হাজারিবাগ | কামরান পারভেজ

হাজারিবাগ | কামরান পারভেজ

🌱

খলিল সর্দার মসজিদের সামনে এসে দাঁড়াতেই শুনছিল, খোকা , এই খোকা শোন..।

কেউ খুব স্নেহ ভরে ডাকছে। কিন্তু এতোকাল পর যখন রাস্তা ঘাটই সব অচেনা হয়ে গেছে, তখন কে খোকা বলে ডাকবে। একটু বিষ্ময় জাগে। সে দেখল রাস্তার বিপরীত দিকে একটা বন্ধ দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসে আছে একটা লোক।  লোকটার চোখে চোখ পড়তেই আবারও ডাকল- খোকা এদিকে এসো। ভরাট কন্ঠের প্রমিত ভাষায় উচ্চারণ।  গলির মত ছোট রাস্তাটা পার হয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করে, আপনি আমাকে ডাকছেন। আমার নাম তো খোকা না, আমার নাম রাইসুল। রাইসুল আহমেদ। ময়মনসিংহ থেকে গতকাল রাতে এসেছি।

 

লোকটা মাঝ বয়সী।  চোখে ক্লান্তির ছাপ যেন স্থায়ীভাবে লেগে গেছে। গতরাতের প্রচন্ড গরমে নিশ্চিই ভাল ঘুমও হয়নি। তাই হয়তো সকাল সকাল বাড়ির সামনের রাস্তায় বেঞ্চ পেতে বসে রয়েছে। মাথায় চুল কম। চুল আর দাঁড়ি মনে হয় গুনে গুনে ঠিক অর্ধেক কাঁচা আর পাকা। চোখ ভীষণ রকমের গভীর। কম ঘুমানোর কারনে কিছুটা লালও। রাইসুল যে বলেছে, সে খোকা নয়, এটা মনে হয় লোকটা একেবারেই শোনেনি। লোকটা শব্দ ছাড়া কিছুক্ষণ অস্বাভাবিক ভাবে হাসে।

 

লোকটা আবার জিজ্ঞাস করে, খোকা  তো অনেক বড় হয়ে গেছছো। অনেক স্মার্ট আর লেডি কিলার হয়েছো দেখছি। বেশ পটাপট ভাবে কথাগুলো বলে গেলে। এমন একটা পরিস্থিতিতে খুব বিচলতি হওয়ার মত ছেলে রাইসুল। কিন্তু ঘটনাটা খুব দ্রুততার সঙ্গে ঘটতে থাকায় সে বিচলিত হওয়ার সময়ও পায়নি। কাজেই মাথা ঠান্ডা রেখেই রাইসুল আবারও বলে, কিন্তু আমার নাম তো খোকা না। তবে আপনি কিছু বলতে চাইলে বলেন।

 

লোকটা বলে, তুমি এখন কি করছো ? রাইসুল বলে যে, সে এবার পর্দাথ বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স পরীক্ষা দিয়েছে। আসছে শুক্রবার সরকারি একটা চাকরির পরীক্ষা হবে ঢাকায়। মালিবাগে  একটা স্কুলে তার সিট পড়েছে। পরীক্ষার কয়েকদিন আগেই সে ঢাকায় চলে এসেছে, কয়েকদিন বেড়াবে বলে। রাইসুল এও বলে যে,  আপনাকে তো আমি চিনি না। মনে হয় আপনিও আমাকে চিনেন না। আমার বাড়ি ময়মনসিংহ। আপনার পরিচিত অন্য কোন মানুষের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন মনে হচ্ছে।

 

লোকটা  রাইসুলের দিকে তাকিয়ে হাত ইশারা করে কাঠের বেঞ্চের অবশিষ্ট অংশে বসতে বলে। রাইসুল বসে। লোকটা বলে, ঘুড়ির মাঞ্জা মারা সুতা দেখলে তুমি কি এখনো ভয় পাও খোকা?  আহারে!

রাইসুল ভীষণ চমকায়। চমকানোর তীব্রতায় বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পরে। ঘুড়ির মাঞ্জা দেওয়া সুতাকে সে ভয় পায়, এটা এই লোক কিভাবে জানল! মানুষে মানুষে কথা বলার এত এত বিষয় থাকতে মাঞ্জা দেওয়া সুতার বিষয় কেন এলো। গলা শুকিয়ে যাওয়া কন্ঠে রাইসুল প্রশ্ন করে আপনি কে? আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না এখনো। লোকটা আবারও হাতে ইশারা করে রাইসুলকে বসতে বলে। রাইসুল বসতে যাবে এমন সময় কাঠের বেঞ্চের পাশের লোহার একটা ছোট্ট গেট টং টং শব্দে খুলে যায়। শব্দটা মিলিয়ে যাবার আগেই একটা যুবতী মেয়ে বেরিয়ে আসে। মেয়েটার চুল খুব বেশিই এলোমেলো। মনে হয় ঘুম থেকে উঠে আয়না না দেখেই চলে এসেছে। মেয়েটা রাইসুলের দিকে না তাকিয়ে বলে, উনার মাথায় গোলমাল আছে। আপনি চলে যান। এরপর যুবতী মেয়েটা  লোকটার হাত ধরে গেটের ভিতরের দিকে নিতে থাকে।

 

পনের বছর পর রাইসুল আবারও হাজরিবাগ এসেছে। হাজারিবাগের যে পার্কটায় ২ টাকা ঘন্টায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত সে পার্কটা প্রথমে  খুঁজে বের করবে বলে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল । ভ্যাপসা গরমের সকাল ছিল। হোটেল

রেস্তোরাঁগুলোতে পরোটার তাওয়ার নিচের আগুনের শো শো শব্দ তখনও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ শুনতে পাচ্ছিল। হাজারিবাগে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা যেসব মানুষ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কাজে যায়, তাঁরা সদ্য গোসল করা ভেজা চুল আচঁড়ানো মাথায় সেকশন ২ এর দিকে হেঁটে যাচ্ছিল টেম্পো ধরতে। রাইসুুল ঘড়ি দেখল। সাড়ে আটটা। গরমের কারনে সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। তিনজনের বিছানায় সারারাত একটা স্যান্ড ফ্যান চলেছে। উপরে একটা সিলিং ফ্যানও ছিল। বাতাসে মনে হয়েছে একেকবার উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শরীরের ভ্যাপসা ঘাম একবারের জন্যও শুকায়নি।  ঘর থেকে বের হওয়ার মত সকাল হয়ে গেলে সে আর ঘরে থাকতে পারল না। সকাল সকাল গোসল করে সে বের হয়ে পরে। তখন পর্যন্ত শুধু চাচীই ঘুম থেকে জেগেছেন। তিনি ঘুম ঘুম চোখে ঘরের সামনে বারান্দায় বসে রুটরি জন্য আটা মাখছিলেন। রাইসুল বের হয়ে আসার সময় চাচী বলছিলেন, আব্বা অত সকালে কোথায় যাইতাছেন?

 

পনের বছর পর গতরাতেই প্রথম রাইসুল ঢাকায় এসেছে। মফস্বলের সরকারি কলেজ থেকে অর্নাস পরীক্ষা দেওয়ার পর চাকরির চেষ্টা শুরু করেছে। শক্রবার প্রথমবার সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষা দিবে। আম্মা বলল, অনেক বছর পর ঢাকায় যাবি। কয়েকদিন হাতে নিয়ে যাস। ছোটবেলায় যখন আমরা ঢাকায় থাকতাম, প্রত্যেক বিষ্যুতবার সন্ধ্যায় আমরা আপার বাসায় চলে যেতাম। হঠাৎ হঠাৎ কোন বিষ্যুতবারে আমরা না গেলে পরের দিন শুক্কুর বার বড় আপা আর দুলাভাই চলে আসত আমাদের বাসায়। তোকে আপা দুলাভাই খুব আদর করত। ঢাকায় গেলে আপার বাসায় ওঠবি।  রাইসুলের মনে পড়ে যায় বড় খালার বাসা ছিল তখন হাতিরপুলে। বাসার সামনের বড় রাস্তায় একটা লোহার চেয়ার তৈরির দোকান ছিল।

ঢাকায় কয়েকদিন থাকার মত আরও দুইটা জায়গা ছিল রাইসুলের।  মিরপুরে এক ফুফুর বাসা আর হাজারিবাগে গ্রাম সম্পর্কীয় এক চাচা। তিনটা অপশনের মধ্যে রাইসুল হাজারিবাগটাকে বেছে নেয়। পনের বছর আগে রাইসুলরা হাজারিবাগে থাকত।  একদিন সকালে গ্রাম থেকে রওনা দিয়ে সন্ধ্যার মুখে  হাজারিবাগের ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল তারা। বাড়িটা ছিল দুতলা। নিচতলায় তাদের পাশে ছিল আরও একটা পরিবার। দুই পরিবারের জন্য ছিল অভিন্ন বারান্দা। উপর তলায় থাকত বাড়ির মালিক এক বৃদ্ধা আর বৃদ্ধা। এ বাড়িতে কিছু দিন থাকার পর হাজারিবাগেই অন্য একটা বাড়িতে উঠেছিল তারা। সে বাড়িটাতে ছিল ঢাকাবাসের বাকি কয়েক বছর। ঘুড়ি উড়ানোর মাঞ্জা দেওয়া সুতাকে ভয় পাওয়া শুরু হয়েছিল সে বাড়ি থেকেই। 

 

রাইসুলরা চার ভাইবোন। স্বপরিবারে যখন ঢাকায় গিয়েছিল তখন বছরের মাঝামাঝি সময়। ঘোর বর্ষাকাল। সকাল দুপুর আর রাতভর বৃষ্টি হয়। জানালা দিয়ে দেখা যাওয়া ঘরের পেছনের গাছগাছড়ার ঝোপটা সবুজে ভরে উঠেছিল। বছর শেষ হলে তিন ভাইবোন স্কুলে ভর্তি হয়। রাইসুল কেজিতে, আর বড় ভাই ওয়ানে। বড় বোন ক্লাস ফাইভে। সবার ছোট বোন তখন সবে হাঁটতে শিখছে। বাবার ছিল সরকারি চাকরি। আর মা গৃহিনী। দুপুরের মধ্যে তিনজনই স্কুল থেকে বাসায় ফিরত। বাসায় ফিরলে মা তখনও রাইসুলকে গোসল করায়। তিনজনই মায়ের হাতে খাওয়ার বায়না করলে মা বড় একটা গামলায় ভাত মাখিয়ে তাদের খাইয়ে দিত। শেষ দুপুরে ঘরের সব কাজ সারা হলে মা চারজনকে ঘুমানের আদেশ দিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ত। বড় একটা খাটের উপর ফ্যান ঘুরত। ঘরের মেঝেটা এত চকচকে ছিল যে মনে হতো ওইটা  পৃথিবীর স্বর্গ। রাইসুলের দিনের বেলায় ঘুম  আসত না। ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকতো কিছুক্ষণ। মা ঘুমালে রাইসুল নি:শব্দে ঘর থেকে বের হয়ে পড়ত। তখন দ্বিতীয় বাড়িটাতে ভাড়া থাকত রাইসুলরা। একতলা বাড়ির ছাদে উঠার কোন সিঁড়ি ছিল না। হাজারিবাগে তখন এরকম একতলা অনেক বাড়ি ছিল। রাইসুল দেখেছে সেসব বাড়ির কিশোর ছেলেরা বাড়ির সীমানার দেয়াল দিয়ে ছাদে উঠে ঘুড়ি উড়ায়। রাইসুলও নিজের বাড়ির প্রাচীরের একটা অংশ দিয়ে ছাদে উঠার কায়দা রপ্ত করে ফেলেছিল। 

দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত পুরো হাজারিবাগে যেন কাউফিউ জারি করা নিরবতা নেমে আসত। দুপুরের খাওয়ার পর রাজ্যের আলস্য নিয়ে মানুষ বিছানা নিত। গরমের দিনগুলোতে ঘরের মেঝেতে শুয়ে রেডিওতে সিনেমার বিজ্ঞাপন শুনত অনেকে। পনের মিনিটের সিনেমার বিজ্ঞাপনে সংলাপের পাশাপাশি থাকত টান টান উত্তেজনার ধারা বর্ণনা। শেষটায় উপস্থপাক নিজেও যেন ভীষণ রকমের অবেগপ্রবন হয়ে কাহিনীর একটা গোলক ধাধা সৃষ্টি করতো। এমন এক অলস দুপুরে মা ভাই বোন ঘুমালে রাইসুল ছাদে উঠেছিল। মানুষের চেহারা চেনা যায় না- এমন দূরত্বের মুখোমুখি একটা ছাদে তিনটা ছেলে ঘুড়ি উড়াচ্ছিল। রাইসুল ছেলেদের দেখছিল। হঠাৎ করেই লাল রঙের একটা ঘুড়ি ক্রমশ নিচে নামতে থাকে। রাইসুল ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্রমশ ঘুড়িটা আরও নিচে নেমে আসে। রাইসুল ভাবে আরও নিচে নামলে সে সুতাসহ ঘুড়িটা ছিঁড়ে ছাদ থেকে পালিয়ে যাবে। একজনের ছাদে বা বাড়ির গাছগাছালিতে অন্যের ঘুড়ি পড়লে ছিঁড়ে নেওয়ার রেওয়াজ ছিল হাজারিবাগে। রাইসুলের চাওয়া মত লাল ঘুড়িটা হাতের কাছেই চলে আসে। ছিড়ে নেওয়ার জন্য সুতায় ধরতেই  ছেলেটা নাটাইয়ের কারসাজিতে হ্যাচকা একটা টান মারতেই ঘুড়িটা আবার নাগালের বাইরে চলে যায়। সুতার ধারে রাইসুলের ডান হাতের দুটো আঙুল অনেকটা কেটে যায়। ওই সময় চেহারা চিনতে পারার দূরত্বের ওই ছাদ থেকে ছেলেরা রাইসুলকে বোকা বানানোর আনন্দে হেসে উল্লাস করে। সেই থেকেই মাঞ্জা দেওয়া সুতায় তার ভয়। 

 

হাজারিবাগ পার্কটাকে দেখে হতাশ হয় রাইসুল। মনে হয় বুড়িয়ে যাওয়া জাতি সাপ। খোলস ছেড়ে দুপরের রোদে নিস্তেজ শুয়ে আছে। রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছা জানানো পোষ্টারে ছেঁয়ে আছে পার্কের চারপাশ । ভেতরে সুতায় বেধে পোস্টার টানানো হয়েছে। পার্কের গেটের সামনের রাস্তায় একটা রিকশা  সাইকেল সারাইয়ের দোকান। দোকানটা দেখেই বুঝা যায় সেখানে ঘন্টা চুক্তিতে সাইকেল ভাড়া দেওয়া হয় না। মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে শেষপর্যন্ত যখন হাজারিবাগের গ্রাম সম্পর্কীয় চাচার বাসায় থাকার কথা পাকাপাকি হয়, তখন থেকে পার্কটার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছে। কালেভদ্রেই আব্বা  দুই ভাইকে পার্কটাতে নিয়ে যেতেন। প্রথমবার যাওয়ার দিন রাইসুলের বড় ভাই ভাড়ায় সাইকেল চালালেও বাবা তাকে চালাতে দেয়নি। বাবা মনে করেছিল রাইসুল তখনও সাইকেল চালানোর মত বড় হয়নি। তাতে তার কোন আপসোস ছিল না। পার্কের ভেতর  ভাইকে কয়েক চক্কর সাইকেল চালাতে দেখেই তার ভাল লেগেছিল। কি বিশাল মনে হতো পার্কটাকে। এই পার্কেই প্রথম পায়ে প্যাড পরে ক্রিকেট খেলতে দেখেছে রাইসুল। কাঠের বল যখন ব্যাটে লাগত, সে কি আওয়াজ। সেই আওয়াজ আশেপাশে কোথাও প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়াত। রাইসুল ভাবে মাঠটা কি আসলে ছোট হয়ে গেছে, নাকি ছোট বেলায় মাঠটাকে বেশি বড় মনে হতো। এমন আগেও হয়েছে। 

মামার বাড়ির পাশে একটা পুকুরকে ছোট বেলায় সমুদ্রের মত বড় মনে হতো। মাঝে ক্লাস সেভেন থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত মামার বাড়ি যাওয়া হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার রাইসুল যখন মামার বাড়িতে যায় দেখে পুকুরটা খুব ছোট। সে অনেকের কাছে জেনেছে পুকুরটা আগেও এমনই ছিল।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাজারিবাগে ঘুরেছে সে। কিন্তু কোনভাবেই বুঝতে পারল না তারা কোন এলাকায় থাকত। কোন কিছুই আগের মত থাকার কথাও না। রাইসুলরা হাজারিবাগে প্রথম যে বাড়িটায় উঠেছিল সে বাড়ির মালিকের নাম ছিল আইয়ুব খান।  দুতলায় আইয়ুব খান আর তার স্ত্রী থাকতেন। তাদের সন্তানেরা কেউ থাকত না। আইয়ুব খানের মাথার সবগুলো চুলই ছিল পাকা। তারপরও মাঝে মাঝে দেখা যেত বাড়ির আঙ্গিনায় একটা বেতের চেয়ারে আধশোয়া হয়ে ছোট ছোট গরির ছেলে মেয়েদের দিয়ে মাথার পাকা চুল আনাত। আইয়ুব খান সেই আরামে চোখ বুজে থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়ত। পাড়ার ছেলেরা  তাকে ‘আইয়ুব খান বোম্বা লাঠি’ বলে খেপাত। আইয়ুব খান বোম্বা লাঠির কি মানে রাইসুল তা জানার আগেই বাড়িটা ছেড়েছিল। তবে এ কথা শুনে আইয়ুব খান উন্মাদের খেপত। 

একদিন বিকাল বেলা পাড়ার একদল ছেলে বাড়ির সামনের রাস্তায় দিয়ে যাওয়ার সময় ‘আইয়ুব খান বোম্বা লাঠি’ বলে মোটামোটি একটা মিছিলই করে ফেলে। রাইসুল ওই সময় বাড়ির গেটের সামনে দাড়িয়  ছেলেদের দেখছিল। মিছিলটি মিলিয়ে যাওয়ার পর রাইসুল দুতলার দিকে মুখ করে ছেলেদের নামে নালিশ কওে আইয়ুব খানকে বলেছিল, আপনাকে না বোম্বা লাঠি বলেছে। আইয়ুব খান ঘর থেকে বের হয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে রাইসুলের দিকেই পেপার ওয়েট ছুঁড়ে মেরেছিল।  অল্পের জন্য সেটা গায়ে লাগেনি।

পুরো হাজারিবাগ জুড়েই অসংখ্য গলি। সব গলি একই রকম লাগে। গলিতে গলিত প্রচুর বিরিয়ানির দোকান।  সকাল বেলায় এমনই একটা নির্জন গলিতে হাতে ডালপুরির ঠোঙ্গা নিয়ে  উদয় হত ভাই। সকালে ভাই ডালপুরি কিনতে যেত। ছোট থাকার অজুহাতে ডালপুরি কিনতেও সে ভাইয়ের সঙ্গে যেতে পারত  না। বাসার গেটের ভেতর থেকে গলা বের করে ডালপুরি নিয়ে ভাইয়ের ফিরে আসার জন্য সে অপেক্ষা করত। গলিতে গলিতে হেঁটে দুপুরে খুব ক্লান্ত ছিল রাইসুল। গ্রাম সম্পর্কীয় সেই চাচার বাসায় ফেরার সময় আবার খলিল সর্দার মসজিদের পাশের সেই

জায়গায়র সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই লোকটাকে তখন দেখা যায় না। লোকটা যে জায়গায় বসা ছিল সেখানকার দোকানটা তখন খোলা। রাইসুল দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে, লোকটার কথা জিজ্ঞাস করবে কি না। কিন্তু কি জিজ্ঞাস করবে ভেবে পায় না। দোকানের সামনে গিয়ে বলতে চায় দু প্যাকেট পটেটো চিপস দেন। কিন্তু চিপসের কথা না বলে, বলে দুটা বেনসন সিগারেট দেন। রাইসুল ভাবে চিপসের চেয়ে সিগারেট কেনাটা অনেক বেশি পরুষালী ব্যাপার। সিরাগেট দুটো হাতে নেওয়ার পর দোকানীর সঙ্গে রাইসুলের কাজ ফুরিয়ে যায়। দোকানটায় তখন কয়েকজন কাস্টমার। ভর দুপুরে দোকান বন্ধ করে বাসায় গিয়ে আয়েশ করার রেওয়াজ এখনও আছে। দোকানি কাস্টমারদের তাড়া দিচ্ছে। বারবার বরছে, দোকান এখন বন্ধ হয়ে যাবে। সবাই একটু হাত চালান। রাইসুলকে সিগারেট দুইটা দেওয়ার পর দোকানি চোখের ঈশারায় দ্রুত টাকা বের করতে বলে। রাইসুল কিছুটা থমথমে খেয়ে বলে, দু প্যকেট মিনি শ্যাম্পু দেন। দোকানি কিছুটা রিরক্ত হলেও দ্রুত শ্যাম্পু দেয়। রাইসুল দোকানে চোখ বুলায়। যেন মনে করতে চায় তার আর কি কি  লাগবে। দোকানি এবার রাইসুলের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাই চালু করেন। রাইসুল টাকা দিতে দিতে বলে, ভাই, সকালে  আপনার দোকান বন্ধ ছিল। তখন এখানে একজন মোটা মত মাঝ বয়সী লোক ছিল? দোকানি সিগারেট আর শ্যাম্পুর দাম রেখে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে এত দ্রুত অপেক্ষমান অন্য কাস্টামারের দিকে চলে যায়, যেন সে রাইসুলের কথা শোনেনি।

রাতে খেতে বসে হাজারো নালিশের মুখে পড়ে রাইসুল।  গ্রাম সম্পর্কীয় চাচার অনুযোগ, তুমি নাকি সাকলে নাস্তা না কইর‌্যাই বাইরে গেছিলা। হের পর নাকি বিকালে বাসায় আইস্যা দুপুরের খাওন খাইছো। রাইসুল কিছু না বলে মৃদু হেসে বিষয়টা এড়িয়ে যায়। ছোট্ট দুইটা ঘর। একটা ঘরে চাচা চাচী আর তাদের ছোট ছোট দুই মেয়ে। পাশের ঘরে চাচীর এক ভাই আর চাচার এক ভাগ্নে। সাবাই মিলে ঢাকায় ব্যবসা করে। সকালে ঘুম থেকেই উঠেই সবাই বের হয়ে যায়। রাতে ফিরে। রাতেই ভাল মন্দ রান্না হয়। সবাই এক সঙ্গে বসে খায়। মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে হয় খাবার আয়োজন। রাইসুলের জন্য খাটের উপর পাটি পাতা হয়েছে। খেতে খেতে চাচা গ্রামের অনেকের কুশল জানতে চায়। রাতের খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দই আর মিষ্টি। মনে হয় রাইসুলের জন্য আনা হয়েছে। দুপুরেও তার জন্য বিশেষ আয়োজন‌ছিল । চাচীর সামনে খেতে খুব লজ্জা লাগছিল। চাচী বারবার বলছিল, রান্না জানি কেমন হইছে, খাওয়া যায় কি না। দুপুরে খাওয়ার পর চাচার ভাগ্নে আর চাচীর ভাই যে ঘরটায় থাকে সে ঘরটা অন্ধকার করে শুয়েছিল ভর সন্ধ্যা পর্যন্ত। বারবার মনে হতে থাকে সকালের সেই লোকটার কথা। মাঞ্জা দেওয়া সুতাকে রাইসুল যে ভয় পায়, লোকটা কি করে জানে। নাকি মাথায় গোলমাল থাকার কারনে সবাইকে একই কথা বলে।

চাচা খাওয়া শেষ করে বারান্দার বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে আবারও ঘরে এসে খাটের এক মাথায় বসে। রাইসুলকে বলে, কই কই গেছিলা? রাইসুল বলে, তেমন কোথায় না। হাজারিবাগ পার্কের সামনে.. এমনি ..। পাপ্পুদের বাসা গেছিলা? অবশ্য পাপ্পুরে তো দিনে পাওয়া যায় না। রাতেচেম্বারে বসে। দুনিয়ার লোক আসে তদবির করাতে।  রাইসুলের মনে পড়ে, পাপ্পু ভাইয়ের কথা। একটু দূরের সর্ম্পকের ভাই। বয়সে তার চেয়ে বেশ বড়। ছোটবেলায় পাশাপাশি বাসায় থাকার সুবাধে অনেকবার দেখা হয়েছে। পাপ্পু ভাই নাকি এখন অনেক বড় নেতা। মন্ত্রী আর এমপিদের সঙ্গে প্রতিদিন উঠাবসা। চাচা আবারও বলে, তোমরা যে বাসায় থাকতা সেই বাসাটায় গেছিলা?হঠাৎ পুরোনো প্রেমিকার খোঁজ জানার মত রাইসুল চমকে উঠে। বাসাটা কি তাহলে আগের মতই আছে। সে চিনতে পারেনি। রাইসুল চাচার কাছে তার ব্যাপক কৌতুহল লুকিয়ে খুব দায়সারা ভাবে জিজ্ঞাস করে কোন দিকে বাসাটা? খলিল সর্দার মসজিদটা দেখছ না? মসজিদটার ছোট গেটটার উল্টা দিকেই তো। আমি যাই তো মাঝে মাঝে। ময়মনসিংহের এক লোক ভাড়া থাকে। আমাগোর মার্কেটেই ব্যবসা করে। দেখি কাইল একটু আগে আগে আইস্যা তোমারে নিয়া যামু নে।

চাচীর ভাই মাদুরে বাসে খাচ্ছিল। হাঠাৎ করে টেলিভিশনে চলতে থাকা সিনেমায় ডিপজলের সঙ্গে সঙ্গে ডায়ালগ আওড়ালে সবার দৃষ্টি পড়ে টেলিভিশনের দিকে। চাচাও হঠাৎ টেলিভিশনে মনোযোগ দিলে যেন রাতের খাবারের দৃশ্যের পর্দা নামে। রাতের  হাজারিবাগটা মফস্বল শহরের মত লাগে। বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের ঘুঁটির সঙ্গে ঘেঁষা ছোট্ট পান সিগারেটের দোকানের সামনে গায়ে গামছা জড়িয়ে ছোট ছোট জটলা চোখে পড়ে। হাঠাৎ হঠাৎ খুব ক্লান্ত শরীরে দুয়েক জনকে হেঁটে আসতে দেখায যায়। তারা দিনের কাজ করে বাড়ি ফিরছে।  

চাচীর ভাই আর চাচার ভাগ্নে ঘুমিয়ে পড়লে খুব নি:শব্দে বারান্দার গ্রীলে তালা লাগিয়ে বের হয়ে পরে রাইসুল। চাচার কাছ থেকে  শোনার পর থেকেই বাড়িটা দেখতে ইচ্ছা করছে। বাড়ির ভেতরে একটা গাব গাছ ছিল। গেটের বাইরে রাস্তায় প্রায়ই ড্রেনের আবর্জনা পড়ে থাকত। খলিল সর্দার মসজিদের সামনে দাড়িয়ে রাইসুল মনে মনে এমন একটা বাড়ি কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। সব দিকেই উঁচু উঁচু বাড়ি। বাড়ি গুলোর ছোট ছোট গেট। 

হঠাৎ লোড শেডিং করলে মানুষ হৈ হৈ করে উঠে। রাইসুলরা যখন হাজারিবাগে থাকতো তখনও এমন হতো। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় আবার ফিরে আসার সময় পুরো এলাকার মানুষ হৈ হৈ করে উঠত। রাত তখন সোয়া বারোটা। লোড শেডিংয়ের পর প্লেগ মহামারির আগে ওরান শহরে যেভাবে গর্তের ইদুর বের হয়ে আসতে শুরু করেছিল, সেভাবে মানুষ বের হয়ে আসে গলিতে গলিতে। শ’য়ে শ’য়ে মানুষ গলির ধার ঘেঁষে নিজেদের বাড়িটার কাছকাছি দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পরে। একটা গুমগুম আওয়াজ হতে থাকে। 

খলিল সর্দার মসজিদের বারান্দায়  দাঁড়িয়ে রাইসুল বাড়িটা খোঁজার চেষ্টা করছিল। ওই সময় সকালের মত একটা ডাক। খোকা এদিকে এসো।  বাড়িগুলোর জানালা দিয়ে চার্জ লাইটের আলোয় দেখা যায় সকালের সেই জায়গাটায় বেঞ্চ পেতে লোকটা বসে আছে। রাইসুলকে হাত ইশারায় ডাকে। রাইসুল এগিয়ে গেলে লোকটা ইশারায় বসতে বলে। রাইসুল খুব অস্থির হয়ে ওঠে। সময় নষ্ট না করে লোকটাকে জিজ্ঞাস করে, আমি মাঞ্জা দেওয়া সুতা ভয় পাই, এটা আপনি কিভাবে জানেন। আপনি কি আমাকে চিনেন? লোকটা বলে- আমি কেন, মহল্লার সবাই তো জানে এ কথা। সেদিন দুপুর বেলায় যে ছাদে উঠে তুমি লাল ঘুড়িটা ধরতে চাইলে, আর দুষ্ট ছেলেরা তোমার হাতের আঙুল কেটে দিল। এ কথা তো মহল্লার সবাই জানে। রাইসুলের বিষ্ময়ের সীমা থাকে না। কি বলছে লোকটা। এতো বছর আগে দুষ্ট কয়েকটা ছেলে যে, তার হাতের আঙুল কেটে দিয়েছিল, এ কথা সে তার মাকেও বলেনি। রাইসুল লোকটাকে বলে, এটা কোন ভাবেই সম্ভব না। কারণ সেদিন আমার হাতের আঙুল কাটার কথাও আমি কাউকে বলিনি। 

তুমি না বললে কি হবে। মহল্লার সব মোড়ে মোড়ে জানে। লাল ঘুড়ি ধরতে গিয়ে তোমার আঙুল কেটেছিল । এই কথা শুনে মহল্লার সবাই প্রথমে সে কি হাসি। পরে অবশ্য সবাই  ছেলেগুলোকে বকাঝকা করেছে। রাইসুল বিষ্ময়ভরে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা বলে, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না। দেখ গলিতে কত মানুষ। তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞাস করে দেখ।

 

🔸🔸🔸🔸🔸🔸

কামরান পারভেজ

জন্ম- ৪ জানুয়ারি ১৯৮১

সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত। ২০১০ সালে বাংলা একাডেমীর তরুণ লেখক প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহন শেষে সনদপ্রাপ্ত হন।

প্রকাশিত গ্রন্থ – দিকচিহ্নহীন (২০১২) ও অবেলার গল্প (২০১৮)

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

আত্মজা ও একটি বাঘের গল্প | শেখ লুৎফর

Mon Jul 6 , 2020
আত্মজা ও একটি বাঘের গল্প |শেখ লুৎফর 🌱 এক কাপ চা দেওয়ার কথা বলে স্টলের বেঞ্চটায় বাঘ কোনোমতে নিজের দেহটা ধপাস করে ছেড়ে দেয়। এরকম অসার ভঙ্গিতে তার দীর্ঘ দেহের গোঁজা পিঠটা আরও বেশি কুঁজো দেখায়। এক অসহ্য মানসিক পীড়নে খাড়া, লম্বা নাকটা কেঁপে-কেঁপে বারবার বেঁকে যাচ্ছে। আসলে লোকটা ভেতরে […]
Shares