করোনাকে যুদ্ধ বলবো না | মুম রহমান

করোনাকে যুদ্ধ বলবো না | মুম রহমান

🌱

করোনা পরিস্থিতি প্রশমিত হয়ে এলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন উহুয়ানে যান তখন ঘোষণা দেন, জনগণ যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছিলেনআমরা যুদ্ধে আছি ডোনাল্ড ট্রাস্প মহাশয় তো নিজেকেযুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্টবলে ঘোষণাই দিয়েছেন। এখন রাজনৈতিক নেতা বা দেশের শীর্ষ কর্তাদের মুখেও করোনা ভাইরাস যুদ্ধের খেতাব পেয়েছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আক্রমণ কি সত্যিই যুদ্ধের সমতুল্য? এই যুদ্ধ কি খালি চোখে দেখতে নাপাওয়া জীবাণুর বিরুদ্ধে তাবত মানব জাতির? তা যুদ্ধটা লাগালো কে? যুদ্ধে করোনা জিতলে কার লাভ আর মানুষ জিতলে কার লাভ

কিন্তু সব প্রশ্নে যাবার আগে যেটা জানা দরকারি তা হলো, যুদ্ধ কি? যুদ্ধের সংজ্ঞা কি

প্রথম কথাই হলো, যুদ্ধ একটা সামরিক প্রক্রিয়া। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটি রাষ্ট্রের সশস্ত্র যুদ্ধ। এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্ম, গোত্র, জাতীয়তা ইত্যাদি শব্দও যোগ হতে পারে। তা যুদ্ধটা রাষ্ট্র, ধর্ম, মতবাদ যার সঙ্গেই হোক সেটা সশস্ত্র এবং সামরিক প্রক্রিয়া। একটা যুদ্ধে শুধু আহত, নিহতের সংখ্যাও শুধু নয়, সাথে যোগ হয় সম্ভ্রম হানি ভয়াবহ স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নাশ। কেউ মানুষ হারায়, কেউ মান হারায়, কেউ সম্পত্তি হারায়, কেউ ঠিকানা হারায়।  যুদ্ধ যথার্থ ভয়াবহ এক বিধ্বংসি প্রক্রিয়া। 

এখন বিশ্বব্যাপী গণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরাও করোনা যুদ্ধ, করোনা যোদ্ধা, এমনকি এই বংলাদেশে করোনা শহীদএর মতো শব্দ ব্যবহার করছেন। আপাতভাবে শব্দগুলা শুনতে ভালো লাগে। আপাতভাবে যুদ্ধের সঙ্গে করোনা ভাইরাসকে তুলনা করতে আরামও লাগে। কিন্তু যুদ্ধ আরজরুরি চিকিৎসা‘ (medical emergency)  এক নয়। রাষ্ট্রনায়ক, সিনেমার নায়ক, মিডিয়া যতোবার খুশি করোনা যুদ্ধ, করোনা যুদ্ধ বলে চেচাক না কেন আদতে এটা কোন যুদ্ধ নয়। ঋত্বিক রোশন আর টাইগার শ্রফ যতোই মারামারি করুকসিনেমার নামওয়ারহলো সেটা যেমন আসল যুদ্ধ নয়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে থেকে সাড়ে আটকোটি মানুষ মারা গেছে  বলে ধারণা করা হয়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ জীবন দিতে হয়েছে। বাকী ক্ষয়ক্ষতির হার বিশাল। যুদ্ধ কেবল প্রাণ নাশ করে না, শক্তি, ধনসম্পদের স্থায়ী ক্ষতি করে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যার কুপরিকল্পনার ধকল আমরা আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ১৯৪৫ সালের আগস্ট হিরোশিমায় ফেলা হয়লিটল বয়আর আগস্ট নাগাসাকিতে ফেলা হয়ফ্যাট ম্যান এই ছোট বাচ্চা আর মোটা মানুষ নামের দুই পারমানবিক বোমার কুপ্রভাব আজো বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কে ভোগাচ্ছে। 

প্রথম কথাই হলো করোনা ভাইরাস একটা রোগ। যদিষড়যন্ত্র তত্ত্ব‘ ( কন্সপেরেন্সি থিউরি)-গুলোকে গুরুত্ব না দেই তবে এটা একটা রোগ, যে রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে। রোগ যতো বড় আর বিশাল আকারও ধারণ করুক না কেন যুদ্ধের সমান বিধ্বংসী নয়। করোনার চেয়েও অনেক ভয়াবহ রোগ পৃথিবীতে এসেছে, গেছে এবং আছেও। এইডসে মৃত্যুর সংখ্যা করোনার চেয়ে বেশিই। আজো ডায়বেটিস রোগের প্রতিশেধক তৈরি হয়নি। কাজেই রোগকে রোগ হিসাবে দেখলে ভালো। একে যুদ্ধ বলে ঘোষণা যদি দিতেই হয় তবে এটি বায়োলজিক্যাল যুদ্ধ, সংক্ষেপে বায়োওয়ার (জীবাণু যুদ্ধ) এখন সমস্যাটি হলো জীবাণু যুদ্ধ এমনি এমনি হয় না। কারা কোন পরীক্ষাগারে জীবাণু তৈরি করেছে, কেন, কখন, কাদের বিরুদ্ধে জীবাণু ব্যবহার করেছেএইসব প্রশ্নের উত্তর হাতের কাছে না থাকলে করোনাকে জীবাণু যুদ্ধ বলে ঘোষণা দিতে অসুবিধা আছে। এখন যদি চীন, ফ্রান্স, ইতালি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করা যায়, করোনা যুদ্ধ কে লাগালো, তাহলে কি ঠিকঠাক উত্তর পাওয়া যাবে? যুদ্ধের পেছনে উগ্র রাজনীতি থাকে, শোষণবঞ্চনার ইতিহাস থাকে। মহামারি, সংক্রামক রোগ যতো জটিলই হোক যুদ্ধের মতো নোংরা নয়। যুদ্ধ জগতের নোংরাতম কর্মকাণ্ড। সেই নোংরা কর্মকাণ্ডের মধ্যে বেডেস্ট (আমার ভাতিজা আয়ান এই শব্দ বলে তীব্র রেগে গেলে) মানে খারাপতম কর্মকাণ্ড হতে পারে পরমাণু যুদ্ধ এবং জীবানু (অনুজীব) যুদ্ধ। কিন্তু কে এই বেডেস্ট কর্মটির দায় নেবেন? কেউ যেহেতু এই সন্ত্রাসী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করছেন না সেহেতু ধরে নিচ্ছি এটি যুদ্ধ নয়। 

কিন্তু করোনাকে যুদ্ধ বলতে অসুবিধা কোথায়?

এই অসুবিধাটা বুঝতে হলে ভাষার রাজনীতি বুঝতে হবে। আমি ভাষাবিদ নই, ভাষাপ্রমী। শব্দ সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করি। তারই প্রক্রিয়া হিসাবে শব্দের প্রভাব নিয়ে ভাবি। বিশাল নদী, ভয়াবহ সমুদ্র, বিরাট পাহাড়, বড় মসজিদ এই শব্দগুলো শব্দ জুটিতে বিশেষণের একটা প্রভাব আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, পারিবারিক যুদ্ধ, মাফিয়া যুদ্ধ এইসবগুলো শব্দ জুটিতে যুদ্ধ থাকলে প্রত্যেকটা যুদ্ধের ধাঁচ, ঝাঁজ, আকার, প্রকার আলাদা। স্বয়ং যুদ্ধ শব্দটাও এখানে নানা রকমের ইমেজ তৈরি করে। এই যে শব্দের ইমেজ তৈরি করা সেটা একটা বিরাট ক্ষমতা।আম‘ বললে চোখে এক রকমের ছবি ভাসেআঙুরবললে আরেক রকমের ছবি ভাসে। শব্দের ভুল ব্যবহার ছবিটাকে নষ্ট করে দেয়, একটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। 

করোনার সঙ্গেযুদ্ধশব্দের ব্যবহারে এখানেই আমার আপত্তি। যুদ্ধ শব্দ ব্যবহারের কারণেই করোনা একটা রাজনৈতিক চেহারা পায়। বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতারা (সে সরকার পক্ষ হোক বা বিপক্ষ হোক) করোনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেনকরছেন। কেন? কারণটা বের্টল্ট ব্রেখট মহাশয় বলে গেছেন বহু আগেই। কবি, নাট্যকার ব্রেখট বলেছিলেন (সম্ভবত মাদার কারেজ নাটকে), যুদ্ধ হলো সবচেয়ে বড় ব্যবসা। একটা যুদ্ধ মানে সহস্র কোটি টাকার অস্ত্র, গোলা বারুদ কেনাবেচার কারবার, জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোকমানোর কুনীতি। গোলা বারুদ কেনাকাটার মতোই চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা বেচা হচ্ছে, সে নিয়ে দূর্নীতিও হচ্ছে, জিনিস পত্রের দাম বাড়া কমার ফাজলামো অবশ্য ইদ, রোজা, পূজা, বন্যা,বৃষ্টিনানা অজুহাতেই হয়। তবু করোনা যুদ্ধ নয়। ফায়দাবাজরা যে কোন দূর্যোগকেই সুযোগ হিসাবে নেন এবং সুযোগটাকে  আরো বেশি বড় করে দেখিয়ে কাজে লাগান। 

ক্ষেত্রে করোনাকে যুদ্ধ বললে সাধারণ মানুষ আরো বিপদগ্রস্থ হবে। যুদ্ধের আতঙ্ক অনেককে বিভ্রান্ত করবে, সংশয় বাড়িয়ে দেবে।যুদ্ধশব্দের মধ্যেই অস্থিরতা, অশান্তি বিদ্যমান। সাধারণ মানুষকে এই অশান্তি, বিভ্রান্তির বাড়তি চাপে নাফেলাই ভালো। অন্যদিকে সুবিধা লোভীরাযুদ্ধ‘ শব্দ থেকেই মুনাফা আদায় করতে পারবেন। 

করোনা যথার্থ অর্থেই জরুরি স্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর করোনা সরাসরি হুমকি। এমন হুমকি পৃথিবীতে আরো এসেছে। এই হুমকিকে কাটিয়ে উঠতে হবে সঠিক পরিকল্পনা উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। এই প্রতিক্রিয়া এবং জরুরি অবস্থার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোআতঙ্কগ্রস্থ না হওয়া। দ্বিতীয় দিক হলো সমস্যার মূলে যাওয়া। বিশ্বব্যাপী যতো বিনিয়োগ আর উদ্ভাবন হানাহানির জন্য হয়েছে তার তুলনায় চিকিৎসা স্বাস্থ্য খাত যথার্থ অবহেলিত ছিলো।  এই দীর্ঘ অবহেলার নিরসন ঘটাতে হবে। লড়াই করতে হবে খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীকে পরিবারকে সহায়তা দিতে হবে। এবং এইসবই হতে হবে জরুরি সেবার মডিউলে। যুদ্ধ নয়, করোনাকে বিপদ, দুর্যোগ হিসাবে দেখতে হবে। তাতে করে করোনার প্রতি সবার দৃষ্টভঙ্গিও বদলাবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। এবং দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুদ্ধের ধারণাকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে।

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। পেশা- লেখালেখি। 

কবিতা, কথাসাহিত্য, অনুবাদ, নাটক, প্রবন্ধ, সাহিত্য-সমালোচনাসহ শিল্প-সাহিত্যের গভীর নির্জন পথে সতত সচল রেখেছেন দৃষ্টি ও মনন।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

স্যারের আশ্রমে জিয়নকাঠি | মুন্নী সাহা

Fri Jul 24 , 2020
স্যারের আশ্রমে জিয়নকাঠি | মুন্নী সাহা 🌱 তখন আমি এটিএন বাংলার ব্যস্ততম রিপোর্টার। ২০০৬ এর নভেম্বর। তুমুল পলিটিক্যাল টানাপোড়েন, এডিবি ওয়ার্ল্ডব্যাংকের নাক গলানো ব্রিফিং প্রায় প্রতিদিনই চলতো। খুব হন্তদন্ত হয়ে ছুটছিলাম এডিবির ব্রিফিংয়ে। হঠাৎ সুলতানা কামালের ফোন—” মুন্নী আমি তোর লুলু খালা। তোর স্যার ভীষণ অসুস্থ রে… গ্রীন লাইফ হসপিটালে […]
Shares