রেনেসাঁ-মানব আবুল ফজল | আল মাকসুদ

রেনেসাঁ-মানব আবুল ফজল | আল মাকসুদ

🌱

বংশকৌলিন্যের বিবেচনায় হতে পারতেন কাজী আবুল ফজল; কিন্তু তা হলো না। ইতিহাসখ্যাত কাজীদের খাতায় নাম লেখাতে পারেননি বলে আফসোসও ছিলো তাঁর।

‘…কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী ইমদাদুল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আকরাম হোসেন, ইত্যাদি কাজী নক্ষত্রমণ্ডলীতে আমার আর স্থানই হল না। আমার এক শিল্পী বন্ধু আছেন তিনিও কাজী আবুল কাসেম। হায়, আমি আর ইহজন্মে কাজী আবুল ফজল হতে পারলাম না।… (রেখাচিত্র, আবুল ফজল ২০২০ : ২৮, বাতিঘর সংস্করণ)। 

 

ইতিহাস তবে বঞ্চিত করেনি তাঁকে। হলেন মোহাম্মদ আবুল ফজল-কিন্তু তাতেও ইতিহাসের ভবিষ্যৎ রেখাচিত্র নামটা গ্রহণ করলো না- মোহাম্মদ পড়লো বাদ; হলেন কেবল আবুল ফজল। এবং শেষ অব্দি এই-ই তার পরিচয় খ্যাতির মানবীয় নাম। জন্মেছিলেন আজকের এই দিনে ১ জুলাই ১৯০৩ সালে। মধ্যবিত্ত পরিবারে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানা (বর্তমানে উপজেলা)’র কেঁওচিয়া গ্রামে। রোসাঙ্গ (আজকের রোহিঙ্গা) প্রভাবিত নাম। ছিলেন ইমামপুত্র। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় নির্বিকল্প ছিলো মাদ্রাসা। দারিদ্র্যহেতু জায়গির থাকাটা অনেকটা ছিলো অনিবার্যৃ । সেকালে অবশ্য পড়ালেখা করতে গ্রাম ছেড়ে শহরে এলে অনেক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তানদেরকেও হয়তো জায়গির না থেকে পড়াশোনা করা সম্ভব ছিলো না। ১৯২৩ সালে হাই মাদ্রাসা পাসের পর থেকে তার জীবন ঢাকা ও কলকাতাকেন্দ্রিক। 

পেয়েছেন রবীন্দ্র-নজরুল সান্নিধ্য। কবি জসীমউদদীন, কবি সুফিয়া কামাল, কবি আবদুল কাদির ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। মাদ্রাসা (পরে কখনো খুলনা জিলা স্কুল, চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুল, কৃষ্ণনগর কলেজ, কলকাতা, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম) শিক্ষক থেকে হয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯ এপ্রিল ১৯৭৩- ২৭ নভেম্বর ১৯৭৫) । 

নেতা বঙ্গবন্ধু চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন তার সাহিত্যকীর্তি তাঁকেও মুগ্ধ করেছে :

 

জনাব অধ্যাপক সাহেব,

আমার ছালাম গ্রহণ করবেন। আশা করি ছহি-ছালামতে আছেন।

সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত আপনার প্রবন্ধ ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আপনার সাবলীল লেখনী নিঃসৃত সৃজনশীল প্রবন্ধটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে অধিক সংখ্যক মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারলে নির্যআতিত মানুষের পরম কল্যাণ সাধিত হবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। প্রবন্ধটি আমি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করতে মনস্থ করেছি। আপনার অনুমতি পেলে কৃতার্থ হব।

আপনার স্নেহের

শেখ মুজিব

১৭/১১/১৯৬৯

 

চার বছর পর রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৫ এপ্রিল ফোন করে তাঁর খোঁজখবর নেন এবং একটি দায়িত্বগ্রহণের ইঙ্গিত দেন। তারপর ১৮ এপ্রিল ১৯৭৩ সরকারি আদেশপত্র লাভ করেন; ১৯ এপ্রিল ভিসি হিশেবে যোগদান করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

জীবনের বিচিত্র বাঁকে বাঁকে ঘুরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি মুসলমানের রেনেসাঁ-মানব। উদার ও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার শীর্ষে পৌঁছতে পেরেছিলেন প্রজ্ঞা, আদর্শ ও নীতিবোধের আলোয় । তিনি মানবতন্ত্রী। দূরকে দেখার এক অনন্য প্রজ্ঞাকে লালন করতেন তিনি। সাদাসিধে জীবনের মাঝে খুঁজেফিরেছেন জীবনের ললিতবোধ ও পরিশীলনকে। মুসলিম সাহিত্য সমাজ- নামক সংগঠন ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রগতির দীপিকাকে প্রজ্বলিত করেছেন স্বোপার্জিত সাহস ও দৃঢ়তায়। কখনো আপস করেননি অন্যায়ের সঙ্গে। 

তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা পেয়েছিলেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে; কিন্তু মাদ্রাসার অন্তরালে জীবনবোধের যে কূপমণ্ডুকতার বাস-তার সঙ্গে শিক্ষার্থী আবুল ফজলের দূরত্ব ছিলো যোজন যোজন। তাই বলে এই শিক্ষাকে তিনি পশ্চাৎপদ শিক্ষা বলতে চাননি। হয়তো উপলব্ধি করেছেন-এই শিক্ষাব্যবস্থারও প্রয়োজন আছে এই দেশে;- যার প্রমাণ পাই যখন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন ড. আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০) তার ‘আবুল ফজল : স্মৃতিকথা’- প্রবন্ধে :  

‘আমরা প্রায় একবাক্যে বলেছিলাম যে, অন্তত একটা স্তর পর্য্ন্ত দেশে একই ভাষার মাধ্যমে একই পাঠ্যসূচিতে শিক্ষাদান করা দরকার। অর্থাৎ বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল কিংবা হাইস্কুল ভিন্ন ভিন্ন স্কিমের মাদ্রাসা ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত নয়। শুধু অধ্যাপক আবুল ফজল আমাদের সঙ্গে একমত হননি। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। আমি অবাক হয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেব কিন্তু এখানেই থামেন নি। এ বিষয়ে তাঁর মতামত পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন এবং পরে ডক্টর কুদরাতি-এ-খুদার সভাপতিত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশনের কাছে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে চিঠি লিখে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার অনুরোধ করেছিলেন।… (মানবতন্ত্রী আবুল ফজল: শতবার্ষিক স্মারকগ্রন্থ ২০০৯ : ৫৯)।

লিখেছেন গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ ভ্রমণকাহিনি ও স্মৃতিকথা। তাঁর স্মৃতিকথা- রেখাচিত্র (১৯৬৫) এবং শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি (১৯৭৮) বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন ইতিহাস রাজনীতি ও সংস্কৃতির দলিল হিশেবে স্বীকৃত হবে সারস্বত সমাজের কাছে চিরকাল।   

শিক্ষাবিদ, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী আবুল ফজলের প্রতি আজকের এই দিনে আমাদের প্রাণের শ্রদ্ধাঞ্জলি!

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

তাঁহাদেরে আমি নমি | শামীম আজাদ

Fri Jul 3 , 2020
তাঁহাদেরে আমি নমি | শামীম আজাদ 🌱 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ ১০০ বছরে পড়লো। আজ থেকে ৫০ বছর আগে আমি শুনেছি ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন ছিলো। তখন কিভাবে আমাদের বাংলা বিভাগের শুরু হয়। সে সময় তা ছিল ‘সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ’। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী । ডক্টর মুহম্মদ […]
Shares