স্যারের আশ্রমে জিয়নকাঠি | মুন্নী সাহা

স্যারের আশ্রমে জিয়নকাঠি | মুন্নী সাহা

🌱

তখন আমি এটিএন বাংলার ব্যস্ততম রিপোর্টার। ২০০৬ এর নভেম্বর। তুমুল পলিটিক্যাল টানাপোড়েন, এডিবি ওয়ার্ল্ডব্যাংকের নাক গলানো ব্রিফিং প্রায় প্রতিদিনই চলতো। খুব হন্তদন্ত হয়ে ছুটছিলাম এডিবির ব্রিফিংয়ে। হঠাৎ সুলতানা কামালের ফোন—” মুন্নী আমি তোর লুলু খালা। তোর স্যার ভীষণ অসুস্থ রে… গ্রীন লাইফ হসপিটালে আছি আমরা। এখনই OT তে নেবে। বড় অপারেশন। তোকে একটু দেখতে চেয়েছিলো, আসতে পারবি?”

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি পান্থপথ ক্রস করেছি। গাড়ী ঘুরিয়ে তিন মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে, এবং একদম বাংলা সিনেমার মত একটা সিন্ বাস্তবে  ঘটে গেলো। আমার সামনে দিয়ে শাহেদ কামাল স্যারকে ট্রলিতে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে। স্যার… স্যার বলে করিডোরে দৌড়াতে লাগলাম। ট্রলিটা থামলো, স্যারের হাতের ইশারায়। ডান হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে, সেই রাজকীয় আওয়াজে বললেন- ‘আপনি এলেন আমাকে দেখতে’? চোখ ছলছল দু’জনেরই। একটুক্ষণ হাতটা ধরে রেখে, মুখে কোনো আওয়াজ না করেই কত কিছু যে বললাম। আমার শিক্ষকের চোখে স্নেহের বাড়াবাড়ি। চোখটা মুছে দিতে দিতে বললাম, ‘আপনি আবার সাইকেল চালিয়ে ইউনিভার্সিটিতে যাবেন স্যার। ক্লাস নেবেন। আমার মতো অনেকেই আপনার ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করে স্যার’। এবার রাগী, রোগাক্রান্ত জ্ঞানীজনের চোখে মিষ্টি হাসি। যে হাসি অনুবাদ করলে খাঁটি বাংলায় দাঁড়ায়— ‘কচু! ঘণ্টা! তোমরা সব আমার ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করো? আমি রেগে মেগে চক- ডাস্টার ছুঁড়ে মারি বলে, সব তোমরা আমার ক্লাস বাঙ্ক করো… বুঝিনা মনে করেছো’? 

স্যার চলে গেলেন অপারেশেন থিয়েটারে, আমি স্মৃতির অলিগলিতে। 

মাস্টার্সে স্যারের ক্লাস প্রথম পাই। এডিটিং। থিউরি, প্র্যাকটিক্যাল- দুটোতেই শাহেদ কামাল স্যার। প্রথম দিনেই সাদাপাকা গোঁফ, ক্লীন সেইভড, মাথাও সেইভ করা, সাদা ফতুয়া পরা, ঐশ্বরিক স্বর আর উচ্চারণে ক্লাসরুমে এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত দাবড়ানোর ভঙ্গী দেখে মোটামুটি সবাই কাঁপছিলাম। রাগী মানুষ হিসেবে ভয় নয়, দারুণ পার্সোনালিটি আর মেধার কাছে ভয় ও বিনয়। 

স্যার আমাদের সবার হাতে bss এর কপি ধরিয়ে দিলেন, অনুবাদ করার জন্য। খাতায় লিখছি। random দুয়েকজনকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, তোমার কপি কী? পড়ে শোনাও…

random এ আমি ধরা খেলাম। কপিটার slug, date line কেবল পড়েছি, আর ওমনিই স্যারের পাল্টা প্রশ্ন- কোটা-কিনা-বালি কোথায়? 

আমি এ্যা এ্যা করছি, স্যার হুকুম দিলেন– কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। 

পুরো ৫০ মিনিট কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ক্লাশ শেষে স্যার, টিচার্স রুমে নিয়ে গেলেন, গ্লোবটা ঘুরিয়ে  ঘুরিয়ে কোটা- কিনা-বালি, দেখিয়ে কত শত গল্প। সেই শুরু। তারপর থেকে, আমি স্যারের এডিটিং ক্লাসের একনিষ্ঠ শ্রোতা। আমার নিষ্ঠাকে স্যার লাই দিলেন, ভরে নিলেন বাৎসল্যের কৌটায়।  ক্লাসে, স্টাডি ট্যুর-এ স্যারের 

সঙ্গ-গল্প, জীবন-শিক্ষার লেকচারের নিষ্ঠাবতি এই শ্রোতারই বিশেষণ মিলেছে— “প্রিয় ছাত্রীর”। সেটা যে পড়ুয়া, ভাল ছাত্রী হিসেবে নয়, তা আর ফলাও করে বলার দরকার নেই বোধহয়। 

সেই থেকেই গুরু-শিষ্যার গাঁটছড়া, সে কারণেই অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে একটিবার দেখতে চাওয়া, সেই থেকেই আমার একান্ত তীর্থের ঠিকানা ‘সাঁঝের মায়া’। 

দেশ-বিদেশে মনের মত প্রিয়জনদেরকে আমার এই লিভিং তীর্থে নিয়ে যাই। আমার স্যার তাঁর খেই হারিয়ে ফেলা জ্ঞানের গল্প দিয়ে পূণ্য স্নান করিয়ে আমাদের শুদ্ধ করেন। আরো অনেকখানি, অন্যরকম বাঁচায় বাঁচিয়ে দেন। 

এমনি বাঁচাতে বারবার জন্মাতে চাই প্রিয় শিক্ষক। আপনি থাকুন আমাদের জিয়ন কাঠি হয়ে। ৮ শ্রাবণ আর ২৪ জুলাই একসাথে আজ। স্যারের আশিতে। শুভ জন্মদিন প্রিয় শিক্ষক।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

এই পথে আলো জ্বেলে ইতিহাসের মিষ্টিরস  | সৌমিত্র শেখর

Tue Jul 28 , 2020
আমার মনে হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সন-তারিখে ঠাসা মোটামোটা বইগুলো গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত রেখে ‘এই পথে আলো জ্বেলে’-র মতো বই যদি সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়, তাহলে ইতিহাসের পাঠবিস্তার সহজতর হতে পারে এবং পাঠক আনন্দ ও জিজ্ঞাসা নিয়ে সঠিক ইতিহাসও জানতে পারে। এই পথে আলো জ্বেলে ইতিহাসের মিষ্টিরস  🌱 সৌমিত্র শেখর […]
Shares