আত্মজা ও একটি বাঘের গল্প | শেখ লুৎফর

আত্মজা ও একটি বাঘের গল্প |শেখ লুৎফর

🌱

এক কাপ চা দেওয়ার কথা বলে স্টলের বেঞ্চটায় বাঘ কোনোমতে নিজের দেহটা ধপাস করে ছেড়ে দেয়। এরকম অসার ভঙ্গিতে তার দীর্ঘ দেহের গোঁজা পিঠটা আরও বেশি কুঁজো দেখায়। এক অসহ্য মানসিক পীড়নে খাড়া, লম্বা নাকটা কেঁপে-কেঁপে বারবার বেঁকে যাচ্ছে। আসলে লোকটা ভেতরে ভেতরে এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে সে, এতক্ষণ কায়মনে চাইছিল কোথাও ঝপাত করে পড়ে যেতে। দুর্ভাবনা যেন তার ভেতরটাকে অদৃশ্য রাক্ষসের মতো ছোবড়া করে ফেলেছে। তবু দায়ে পড়ে পেরেশান দেহটা টেনে-হিঁচড়ে বড় বড় দুইটা শুকনা হাওর পেছনে ফেলে এসেছে। সকাল থেকেই মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। শেষ চৈতের কড়া রোদে এখন চোখের নজরটাও ঝাপসা।

সে দূরের গ্রামগুলার কালচে রেখার দিকে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। সেদিক থেকে চৈতের ঝলসানো বাতাস শনশন করে ছোটে এসে তার মাথার লম্বা-জংলি চুলগুলা নিয়ে খেলছে। সামনের দিকে মাইল পাঁচেক ছড়ানো সবুজ হাওর, হাঁটুসমান ঘাস আর বরো ধানের রাঙিন পৃথিবী। মাঝে মাঝে হিজল গাছের সারি; কড়া রোদে সিদ্দি-টানা মানুষের মতো নিঃসঙ্গ-বেদনায় ভোম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে ছোট্ট ডুবার স্বচ্ছ পানিতে এক চিলতে বোবা আকাশ। এবং এই আচানক শান্তির পয়গামে সমস্ত চরাচর বুঝিবা মগ্নঋষি।

লোকটার গুঁফো মুখাটা দেখে মনে হয় হাওরের এই অতুল ভৈববের কিছুই সে দেখছে না। তার বদলে কেমন একটা গুমরানো রোদনে জমে ওঠা সিদ্ধির নেশার মতো খাপছাড়া, ঢুলো ঢুলো ভঙ্গি। চকিতে সে একবার কোমড়ের কশিতে হাত দেয়; গাঁঞ্জার পুরিন্ধাটা আছে-ত? 

একটু স্বস্তিতে সে এবার ঘুম জড়ানো সবুজের বুক চিড়ে চলে যাওয়া সাবমার্সেবল পথটার দিকে তাকায়। সিমেন্ট-পাথরে ঢালাই সড়কটা চলে গেছে থানা সদরে দিকে। তারপর সে মাথা নুয়ে বড় বড় থ্যাবরা আর ফাঁটা পা দুইটার ওপর জমে ওঠা ধূলার ঘন আস্তর দেখে। 

দোকানের সামনে গোটা তিনেক পুরানা লক্কর-ঝক্কর টেম্পু ক্ষ্যাপের আশায় উজবুকের মতো নেতিয়ে পড়ে আছে। এখন আর তাকে হাঁটতে হবে না। একটা টেম্পুতে উঠে বসলেই হলো। চোখ বোঁজে ভাবতে-ভাবতে সদরে পৌঁছে যাবে। আর সেই ফাঁকে হয়তো সে নিজের সাথে একটা রফা করে নেবে।

দিন যায় যায় মাস যায় মানুষটার বুকে কীএকটা যেন চোরা কাঁটার মতো খচ্ করে ওঠে। তখন পায়ের নিচের মাটি বুঝি হড়কে যায়, দুনিয়াটা অসার লাগে। তারপর-ই শুরু হয় চিন্তার আজাব। ভাবতে ভাবতে মাথাটা এক তাল মাটির মতো ভোঁতা হয়ে এলে সে ঐ ছিদরত থেকে সাময়িক নিস্তারের আশায় কাঁচা টাকা দিয়ে লটারি দেওয়া শুরু করে। লটারির আগে বার-কতক আল্লা-খোদার নাম নেয়। মনে মনে  প্রার্থনা মাগে:

আল্লারে…তুই আমারে রেহাই দে।

তাতেই কি নিস্তার মিলে? দুই-তিন কিস্তিতে একুনে দশ-পনেরবার চালাচালি হয়। কখনও শতভাগ প্রত্যাশিত ফল মিলে না। অধিকাংশ সময় বাজি থাকে; যদি চান ভাসে তবে তার বউ চান্দের মতোই নিষ্কলঙ্ক আর ধান ভাসলে দুনিয়াবি জৌলুশে অন্ধ, বিবেকহীন বেশ্যা। বাড়তি সুবিধা আদায়ের জন্য সুযোগ পেলেই লন্ডনি-মালিককে গতর পেতে দেয়। 

লোকটার বিবেচনায় তার বউটা আসলে তার কোমড়ের পুরনা দাউদটার মতো ত্যান্দর। মালিক বিদেশ থেকে ফিরে এলে মাগীটা আব্বা…আব্বা…করে মুখে ফেনা তুলে যেন সত্যি-সত্যি-ই তার চেটের পয়দা। আর বাপ-বেটি বুজরুগিটা এমন চালে চালায় যাতে তার চোখে ভেল্কি লাগে। তখন তার মনে ঘূর্ণাক্ষরেও কোনো সন্দেহ আসেনা। আর তার তো সারাদিন কাটে গরু-বাছুর, ক্ষেত-খলায়। যতক্ষণ বাড়ির আশ-পাশ থাকে, বউয়ের ওপর কড়া নজর রাখে। কিন্তু আঁটো-সাটো গতরের মেয়েলোকটার চালাকির কাছে শয়তানও হারমানে। কমিনির সাক্ষী-সাবুদ তো দূরে থাক গত ষোল বছরে একদ-ের জন্যও মেয়েমানুষটার কোনো ইলঢিল তার চোখে পড়েনি। কিন্তু মালিক দেশে থাকতে নিত্যদিন এটা-ওটার বাহানায় যখন মুঠি-মুঠি টাকা ঘরে আসে। বউ দেশে জমিন কেনার মতলব আঁটে তখনই তার মনে সন্দেহ বিষ দাঁত ফোটায়। আর যখন মালিক বিদেশে পাড়ি জমায়, সেই পতিত সময়টাতে বউয়ের চলন-বলনে এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে, যেন তার মতো সতী-সাধ্বি নারী জগতে বিরল! ঠিক তার দাউদটাও তেমনি: শীত এলেই ভালো হয়ে যাওয়ার ছলে খসখসে চামড়ার নিচে আত্মগোপন করে। আর তাতেই সে প্রত্যেক বার ধরে নেয়, রোগটা বুঝি এবার সত্যি-সত্যিই গেলো। কিন্তু ফাগুন-চৈত এলেই প্রথমে কষে খাওজানি শুরু হয়। তারপর বর্ষার শুরুতে দগদগে ঘায়ের মতো খাবলাখানেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। মানুষটার বিবেচনায় তার বউ আর দাউদ সমানে সমান। 

সন্ধ্যাটা কাটে তার গরু-বাছুরের তত্ত-তালাশে। এই সময়টায় সে কখনও ঘরমুখো হয় না। কিন্তু গেছেকাল এক দরকারে সে সন্ধ্যার আবছা আন্ধায় বাড়ির দেউড়িতে এসে দাঁড়ায়। মালিকের ঘরের পাশে একটা ছোটখাট ছায়া ঘাপটি মেরে আছে দেখেই সে সচেতন হয়ে ওঠে। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে তার মেয়ের মিনতি ভরা গলা।

না, না আমারে ছাইড়্যা দ্যাইন।

নিজের মেয়ের কাকুতি শোনে তার বুকটা ছাৎ করে ওঠে। কিন্তু বাইরের ছোটখাট কালচে ছায়াটা ততক্ষণে চ ল হয়ে ওঠেছে। সে কিছু ভাবার আগেই ছায়াটা ফিসফিসিয়ে মেয়েকে ধমকে ওঠে, ছিনালের ঢং দ্যাহো! না, না করছ ক্যা? তর নানা যা চায় দ্যায়া দ্যা।

তার দুনিয়াটা টলে ওঠে। নিরুপায় হয়ে সে চোরের মতো পালিয়ে আসে। ততক্ষণে বউ আর মালিকের মতলবটা তার কাছে খোলাসা হয়ে গেছে । সাথে এতদিনের দুটানা হিসাবটাও খাপের খাপ মিলে যায়।

রাত বারোটার দিকে দুই কলকি সিদ্দি টেনে তিন হাত লম্বা ঝকঝকে রামদাটা নিয়ে সে ঘরে ফিরে। মালিক দেশে থাকলে এটা নিয়ে রাতে তাকে বাড়িটা টহলে রাখতে হয়। তাই বউয়ের কাছে রামদাটা বিশেষ কিছু না। তার মনে ছিল বউ-মেয়েকে টুকরা-টুকরা করে শেষ রাতে পথে নামবে। বাকি জীবনটা পথেই কাটিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! নেশার ঘোরে তার মনে পড়ল বউয়ের লালটি বর্ণের ছোট ছোট স্তন দুইটার কথা। একটু পরেই কামনায় সে ভূতের মতো কাঁপতে থাকে। 

কাম শেষে সে একটা বিড়ি টেনে ঘুমিয়ে পড়ে। রামদাটা তার বুকের ওপর লম্বালম্বি। নাক ডাকার শব্দ শুনে বউ তার বুকের উপর থেকে আস্তে করে দাটা সরিয়ে নেয়। এক ঘুমে রাত কাবার। সকালে মালিকের কাছ থেকে তলব আসে। আজ তাকে ফের বাঘ সাজতে হবে। তার জন্য দুইটা দেশি মুরগা আর কিছু টুকিটাকি সওদার জন্য সদরে যাওয়া চাই।

মানুষটার বিষন্নতা ক্রমে জটিল হয়। বউয়ের কথা সে বাদ দিয়েছে মেলা আগে। তবু এই মুহূর্তে বিষাক্ত ক্রোধ ও ঘেন্না পায়ের নখ থেকে হিড়হিড় করে মস্তকে এসে ফেটে পড়লে সে বিড়বিড় করে তার বউকে একটা নোংরা গালি দেয়। আর ঠিক পর মহূর্তেই তার তের বছরের লকলকে মেয়েটার কায়া নজরে ভাসে। বিপন্ন অত্মজার শুকনা মুখ তার আত্মাটাকে সমূলে কামড়ায়। সে যতই অক্ষম আর নাদান হোক তবুতো পিতা! 

এখন তার চোখের কোনাকানা লাল হয়ে ওঠছে; বাঘ বাঘ খেলার চুড়ান্তমার্গে এসে যেমনটা হয়। তখন সে সত্যি-সত্যিই যেন বন্য জীবনের অবাধ স্বাধীনতায় অপ্রতিরোধ্য এক শার্দূল হয়ে ওঠে। কোমরে বাঁধা থাকে মোটা কাছি। নির্দিষ্ট বৃত্তাকার পরিধিতে সে ধাবড়িয়ে ছোটে। দর্শকদের উত্তেজনা তখন ত্রাসে হীম। ঠিক সেই সময় ভিড় থেকে ছুড়ে দেওয়া হয় জীবন্ত মোরগ। উড়ন্ত জীবটা সে হা-করে লুফে নেয়। বড় বড় কয়েকটা কামড়ে জীবটাকে সে কাঁচা পেটে চালান করে দেয়। প্রাণীটার খাল, ফৈড়, রক্ত, নাড়ি-ভুড়ি চারপাশে ছিটকে ছিটকে পড়ে। আর ঠিক তখন যারা তাকে ঠাহর করে দেখেছে তারাই কেবল বলতে পারবে মানুষটার চোখের কোনাকানা লাল হয়ে ওঠার মোদ্ধা কথাটা কী?

মানুষটা বাঘ বাঘ খেলাটা খেলছে আজ কুড়ি বছর। আর একটা ছ্যাঁচড় কুত্তা তার বউকে নিয়ে এত বছর খেলে এখন তার নাবালেগ মেয়েটাকে নষ্ট করার মতলবে মত্ত হয়ে ওঠেছে!

এই অ লে মানুষটাকে সবাই বাঘ বলেই চিনে। তার আদত নাম যে কী, এ তল্লাটের কেউ জানে না। এতদিনে হয়তো বাঘ নিজেও ভুলে গেছে। তার জন্ম-ঠাঁই গারোপাহাড়ের পাশে। যেখানে হাওর-বিল আর ভাতের অভাবের কোনো লেখাজোখা নাই। সে যখন ডাকুমার্কা হুল্লোড় প্রিয় তরুণ তখন ই-িয়ার বর্ডারে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। সেই সময় উত্তরের পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল এক বুড়া সন্ন্যাসী। মাঝে মাঝে তাদের উঠানে এসে দাঁড়াত। জটাধারী বুড়াকে দেখলেই তার মা তাকে দিয়ে ভাতের সানকি পাঠিয়ে দিত। সেই লোকটা একদিন তার গতর টিপে টিপে দেখে বললো, তর হাড় মোডা আছেরে বাঘ হইতারবে।

লোকটা তাকে বাঘ হওয়ার অদ্ভুত খেলাটা শিখিয়ে দিল। যে বছর সে এই খেলাটা রপ্ত করে এ গ্রাম ও গ্রামে খেলা দেখিয়ে কিছু রুটি-রুজি শুরু করে, সেই চৈতের শেষ দিকে একরাতের পাহাড়ি ঢলে গোটা অ ল তলিয়ে যায়। কয়েক ঘন্টাতেই শেষ হয়ে যায় তল্লাটের সমস্ত ফসল। হঠাৎ ঠাঠাপড়ার মতো তার আমুদে-জীবনটাও যেন ঝলসে যায়। 

টানা কয়দিন উপাস দিয়ে এক সময় ত্যক্ত বাঘ মাকে কিছু না-বলে পথে নামে। পাহাড়ের পাশ ধরে দিনের পর দিন হাঁটতে হাঁটতে সুনামগঞ্জে এসে ঠাঁই মেলে এই উজানি গাঁয়ে। বড়ো হাস্য কথা, কিছু রহস্য কথা; অধিকাংশ লোকে উজানি গাঁওকে কয় জানীগাঁও। অকর্মা তরুণরা ইবলিশের মতো ফেকফেক করে বলে যোনীগাঁও! 

এ অ লের মানুষগুলা কৃষিনির্ভর না। তাদের ঘর-গেরস্তিতে রজনের জোগান আসে বাইরের দুনিয়া থেকে। আশি শতাংশ সক্ষম পুরুষই প্রবাসী। তাই এদিকে মানুষের জীবন অনেক সহজ। এরা কথায় কথায় হাসে। মোটা মোটা বাজার করে। তিনবেলা পেট ভরে খায়। কর্তারা কয়েক বছর পরপর উজাই মাছের মতো বিদেশ থেকে তেতে-তেড়ে ফিরে আসে। এক-দুই মাস হুল্লোড় দিয়ে নগদ মালপানিতে টান পড়তেই ফের চুপচাপ সটকে পড়ে। বরফের দেশ থেকে ফিরে আসা  ক্লান্ত-বুড়ারা তসবি হাতে ঝিমায়। মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে হাওরের দূরপ্রান্তের দিকে তাকিয়ে মোট মোটা নিঃশ্বাস ফেলে।

বড় বড় বাড়িগুলা বলতে গেলে খালি। বাঘের মতো দূর-দূরান্তের দীন-দুঃখীরা বউ-ঝি নিয়ে ঐ সব বাড়িতে থাকে। ওরাই বাড়িঘর, জুতজমিনের দেখ-ভাল করে। শিশু-নারী ও অকর্মণ্য বুড়া-বুড়িদের নিত্যকর্মে জোগান দেয়। প্রবাসীরা ফিরে এলে তাদের ফাইফরমাশ খাটে। মালিকের মন জোগাতে সেবা-আত্তি করে। এদের কেউ কেউ গুপ্তি বাহানায় মালিকের নগদ কড়ির কিছুটা তাদের স য়েও মিশায়। আর এইভাবেই অদিরসাত্বক কেচ্ছা-কাহিনীতেও অনেকে জড়ায়।

বাঘ এসেছিল ভাতের খোঁজে। মালিক তাকে ভাতের সাথে বউও দিল। পাত্রী মালিকের কাজের বেটির বেটি। চৌদ্দ বছরের টুকটুকে কুড়াপক্ষী। নাম তার পেয়ারা বেগম। দেখলে চোখ ফেরানো দায়। কামনার আজাবে ইন্দ্রিয় যখন-তখন চেতে ওঠে। যুক্তি ছিল, সে-ইবা কোনখানের তালুকদার। তাই অমত হবার বেউজ্জ্যা কোনো কারণ নাই। মাথার ওপর মালিক আছে। বাপ-দাদার ওয়ারিশ সূত্রে তাগড়া একখান গতর আছে। রাতের একটা মানুষ হলে জীবনটা কাটবে ভালো। মালিকের পড়তা ছিল অন্যখানে। জিনিসটা ঘরেই থাকলো। ফি বছর বাড়ি এলে চেটেপুটে খেতে পাবে।

কামনার ঘোর কেটে গেলে লোকটার হুঁশ ফেরে। ততদিনে জেনে গেছে, মালিকের দরজা-জানলার চৌকাঠের মতো তার বউ-শ্বাশুড়িও মালিকের স্থাবর সম্পত্তি।

বউটার চাওয়ার কোনো কমতি নাই। মালিকের সাথে গুপ্তি সম্পর্কের জের ধরে দেশের বাড়িতে বছর বছর জমি কিনে। গত বছর মাটি কাটিয়ে বাড়ি-ভিটের পত্তন দিয়েছে। সেই ভিটায় আগামীতে ঘর তোলার খেয়াল রাখে। তার মামলতের জোগানের জন্য এখন তের বছরের মেয়েটাকেও মালিকের বিছানায় তুলে দিতে এক বাক্যে রাজি!

মালিক এবার বিদেশ থেকে বুড়া হয়ে ফিরেছে। বরফের দেশে তার দাম কানাকড়ি। ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই নিজেকে নিয়ে ঐ দেশে বড় ব্যস্ত। সে এখন তাদের ঘাড়ের বোঝা। উজানি গাঁয়ের জলো-হাওয়া আর তাজা মাছ-ভাতে দিন কয়েকেই ছানি পড়া চোখ আর ঠান্ডা লৌ সতেজ হয়ে উঠলে মালিকের লুচ্চা রুহুটা নড়েচড়ে বসে। এই ফাঁকে পেয়ারা বেগমের সঙ্গে পুরনা সম্পর্কটাও ঝালাই করে নেয়। দিন কয় বাদেই চোখ পড়ে ডাগর নাতনিটির ওপর। পেয়ারা বেগম মালপানির তক্কে ছিল। তত দিনে মালিকের চোখ মা ছেড়ে মেয়ের দিকে লকলক করছে। এ খবরের আভাসে পেয়ারা বেগমের বিষয় বুদ্ধি গা-ঝাড়া দিয়ে বসে।

চাখানার বাইরে মরে পড়ে থাকা বুড়া টেম্পুটা খকখক করে কয়টা কাশি দিয়ে জেগে ওঠে। গেঞ্জি-প্যান্ট পরা বিটক্যালে চেহারার একটা ছোকরা থানাসদর…থানাসদর…বলে চেঁচানো শুরু করলে বাঘ ধীরে-ধীরে বাইরে এসে দাঁড়ায়। একটু দূরে একটা হিজল গাছ। গাছটার বিষন্ন ছায়া তাকে যেন ইশারায় ডাকে। সে টলতে টলতে ওইদিকে গিয়ে বসে। টেম্পু ছাড়তে এখনও মেলা দেরি। একটু আগে চোখের কোনাকানায় জেগে ওঠা লালটি আভাটা এখন তার সারা চোখ দুইটাতে ছড়িয়ে পড়েছে। কোমরের চোরা দাউদটা বুঝি এই ফাঁকে তাকে ডাক দেয়। সে বড় বড় নখ নিয়ে দাউদটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চুলকানির কড়কড়  শব্দের তালে তালে মাথার উপরের হিজলের ডালের মতো বাঘের শরীরটাও আমুদে দুলছে। বউ আর দাউদ সমানে সমান…এই বোধ থেকে বাঘ বুঝি হিংস্র হয়ে ওঠে! 

এশার অক্তের পর বাঘ এক ছিলিম সিদ্দি টেনে উঠানে এসে দাঁড়ায়। একজন দুই গ্লাস পানি এনে তার সামনে ধরে। সে চোখ বোঁজে মন্ত্র জপে ভিন্ন ভিন্ন গ্লাসে ফুঁ দেয়। একটা মানুষ থেকে বাঘ হয়ে ওঠার আরেকটা বাঘ থেকে মানবজীবনের। মানুষে উঠানটা গমগম করছে। চার কোনায় চারটা এনার্জি বাল্ব। সুঁই পড়লে খোঁজে লওয়া যায়। চারপাশের আচ্চা-বাচ্চা, বুড়া-বুড়ি সবাই হাজির। বাড়িটায় উমালির মেজাজ।

মালিক বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছে। পায়ের ওপর পা, হাতে জলন্ত সিগারেট। মন-গতরের হাব-ভাবে কুড়ি বছর ঝেড়ে ফেলেছে। চোখে চোখ পড়তেই বাঘ নজর ফিরিয়ে নেয়। মনে মনে একবার বউকে তালাশ করে। মানুষটা গড়হাজির।

মোটা কাছিটার এক মাথা কষে ল্যাংটি মারা বাঘের কোমড়ে বাঁধা অন্যটা মাঝ উঠানে পোঁতা মোটা খুঁটিতে। চোখ বন্ধ করে জোড় হাত কপালের নিচে রেখে উঠানের মাটিতে বাঘ সেজদার ভঙ্গিতে নুয়ে পড়ে। মেদহীন পেটটা পিঠের দাঁড়ার সাথে লেগে আছে। তাল কাঠের সালতির মতো কালো, পেটানো একহারা শরীরটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে চওড়া হয়ে গেছে। 

একজন তার শরীরে ওতার-পানি ছিটিয়ে দেয়। সবাই নিশ্চুপ, নিরাপদ তফাতে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বাঘের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। পানির ছিটা শরীরে পড়তেই সরু কোমরের ওপর বিশাল বুক-পিঠের বাঘ থরথর করে কাঁপে। কম্পনের তরঙ্গে দেহটা যেন ফোলে ফোলে আড়ে-দীঘে একটু একটু বাড়ছে। পিঠের বদখৎ গোঁজটা যেন ফেটে পড়বে এমনই তার রোয়াব। বাঘের ঘাড়-পিঠ-পেটের পুটপুটা পাকা ঘামাচিগুলাও বুঝি বিজলি বাতির দিকে চোখ মটকে মস্করা করছে। আর ফাটা পায়ের গোড়ালিতে কত কালের ময়লা-রূপ অন্ধকার যেনবা মালিকের দিকে হা-করে তাকিয়ে আছে। ষোলটা বছর এই মানুষটা তার সর্বস্ব দিয়ে মালিককে খেদমত করে এসেছে কিন্তু আজ তার বাঙ্গি-ফাটা পায়ের নিচে একটা বিশাল গর্ত ছাড়া কিচ্ছু নাই! একটা হিংস্র চেতনা বাঘের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে যেন এই খবরটা জানিয়ে দিলো।

হুম… বলে একটা দীর্ঘ চিৎকারে বাড়িটা কাঁপিয়ে বাঘ লাফিয়ে ওঠে। এরই মাঝে হাত-পা-পেট-পিঠের পেশীগুলা তিন-সুতি রডের মতো টং হয়ে গেছে। জ্বলন্ত চোখ দুইটা টকটকে লাল। বুনো-হিংস্র জন্তুর মতো দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সে ভীড়ের দিকে তেড়ে যায়। কিন্তু মোটা কাছির বাঁধন তাকে নির্দিষ্ট সীমার মাঝে আটকে রাখে।

বাপের জন্মে বাঘের এত আফাল আগে কেউ দেখেনি। একেকটা লাফে কম করে হলেও পাঁচ হাত উপরে ওঠে দুই হাতে শূন্যে খাবলা মেরে কাকে যেন ধরে ফেলতে চায়! ভীড়ের মাঝে আড়ে আড়ে কাকে যেন খোঁজে। লালটি বর্ণের ছোটখাট একটা মেয়েমানুষ তার বোধের ওপর হালকা ধূঁয়াশার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বারবার দাঁতগুলা কড়মড় করে ডেকে ওঠছে। বাঘের দাঁতের আওয়াজে নিরাপদ দূরত্বে থেকেও মালিক নামের ধুর্ত জীবটা হকচকিয়ে ওঠে। ভয় কাটানোর জন্য চেয়ারে বসা লোকটা জোরে জোরে চিৎকার দেয়, আলীমুদ্দি…আলমুদ্দি বাস্তরটা কোয়াই গ্যাছে ?

ভিড়ের মাঝ থেকে কালো কুতকুতে একজন মাঝ-বয়সী লোক রাগে বিরবির করতে করতে ছুটে আসে, আমারে বাস্তর কয় ক্যায়া; আমার কী বাপ নাই? 

আলীমুদ্দি কাছে আসতেই মালিক চোখ মটকে চেঁচায়,বাঘেরে মুরগা দ্যা।

বাঘ পরপর দুইটা জ্যান্ত মুরগ চিবিয়ে খায়। হাড্ডি পিষার কড়কড় শব্দে মালিকের বুক কাঁপে। সে ফের আলীমুদ্দি…আলীমুদ্দি…বলে চেঁচায়। জীবন্ত জীবের গরম রক্তের স্বাদ বুঝি বাঘের উন্মত্ততায় ভিন্নমাত্রা এনে দেয়। টকটকে লাল চোখ দুইটা আর ত্যাড়া-বাঁকা দাঁতগুলা বিদ্যুতের আলোতে বারবার ঝলকে উঠছে দেখে ভিড়ের মাঝে ফিসফিস রব ওঠে, বাঘ ইতা করে কিতার লাগি ?

তামেশগিররা আরও নিরাপদ দূরত্বে সড়ে দাঁড়ায়। বাঘের চোখের দিকে তাকিয়ে মালিকের গলা শুকিয়ে যায়। ভয়ে মাথার রোঁয়াতক শিরশির করে খাড়া হয়ে ওঠে। অবাক কির্তী! যে বাঘ কোনোদিন তার চোখে চোখ রাখেনি আজ সেই কি-না এক আগুন চোখে তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে!

মালিক তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে। ডান হাতটা উঁচিয়ে একটু যেন সামনের দিকে এগিয়ে চিৎকার দেয়, আলীমুদ্দি কোয়াই…ভাস্তর আলীমুদ্দি…।

কোনার দিক থেকে আলীমুদ্দি আবার বিরবির করতে করতে এগিয়ে আসে। এই সুযোগে বাঘ ডান দিক থেকে যেন উড়াল দিয়ে বামে মোচড় লয়। সে দুই লাফে কুড়ি হাত দূর থেকে উড়ে এসে এক খাবলায় মালিককে বারান্দা থেকে মুরগার মতো উঠিয়ে নেয়। ভিড়ের বোবা মানুষগুলার চোখ বুঝি কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে এইরকম আচানক হয়ে তারা দেখে, বারান্দার চেয়ারটা খালি, লন্ডনি মানুষটা মাটিতে পড়ে নিজের রক্তের লুটোপুটি খাচ্ছে। তারপর ঘোর কেটে গেলে সবাই দেখে, এক গর্জনে দড়িটা ছিঁড়ে বনের কালো চিতার মতো বড়ো বড়ো লাফে বাঘ উত্তর দিকে ছুটছে। তার মুখে ঝুলছে সাদা ফিতার মতো খাঁজকাটা একটা শ্বাসনালী।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা ■ মেরেলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা 🌱 অনুবাদ: পারভেজ চৌধুরী

Mon Jul 6 , 2020
এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা ■ মেরেলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা 🌱 অনুবাদ: পারভেজ চৌধুরী   🔅🔅 দয়াল এই রমণীকে তুমি গ্রহণ করো। মেরেলিন মনরো নামে যে ভুবনখ্যাত। যদিও এটা তাঁর আসল নাম নয়। (তুমিতো জানোই, ৬ বছরের ধর্ষিতা এই অনাথ শিশুর আসল নাম, যে কিনা ১৬ বছরে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে) সে তোমার […]
Shares