কবিতাগুচ্ছ | রুবাইয়াৎ আহমেদ

কবিতাগুচ্ছ | রুবাইয়াৎ আহমেদ

🌱

এবং এরপরও আমরা স্মরণ করবো যে

 

এক.

এবং এরপরও আমরা স্মরণ করবো যে, মানুষে মানুষে প্রেম ছিল, ভালোবাসা ছিল, নধর শীতে মানুষ পরিপক্ক খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে ওম পোহাতো সূর্য ডোবার কালে। বাছুরের চোখ বাঁচিয়ে দোয়ানো দুধ নাক ডুবিয়ে পান করতো যে শিশুটি, মেলামিনের রহস্য ভেদ তখন তার প্রয়োজন ছিল না। আমরা দেখবো ফরমালিনে ডোবানো পাথরচোখা মাছ, আমাদের মনোরাজ্যের জলমহালে হাজারো রূপার ঝিলিক তখনো বংশগতির ধারায়। এক একটি আপেল কিংবা হলদে-সবুজ কলার আবডালে কাক ফাঁকি দেয়া সুপুষ্ট রসালো আম, ধূলোর ঝালরে ঢাকা। আমরা স্মরণ করবো, আমরা স্মরণ করতে থাকবো, আমাদের স্মরণের ওপারে অজস্র দীর্ঘশ্বাস, কিছু সুখস্মৃতি বয়ে আনবে চিরকাল। আমাদের চারপাশজুড়ে থাকবে রবিবাবুর গুরুগম্ভীর বিশাল ছায়া, আমাদের কিছুতেই বিস্মৃত হতে দেবে না ভাষার মাধুর্য অথবা অবিরল সুরের মুর্চ্ছনা। আমরা খুঁজে ফিরবো, কাঁদবো, আমাদের শিকড়ের টানে উঠে আসবে জল না হয় রক্ত। এবং এরপরও আমরা স্মরণ করবো, স্মরণ করবো তো!

 

দুই.

এবং এরপরও আমরা স্মরণ করবো যে, আমাদের নিজস্ব একখণ্ড ভূমি ছিল। এখানে সামান্য কৌশলে মাঠ ভরে যেতো সোনালি আলোয়। ছিল সমুদ্রগামী অগণিত নদী, খাল-বিল, পুকুর নিচু জমি। অঝোর বর্ষায় মন পবন, সমুদ্রের ছোট মেয়ে হাওড় তখন যেত নায়র ডিঙ্গাপোতা, হাকালুকি, টাঙ্গুয়ার কত শত জলের মহাল। দিগন্তজুড়ে ছোট-বড় পাহাড় আর তার গায়ে তরুণ শ্রামণিকদের পদচ্ছাপ কালের গহ্বরে। আমাদের মনে হবে, আমরা মনে করবো যে, বুদ্ধের  স্তোত্র এই ভূমে ভেসে গেছে রক্তস্রোতে, সনাতনী তলোয়ারে মানুষে মানুষে বিভাজন এঁকে দিয়ে। ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দে উড়ে আসে অচিন দর্শন, আপাত মুক্তির স্বাদে পড়ে নেয় পায়ে জন্মান্ধ বেড়ি। এবং এরপরও আমরা স্মরণ করবো যে, এই ভূমে ‘মা’ ছিল প্রিয়তম মানুষের নাম, পিতা পরম ধর্ম, ভাই-বোন সেতো চিরকালের আরাধ্য অটুট সম্পর্কের অভিজ্ঞান। আমাদের মনে হবে, এখানে বিভাজন বিভাজিত ছিল না কখনো, এখানে বিভাজন জন্মেছে আমাদের লোভে, এখানে বিভাজন শিকড় গেড়েছে আমাদের স্বার্থের সারে, কী সম্পর্কে, শ্রেণীতে, ধর্মে, অর্থে অথবা সামাজিকতায়।   

 

কবি ও কবিতা

বেদনার নাম জপে

কবি হয় পীর;

কবিতাতো শোকভূক

আলোর শরীর।

 

প্রথার গ্রহণ

[কবি মাহবুব কবিরের ‘হত্যামুখর দিন’ কবিতাটি স্মরণে রেখে]

 

ঈদ এলে জেনে যাই

কি করে পশুদেহ হতে

ছাল ছাড়িয়ে নিতে হয়

কি করে ছালে লবণ মাখিয়ে 

পচনরোধে ব্যবস্থা নিতে হয়

 

ছাল ছাড়ানো আর

লবণ মাখানো দেখে

আমার ভেতরে

ছুরি চাকু আর দা-এর মাতম চলে

আমার পূর্ব পুরুষের কথা মনে পড়ে

 

প্রজন্ম

‘উবাই চোদরি হেম্মে যা

রায়জালা করিস না’

ক্ষেপে যায় বৃদ্ধ নানা

দা-তার-চটি যোগে

বেড়া বাঁধে শিল্পী

মালশা ঠাসা পুরনো হুঁকোয়

টান দেয় মসৃণ

সুরেলা ধ্বনি

তামাক গন্ধ, আহা!

অদূরে অবোধ শিশু

মনের আকাশে উড়ায়

রঙ্গিন ঘুড়ি।

ভেতরে দীর্ঘশ্বাস চেপে

কালের বৃদ্ধ হুঁকো ছেড়ে

লুঙ্গির গিঁটেতে খোঁজে

পাতার বিড়ি।

 

চোখ

চোখের দেখায় কি সব সত্য বুঝে নেয়া যায়

থাকে নাকি ভ্রান্তি আঁধার ডাকাতের হাতে 

আরো কিছু কথা 

নেপথ্য কারিগর।

জানি মৃত্যুর ভেতরে থাকে

অজস্র কান্নার কণা বেদনার মেঘ;

কিন্তু অনন্ত প্রশান্তির ঘুম, চিরনিদ্রা,

সেওতো ভিন্ন সূত্র সত্যের। 

জানিনা তো, দৃষ্টিসীমার মাঝে 

কতশত অদেখা রশ্মি জীবাণু জগৎ,

খুব নিবিড় হয়ে থাকে জীবনপ্রবাহে

আর অনুভবে।

তাই বলি, 

চোখ এক বহুরূপী দানবের নাম;

দেখা অদেখার মাঝে প্রকৃত মানব,

খুঁজে পেতে গড়ে নেয়,

যথাযোগ্য সত্য প্রতিমা।

 

সোনালি খোয়াব

কাঠিপিতা বেড়া হলে

হলে শিশুর তলোয়ার

তবু চলে;

কাঠিপিতা গোবরে আবরিত হলে

জ্বালানির খড়ি হলে

কেঁদে ওঠে প্রাণ।

আঁশমাতার বিছানো চুল

বেণীতে দড়ি, বিন্যাসে পরিধেয়;

আরো থেকে যায় হস্তশিল্পের অপার সম্ভাবনা।

বেড়ার উপাদান, শিশুর তলোয়ার,

দড়ি আর পরিধেয় তাদের সোনালি সন্তান;

অপার সম্ভাবনা সব, সোনালি খোয়াব। 

 

রঙের ভাসান

১.

দু’হাত দু’উরুর মাঝখানে চেপে

বসে আছে বিহ্বল বালিকা,

লাল প্রস্রবণ তার পা বেয়ে নামছে।

২.

জবাই করা মোরগটি তড়পাচ্ছে;

লাল লাল আনন্দে 

ভিজে যাচ্ছে চারপাশের ধূলো!

৩.

কিশোরী বধূটি দূরদেশে যাচ্ছে,

লাল শাড়িতে, আলতাতে,

তাকে প্রতিমার মতো লাগছে।

৪.

একটি উঁচু ঢিবি।

চারপাশে রক্তাপ্লুত ঢুলু ঢুলু চোখ।

ঢিবিটি লালসালুতে ঢাকা।

৫.

রাতের প্রথম প্রহরে 

ছোরাটি চালিয়ে দেয়া হয় লোকটির কণ্ঠে;

ইমাম হুসেন নয় বলে, গলা দিয়ে রক্ত ছুটতে থাকে।

৬.

পায়ের বুড়ো আঙ্গুল

তুলে নিয়েছে সিঁথির সিঁদুর;

আর লোকটি চিতার আগুনে পুড়ছে।

৭.

সাতটি কিংবা তিনটি উলুধ্বনিতে বুঝি,

এইমাত্র একটি শিশু জন্ম নিয়েছে,

সারাশরীর তার আঁঠালো রক্ত মেখে আছে।

 

স্বপ্ন

স্বপ্ন মুখে চেপে উড়ে চলে দ্রষ্টা

হয়তো কোথাও খসে যায় সে,

পাহাড়ে, পাথরে, জলে, মৃতের সারিতে;

আর স্বপ্ন, স্বপ্নেরা,

ঠিক ঠিক পৌঁছে যায় গন্তব্যে।

 

মৃত্তিকাখ্যান

যদি মাটি হই

কুপিয়ে অথবা খুঁড়ে লাগাও বৃক্ষ,

লাঙল, নিড়ানি কিংবা

আধুনিক প্রযুক্তযোগে ফলাও শস্য।

যদি মাটি হই

ফ্রেমের ছাঁচে ইট,

বেড়া আর দেয়ালের আয়ুষ্কামনায়

মেখে দাও দ্রুত।

যদি মাটি হই

কুমারের হাতে পড়ে

বাসন কোসন অতঃপর 

কারুময় কুটির শিল্প।

যদি মাটি হই

সারের সঙ্গে মিশিয়ে

যোগাও পুষ্টি বৃক্ষে, শস্যে

খড়ের কাঠামোতে সঁপে

গড়ো প্রতিমা।

যদি মাটি হই

মৃত, গলিত, নোংরা, বর্জ্যসব

ঢেকে দাও প্রলেপে আমার।

আমার ওপর ভিত্তি ঢেলে

সাজাও ইমারত

বুকের অভ্যন্তর হতে আনো খনিজ

আমাকে বিভাজনে, দখলে বাঁধাও যুদ্ধ।

যদি মাটি হই

নারী অথবা মায়ের উপমা করে

লেখ কবিতা।

যদি মাটি হই

তবে জেনো, আমার কোনো ভাষা জানা নাই।

 

পৃথিবী পুরাণ

বাবা যেন সূর্য

মা হলো চাঁদ;

তাদের কামনারূপ

পৃথিবী আমি।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বদনা বৃত্তান্ত এবং হাত ধোঁয়া কর্মসূচী  | ইমরান উজ-জামান

Thu Jun 25 , 2020
বদনা বৃত্তান্ত এবং হাত ধোঁয়া কর্মসূচী | ইমরান উজ-জামান 🌱 কাজলরেখা-রজতরেখার উপকূলের ফিরিঙ্গিবর তল্লাটে পীড়-মুরীদানের প্রচলন খুব। বছরে একবার ফসল কাটার মৌসুমে হাতি চড়ে পীড় সাহেব আসেন, মুরীদানের বাড়ি থাকেন কিয়ৎদিন। মুরীদানদের দেয়া ধান-চাল-টাকা-পয়সা এক সঙ্গে করে নিয়ে চুরাইন বিল সংলগ্ন মায়া তিমির চন্দ্রিকায় তার হুজরায় ফিরে যান।  শোনা যাচ্ছে […]
Shares