এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা ■ মেরেলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা 🌱 অনুবাদ: পারভেজ চৌধুরী

এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা ■

মেরেলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা

🌱

অনুবাদ: পারভেজ চৌধুরী

 

🔅🔅

দয়াল

এই রমণীকে তুমি গ্রহণ করো। মেরেলিন মনরো নামে যে ভুবনখ্যাত।

যদিও এটা তাঁর আসল নাম নয়। (তুমিতো জানোই, ৬ বছরের ধর্ষিতা এই অনাথ শিশুর আসল নাম, যে কিনা ১৬ বছরে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে)

সে তোমার সামনে অপার হয়ে বসে আছে

মেক-আপহীন,

নিজস্ব সংবাদসংস্থা, আলোকচিত্রী ছাড়া

এমনকি কোন অটোগ্রাফ শিকারীও নেই আশেপাশে

একা

নভোচারী যেমন মহাশূন্যে রাতের মুখোমুখি হয়।

প্রণীত মানুষের ভিড় জমার আগেই গির্জায় নগ্ন হবে একদিন (টাইম পত্রিকার ভাষ্যমতে)

এইছিলো মেয়েবেলার স্বপ্ন!

সবাই অবনত

সর্ন্তপণে তার হেঁটে যাওয়া, কারো মাথায় যেন ছোঁয়া না লাগে!

আমাদের স্বপ্নের সাথে তোমার বোঝাপড়া বেশ ভালো, মনোবিজ্ঞানীদের চেয়ে।

গির্জা,

বাড়ি,

গুহা;

এ-সবই মাতৃগর্ভের মতো কুশলে থাকার প্রতীক

কিংবা আরও অন্য কিছু …

একটি বিষয় পরিষ্কার, তার ভক্তদের মাথা

(ঝলমলে আলোতে থাকার পরও ছিলো অন্ধকারে)

এটা তো ঠিক, টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্সের স্টুডিও কোনো মন্দির নয়

মার্বেল কিংবা স্বর্ণের মন্দির বিরাজ করে তার দেহের ভেতর

যেখানে চাবুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে মানবজাতি।

যা চালায় কালের বাণিজ্য বাতাসে নষ্ট টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্সের কর্তাব্যক্তিরা

তোমার আখড়াকে যারা রূপান্তর করেছে চোরের আস্তানায়।

দয়াল

পাপ আর তেজস্ক্রিয়তায় পঙ্কিল নশ্বর এ চরাচর।

এসবের জন্যে দোকানের এই তরুণ কর্মচারীর উপর দোষ চাপাতে পারো না

যে অন্যদের মতোই স্বপ্ন দেখেছে একদিন তারকা হবে।

স্বপ্ন তার সত্যি হয়েছে শেষাবধি। (কিন্তু এটা টেকনোকালার বাস্তবতার মতো)

যেভাবে আমরা চিত্রনাট্য দিয়েছি, সে অভিনয় করেছে শুধু;

গল্পটা সাদামাটা, অর্থহীন কিন্তু জীবন থেকে নেয়া।

দয়াল

ক্ষমা করো তাঁকে ।

বিংশ শতাব্দীতে বিশাল এই রিয়েলিটি শো নির্মাণের পেছনে যারা কাজ করেছি

তাদেরও ক্ষমা করো।

হতাশগ্রস্থ, প্রেম-কাঙাল মেয়েটার হাতে মনোচিকিতসকের পরামর্শে

ভালোবাসাময় অর্ন্তচুক্তির বদলে তুলে দিয়েছি চেতনানাশক।

কারণ আমরা মহামানব নই।

মনে রেখো দয়াল

ক্যামেরার প্রতি ক্রমশই ভয় বাড়ছিলো তার এবং কিছুটা অভিমান

মেক-আপের প্রতি তীব্র বিরাগ

তবুও প্রতিটি দৃশ্যে নতুন করে নিতে হয়েছে মেক-আপ

স্টুডিওতে সময়খেকো সন্ত্রাস প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে তাঁকে ।

আর সব তরুণীর মতো তারও স্বপ্ন ছিলো তারকা হবার।

যে জীবন বিরহকাতর, টালমাটাল ও দুঃস্বপ্নের মতো এলোমেলো

যা কিনা মনোচিকিতসকেরা বিশ্লেষণ করে কেস স্টাডি করেছে একের পর এক।

দুচোখ বন্ধ করে চুমো খাওয়া

এই ছিলো তাঁর শিহরণ জাগানিয়া

বিস্ময় বিশ্বেরও।

চোখ খোলার পর বুঝতে পারে

সে আছে ফ্ল্যাডলাইটের মুহুর্মুহু আলোর ঝলকে হাজারো রঙের খেলায়।

লাইট নিভিয়ে

ঘরের দুটো দেয়াল সরিয়ে নেয়া হলো (তা ছিলো শ্যুটিং সেট)

চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মাতার নীরব প্রস্থান, দৃশ্যের শেষ এভাবেই।

প্রমোদতরীতে বেড়াতে যাওয়া,

সিঙ্গাপুরে চুমো,

রিওতে নাচের আসর,

কিংবা উইন্ডসরের ডিউক অব ডাচেসের বাড়িতে রাতের গুমোট পার্টি

এ সবই মলিন এপার্টম্যান্ট, হতশ্রী রুম থেকে দেখা।

শেষ চুমো ছাড়াই ছায়াছবিটি শেষ হলো …

বিছানায় পাওয়া গেলো তাকে মৃত, হাত ছিলো টেলিফোনে

গোয়েন্দারা কখনোও জানতে পারেনি, কাকে ফোন করতে চেয়েছিলো?

এমন কাউকে ফোন করেছিলো …

হয়তো বারবার শুনেছিলো রেকর্ড করা গলায় ‘রং নাম্বার’ ।

অথবা কোন গ্যাঙস্টারের দ্বারা আহত হয়ে

সংযোগ বিচ্ছিন্ন টেলিফোনে রেখেছিলো হাত …

দয়াল

যাই হোক না কেন, সে কল করেছিলো অথবা করেনি

(হয়তো কাউকেই করেনি কিংবা এমন কাউকে করেছিলো যার নাম্বার নেই লস এঞ্জেলসের টেলিফোন ডিরেক্টরিতে)

তুমি তাঁর ঐ ফোনটা অন্তততঃ একবার রিসিভ করো।

 

🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅

 

কবি ও বিপ্লবী এর্নেস্তো কার্দেনাল (জন্ম: ২০ জানুয়ারী ১৯২৫) মারা গেছেন  ০১ মার্চ  ২০২০। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৯৫ বছর। কবি বাদেও তিনি নিকারাগুয়ান ক্যাথলিক যাজক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। সাড়া বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাস অভিঘাতে নিমজ্জিত, আতংকিত সে সময়ে মৃত্যুর কারণে তাঁকে নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয়নি।  ক্লাস নাইন অথবা টেনে পড়ার সময় এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা পড়ি সংবাদ সাময়িকীতে। অনুবাদ করেছিলেন মফিদুল হক। এক গুচ্ছ  কবিতার সাথে ছিলো কবি পরিচিতি। পরবর্তী সময়ে মফিদ ভাইয়ের সাথে এর্নেস্তোকে নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে।কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের সাথে মফিদুল হকের দেখা হয়েছে, সম্ভবত ছবিও আছে। কবি এর্নেস্তো কার্দেনাল মূলতঃ  প্রেম, দ্রোহ এবং স্বদেশ চেতনার কবি কিন্তু তিনি বড়োবেশী উত্তর অামিরিকান সাহিত্যে প্রভাবিত ছিলেন। সে সময়েই নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট  বিপ্লবী দানিয়েল ওর্তেগার বেশ কিছু কবিতাও পড়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক সাহিত্য ও রাজনৈতিক কর্মী বন্ধুদের হাতে এর্নেস্তো কার্দেনালের মলিন মলাটের কবিতার বই দেখতে পেতাম। সেই ঝলমলে সোনালী সময়ে আমাদের মনোভূমিতে উদিত সূর্যের মত আরেকজন ধরা দেন বাংলা গানের বাঁক সুমন চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী সময়ের কবীর সুমন। আমরা পাগলের মতো সুমনের গান শুনি, সুমন সম্পর্কে, সুমনের সাক্ষাৎকার পড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের কীংবদন্তি শিল্পী পীট সিগার সুমনের বন্ধু্। সুমন পীট সিগারকে জানালেন তিনি নিকারাগুয়ায় যেতে চান। সেখানকার  সমাজ এবং বিপ্লব নিয়ে লিখবেন। পীট সিগার সুমনকে পাঠালেন তার বন্ধু নিকারাগুয়ার তৎকালীন সাংস্কৃতিকমন্ত্রী (১৯৭৯-১৯৮৭) কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের কাছে। নিকারাগুয়া ঘুরে এসে সুমনের বই প্রকাশিত হলো মুক্ত নিকারাগুয়া । সে সময়ে সুমন কাজ করতেন ভয়েজ অব আমিরিকায় সেই জন্যে ছদ্মনাম মানব মিত্র নামে প্রকাশিত হয়। কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা বাংলা ভাষায় অনেকেই অনুবাদ করেন তাঁদের মধ্যে মফিদুল হক, ফারুক মেহদী, আলম খোরশেদ ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কবি সৈয়দ তারিক অনুবাদ করেছিলেন কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। মাঝে মধ্যে অনেকেই কার্দেনালের কবিতার অনবদ্য অনুবাদ করেছেন যারা কেবলই কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের মুগ্ধ পাঠক। আমি নিজেও চেষ্টা করেছিলাম কার্দেনালের কিছু কবিতা ইংরেজী থেকে বাংলা করার। সেই অনূদিত কবিতাগুচ্ছ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিকে প্রকাশিতও হয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম এ কাজ আমার মতো মূর্খ মানুষের নয়। তারপরও যেগুলি অনুবাদ করেছি সেইসব নিয়ে একটি বই করার দুঃসাহসও করেছিলাম। আজ পযর্ন্ত তা’ হয়ে উঠেনি । কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের সাথে আমার একটা নিবিড়  যোগাযোগ গড়ে উঠেছিলো চিঠি, ইমেইল এবং ফোনের মাধ্যমে এবং শেষ পযর্ন্ত নিয়িমিত ছিলো। টরন্টোয় এসে তাঁকে জানালাম আমি নিকারাগুয়ায় এসে তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। এসে তাঁর সঙ্গে আড্ডা দেব, তাঁর কিছু ছবি তুলবো।   

তিনি জানালেন রাজধানী মানাগুয়ায় তার অফিসে এসে দেখা করতে। লোক ঠিক করা আছে। সেখান থেকে সেই সলেনতিনামি দ্বীপে আমাকে নিয়ে আসা হবে যেখানে তিনি থাকেন। যেহেতু টরন্টো নতুন এসেছি আমি উনার কাছে কিছুদিন সময় চেয়েছিলাম। ঝাকমারী জীবনের ডামাঢোলে ভুলেই বসেছিলাম মানুষটার বয়স নব্বইয়ের উপর, যে কোনদিন পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারেন … 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ফেরারী বাতাস এবং হারানো কলকব্জা | পারভেজ চৌধুরী

Wed Jul 8 , 2020
ফেরারী বাতাস এবং হারানো কলকব্জা | পারভেজ চৌধুরী 🌱 একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। ধূসর বিকেলের আকাশটা এখনও মেঘলা। একা একা বসে আছি ব্যালকনিতে। ফেরারী বাতাসে বারবার দুলে উঠছে পাইন গাছগুলি। একটা ফোন কল আসছে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি কোন নাম নেই, প্রাইভেট নাম্বার লেখা। কখনো কেটে দিচ্ছি। কখনো ধরছিনা, […]
Shares