীয় প্রশাসন নিষেধ করেছে বনে যাওয়া। তবুও মানুষ যাচ্ছে। অনেকে মনে করেণ বনে না গেলে বনবিবি তুষ্ট হবেন না। প্রশাসনের নিষেধের কার হচ্ছে ঐ পারে গিয়ে রান্না-বারা ও চিপস, চানাচুর বিস্কুট খেয়ে প্যাকেট ওখানেই রেখে আসে, পরিবেশ দুষিত হয়। এছারা গত কয়েক বছর আগে বনে গিয়ে মেলামেশার ভিডিও করে সেই ভিডিও আবার ইন্টানেটে আপলোড করে দিয়েছিলো।    

সুন্দরবনের সঙ্গে ঢাংমারী গ্রামকে ঢাংমারী নদী বিভাজন করেছে। এই নদী ঢাংমারী বাসীর জন্য ঢাল স্বরুপ। কারন বাঘ মামা এই নদী পার হয়ে লোকালয়ে আসতে সাহস পায় না। আর যদি আসেও বানর আর অন্যান্য প্রাণীকুল মানুষ জাতিকে আগে ভাগে সাবধান করে দেয়।   

 

এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্র পড়া হয়-

এই মন্ত্রের নাম, নিদান

দয়া করো দরবেশ

রক্ষা করো খোদা

দোহাই আলি, দোহাই আলি

দোহাই আলি (তিনবার পড়তে হবে)

   

প্রতি বছরের পহেলা মাঘ সুন্দরবনের ওপর নিভর্রশীল বনসংলগ্ন লোকালয়ে বনবিবি’র পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ‘বনবিবি’ দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো সুন্দরবনজীবীর মনে ভক্তি, শ্রদ্ধা আর পূজার দেবী। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাণীশান্তা ইউনিয়নের ঢাংমারী গ্রামে ছিলো আমাদের এবারের মোকাম। 

বিষ ধ্বংশের মন্ত্র-

অদ্য কশ মোহম্মদের বানি

মোহম্মদের কলেমা দিয়ে

বিষ করলাম পানি

পদ্মার সাথে বিশ ভাটি দিয়ে যা। 

(সাতবার পড়তে হবে। )

 

কথিত আছে বহু বছর আগে সুন্দরবনের পাশের এক গ্রামের এক দরিদ্র মায়ের সাথে তার শিশু থাকত। শিশু ছেলেটির নাম ছিল দুঃখে। একদিন দুঃখে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে যান ধনে আর মনে নামের দুই মৌয়ালের সঙ্গে। যাবার আগে দুঃখের মা তাকে বলে দেন, ‘বনে আমার মতো তোর আরেক মা আছেন। কোনো বিপদে পড়লে তাকে ডাকবি।’

তখন সুন্দরবনে গাজী নামে এক আউলিয়া থাকতেন। আর দক্ষিণ রায় ছিল বাঘবেশী অপশক্তি। গাজীর সঙ্গে সখ্যতা ছিল দক্ষিণ রায়ের। এক রাতে দক্ষিণ রায় মৌয়ালী ধনে-মনের স্বপ্নে আসেন। দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর সম্পদ দেওয়ার লোভ দেখায় দক্ষিণ রায়। এর পরিবর্তে শিশু দুঃখেকে উৎসর্গ করার প্রস্তাব দেয়। অন্যথায় ধনে-মনের নৌকা ডুবে যাওয়া ও মধু না পাওয়ার ভয় দেখানো হয়। ধনে আর মনে ভয়ে দুঃখেকে পানি আনতে পাঠিয়ে নৌকা ছেড়ে লোকালয়ে ফিরে যায়।

দুঃখে ফিরে এসে মৌয়ালদের না পেয়ে, তার মায়ের কথামতো বনের মাকে স্মরণ করে। বনবিবি এসে দুঃখেকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং তাকে কুমিরের পিঠে ভাসিয়ে মায়ের কাছে ফেরত পাঠান। আর বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলি বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে ধরে বনবিবির কাছে নিয়ে যান। গাজী-দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির পক্ষ নেন। এমন নানা কাহিনীতে বনবিবিকে সুন্দরবনজীবী মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদা পেয়ে পূজিত হতে শুরু করেন। ১৪ শতকের প্রথমাধের্র দিকে দক্ষিণে সুন্দরবন ও পশ্চিমে হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের প্রতাপশালী রাজা মুকুট রায়। সুন্দরবনের বাঘের দেবতা হিসেবে পূজিত ব্রাহ্মণ দক্ষিণ রায় ছিলেন এই মুকুট রায়ের সেনাপতি। মুকুট রায়ের মেয়ে বনবিবি। হিন্দু-মুসলমান অধ্যুষিত সুন্দরবনের সবাই তাকে স্মরণ করে। তবে মুসলমানরা মনে করেন এই বনবিবি হলো গাজীর স্ত্রী। যার নাম চম্পাবতী। কাজেই তারা চম্পামাই বলে সম্বোধন করে থাকেন।  

সুন্দরবনে প্রবেশের আগে হাতজোড় করে বনবিবির পাশাপাশি গাজীর নামে দোহাই দিয়ে বনে প্রবেশ করেন সবাই। মুকুট রায়কে পরাজিত করে তার রাজ্য ও রাজধানী ছারখার করে তার কন্যা চম্পাবতীকে বিয়ে করেন গাজী পীর। পিতা জাফর খান গাজী বা শাহ সিকান্দার ছিলেন ত্রিবেনী ও সপ্তগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্তা। গাজী পীর এর বংশ পরিচয় পুঁথিতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

গোড়া বাজা গয়েপদি, তার বেটা সমসদি

পুত্র তার সাঁই সেকান্দার, 

তার বেটা বড়খান গাজী

খোদাবন্দ, মুলুকের কাজী

কুলযুগে তার অবসর বাদশাই ছিড়িল বঙ্গে

কেবল ভাই কালুর সঙ্গে, 

নিজ নামে হইলো ফকির।

বাল্যকালেই ফকির-দরবেশের সাহচর্যে আধ্ম্যাতিক সাধনায় উন্নতি লাভ করেন গাজী। পিতার ‍কাছে শাসন ক্ষমতা নিতেও অস্বীকার করেন তিনি। ইসলাম প্রচার শুরু করেন দক্ষিণ বঙ্গের যশোর-খুলনা অঞ্চলে। ধর্ম প্রচারে বাধা প্রাপ্ত হয়ে রাজা মুকুট রায়ের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় তার। মুকুট রায়ের স্ত্রী লীলাবতীর ৭ পুত্র। ১ কন্যা চম্পাবতী বা শুভদ্রা। তার রূপের খ্যাতি ছিলো জগৎজোড়া। এ নিয়ে পিতার গর্ব ছিলো সীমাহীন। কিন্তু গাজী তার প্রেমে পড়েন। পুঁথিতে বলা হচ্ছে-

বিধুমুখী চম্পাবতী কার কাছে আছে বসি

জ্বলিতেছে রূপ যিনি লক্ষ কোটি শশী।

হঠাৎ চম্পার রূপ নয়নে হেরিয়া

মূর্চ্ছিত হইয়া গাজী পড়িলো ঢলিয়া।

 

গাজী ছিলেন সংসার বিবাগী মানুষ। কার্যত মুকুট রায়ের কাল হয় জাতিবিদ্বেষ। ভাই কালুকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মুকুট রায়ের দরবারে পাঠিয়েছিলেন গাজী। কিন্তু মুকুট রায় তাকে বন্দি করেন। এরই জেরে লাউজানিতে মুকুট রায়ের সঙ্গে গাজী পীরের যুদ্ধ হয় ১৩৬৫ সালে। গাজীর দল যুদ্ধে জেতে। মুকুট রায় সপরিবারে আত্মহত্যা করেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র কামদেব ও চম্প‍াবতী বন্দি হন গাজী বাহিনীর হাতে। পরে ইসলাম গ্রহণ করে কামদেব হন পীর ঠাকুর। আর ভক্তদের অনুরোধে চম্পাকে বিয়ে করেন গাজী। গাজীর নামেই গড়ে ওঠে গাজীর হাট, গাজীপুর, গাজীর জাঙ্গাল, গাজীডাঙ্গা, গাজীর ঘাট, গাজীর দেউল, গাজীর খাল, গাজীর ঘুটো ইত্যাদি এলাকা। বনে গাজীকে প্রাণ ভরে স্মরণ করে বনজীবিরা।

সুন্দরবন এলাকার সমাজজীবন গ্রামপ্রধান। কৃষির জন্য, ফসল উৎপাদনের জন্য আর ইংরেজদের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য এক সময় সুন্দরবন কেটে লোকালয় করা হয়েছে। সমুদ্র, নদী-খাল আর বাদাবন দিয়ে পরিবেষ্টিত এ অ লের কৃষিজীবী, বনজীবী এবং জলজীবী মানুষরা প্রতিনিয়ত ঝড়-বন্যা, মারি-মড়ক এবং শ্বাপদ-শঙ্কুল প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। প্রাকৃতিক সম্পদই এখানকার মানুষের জীবনধারণের একমাত্র রসদ। তাই এখানকার শ্রমজীবী মানুষরা প্রকৃতিকে জয় করতে, প্রকৃতির দান গ্রহণ করার পথে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে, জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দেব-দেবী এবং পীর-গাজীদের ওপর নির্ভর করে।

দেবদেবী এবং পীর-গাজীদের কাছ থেকে এই মানুষরা যে শক্তি পায়, তাই দিয়ে সে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হিংস্র কুমির-কামট, বিষাক্ত সরীসৃপ এবং ভয়াল জঙ্গলের সব ভয়কে উপেক্ষা করার সাহস পায়। এই সাহসকে আমরা এক ধরনের হাতিয়ার বলতে পারি। দেবতার ধ্যান, জ্ঞান, পূজা, শিরণি, উরস, মেলা ইত্যাদির মাধ্যমে এই সাহস সুন্দরবনের মানুষেরা অর্জন করে থাকে। তাই এখানকার লোকধর্মে বিরল-বিচিত্র রূপ দেখা যায়। সুন্দরবনের দেবতারা একই সঙ্গে নানা ধর্মের লোকদের নৈবেদ্য পেয়ে থাকেন।

এখানকার মানুষেরা নিজ নিজ ধর্মের বাইরেও কিছু লৌকিক দেব-দেবী এবং পীর গাজীর আরাধনা করে থাকে। পালন করে বহু ব্রত বা নিয়ম-কানুন। প্রতিটি দেব-দেবীকে নিয়ে রয়েছে কিছু গল্প বা উপাখ্যান, যার ওপর ভিত্তি করে কাব্য, পুঁথি, গান ইত্যাদি রচিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

‘বনবিবি’। সুন্দরবনজীবীদের কাছে পূজিত এক নারীশক্তি। বনজীবী বিশ্বাসী জেলে, বাওয়ালি আর মৌয়ালদের সুরক্ষার দেবী তিনি । এই সুরক্ষা বনের বাঘ এবং বাঘরূপী অপশক্তি ‘দক্ষিণ রায়’ বা ‘রায়মণির’ হাত থেকে। যেমনটি পেয়েছিল সুন্দরবনের লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ শিশুচরিত্র দুঃখে, বহু শত বছর আগে। 

বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ এই অঞ্চলের যেসব স্থানে বনবিবির পূজা হয়, তার মধ্যে অন্যতম খুলনার দাকোপ উপজেলার বাণীশান্তা ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন ঢাংমারী গ্রাম। একটি খাল দিয়ে গ্রাম আর বনের সীমানা। এই গ্রামের পূর্ব ঢাংমারী সর্বজনীন বনবিবি মন্দিরের পুরোহিত শশীভূষণ মন্ডলের কাছ থেকে জানা যায় ১৮৯৬ সাল থেকে বনবিবির পূজা হয় এই তল্লাটে।

বনবিবি, গাজীপীর, বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়, বনদেবী নারায়ণী, সন্তান রক্ষক পাঁচু ঠাকুর ও পেঁচো-পেঁচি, কুমির দেবতা কালু রায়, 

বাদাবনের রক্ষক আটেশ্বর, জ্বরনাশক জ্বরাসুর, সর্পদেবী মনসা, জঙ্গল জননী বিশালাক্ষী, ভাঙ্গড় পীর, গ্রামজননী বিবি মা, পশুরক্ষক মানিক পীর, মাছের দেবতা মাকাল ঠাকুর। এমন সব ঐতিহাসিক ও পৌরানিক চরিত্রের রাজদরবার সুন্দরবন। কাজেই ভীত মানুষ রোগ-শোক-জ্বরা-আততাযীর হাত থেকে বাঁচতে অহরনিশি জপ করে এদের নাম।   

কাঁচা কাষ্ঠ, ফাটা হাড়ি

কেমনে ভাত রাঁধব আমি

বনবিবি মা, আমায় উপায় বল না

এমনই করে সুর করে গান গেয়ে বনদেবীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে সুন্দরবন সংলগ্ন বসতির মানুষ। বনদেবী, বনবিবি, বনদুর্গা, ব্যাঘ্রদেবী নানা নামে পরিচিত তিনি। হিন্দুদের কাছে তিনি দেবী, মুসলমানদের কাছে পিরানী। তাকে বলা হয় সুন্দরবনের রক্ষাকর্তী। মৌয়াল, কাঠুরে, বাওয়াল, জেলে সম্প্রদায়ের কাছে তিনি পরম আস্থার প্রতীক। সুন্দরবনের ৬০-৪০ ভাগ অংশ যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত, দুই অ লের মানুষের কাছেই সমান জনপ্রিয় বনবিবি। দক্ষিণবঙ্গের আবহমান সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা বনবিবিকে স্মরণ করে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ‘মা বনবিবির পূজা’। 

 

কাহিনী আরো পিছনে-

১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে আরবের মক্কা নগরীতে এক ফকির পরিবারে জন্ম নেন বনবিবি। তার বাবার নাম ইব্রাহীম বা বেরাহিম, মায়ের নাম গুলান বিবি। বেরাহীমের প্রথম স্ত্রী ফুলবিবির কোনো সন্তান না হওয়ায় চিন্তিত ছিলেন তারা। পরবর্তীতে ফুলবিবির অনুমতি নিয়ে গুলানবিবি বা গোলালবিবিকে বিয়ে করেন বেরাহিম। তবে শর্ত ছিল, ভবিষ্যতে ফুলবিবির একটি মনোবাসনা অবশ্যই তাকে পূরণ করতে হবে।

গুলানবিবি গর্ভধারণ করলে ফুলবিবি হিংসায় কাতর হয়ে গুলানবিবিকে গর্বজাতসহ সুন্দরবনের জঙ্গলে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে বিবাহকালীন শর্ত পূরণ করেন। কিছুদিনের মধ্যে জঙ্গলেই গুলানবিবির ঘর আলো করে জন্ম নেয় দুই সন্তান বনবিবি ও শাহাজংলি বা শাহ জংগলি। তাদের দেখাশোনার জন্য স্বর্গ থেকে পাঠানো হয় চার দাসীকে। বনবিবি সেখানে বড় হয় স্বর্গ দাসী রুপী, এক মাদী হরিণের কাছে। সাত বছর পর নিজের ভুল বুঝতে পেরে গুলানবিবিকে দুই শিশু সন্তানসহ মক্কাতে ফিরিয়ে নিতে আসেন বেরাহীম। কিন্তু বাবার সঙ্গে সুন্দরবন ছেড়ে মক্কায় যেতে অস্বীকৃতি জানায় বনবিবি। সুন্দরবনের মানুষ ও পশুদের সঙ্গে তার এমন হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিল যে, তাদের ছেড়ে বাবার সঙ্গে চলে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। বোনের টানে বনবিবির সাথেই জঙ্গলে রয়ে যায় শাহাজংগুলি।

একবার মসজিদে খেলতে গিয়ে বনবিবি ও শাহাজংগলি খুঁজে পায় দুটি জাদুর টুপি। এই জাদুর টুপিতে চেপে তারা ঘুরে বেড়ায় হিন্দুস্তানের আঠারো ভাটির দেশে। যা কিনা আদতে, হযরত জিবরাঈল (আ.) তাদের আঠারোটি দেশ ঘুরিয়ে দেখান ভাই-বোনকে। হিন্দুস্তানে পৌঁছে আযান দেন শাহাজংগলি।

বনবিবি ও শাহাজংগলি যখন সুন্দরবন সংলগ্ন আঠারো ভাটির দেশে পৌঁছান, তখন সেখানকার রাজা ছিল নিষ্ঠুরতার প্রতীক দক্ষিণ রায় বা রায়মণি। শাহাজংগলির সেই আযানের ধ্বনি কানে যায় দক্ষিণ রায়ের। তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে বন্ধু সনাতন রায়কে পাঠায় রাজা। সনাতন এসে দুই ভাইবোনের কথা জানালে নিজ সা¤্রাজ্য থেকে তাদের উৎখাত করতে উদ্যত হয় দক্ষিণ রায়। দক্ষিণ রায় নিজে যুদ্ধের ময়দানে যেতে চাইলে তার মা নারায়ণী তাকে থামিয়ে দেয়। নারায়ণী নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ  ঘোষণা করে। বনবিবি আর শাহাজংগলির সাথে ছিল অলৌকিক ক্ষমতা, কাজেই দীর্ঘযুদ্ধের পরে হার মানতে বাধ্য হয় নারায়ণী ও তার বাহিনী। তবে দয়াপরবশ হয়ে বনবিবি তার অর্জিত সাম্রাজ্যের অর্ধেকটা দান করে নারায়ণী ও তার পুত্রকে। নারায়ণীর সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সুন্দরবন অ লের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেয় বনবিবি, দক্ষিণ রায় রাজত্ব করে জঙ্গলের গহীন কোণে।

বনবিবি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম বায়ানুদ্দিন, মোহাম্মদ খাতের। তাদের দুজনের লেখায় বেশ মিলও পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে অমিতাভ ঘোষ তার ‘দ্য হাংগ্রি টাইড’ নামক পরিবেশবাদী উপন্যাসে এই ঘটনা দুটিকে ‘দুখে’স রিডাম্পশন’ বা ‘দুখের মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কথায় আছে, নানা মুনির নানা মত। ক্বেরাতুল হায়দার এক পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন বনবিবি আর কেউ নন, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর কন্যা ফাতিমা (রা)! তবে এই কথার কোনো প্রমাণ নেই। জঙ্গলে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের মুখে মুখে তিনি বনের যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাকারী বনবিবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পূজামণ্ডপে বনবিবির প্রতিমার সঙ্গে থাকে বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে, তার দুই চাচা ধন আর মন-এর প্রতিমা এবং দক্ষিণ রায় তথা ব্যাঘ্রমূর্তি। মন্ত্রপাঠ, নৈবেদ্য ইত্যাদি ধর্মীয় আচারাদির পাশাপাশি প্রসাদ ও শিরনি বিতরণ করা হয়। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ মনস্কামনা পূর্ণ করতে মানত করেন। ইচ্ছা পূরণ হলে পরবর্তী বছর পূজার দিনে মানত পূরণ করা হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ মেলা বসে অনেক স্থানে।

বনবিবির জহুরনামা পীরমাহাত্ম্যবিষয়ক  পাঁচালি কাব্য। দোভাষী পুথিকার মহম্মদ খান এর রচয়িতা। বনবিবি সুন্দরবনের অধিষ্ঠাত্রী কাল্পনিক পীরানি। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। মধ্যযুগীয় লোকসমাজ রোগ-শোক ও হিংস্র জীবজন্তুর প্রকোপ  থেকে বাঁচার জন্য এসব কাল্পনিক দৈবসত্তার পূজা করত, তাদের নিকট মানত করত এবং  শির্নী দিত। সেই ধারা এখনও বহমান।

বনবিবি সুন্দরবনের মউল্যা বা মধুসংগ্রহকারী শ্রমজীবীদের রক্ষাকর্ত্রী। গভীর বনে মধু ও মোম সংগ্রহ করতে যাওয়ার আগে তারা বনবিবির উদ্দেশে ক্ষীরাদি অন্নযোগে শির্নী দেয়। এতে বাঘ ও ভূতপ্রেতের ভয় থাকে না বলে তাদের বিশ্বাস, কারণ বনবিবি ওইসব অপশক্তির ওপর কর্তৃত্ব করেন।

বনবিবির কাহিনি শুধুই গল্প, না সত্য, তা নিয়ে বিভেদ আছে। তবে এই কাহিনির কিছু চরিত্র ইতিহাসে বর্তমান। আর এই ইতিহাসের উপাত্ত বনবিবির অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসীদের আরও সংহত করেছে বলে মনে করেন ভক্তরা।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণ রায়, বণিক ধোনাই ও মোনাই এবং গাজীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বনবিবির জহুরানামা নামে একটি বই উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, বনবিবি বেরাহিম নামে এক আরবদেশির কন্যা। বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতিনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সেখানে তাঁর গর্ভে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গুলী জন্ম নেন। দক্ষিণ রায় যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটির দেশের রাজা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় পরাজিত হয়ে সন্ধি করেন।

ইতিহাসের সঙ্গে লোককথার যতই অসংগতি থাক, বনবিবি দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো সুন্দরবনজীবীর মনে এখনো ভক্তি, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের স্তম্ভ হয়ে আছেন।

শিশু দুঃখের হাতে থাকে রুমাল ও লাটিম। পূজার থানগুলো প্রচলিত পূজার থানের চেয়ে আলাদা। বনবিবির থানে প্রসাদ রাখতে ব্যবহার করা হয় সুন্দরবনের আমুরগাছের পাতা। বনবিবির উদ্দেশে শাড়ি ও অন্য পূজিতদের উদ্দেশে দেওয়া হয় লুঙ্গি। নারীরাও বনবিবি পূজার পৌরোহিত্য করে থাকেন। সুন্দরবনের ভেতরের পূজায় শিরনি রান্না হলেও তা এপারে লোকালয়ে এনে কলার পাতায় বিতরণ করা হয়। বনজীবীদের বিশ্বাস, জঙ্গল এঁটো করলে বনবিবি রুষ্ট হন। এলাকার সবাই মনস্কামনা পূর্ণ করতে মানত করেন। বনবিবির উদ্দেশে ডিম ও মুরগি মানত করা হয় বেশি। ইচ্ছা পূরণ হলে পরবর্তী বছর পূজার দিনে মানত পূরণ করা হয়।

ঢাংমারী গ্রামের সরদারবাড়ি ও গাইনবাড়ি মন্ডপে নারীদের পৌরোহিত্য করতে দেখা যায়।

কল্পকাহিনি বা সত্যি যা-ই হোক না কেন, সুন্দরবনজীবীদের কাছে বিশ্বাসের আরেক নাম বনবিবি।

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য বনবিবি পূজা। বননির্ভর জনগোষ্ঠীর আবহমান সংস্কৃতির এক অনবদ্য বিশ্বাসের সংস্কৃতি হল মা বনবিবির পুজা। মা বনবিবিকে নিয়ে রচিত দক্ষিণ বাংলার অতি জনপ্রিয় পালাগান ‘দুখে যাত্রা’ তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

গুল ও হুঁকো | স্বপ্নময় চক্রবর্তী

Thu Jun 18 , 2020
গুল ও হুঁকো | স্বপ্নময় চক্রবর্তী 🌱 গুল নজরুলের গানে শত গুল আছে। বারবার গুল। ফার্সিতে গুল মানে গোলাপ। গুলবাগিচার বুলবুলি আমি রঙিন প্রেমের গাই গজল…। বাংলায় গুল মানে মিছে কথা বা বাড়িয়ে বলা কথা। আজগুবি কথাও গুল। গুল মারিস না পরে গ্যাস দিসনা এ  রূপান্তরিত হয়েছে। বাজে কথা অর্থে […]