এই পথে আলো জ্বেলে ইতিহাসের মিষ্টিরস  | সৌমিত্র শেখর

আমার মনে হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সন-তারিখে ঠাসা মোটামোটা বইগুলো গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত রেখে ‘এই পথে আলো জ্বেলে’-র মতো বই যদি সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়, তাহলে ইতিহাসের পাঠবিস্তার সহজতর হতে পারে এবং পাঠক আনন্দ ও জিজ্ঞাসা নিয়ে সঠিক ইতিহাসও জানতে পারে।

এই পথে আলো জ্বেলে ইতিহাসের মিষ্টিরস 

🌱

সৌমিত্র শেখর

১৯৯৬-র জানুয়ারি। সবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। আমাকে পড়াতে দেওয়া হলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’। মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি এবং পড়িয়েছি। তখন বাংলাদেশে বাংলা পড়ানোর  বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র পাঁচটি: ঢাকা-রাজশাহি-চট্টগ্রাম-জাহাঙ্গিরনগর-ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। কোথাও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য পাঠ্য ছিল না, এতোটা আধুনিক লেখাতো ছিল না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বয়স তখন বাষট্টি বছর। এরপর তিনি আরও ষোল বছর বেঁচে ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সে দিক থেকে এগিয়ে ছিল। তারা পাঠ্য করেছিল সুনীল, গৌরকিশোরকে। সুনীলের সেই বই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও অ্যাকাডেমিক আলোচনা খুব বেশি তখন হয়নি। আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তীকে বললে, তিনি ছাত্রদের হাতে দেবার জন্য ‘সেই সময়’-এর উপর তাঁর একটি লেখা আমাকে দেন। সেটি পেয়ে আমার ছাত্রছাত্রীরা খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু আমি খুশি হয়েছিলাম ‘সেই সময়’ পড়ানোর সুযোগ পেয়ে। পড়ানোর সূত্রে ক্লাস শুরু করে পরে ‘সেই সময়-প্রথম আলো-পূর্বপশ্চিম-অর্ধেক জীবন’ পড়েছি এবং এখনো ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের আমি এই উপন্যাস চারটি (একাধিক খণ্ডে) পড়তে বলি। অনেকেই পড়ে। যারা পড়ে, তাদের আনন্দ দেখে আমি গর্ববোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেই সময়’ পাঠ্য শুনে পশ্চিমবঙ্গের অনেকে বলেছেন, সেকি, শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ পাঠ্য না করে সুনীলের ‘ওটা’! ঐ ‘ওটা’ শব্দের মধ্যে যে তাচ্ছিল্যভাব, লিখে আমি সেটা এখানে প্রকাশ করতে পারব না। হ্যাঁ, সুনীলের ‘সেই সময়’ নিয়ে আমারও জিজ্ঞাসা আছে। তিনি ‘ফিকশান’ লিখতে গিয়ে একটু বেশিই কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। তা না হলে মধুসূদনের অতি প্রিয় বন্ধু গৌরদাসের সঙ্গে তাঁর শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেন? কিন্তু আমি বলবো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬ সালে ঠিকই করেছিল। প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের হাতে মোটা হলেও একটি সহজেবোধ্য এমন বই তুলে ধরেছিল, সেখানে তারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের আধুনিক যুগের সূচনাটি গল্পের মতো করে পেয়েছিল। তা না হলে, একজন ছাত্র কি আমাকে এমনিতেই এসে বলে, ‘স্যার, আমার সামনে চরিত্রগুলো যেন কথা বলছে!’ জানি না, এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কী পড়ানো হয়।

আমি চব্বিশ বছর আগের এতোগুলো কথা স্মরণ করতে পারলাম, আনিসুল হকের ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ (২০১৯) বইটি পড়ে। তিনি এর আগে একই ধারায় আরও তিনটি গ্রন্থ লিখেছেন: ‘যারা ভোর এনেছিল’, ‘উষার দুয়ারে’, ‘আলো আঁধারের যাত্রী’। প্রথমটির যাত্রা ১৯২০ থেকে। অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘অর্ধেক জীবন’ দিয়ে যেখানে পশ্চিমবঙ্গের যাপিত জীবন তুলে ধরেন, সেখানে আনিসুল হক চলে আসেন পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। তাই সুনীলের ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর পাশাপাশি ‘যারা ভোর এনেছিল’ পড়লে ইতিহাসের বাঁকবদলটি বুঝতে সুবিধে হবে বাঙালি সর্বজনের। এসূত্রেই বলা যায়, ‘সেই সময়’ দিয়ে শুরু করলে ধারাবাহিকভাবে ‘যারা ভোর এনছিল’ দিয়ে পূর্ববঙ্গে পৌঁছা যাবে, ‘অর্ধেক জীবন’-এ বোঝা যাবে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ও বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির উত্তাপ। তবে এখানে শুধু ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ নিয়েই কথা বলা যাক।

আলো দিয়ে আলো জ্বালার কথা শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথের কাছে। পরে রণেশ দাশগুপ্ত সেটি দিয়ে তাঁর একটি বইয়ের নামকরণ করেন। ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ জীবনানন্দ দাশের শব্দগুচ্ছ; ব্যবহার করেন আনিসুল হক। খুবই প্রাসঙ্গিক ব্যবহার। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় বলেছেন: এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে। এই প্রত্যাশাসূত্রেই তাঁর কথা: ‘মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি / না এলেই ভালো হতো অনুভব করে; / এসে যে গভীরতর লাভ হলো সে-সব বুঝেছি / শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;’। আদতেই এটি ‘গভীরতর লাভ’ আমাদের। কিন্তু এই লাভ যাঁরা আমাদের ঝুলিতে পুরে দিয়ে গেলেন, তাঁদের অনুসন্ধানে ব্রতী আনিসুল হক। তিনি ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ গ্রন্থটি রচনা করেছেন ‘ফিকশান’ করে। ‘ফিকশান’-এর যে বৈশিষ্ট্য তা মান্য করেই এখানে সত্য আর কল্পনার এক দ্বিবেণী গাঁথা হয়েছে। ভূমিকাতে লেখক বলেছে: ‘এটি উপন্যাস হিসেবে পড়তে হবে, এই হলো লেখকের অভিপ্রায়। ইতিহাস হিসেবে এটিকে না পড়াই ভালো। যদিও কোনো ঐতিহাসিক তথ্য  ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়নি, বরং সত্যতা রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে পুরোপুরি।’ লেখকের এই অভিপ্রায় সত্যেও এখান থেকে ইতিহাস শিক্ষা করা সম্ভবপর। কারণ, বইটি হাতে পেয়েছি আমি ২০১৯ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। তারপর ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে আমার তাজাপাঠের সঙ্গে মিলিয়ে করোনাকালে যখন এটি সদ্যপাঠ করলাম, তখন দেখলাম আনিসুল হকের অসম্ভব কল্পনাশক্তি! ইতিহাসের অণুমাত্র সূত্র নিয়ে তিনি বাস্তবঘন এমন পরম্পরা সৃষ্টি করতে পারেন, যা তাঁকে বড়ো লেখকের মর্যাদা দান করে। ‘ফিকশান’-এ বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবার অধিকার আছে লেখকের। এখানে কিন্তু এতোটা ‘স্বাধীনতা’ নেননি লেখক। তিনি কল্পনায় সৃজন করেছেন এবং সেই সৃজনটি হয়েছে পাঠকের সংবেদনশীল অভিজ্ঞতার আলোকে। একটি উদাহরণ দিই: শেখ হাসিনা ‘স্মৃতি বড় মধুর, স্মৃতি বড় বেদনার’ নামে একটি লেখায় লিখেছেন– ১৯৬৬ সালে তিনি যখন উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী, পরীক্ষা দেবেন; তখন এক রাতে বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জ থেকে ৬ দফার সভা সেরে ধানমন্ডির বাড়িতে এসে খেয়েদেয়ে ঘুমোলেন। গভীর রাতে বই পড়ছিলেন বলে শেখ হাসিনা বুঝতে পারলেন, বাড়িতে পুলিশ এসেছে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার জন্য। নবনির্মিত দোতলা থেকে দ্রুত নেমে তিনি মোবাবিলা করলেন পুলিশের। বললেন, এতো রাতে বঙ্গবন্ধুকে কিছুতেই ডেকে দেওয়া যাবে না। তাদের সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে। সামান্য এই সূত্রটুকু নিয়ে শেখ হাসিনার এই সাহসী ও প্রত্যয়ী ভূমিকাকে লেখক অনিসুল হক আরও মহিমান্বিত ও বিশ্বাসঘন করে উপস্থাপন করেন ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ উপন্যাসে। উপন্যাস থেকে পুরোটা না-পড়লে শুধু লিখে এখানে বোঝানো যাবেও না সবটা। তবু সামান্য বলার চেষ্টা করা যাক: আনিসুল হক এই ঘটনায় শেখ হাসিনার যে সাহস আর সংবেদনশীল মনের পরিচয় তুলে ধরেন, এককথায় তা বিশ্বাসঘন ও অসাধারণ। তিনি লেখেন, পুলিশ এসেছে গ্রেফতারের আদেশ নিয়ে। শেখ হাসিনা দোতলা থেকে দ্রুত নেমে এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন; যেন বাংলা-মা তার সন্তানকে শত্রুস্পর্শ করার আগে ব্যূহ নির্মাণ করলেন। পুলিশকে শেখ হাসিনা বললেন, এতো রাতে পরিশ্রান্ত পিতাকে ডেকে দেওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের অসম্মানও করলেন না তিনি। গৃহকর্মীদের বললেন, বসার চেয়ার দিতে। পুলিশকে বললেন, সবাই বসে চা খান। তিনি গেলেন পুলিশের জন্য চা বানাতে। কিন্তু চোখে তাঁর পদ্মা-মেঘনা নেমে আসে। বুক ফেটে যায় কান্নায়। চা তৈরি হয়। আনিসুল হকের ভাষায়: ‘হাসিনা দোতলার ঘরে ইলেকট্রিক কেতলিতে চায়ের পানি গরম দিলেন। চা বানানো হলো। সবাই চা খাচ্ছে। একটু পরে আব্বা চলে যাবেন। হাসিনার চোখের পানি গিয়ে পড়ল তাঁর চায়ের কাপে।’ এরপর শেখ হাসিনা পিতার ব্যাগ গুছিয়ে দেন সযত্নে। কারণ, তিনি জানেন পিতা তাঁর কতদিনের জন্য আবার জেলে যাচ্ছেন, সেটি সবারই অজানা! আনিসুল হকের সাবলীল কল্পনা এভাবে সংবেদনশীল বর্ণনায় যখন বিশ্বাসঘন হয়ে ওঠে, তখন পাঠকের অন্তরে শেখ হাসিনার চরিত্রের দৃঢ়তা ও কমনীয়তা প্রকাশ পায় যুগপৎভাবে। উত্তরকালে তিনি যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করে জেলে যান, তবু আপোস করেন না; আবার একই সঙ্গে তিনি নিজের শিক্ষকের জন্য প্রধানমন্ত্রীর লালগালিচা ছেড়ে দিয়ে তাঁর পাশে হাঁটেন বা কাঁধের এলোমেলো শালচাদর গুছিয়ে দেন শিক্ষাগুরুর– এই দুই রূপের শেখ হাসিনার ইঙ্গিতই তুলে ধরেন আনিসুল হক। রবীন্দ্রনাথ যে গানে বলেছিলেন: ‘ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে / বাঁ-হাত করে শঙ্কা হরণ / দুই নয়নে স্নেহের হাসি / ললাটনেত্র আগুনবরন’– শেখ হাসিনা যেন ঠিক সেই মূর্তিময়ী।   সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কল্পনার স্বাধীনতা নিতে গিয়ে যেখানে বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করে ফেলেন, আনিসুল হক সেখানে বিতর্ক এড়িয়ে কথার পল্লব এমনভাবে বিস্তার করেন, যেখানে পাঠক পান পাঠসুখে অক্সিজেন। এমন কল্পনা ও উল্লেখ অনেকই তিনি করেছেন। যেমন, তাজউদ্দীন আহমদের কারাবাসকালে কন্যা রিমি-রিপির ট্রেনযাত্রা। সেখানে যাত্রীদের কাছে রিমির সময় জিজ্ঞেস করার ব্যাপারটি বেশ মজার করে উপস্থাপন করেছেন লেখক। এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ট্রেনের শব্দ ও ঝাঁকুনিতে লোকছড়ার সুর: ‘কয়টা বাজে? সাতটা! / কয়টা বাজে? আটটা! / কয়টা বাজে? সাড়ে আট!’ এসব পড়তে পড়তে মনে হয় না, খুবই সিরিয়াস ইতিহাসে পাঠক প্রবেশ করছেন (আদতেই কিন্তু করছেন); মনে হয়, কোনো সরল গ্রামীণ রচনা তাদের সম্মুখে। এভাবেই লেখক ইতিহাসের কঠিন স্ফটিক তালমিশ্রির মতো গুলে দেন।

‘এই পথে আলো জ্বেলে’কে যদি ‘৬ দফা থেকে ১১ দফা’ বলি তাহলে বোধ হয় মোটেও ভুল বলা হবে না। বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনটি দফা খুবই গুরুত্বপূর্ণ : ২১ দফা, ৬ দফা, ১১ দফা। ২১ দফার ব্যাপারটি ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ভিত্তি এবং তাতে মানুষ ২১ দফার পক্ষে ভোট দিয়ে যুক্তফ্রন্টকে জয়ী করে। ৬ দফাকে তো বলাই হয়: বাঙালির মুক্তিসনদ। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা উত্থাপন করেন। পুস্তিকায় লেখা ছিল, ‘ছয় দফা : আমাদের বাঁচার দাবি’।  আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণা করে। এই তিনটি দফারই মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম লিগের শাসনমুক্তি থেকে বাঙালির স্বাধিকারের পথ ধরে স্বাধীনতা অর্জন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯– এই চার বছর রাজনীতিতে বহু ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে আটক, আওয়ামী লীগের নেতাদের নামে হুলিয়া জারি, ভাসানির ৬ দফা বিরোধী অবস্থান, ১৯৬৮-এ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানো ও পাকিস্তানের দমননীতি গ্রহণ, ভাসানিসহ অনেক নেতার ভুল পথ অনুসরণ ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র লীগ ও দুই ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া ও মেনন) সমন্বয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে নিয়ে আসে আবার সঠিক পথে। এ সময় উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাংস্কৃতিক কর্মীদের নানামুখী প্রতিবাদী অংশগ্রহণ। তাঁরা রাজনীতির শূন্যস্থানটুকু পরিপূর্ণ করতে ছিলেন সচেষ্ট। 

আনিসুল হক রাজনীতির এই কঠিন চারটি বছরকে সহজ করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। কী করে ৬ দফার কাছে অন্য দলগুলোর নানা কর্মসূচি বা দফা ম্লান হয়ে যায়, কী করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয় এবং তিনি জনতার মনে ও কণ্ঠে ঠাঁই নেন, কী করে শামসুর রাহমান বা নির্মলেন্দু গুণের আন্দোলনের কবিতাগুলো জন্মগ্রহণ করে, আর কী করেই-বা এতো গান থাকা সত্ত্বেও ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়– এসবই ছবির মতো লেখক তুলে ধরেছেন তাঁর এই গ্রন্থে। আমার মনে হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সন-তারিখে ঠাসা মোটামোটা বইগুলো গবেষকদের জন্য সংরক্ষিত রেখে ‘এই পথে আলো জ্বেলে’-র মতো বই যদি সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়, তাহলে ইতিহাসের পাঠবিস্তার সহজতর হতে পারে এবং পাঠক আনন্দ ও জিজ্ঞাসা নিয়ে সঠিক ইতিহাসও জানতে পারে।

এই গ্রন্থে ব্যঙ্গমা আর ব্যঙ্গমির মুখ দিয়ে ইতিহাসের চালচিত্রটি বলিয়ে তারপরে কথকতার ভেতরে প্রবেশ করেছেন আনিসুল হক। এটি তাঁর কাহিনি পরিবেশনকৌশল। আমাদের পুরোনো কথারীতির এ অনুসরণ নিশ্চয়ই উপন্যাসটিকে বাঙালির অভিজ্ঞতার আরো নিকটবর্তী করেছে। এই ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমি ত্রিকালদর্শীর মতো ইতিহাসের গূঢ়কথা আগাম বলে দেয়। ভাসানি যে জানতেন, আইয়ুব খান পড়ে যাচ্ছেন আর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসছেন, সে ইঙ্গিত তারা দিয়েছে। এর আগে বেতিয়ারা যুদ্ধে নিজামউদ্দীন আজাদ অংশ নিয়ে শহিদ হবে, সে কথাও অগ্রিম বলে দিয়েছে; শেখ রাসেল সম্পর্কে বলেছেন, এই ছেলেটি দশ বছরের চিরবালক হয়ে থাকবে, কোনো দিন এগারো বছরের হবে না! এই গ্রন্থে কিছু মজাদার কিন্তু চলিতসত্য তিনি যুক্ত করেছেন। যেমন, ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল বড়ো হয় কিন্তু ভোট বেশি পায় না। আবার লেখা হয়েছে, ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে সব সময়ই ছাত্রী বেশি হয়। উল্লেখ্য, একথাগুলোয় সমকালীন সত্যতা আছে, কিন্তু ইতিহাসে লেখা ছিল না। সব মিলিয়ে একটি উপভোগ্য ‘ফিকশান’ ‘এই পথে আলো জ্বেলে’। আবার কথাটি বলি: ইতিহাসের স্ফটিককে তালমিশ্রির মতো গলিয়ে সুমিষ্ট উপস্থাপনা।   

২৮শে জুলাই, ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

অর্গাজম | জাহিদুর রহিম 

Wed Jul 29 , 2020
অর্গাজম | জাহিদুর রহিম  🌱 এক  ঘটনাটা অন্যভাবে ঘটতে পারতো যদি মদ সত্য কথা বলার গুণাগুণ ধারণ না করত। আমাদের চেনাজানা পরিচিত জগতের মধ্যে কিছু মানুষ খেয়ালে বেখেয়ালে একটা অদ্ভূত হওয়ার মতো হারিয়ে যায় যে হওয়ার উৎস অনুসন্ধান করেও পাওয়া যাবে না যদি না আপনি মাতাল হন। এবং মদ উৎস […]
Shares