মামুন খানের জলসায়রের পলি | সৌমিত্র শেখর

মামুন খানের জলসায়রের পলি | সৌমিত্র শেখর

🌱

জলের প্রতি অবারিত তৃষ্ণা মামুন খানের। ভাটি অঞ্চলের মানুষ বলেই কিনা জানি না, ‘জল’ তাঁর প্রিয়। একবার এক জলযানে ভেসেছিলাম কতিপয় কাব্যপ্রেমী সহযোগে, থ-ধরে থাকা মেঘনায়, সারারাত। সেখানে কবি-সঙ্গীতশিল্পী হাসান মাহমুদের দরাজগলায় গানের ঝরনাধারা নেমে আসে আর মামুন খানকে আনন্দে নৃত্য করতে দেখি। অবশ্য উল্লাস আমাদের কারো কম ছিল না। কিন্তু মামুন খানের ধারাটি ছিল ভিন্ন; পরম্পরা ছিল পূর্বাপর। এটা তাঁর কাব্যক্ষেত্রেও দেখা যায়। 

২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে শুরু করেছিলেন ‘জল ও জলপাই’ নামের কাব্যগ্রন্থ দিয়ে, আর এবার (২০২০) বের হয়েছে তাঁর ‘জলসায়রের পলি’। প্রথমটিতে জল থাকলেও শেষটিতে কিন্তু মাটি, উর্বর মাটি। তবে শব্দ হিসেবে ‘জল’ আছেই : জলে জলময়! মামুনের কবিতার বৈশিষ্ট্যই হলো, ছোট্ট করে ভ্রমরগুঞ্জন তোলা। দ্বিরেফ যেমন মিষ্টি শব্দে ফুলের চারদিকে মধুর সন্ধান করে, দুটো রেফের মতো বর্শারোম নিয়ে এদিক-ওদিক ওড়াউড়িতে থাকে নিজের মতো মত্ত– মামুন খানের কবিতাও তেমনি পাঠকের ওষ্ঠাধরে মধুর অনুরণন সৃষ্টি করে। শুরু হয়ে শেষও হয়ে যায়; জিভে থাকে কাঁচা আমলকি-স্বাদের মিষ্টতা। তাঁর কবিতার অবয়ব বাড়তে থাকে না কাঁঠালের অযাচিত আঁঠার মতো; সৌখিন গুম্ফধারীরা সাড়ে সর্বনাশে পতিত হন না! ক্ষুদ্রাবয়বতাই শুধু মামুনের কবিতার বৈশিষ্ট্য নয়, ছোটোর মধ্যে দারুণ এক দ্যুতি ধারণ করে তাঁর কবিতা উজ্জ্বল। এই দ্যুতি আছে বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতি সুনিবিড় টানে। একে ‘সুখটানে’র সঙ্গে তুলনা করা চলে। বিশেষ করে নিজ অঞ্চলের অন্তরছোঁয়া শব্দরাজিকে মামুন যখন তাঁর কবিতায় যোজন করেন, তখন তা স্বাভাবিক শব্দমূল্যের চেয়ে বেশি কিছু দাবি নিয়ে আসে। তাই ‘হারাইয়া বিচড়াই’ কিংবা ‘আছে ঝিলিঙ্গামারা রাত’ পাঠকের মনোজগতে বিশেষ দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি করে। 

 

প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ দুক্ষেত্রেই মামুন নিজের একটি ঘরানা তৈরি করে এগিয়েছেন। নিজেকে বলেছেন তিনি ‘জলসায়রের গোঁয়ার’: ‘আমি জলসায়রের গোঁয়ার / ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব দেশে দাঁড়িয়ে / গাকে উদাম করে দিয়ে অপেক্ষায় আছি তার–’। এই গোঁয়ারই কিন্তু সংবেদনশীল দৃষ্টি নিয়ে বৃদ্ধাসুন্দরীদের খুঁটেখুঁটে দেখতে দেখতে হাওরের পাড়ে পড়ে থাকা প্রায় পরিত্যক্ত নৌকাগুলোর একদা-যৌবন কল্পনা করেন। মামুন খানের কবিতায় চিল্কেরোদের মতো দর্শন উঁকি দেয়। এ দর্শনকে আরো আলোময় করেন রাধারমণ দত্ত, উকিল মুন্সি, জালাল খাঁর মতো মরমীরা। আর এখানেই তাঁর কবিতা পাঠকাত্মাকে ছায়া দেয়, ওষ্ঠাধর থেকে তা মর্মে প্রবেশ করে। যাপিত জীবনই শুধু ‘জীবন’ নয়, তার আর কোনো রূপ আছে; মামুন খানের শব্দবন্ধ/গুলোই ‘কবিতা’ নয়, তার এক ভিন্ন পরিচয় আছে। এ পরিচয় পেতে হলে হাতে নিতে হবে একমুঠো ‘জলসায়রের পলি’ : যেখানে বোঝা যাবে, মামুন খান নিজেই তাঁর ‘কবিতা’র রূপরূপান্তর নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসায় মুখর এভাবে– ‘যেমন এই যে আমি কবিতার সাথে / থেকে থেকে থেকেও ভাবছি / কবিতা কেমন?’ একই গ্রন্থের পাঠক হিসেবে এই একটি প্রশ্নেরই উত্তর আপনার আর আমার ভিন্ন হবে, অবশ্যই।  

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কবির নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ | মামুন খান

Fri Jul 17 , 2020
  কবির নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ | মামুন খান 🔸🔸🔸 হাওরের নির্জন উপান্তে বয়রালার পলি ও পললে মামুন খানের নির্জন আশ্রম। এখানে জীবন নীল হয়ে আছে আপন গাছের ছায়ায়। এই আশ্রমের শিক্ষা ও শান্তি দিয়েই কবি প্রতিদিনের উলঙ্গ বাস্তবতায় নিজেকে পবিত্র রাখেন। জীবন একটা জ্বলন্ত পাথর। এই জ্বলন্ত পাথরটাকে জনসমক্ষে দেখানো যায় […]
Shares