কবির নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ | মামুন খান

 

কবির নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ | মামুন খান

🔸🔸🔸
হাওরের নির্জন উপান্তে বয়রালার পলি ও পললে মামুন খানের নির্জন আশ্রম। এখানে জীবন নীল হয়ে আছে আপন গাছের ছায়ায়। এই আশ্রমের শিক্ষা ও শান্তি দিয়েই কবি প্রতিদিনের উলঙ্গ বাস্তবতায় নিজেকে পবিত্র রাখেন। জীবন একটা জ্বলন্ত পাথর। এই জ্বলন্ত পাথরটাকে জনসমক্ষে দেখানো যায় না। দুপুরের মাছরাঙার মতো চুপচাপ সইতে হয়। কবিতা মূলত কবির আশ্রম। ঘোষণাহীন শব্দগুচ্ছতে অনবরত সমর্পণ। আশ্চর্য জীবনের খোঁজে জেন সাধুরা বনের কুটিরে, পাহাড়ের খোপে জীবন কাটিয়ে দেন; ডানেবামে না তাকিয়ে মামুন খানও নিজের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।

কবির তিনটি কাব্যগ্রন্থ। আত্মযাপনের তিনটি আয়নায় একজন মামুন খানকেই খুঁজে পাই আমরা। ‘জল ও জলপাই’য়ে যে ভাষা ও অভিজ্ঞানের উন্মেষ ‘জলসায়রের পলি’তে তার বিকাশ। আসুন পাঠক, কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’ ভুবনে প্রবেশ করি। সেখানে নিজেকেই খুঁজে পাবেন। দেখবেন নিজের দিকেই হাওয়া বইছে। দেখবেন নিজের চেহারা শান্তি নিচ্ছে মরমি বাতাসে।

‘জল ও জলপাই ‘, ‘বাইরে দুপুর ভিতরে ভৈরবী ‘, এবং ‘জলসায়রের পলি’ কবির এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘কবির নির্বাচিত ত্রিশটা কবিতা’ পাঠকের দরবারে রাখা হলো। এই দরবারের নির্জন জিকির ও অভিজ্ঞানে অনুধ্যানের পাঠকবৃন্দ প্রবেশ করবেন- এই আমাদের প্রত্যাশা।

🌱

পাখিটা

এতক্ষণ তার মতই সে ছিল বসে।

যেই দেখতে শুরু করলাম
সেও শুরু করে দিল গোছাতে তার পালক।
মনে মনে যেই বললাম বাহ!
ডাল ছেড়েই সে দিল ঊড়াল!

ফেলে যাওয়া ডালটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে
মনে হচ্ছিল, বহুদিন কেঊ এসে বসে না
এমন একটি ভাঙা বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

আর ভেতরে, নির্জন দুপুরটাকে কাঁপিয়ে
কেঁদে যাচ্ছিল একাকিনী একটা ঘুঘু…

 

শূন্য

আমার সবচেয়ে সুন্দর দিনটিতে আমি থাকবো না।

আমাকে ঘিরে চারপাশে ফুটে থাকবে
অজস্র নরম দৃশ্য
গন্ধ উড়বে, পাথর গলবে
শংসাতরঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ‘হ্যাঁ’ করে কাঁপবে বাতাস
মৃদু-পাপড়ি আর মৃত্তিকার বিক্ষত পরতে পরতে
বাজতে থাকবে অন্ধ-এস্রাজ…

শতদিক থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে আসা শত শত স্বজন
ভেজা আকাশের ছায়া মেখে মুখে
দেখতে থাকবে আমাকে আমার না-থাকাকে।

আমি দেখবো না এর কিছুই।
আমার কাছে এসবের কোনো মানেও আর থাকবে না।

আমি তো তখন এই মহাপ্রেক্ষাগৃহের সমস্ত
রঙ রেখা ঘ্রাণ প্রাণ ধ্বনি সবকিছুকে একাকার করে দিয়ে
অতিকায় কালো একটা ‘শূন্য’ হয়ে যাবো।

 

চিরন্তন মানচিত্র

খনিজজৌলুসে ভরতি তোমার ভূগোল।
লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যুগ-যুগ ধরে খুড়ে যাচ্ছে
তবু একটুও হিজিবিজি হচ্ছেনা তোমার মানচিত্র।

তোমার পরতে পরতে লুপ্ত হয়ে থাকা
তরবারির খন্ডিত ডগা
রক্তাক্ত মখমল
ক্ষয়ে যাওয়া তুলি
ফেনিল পুঁথি
সবকিছু পায়ে দলে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকের দল।

তাদের নিঃশ্বাস যত দ্রুত আর ক্লান্ত হচ্ছে
ততই তুমি উজ্জ্বল হয়ে উঠছ দিনদিন…

 

সংসার

সন্ধ্যার আগে সারাদিন নানান ভঙিতে
এলোমেলো হয়ে থাকে জীবন।

থুথুর ফেনা জুতোর ধুলি নখের আচঁর গায়ে মেখে
যখন ফিরে আসি ঘরে
রাতের গায়ে একবিন্দু মোম জ্বালিয়ে
আলোর ওপাশে বসে থাকে বউ।

আলোর মতো নরম করে সে হাসে
নরম দু‘হাতে ভাঁজ করে দেয়
সারাদিনের এলোমেলো জীবন।

লোমের গোড়ায় জমে থাকা ঘামের গায়ে তখন
মনে হয় বসে আছে মাঝ-সমুদ্র থেকে উড়ে আসা
একঝাঁক শীতল ডানার পাখি…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

জিতসোমা-নয়

কামিনীর ঝোপ থেকে জানালায়
হামলে পড়ছে হাওয়ার পর হাওয়া ঘ্রাণের পর ঘ্রাণ
এমনই খাপে খাপে ঠাট করা রাত।

ডানা থেকে যখন সরে গেল
সমর্পণাচ্ছন্ন পালকের শিহরণ
আধোভেজা কেশরের আড়াল থেকে যখন
আমিও গুটিয়ে নিলাম তৃষ্ণা

মনে হচ্ছিল দমবন্ধ হিম একটা মহাকাল
কত যুগ যেন থমকে থেকে
মোমের আলোর পাশ ঘেষে
কোথায় যেন মিলিয়ে গেল হঠাৎ!

আমি পাথর থেতলানো আহত প্রাণীর মতো
একটু সোজা হয়ে কী যেন বলতে চাইছিলাম

যখন বলছিলে ‘মানুষ কত আজব, না?’

 

জিতসোমা-চৌদ্দ

রঙের আড়ালে মাটি
মাটির আড়ালে খড়
খড়ের আড়ালে খন্ডিত বাঁশ
-এ সবকিছুকে ছাপিয়ে যে তুমি
মোহিত করে রাখছ মন্ডপ
আমিই তার শিল্পী।

তোমার চারপাশ উচ্চ উলুধ্বনি আর ধূপধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
দূরে, অস্পষ্ট দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে
মনেই নেই তোমার!

লগ্নশেষে চারদিকে যখন
তোমাকে ঘিরে বেজে উঠবে বিসর্জনের কোরাস
পৃথিবীতে একটিমাত্র মুখ
বিষাদে নত হয়ে থাকা একটি মুখ
দেখতে যদি চাও
আমার দিকে তাকিয়ো একবার।

আমি যে কারিগর তোমার!

 

বাদক

হলভর্তি নক্ষত্রের সামনে আমাকে বাজাচ্ছো তুমি

তোমার আঙ্গুলের আনন্দে
লাফাতে লাফাতে কোনো কোনো নক্ষত্র
ছুটে আসছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দিকে

মহানক্ষত্রালোক থেকে ভেসে আসা করতালির শব্দে
আর মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে পৃথিবী

কেঁপে উঠছে তোমার আঙ্গুল

 

কবর

একটু আগে ভূ-গর্ভে ঠেলা দেয়া হয়েছে আমার আব্বাকে
নক্ষত্রের দিকে হাত রেখে আমরা এখন
তাঁর শান্তিময় ভূ-গর্ভবাসের প্রার্থনায় আছি

প্রার্থনায় আমরা যা-ই বলছি না কেন
আমরা জানি, স্থানটি শিয়াল শকুন থেকে নিরাপদ
ভূ-পৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলকেও রাখবে স্বাভাবিক

 

কবর : ২

দু’ফসলা জমিটির এক কোণে
নবীন-প্রবীণ অনেকগুলো কবরকে ভাবছি
ভাবছি পৃথিবীতে জমিগুলোর এরকম
লক্ষ লক্ষ কবরকে ভুলে যাওয়ার কথা

হয়তো ভুলে যাওয়া অসংখ্য পিতার উর্বরতা
আজো লাঙ্গলে লাঙ্গলে ফিরে আসে
আমাদের ফসলে ফসলে

 

তালাচাবি

বাইরে থেকে ফিরে রুমের তালায় চাবি
ঢুকাতে ঢুকাতে অনুভব করি অন্যরকম পুলক
রুমের ভেতরে তো একই রকম পরিচিত সব
তবু মনে হয় নতুন কিছুতে প্রথম প্রথম ঢুকছি

চাবি যে কী করে তালার
আজন্ম কঠোর কাঠিণ্যকে শিথিল করে ফেলে
তা আমি না বুঝেও বুঝি যে এদের
খাপে খাপে মিলে যাওয়াটাই ঘটনা

এই সামান্য ঘটনা ঘটার আগে
ক্যান যে এতো খাটাখাটি লাগে!

 

শেষ ঋতুর হাওয়া

বেড়ায় আড়াল হয়ে আছে বাগান
বাগানে গোপন হয়ে আছে ফুল

বেড়ার আশপাশে উড়ছে একজোড়া ভ্রমর
বাগান আর ভ্রমরের মাঝখান দিয়ে বইছে
শেষ ঋতুর হাওয়া

ভ্রমর জানে আড়াল-মধুর মাধুরী বেশি :
বাগান কী জানে বেলা পড়ে গেলে
তৃষ্ণা যে থাকে না ভ্রমরের!

 

গানওয়ালা

বিষণ্ণ একতারার পাশে বসে আছে অন্ধ এক গানওয়ালা

সে জানে চৈত্রের হাওয়া যতই উড়াক ধূলি
রোদে যতই পোড়াক লোকালয়
এই গানের কাছে কেউ না কেউ এসে দাঁড়াবেই

সে জানে তার আঙ্গুলের চেয়ে এমন মৌন ছন্দে
আর কে পারবে বাজাতে ধূলির মতো পতিত প্রাণ
তার গলার চেয়ে আর কে পারবে
এমন নম্র সুরে বোঝাতে বেদনা কারে কয়!

মানুষ যতই আনন্দবিলাসী হোক
সে জানে রোদনের চেয়ে মধুর কোনো সান্ত্বনা নেই!

 

কৃষক

বাতাসের মুখোমুখি বসে আছে আমার শরীর
আমার মন জানে এই বসন্তসন্ধ্যাটি
জ্যোৎস্নাহীন হয়ে যাবার আগে
পৃথিবীর ছোট ছোট শহরগুলো থেকে
বোরো সবুজের মতো কুমারীরা
নেমে আসবে আমাদের মাঠে মাঠে…

মাঠের মুখোমুখি কৃষকটি আমার মন।

 

গৃহিণী

শেষ বয়সী ডাঁটাটায় ঝুলে থাকা
যুবতী শিমগুলোর
অক্ষত বৃদ্ধা বয়স প্রার্থনা করছেন আমাদের মা

আমাদের দীর্ঘ বয়সী মা জানেন
শিমগুলোর প্রত্যেকটির রয়েছে
চারটি পাঁচটি করে অপার ভবিষ্যৎ।
আমাদের পাড়ায় পাড়ায় চালে চালে
মাচায় মাচায় অসীম সবুজের নিশ্চয়তা

 

চেয়ার

কেউ এসে বইসা পড়তে পারে এই ভয়ে
কেউ-ই ছাড়ছেন না চেয়ার

ত্যাগের বেগ নিয়েও প্রকৃত সুখ থেকে তারা
বি ত আজ এই একমাত্র চেয়ারেরই কারণে

একমাত্র চেয়ারকেই তারা এই জীবনে মেনেছেন সার

তারা পশ্চাৎ দেবেন তবু ছাড়বেন না চেয়ার!

 

দশশো বছর প্রাসাদবাসের পরও

দশশো বছর প্রাসাদবাসে ছিলো আমার অক্ষরজীবন
কিছু কিছু পংক্তি থেকে তা উদ্ধার করে পণ্ডিতেরা দেখলেন
আমার চোখ স্থির হয়ে আছে যেখানে
ভাতশূন্য হাঁড়িদের পাশে
শোভিত আমার শবরীর স্তনগুলো গুঞ্জারমালায়

একটি পদ্মের পাঁপড়িতে
যেখানে আমার ডোম্বীদের সুডৌল পায়ের নৃতকলা

পণ্ডিতেরা দেখলেন আমার শরীর থেকে
দশশো বছর প্রাসাদবাসের পরও ছড়িয়ে যাচ্ছে
সস্তা মদের একেকটি সহজ আনন্দ
একেকজন সহজিয়া সাধক

 

ওম

শাদা খোলসের নম্র যে ওম
তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো
উগ্র লাল এক লেপ
বালিকা তা ছড়িয়ে দিলো ছাদে

বোঝা গেল ওমেরও ওম প্রয়োজন
যা নিতে হয় খোলশ মুক্ত করে
যা হতে হয় আরো উগ্র আরো তীব্র…

 

ওম : ২

শীত এলেই বেড়ে যায় কোলবালিশের ব্যঞ্জনা
তার ওমের ঘোরে বিভ্রান্ত রাত যেন
কাটতেই চায় না

দিনের বেলায় কণ্টকিনী শিমুলের পায়ের কাছে বসে
প্রার্থনার মতো তাই কাঁদি
‘আসছে শীতে বোন তুমি মাংস প্রসবিনী হইয়ো!’

 

কোচিং লাইফ

দু’দিন সকালে উঠবার তাগিদে সারাটা সপ্তা ব্যস্ত থাকি

নরোম নরোম বালিকাদের সামনে
ণ-ত্ব, ষ-ত্ব, সন্ধিতে নিরস আমার গলা

আমার শাদা শার্ট তীব্র শীতেও লাল হয়ে ওঠে না।

জল ও জলপাই

এমনই নম্র-শুভ্র মিহি তোমার পোশাক
যেন অভিবাদন উন্মুখ এক রাজরক্ষিতা
দাঁড়িয়ে আছে সাজিয়ে স্বর্গ

আমরা যারা ছোটলোক; অর্থাৎ রাজবংশীয় নই
জল গিলতে গিলতে
বয়ামের ভিতর দেখে যাচ্ছি স্বচ্ছ জলপাই

বয়ামের ভ্রুক্ষেপ নেই তাতে, জলপাইয়ের তো নয়ই
আর তুমি তো জানোই ছোটলোকেরা
চিরকালই চক্ষুসর্বস্ব হয়

আরো জানো যে
সম্পূর্ণ পোশাকমুক্ত হওয়াটাও রাজরচিতে কদর্য

 

জল ও জলপাই : ২

পর্দার ফাঁকফোকর দিয়া
দৃশ্যমান হয় যেসব হালকা পাতলা নড়াচড়া
তারমধ্যে একমাত্র অ ল-বৈরাগ্যকেই মনে হয়
বহির্গামী

আর তার অনুগামী
জগতের যতো হীনমন্য নগণ্য নিম্নবর্গীয়
চক্ষুসর্বস্ব পোলাপান!

 

জল ও জলপাই : ৩

ছেলেকে ‘এ’তে অ্যাপল শেখাতে শেখাতে মাতা প্রায়
অর্ধনত, ভেঙে রয়েছেন।
কোলে তার ঝুলে রয়েছে অগোছালো তাঁত তাতেই
উৎকৃষ্ট পুষ্টিভর্তি বয়ামগুলো
স্পষ্ট পরিহাসে মেতে উঠেছে

কারণ দেখছে যে,
অভ্যাগত বালকটি মূলত অপুষ্টিতেই ভুগছে!

 

জল ও জলপাই : ৪

ভারতবর্ষের সব ক’টি দেশ ও প্রদেশের
হামলে পড়া তুফান হাওয়ায়
একলা নেচে যাচ্ছেন একরত্তি ঐশ্বরিয়া

শরীরকে রেখে যাই-যাই করছে তার
হালকা মিহি শাদা পোশাক

এই দৃশ্যে আমি আর বালিকাবোন
যুগপৎ সম্মোহিত!

এখান থেকে আমরা উভয়েই
অনেক কিছু দেখছি এবং শিখছি

 

আমি আর সাকীপা

ঝড় শেষে ঘর বিচ্ছিন্ন টিন কুড়াতে এসে
ডাল বিচ্ছিন্ন অসংখ্য আম পায়ে রেখে
আমি আর সাকীপা দাঁড়ানো ছিলাম

মেজোখালা দেখলেন
অবিচ্ছিন্ন যা কুড়াচ্ছি আমি।

 

সহজ-মুখ

আমার সহজ-মুখ দেখে তোমরা ভাবো
সবটুকু মুখস্থ তোমাদের!
চাকার নিচে ধূলির যে বেদনা আমার
তোমাদের চোখ থেকে লুকিয়ে রাখি তার নাগাল।

আমাকে মাড়িয়ে যাওয়া পায়েদের আনন্দ দেখেই বুঝি-
তোমাদের ডায়েরির কোনো পৃষ্ঠায় আঁকা নেই
দাদীমার হাসিমুখ নেই শেষ দিনগুলোতে
মায়ের পাশে থাকতে না পারার যাতনা।

তোমাদের চোখের খাঁ-খাঁ রোদ্দুর দেখেই বুঝি
বাবার কবর থেকে এখানে কোনোদিন এসে ভিড়েনি
এক ফোটাও সবুজ…

ছুটতে ছুটতে জীবন তোমাদের অনেক পেছনে পড়ে গেছে
কী করে পড়বে তোমরা আমার সহজ-মুখ!

 

ঘাসকন্যা

অনেক ঢালুতে
একেবারে জলের কোল ঘেষে
লতালতির সংসারে
নিভৃতে ফুটে আছো একাকিনী ঘাসকন্যা।

পাতারা আড়াল দিয়ে রেখেছে তোমার
নীলাভ যৌবন,শুভ্রমায়া যেনো কোনো
নিঠুর লুটেরা হাত এসে তোমায়
না পারে করতে হরণ ।

ছয়মাস পর জেগে ওঠা এই হাওড়ে
আলের পর আল মাড়িয়ে
সন্ধ্যার আগে আগে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায় যে সাধু
সে যদি উবু হয়ে হঠাৎ প্রণাম করে বসে তোমায়
কী ভাববে তোমার সমাজ, ঘাসপতিরা?

অসতী তুমিও কৌমার্যভ্রষ্টা?

 

উন্মাদের হস্তলিপি

উম্মাদের হস্তলিপি পাঠের আগে কিছু খেয়ে নেয়া ভালো।
তাহলে তার হিজিবিজি কালো কালো একান্নবর্তী সংসারের
নিজেকে ইজিলি ভাবতে পারবা বায়ান্নতম সদস্য।
অথবা তেত্রিশ কোটি নিরানব্বই হাজারদের একজন
সুকুমার শিবরাম সুলতান… আরও আরও
তারপর তুমি।

নদীপাড়ে গিয়ে যদি শুধু পানির কথাই ভাবো
তাহলে তুমি পাণিণীর কাছে যাও যাও
হায়াৎ মামুদের কাছে
তারা স্পষ্ট করে বসে আছেন মাতাল আর উন্মাদের সুস্পষ্ট ফারাক।

যেমন ফারাক্কা বাংলাদেশ: ইন্ডিয়া।
যেমন টুপি মগজ আর মাথা: বাম আর জামাত।

যদি অক্ষম তুমি সুশৃঙ্খলিত যাবজ্জীবন দণ্ডভার সইতে
তবে পড়ে যাও ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা
শুনে যাও যেকোনো ক্রেজি আন্ডারগ্রাউন্ড কিংবা
তুমূল জালাল খাঁ।

আর দেখতে চাইলে দেখে শিখতে চাইলে
বাংলাচার্য হেংলোপোংলো কাঁটা (তার) বিদ্ধ
ঋত্বিক তো আছেন-ই।

জলসায়রের পলি

জলা তলা শনি চানতারা ডিঙ্গাপুতা
জালিয়ার হাওরের নামে
কৈজানি কংশ বালৈ বয়রালা ঘোড়াউত্রা ও ধনু গাঙের নামে
বৈচাজুড়ি খালের নামে
ভেঁওরি বিলের নামে
বাইরাগ ও বাড়িপিছ ভাঙা আফালের নামে
আগাম জলে পচে যাওয়া
ফল ফসল ও ফসালির নাম
মজে যাওয়া গলই ও আলকাতরারঙা ধীমান ধীবরের নামে
কুডুরা মেড়া বরুণ ও হিজলের নামে
আদিগন্ত সবুজরঙা ফাল্গুনমাঠের নামে
উকিল জালাল শরৎ রশিদ ও রাধারমনের নামে
তােমাকে বন্দনা করছি, জলসায়র

তােমার লক্ষ লক্ষ পলি ও পললের ভঁজে
এই সামান্য জীবাশ্মের জন্য একবিন্দু রাখিয়াে ঠাই।
তুমি না দিলে ঠাঁই
এই ব্রহ্মাণ্ডে কে আছে, আমাকে নেবার!

 

চোরাপ্রবাহ

সন্ধ্যার আগে আগে
ঝাঁকে ঝাঁকে লাখে লাখে
পাখি আর পাখিরা
আমাদের গ্রামগুলাের মাথাগুলােকে
তীব্র পাখনার নিচে ফেলে রেখে রেখে
কোন দূর জলাভূমি ছেড়ে
কোন সুদূর বনভূমির দিকে যে ছুটে যেতো
আজো আমি ভাবি
তারা কি ঠিক ঠিক পৌছাতে পারতাে
স্বরচিত নীড়ে?
যেমন আমরা আজানমাত্রই
খেলা ও ক্রীড়া অসমাপ্ত রেখে হাঁস-মুরগীর মতাে পৌছে যেতাম মাতৃ-খোঁয়াড়ে।

 

অঘুমা প্রলাপ

কইর মানুষ কই যায়! কই যায় দিন! প্রেম থেকে বিশ্বাস চলে গেলে প্রেম যায় কই! মন থেকে মায়া উঠে গেলে মন কি আর মন থাকে! মানুষ মানুষ লতায় লতায় জড়ানাে যদি তবে এতাে ছাড়াছাড়ি কেন মানুষে মানুষে! -ঘুম না আসা রাত্রিগুলিতে জ্ঞানী-জ্ঞানী বুড়িদের মতাে এইসব কথা মনে আসতে থাকে। কী যে হয় তখন! পেছন তাকাতে পারি না, ক্লান্তি লাগে। হতাশা জেগে ওঠে। সামনে তাকাতে পারি, অসহায় লাগে। মনে হয় সব নৈরাশ্য নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে বাড়ির নামায়, অই হিজল গাছটার নিচে। এপাশ করি। ওপাশ করি। কোটি কোটি মরহুম রুহের গরম নিঃশ্বাসের ওপর ভাসতে থাকি। বৃষ্টি ধােয়া, শীতল হাওয়ার উতাল একটা ভােরের জন্য ছটফট করি। জ্বরগ্রস্ত রাতে মায়ের হাতখানার জন্য যেমন করতাম। এখন করি, না? কেন? মা এখন কই? এই যে আম পেকে পেকে গাছ সাবার হয়ে যায়, ছােট্ট নদীটার ঘােলা জলে মাছের মৌসুম এসে চলে যায়, ঈদ আসে ঈদ যায়- কই, কেউ তাে বাড়ি আয়, বাড়ি আয়’ বলে অস্থির করে তােলে না! মা চলে গেলে সন্তান কি অর্ধেক হয়ে যায়! কঠোর খেটে খাওয়া কদরহীন এক বিভ্রান্ত চাড়ালে পরিণত হয় মা-হারা মানুষ? প্রকৃতিও কি কমিয়ে দেয় তার মমতার সমতা?

 

অলৌকিক এক তর্জনী

কোনাে এক ঘােরলাগা মহাঅপরাহ্নে
বজ্ৰ এক বাহুর অগ্রে উদ্যত হয়েছিল অলৌকিক এক তর্জনী
যার প্রতিটি মুদ্রা
প্রতিটি দোলনী
প্রতিটি প্রকম্পন
শত শত বছর ধরে নত-চেতনার এক জাতিকে
যুগ যুগ দলিত এক ভূ-ভাগকে
আশ্চর্য-আজব এক জাদুবলে জাগিয়ে তুললো হঠাৎ!
গলায় এতো তেজ আসলো
যেন এরা হুংকার ছাড়া কথা বলে না
চোখে আগুনের এতাে লেলিহান
যেন বহুকালের ঘুম ভেঙে এইমাত্র তাকালাে আগ্নেয়গিরি
বাহুতে এতাে বল জাগলো
যেন প্রতিদিন পাহাড় উপড়ে উপড়ে বাড়ি ফিরে ওরা।
ফলে, মাত্র দুইশত ষাট দিন পার হতে না হতেই জন্ম নিলাে
স্বপ্নের লাল সবুজ এক দেশ বাংলাদেশ।
আর ওই তর্জনী
মহাকাশভেদী মহকালব্যাপী চিরন্তন এক সৌধ এখন।

 

জীবন গুচ্ছ

দু-একটা হাঁচি দিয়ে নির্ভার হয়ে যাবার নাম জীবন না।
দু-তিন শতাব্দী আগে
ভারত মহাসাগরের সর্ব দক্ষিণে ডুবে যাওয়া সপ্ততল পাল তােলা পর্তুগিজ জাহাজের কংকাল আবার জাহাজ হয়ে ভেসে ওঠার জন্য
জল ও শ্যাওলার সাথে
উপ, প্র-উপ ল্যান্সের সাথে
এখন, এই মুহূর্ত পর্যন্ত করে যাচ্ছে যে লড়াই হয়তাে, তারই নাম জীবন।

🔅🔅🔅
মামুন খান
জন্ম ২৫ আগস্ট ১৯৭৮, নেত্রকোনার মদন উপজেলার নায়েকপুর গ্রামে।
শিক্ষাজীবনের শুরু এবং শৈশবের প্রথম অংশ কেটেছে এখানেই। একই উপজেলার হাজরাগাতীতে তার স্থায়ী বাস।
বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক খান ও মা রহিমা আক্তার খানম দুজনেই প্রয়াত। চার ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।
স্ত্রী নিশাত আরা খান পান্না ও পুত্র পরম খানকে নিয়ে ঢাকায় তার ছোট্ট সংসার।
পড়াশোনা করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। বর্তমানে তিনি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বাংলাভিশনে জ্যেষ্ঠ প্রযোজক হিসেবে কর্মরত।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
জল ও জলপাই (কবিতা ২০০৮),বাইরে দুপুর ভিতরে ভৈরবী (কবিতা ২০১১),‘জলসায়রের পলি’(কবিতা ২০২০), হট্টিটিগুছ (সম্মিলিত কাব্যগ্রন্থ,২০০০), ।

সম্পাদনা: শূন্যদশকের প্রেমের কবিতা (যৌথ)

ই-মেইল: [email protected]

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বিদগ্ধ বিদ্যাময়ী হেনা দাস : আমার শৈশব শিক্ষক | শামীম আজাদ

Mon Jul 20 , 2020
বিদগ্ধ বিদ্যাময়ী হেনা দাস : আমার শৈশব শিক্ষক | শামীম আজাদ 🌱 আমরা তখন নারায়নগঞ্জে আমলা পাড়ায় লালবাবুর পুকুর পাড়ে থাকতাম । সারা পুকুর ভরা বেগুনী ফুল। আর আমার বয়স বারো। মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ে রানী ভবানী হাউস থেকে নাচ আবৃত্তি ও অনবরত গলপ বলার কান্ডকীর্তি শেষে কিন্তু ঐসব কান্ডের প্রমান […]
Shares