গুল ও হুঁকো | স্বপ্নময় চক্রবর্তী

গুল হুঁকো | স্বপ্নময় চক্রবর্তী

🌱

গুল

নজরুলের গানে শত গুল আছে। বারবার গুল। ফার্সিতে গুল মানে গোলাপ। গুলবাগিচার বুলবুলি আমি রঙিন প্রেমের গাই গজল…। বাংলায় গুল মানে মিছে কথা বা বাড়িয়ে বলা কথা। আজগুবি কথাও গুল। গুল মারিস না পরে গ্যাস দিসনা এ  রূপান্তরিত হয়েছে। বাজে কথা অর্থে কেন গুলমারা শব্দটা এলো সেটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আদি কলকাতায়। ছোটবেলায় মা-ঠাকুমাদের গুল দিতে দেখেছি। সে গুল হলো জ্বালানি গুল। কয়লা ভাঙতে গেলে কিছু কয়লা গুঁড়ো হয়ে যেত। সেই গুঁড়ো কয়লা মাটি, গোবর ইত্যাদির সঙ্গে জল দিয়ে মেখে হাতে পাকিয়ে গোল গোল বল বানাতেন, তারপর রোদ্দুরে শুকিয়ে নিতেন। কয়লা বাঁচানোর জন্য গুল ব্যবহার করা হতো। মানে ওইটা কয়লার ভেজাল। ভাবতাম কথার ভেজালকেও তাই গুল বলা হচ্ছে। আবার গুলটাতো হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গড়ে নিতে হয়। এইযে পাকানো, সেটা যেন কোন ঘটনাকে অতিরঞ্জন করার মতোই। গুল পাকানো থেকে গুলমারা শব্দটি এসেছে ভাবতাম। আরো পরে দেখলাম গুলের উৎস খুঁজছে আমাদের আরো পুরনো দিনের কলকাতায় ফিরে যেতে হবে।

প্রাচীন কলকাতায় যে সমস্ত নেশা প্রচলিত ছিলো তার অন্যতম হলো গুলি। যারা গুলির নেশা করতো তাদের বলা হতো গুলিখোর। গুলি তৈরি হতো আফিম দিয়ে। পেয়ারা পাতা কুঁচি কুঁচি করে নিয়ে শুকনো খোলায় কড়কড়ে করে নেয়া হতো। আফিম গলিয়ে পেয়ারা পাতার গুঁড়ো মিশিয়ে ছোট ছোট গুলি পাকিয়ে নেয়া হতো। গুলি খাওয়া হতো বিশেষ এক ধরনের হুঁকো-কলকেয়। গুলি  খাবার হুকো নলচের নাম ছিলো তোড়জোড়। এটা তৈরি করা বেশ ঝামেলার ব্যাপার ছিলো। তোড়জোড় এখনো ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করা অর্থে রয়ে গেছে। যেমন- বিয়েবাড়ির তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো কিংবা সামনে নির্বাচন, বোমা বানানোর তোড়জোড় চলছে। গুলি সেবনের পর লোকজন আজগুবি কথাবার্তা বলতো। যেমন- আমার ভায়রার চন্দননগরের বাড়ির পুকুরে নাইতে গিয়ে ডুব মারলুম, অমনি শুনি জলের ভিতরে গীতা পাঠ হচ্ছে। যতবার ডুব মারি ততবার গীতা শুনি। ও বাড়িতে গেলে খুব পুন্যি হয়।

গুলির দোকান ও খাওয়ার জায়গাকে বলা হতো গুলির আড্ডা। পালা পার্বণে খুব ভালো করে সাজানো হতো। গুলি খাওয়ার পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করতো গুলি খোরদের। তাই গুলির দোকানের পাশে কদমা, বাতাসা ইত্যাদির ছোট দোকান থাকতো। ত্রৈলোক্যনাথের নয়ন চাঁদের ব্যবসায় দেখি নয়নচাঁদ গুলি খেয়ে চিনির জলে ভেজানো শোলা চুষছে। অনেক গুলিখোর আবার হাঁটুতে চিটে গুড় লাগিয়ে রাখতো। গুলি খেয়ে উবু হয়ে বসতে হয় এবং টান মারার পর হাঁটুটা চ্যাটে নিলেই হলো। ওটাই চাট। শ্রদ্ধেয় গবেষক অরুন নাগ মশাই সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গম্ভীরা গান উদ্ধার করেছেন। ওখানে গুলি সংক্রান্ত কথা আছে। মালদহের ওই অঞ্চলে গুলিকে বলা হয় মদত। গানটার কিছু অংশ-

আমি প্রণাম করি, মদত প্রভু বাঞ্ছা কল্পতরু
তোমাকে ভজে মুখটি বাঁদর পুটকি হলো সরু
প্রভুর সিংহাসনটি আনকা হাঁড়ি কানকা ভাঙ্গা গলা
তাতেই হরনা হুক্কা কেমন শোভা ব্রজের বালা…
ইত্যাদি।

বলা হচ্ছে গুলিখোর কেমন বাঁদরের মতো। গাল ভেঙ্গে গেছে। কোমর সরু হয়ে গেছে। আরো বলা হচ্ছে-
“নল যখন চুষি
কখন হাসি কখন কাশি
ভাবি কাজ কি গয়া কাশি
দয়াময়ী গুলিঠাকুর সাত পুরুষের গুরু।”

গুলিখোরদের দেখলেই চেনা যেতো। এদের গায়ের শিরা দেখা যেতো, চামড়া শুকনো। প্রায়ই চক্ষু বুজিয়া থাকে, নেশা ছুটিবার ভয়ে, আশঙ্কায়, সহজে চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া দেখেনা। গোলমালে ভারি বিরক্ত হয়। কেহ কথা বলিলে, আস্তে আস্তে… বলিয়া নিষেধ করে। যখন ইহারা চলিয়া যায়, পায়ের গোড়ালি উঁচু হইয়া থাকে। গুলি খেলে যে নানা রকম সমস্যা হয় সেটা ওরা বুঝেও ছাড়তে পারতো না। কবিগানে আছে-

“এ নেশা কুলের ছেলে, আগলে রাখা, এয়ো রমণী।
বুকে চেপে ধরে আছি, ছাড়তে পারবো নি।
গুলি হল গয়াকাশি, পুরি বৃন্দাবন,
গুলি খেয়েই নেশা তীর্থে হোক না রে মরণ।”

আবার গুলিখোরদের গানে আছে, ( অরুণ নাগের সংগ্রহ করা)
“গুলিছাড়ি কেমনে বিনা মরণে,
সেইয়া কুলের কাটা যেন জড়িয়ে ধরেছে বসনে
একবার মনে করি তোড়জোড় ফেলে দিয়ে
বসে থাকি বোবা হয়ে (কিন্তু) জাসু ভাজ্য স্বপনে”

জাসু ভাজ্য মানে হচ্ছে, পেয়ারা পাতার চূর্ণ দিয়ে আফিম মিশিয়ে গুলি তৈরি করা।

যারা যে নেশা করে, তারা সেই নেশাকে শ্রেষ্ঠ নেশা মনে করে থাকে। গুলিখোরেরা বলতো-
“মদ খায় পাপীতাপী
গ্যাজা খায় চোর
গুলি খায় যারা
তাদের বহু পূণ্যের জোর”

গুলির আরেকটা রূপ ছিলো, তাকে বলা হতো ফুট্টস। চিৎ হয়ে শুয়ে ফাঁটা বাঁশের সরু নল দিয়ে টেনে গুলিটা ফাটিয়ে দেয়া হতো। তখন প্রচুর ধোঁয়া বের হতো। যারা একটানে গুলি ফাটাতে পারত গুলিখোর সমাজে তাদের খুব কদর ছিলো। ফুটটুসের আখড়ায় হোগলার মাদুরর বিছানো থাকতো। এবং সেবা করার পর, কিছুক্ষণ বসার ক্ষমতাও থাকত না। ফুট্টুস আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গুলি বা জাসুও লুপ্ত। গুলির পরিবর্তে আফিম সেবনটা বেঁচে ছিলো আরো বহুদিন। বঙ্কিমচন্দ্রের অমর সৃষ্টি কমলাকান্ত ছিলেন আফিম সেবনকারী। কিন্তু কমলাকান্ত যে ধরনের কথা বলতেন, সেটা বেশ উঁচুদরের। কিন্তু গুলি খোরদের গুলিবাজি ছিল আজগুবি ধরনের। গুলিখোরদের পারস্পরিক সংলাপেই হল গুলিবাজি। যারা গুলিবাজি করত ওরাই গুলিবাজ। গুলি না খেয়েই গুলিবাজি করে ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদরা। গুলকে ওরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন।

হুঁকো

শান্তিনিকেতনে খোয়াইতে প্রতি শনিবার নানা শিল্পসামগ্রীর হাট বসে। অবশ্য ছোট করে প্রতিদিনই বিকেলে বসে। শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ের হাট থেকে একটা একতারা কিনেছিলাম। তারপরই একটা খেলো হুঁকো কেনার শখ হল। আমার শৈশবে দেখেছি বাগবাজার, শ্যামবাজার, শোভাবাজারের বাজারের ভিতর দু একটা দোকানে হুঁকো পাওয়া যেতো, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে কোম্পানি বাগানের কাছে নতুন বাজারেও চোখে পড়েছিল। সেদিন গেলাম কিনতে, – না নেই। পাওয়া গেল না। কোম্পানি বাগান মানে বিডন স্কোয়ার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে প্রথম বাগানটা করেছিল, সেটাই কোম্পানি বাগান। পরে সাহেবরাই বিডন সাহেবের নামে বিডন স্কোয়ার বানালেন, এখন রবীন্দ্রকানন। রবীন্দ্রকাননের উল্টো দিকের বিরাট বাজারটির নাম নতুনবাজার, যদিও ওটা অন্তত দেড়শো বছরের পুরনো।

নতুনবাজারে খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেলো এখানেও হুঁকো পাওয়া যায় না আর, বড়বাজারে হুক্কা পট্টিতে পাওয়া যাবে। অগত্যা বড় বাজারের সত্যনারায়ণ পার্কের কাছে গিয়ে হুক্কা গলির খোঁজ করলাম। ফলপট্টি পেরিয়ে হুক্কাগলি পেলাম। এক সময় ওখানে পরপর হুঁকোর দোকান ছিল নিশ্চয়ই, এখন ওখানে মূলত মসলার দোকান। খুঁজে পেতে একটা দোকান পেলাম যেখানে মাদুর, দড়ি, খসখস এসব বিক্রি হয়। ওরা জানালো হুঁকো  আছে, কিন্তু ভালো হবে না। এখন রাখিনা আর কেউ কেনে না। যা পেলাম তাই সই। নারকেলের মালাটা সুগোল নয় এবং ছোট। তা হোক। একটা যুগের স্মৃতি হিসেবে ঘরেতে থাক।

অথচ একটা সময় ছিলো, তখন হুঁকোর কি রমরমা। সমস্ত গেরস্ত ঘরে একাধিক হুঁকো থাকতো। স্বামী বিবেকানন্দের বাল্যকালের গল্পটা তো সবাই জানি। তথাকথিত নিচু জাতের জন্য বরাদ্দ হুঁকোটা টানতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। তার কৌতুহল ছিলো জাতটা কিভাবে যায় সেটা দেখবেন। কোন বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের  প্রথমটাই হলো হাতে হুঁকো ধরিয়ে দেয়া। যার হুঁকো দেখেন নি, তাদের বলি-

একটা নারকেলের মাথার বাইরেরটা বেশ পালিশ করে দুটো ফুটো করে নিতে হয়। ভিতরের শাঁসটাকে বের করে নিয়ে বড় ফুটো দিয়ে একটা কাঠের নল ঢুকিয়ে দেয়া হয়, যার মাথায় থাকে কলকে। কলকে তে টিকা লাগিয়ে গুড় তামাকের মিশ্রন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে হয়। নারকেলের মালাটি জলে ভরা থাকে। ছোট ফুটো দিয়ে টানলে তামাকের ধোঁয়া জলের ভিতর দিয়ে কিছুটা প্ররিশ্রুত হয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে।

হুঁকো হল সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য। উচ্চস্তরের মানুষদের জন্য গড়গড়া, আলবোলা ইত্যাদি। পদ্ধতিগত ব্যবহারটা এমনই। নারকেল মালার পরিবর্তে পেতল, তামা বা কাসার পাত্র। এবং সঙ্গে একটি নল। হুঁকোর নারকেল মালায় মুখ দিয়ে টানতে হয়, গড়গড়ায় শুয়ে, বসে, আরাম করে নলে মুখে লাগিয়ে যেতে পারে। এই গড়গড়া নবাবদের কাছ থেকে অর্জন করেছিলেন সাহেবরা। অনেক সাহেব সুরাই গড়গড়ায় ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন, এমনকি মেম সাহেবরাও।

হুঁকো বা গড়গড়া খাবার আদর্শ সময় ছিল লাঞ্চ শেষ হলে। ভোজন শেষ হলেই বেহারা তোয়ালে নিয়ে এবং হুঁকোবরদারেরা হুঁকো বা গড়গড়ার নলের শেষ প্রান্ত নিয়ে সাহেবের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতো। আভিজাত্যের মাপকাঠি ছিল গড়গড়ার পাত্রটি। সোনা বাঁধানো রুপোর গড়গড়া ছিলো একনম্বর।
রুপার দু’নম্বর। রুপার রিং দেয়া তামা তিন নম্বর। নল গুলো অনেক লম্বা ছিল। হুঁকোবরদারেরা নলের মাথা ধরে সাহেবদের পিছনে পিছনে ঘুর তো, সাহেব পায়চারি করতে করতে, নাকি সোফায় বসে, নাকি আধশোয়া হয়ে ধূম্র সেবন করবেন হুঁকোবরদারেরা কি করে জানবেন। সাহেব যখন বাইরে যেতেন, হুঁকোবরদারেরদেরও সাজ সরঞ্জাম নিয়ে সাহেবের সঙ্গে যেতে হতো।

মেম সাহেবরা প্রথমদিকে তামাকের গন্ধ সহ্য করতে পারতেন না, কিন্তু ক্রমশ তেনারা প্রেমে পড়ে গেলেন। অনেক মেমসাহেব সাহেবদের সামনেই ধূম্র সেবন করতেন, কিন্তু তাদের আলাদা নল থাকতো। পার্টিতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা নলের ব্যবস্থা রাখতে হতো। নলেনলে জড়াজড়ি হয়ে গেলে গৃহস্তের বদনাম হতো। একটা বিশেষ গড়গড়া ছিল যেটা চারটি করে নলের সংযোগ করা যেতো। এবং কলকেতে আগুন এবং তামাকের ঘাটতি পড়লেও গেরস্তের অকল্যাণ হতো। হুঁকোবরদারদের মধ্যে একজন সরদার বরদার ছিলো। সরদাকে কলকে এবং আগুনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হতো। হুঁকো, সত্যি বলতে কি অনেক বেকারদের চাকরি দিয়েছিলো। হুঁকোবরদারদের সংখ্যা ছিলো বেয়ারাদের ঠিক পরেই।

আরব, পারস্য এসব দেশে নারকল নেই, তাই নারকল মালার হুঁকো হতে পারলো না। অগত্যা ধাতব পাত্র, সেখানে জলভরা থাকতো। জলের পরিবর্তে নবাব-টবাবরা গোলাপজল দিতো। গোলাপজলের ভিতর দিয়ে সুগন্ধি তামাকের ধোঁয়া প্রবাহিত হতো, যার নিকোটিন বেশ কিছুটাই জলে শোষিত।

আমাদের শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, সমরেশ সবাই হুঁকোটানা মানুষের গল্প লিখেছেন। আমি আমার কোন চরিত্রের মুখেই হাতে হুঁকো ধরাতে পারিনি। তবে ঝড়েশ্বর, নলিনী বেরা ধরিয়েছেন। ওরা গ্রামের মানুষদের নিয়ে অনেক লিখেছেন কিনা…
কিন্তু গ্রাম থেকেঝ হারিয়ে যাচ্ছে হুঁকো। আমি দত্তপুকুর, বনগাছিয়া, জামুরিয়া,  কোন হাটেই হুঁকো দেখিনি। কিন্তু সুকুমার রায় লিখেছিলেন,

“হুঁকোমুখো হ্যাংলা
বাড়ি তার বাংলা

বাঙালির কত কি কি গিয়াছে, হুকাও।”

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য | কাজী নজরুল ইসলাম

Mon Jun 22 , 2020
বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য | কাজী নজরুল ইসলাম 🌱 বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্যের দিকে একটু ভাল করে দেখলে সর্বাগ্রে চোখে পড়ে তার দুটি রূপ। এক রূপে সে শেলীর Skylark-এর মতাে, মিল্টনের Birds of Paradise-এর মতাে এই ধূলি-মলিন পৃথিবীর ঊর্ধ্বে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে, তার চরণ কখনাে ধরার মাটি স্পর্শ করে না; কেবলি উর্ধ্বে- আরাে […]