শুক্রবারের ধারাবাহিক গদ্য ২ : বদ্ধ দিনে মুক্ত গান | মুম রহমান  

শুক্রবারের ধারাবাহিক গদ্য ২ :

বদ্ধ দিনে মুক্ত গান | মুম রহমান  

🌱

মানুষ কবে থেকে বেচাকেনা শুরু করলো? দিনক্ষণ ঠিকঠাক বলা খুবই মুশকিল হবে। বেচাকেনা তো শুধু টাকা পয়সার আবিষ্কারের সাথে সম্পৃক্ত নয়, তার শেকড় আরো গভীরে। শুরুতে তো বিনিময় ছিলো। আমার গাছে কলা আছে, তোমার পুকুরে মাছ আছে, আসো বিনিময় করি। তারপর ঠিক হলো, একটা মাছ আর একটা কলার মধ্যে বিনিময় মূল্যে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে। বিনিময়ের প্রাচীন এই পন্থা কিভাবে শুরু হলো? যখন উৎপাদন বা মজুদের হারটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হলো। আপনার কাছে অনেক মুরগি আছে, এতো আছে যে সেটা আপনার দরকার নেই, হয়তো আপনার দরকার লবণ, তেল, পেঁয়াজ। তখন মুরগির বিনিময়ে আপনি এগুলো পাবেন। কিন্তু যার লবণ, তেল, পেঁয়াজ আছে ধরা যাক তার মুরগির দরকারই নেই। তখনই বিকল্প ভাবনা মাথায় এলো। মুরগি কিংবা তেল কিংবা পেঁয়াজ সবকিছুই কেনা যায় বা বেঁচা যায় এমন একটা কিছুর দরকার হলো। সেই দরকার থেকেই কড়ি, টাকা এলো। কড়ি, টাকার বাড়লে সম্পত্তি বাড়তে থাকলো, সম্পত্তি বাড়তে থাকলে ক্ষমতা বাড়তে থাকলো। পুরো ব্যাপারটাই একটা চক্র। অর্থনীতিবিদরা এইসব চক্র নিয়ে ভালো বলতে পারবেন। 

তবে আমার সামান্য জ্ঞানে যা মনে হলো, টাকাকড়ি কেন্দ্রিক পণ্য সভ্যতার একটা চূড়ান্ত জায়গায় আমরা বাস করছি। এই পণ্য সভ্যতা আমাদেরকে উপভোগের চেয়ে ভোগের দিকে ধাবিত করে বেশি। ধরুণ, একটা আইফোন ছাড়া কিংবা নিদেন পক্ষে একটা স্মার্ট ফোন ছাড়া আপনার চলেই না, টেলিভিশন ছাড়া আপনার চলেই না। কিন্তু কথাটা কি আরো কয়েক শতাব্দী আগেও কেউ ভেবেছিলো। প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন নতুন পণ্য এসেছে, যথাবিহিত সেই সব পণ্য বিক্রির স্বার্থে আমাদেরকে বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছে কিংবা এমন অভ্যস্ত করিয়ে ছেড়েছে যে ওই পণ্য এখন অপরিহার্য। 

পণ্য সভ্যতার ভয়াবহ দিকটা এখানেই। যা ছাড়া আপনার জীবন দিব্যি চলছিলো তাকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেবে যে সেটা ছাড়া আপনি জীবন যাপনই করতে পারবেন না। একটা ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইত্যাদি আমাদের জীবনে অতি দরকারী। জীবনযাত্রার মানকে সহজ করেছে। তবুও তর্কের খাতিরে কিংবা তর্ক পেরিয়ে আরো গভীরে ভাবা যায়, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই কিন্তু তার জন্য ক্ষতিও হয়েছে খানিকটাই। তাজা খাবার, চুলায় রান্না করা খাবারের মান স্বাস্থ্যগত উচ্চতা সবাই স্বীকার করবেন। তাই বলে যে নাগরিকতার কথিত আধুনিক জীবনযাপন করি আমরা সেখানে প্রতিদিন রান্না করা, প্রতিদিন বাজার করা সম্ভব নয়। ফলে ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ থাকা ভালো। যদিও প্রত্যেক পরিবারের কর্তার উপর এগুলো কেনার বাধ্যতামূলক চাপ থাকেই।  প্রয়োজনে কিংবা বাধ্য হয়েই কিংবা দরকারেই আমরা এক জীবনে বহু পণ্যই কিনে থাকি। কিন্তু এই মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখুন। একবার ভেবে দেখুন তো আপনার চারপাশে যা কিছু আছে তার সবই কি দরকারি? এমন কোন জিনিস কি আপনি কেনেনি যা নাকিনলেও হতো। 

পণ্য ক্রয়বিক্রয়ের সাথে কিন্তু অনেক কিছু জড়িত। গাড়ি কিনলে গ্যারেজ লাগে, একটা নতুন ডাইনিং টেবিল কিনলেও ঘরে জায়গা লাগে, জামা কিনলে আলমারি লাগে, বই কিনলে সেলফ লাগে এইভাবে একটার কান ধরে আরেকটার মাথা আসে। সেই যে গল্পটা, এক সন্ন্যাসী নির্জন এক দ্বীপে গিয়েছিলো সাধনা করতে। সে কোন কিছুই সঙ্গে নিয়ে যায়নি। সাধু জীবনে আর কিইবা লাগে। কিন্তু দ্বীপে খুব ইঁদুরের উপদ্রব। ইঁদুর তাড়াতে সে একটা বিড়াল নিয়ে গেলো, বিড়ালকে খাওয়াতে লাগে দুধ, দুধের জন্য গরু কিনলো সে। গরুকে দেখা শোনার জন্য রাখাল, রাখালকে খাওয়ানোর জন্যএইভাবে পুরো দ্বীপটি আবার লোকালয় হয়ে উঠলো। দ্বীপের নির্জনতাও শেষ, সাধুর সাধনাও শেষ। বড় অদ্ভূত চক্র। চক্র থেকে বের হওয়া সোজা কথায় অসম্ভব। আমরা শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনকে বাড়াতে বাড়াতে এক তীব্র ভোগবাদের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি। 

এই সময়টাতেই করোনা ভাইরাস নামে আণুবীক্ষণ ভাইরাস এলো। এই ভাইরাস খালি আমাদেরকে কোভিড ১৯ নামের রোগই দিলো না, অনেক কিছু শিখিয়েও দিয়ে গেলো। আমরা দেখলাম, ভোগবাদী সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানা ক্ষতকে। শিক্ষা যখন ব্যবসা, চিকিৎসা যখন ব্যবসা তখন পরিণতি কতো ভয়াবহ হতে পারে তার কিছু নমুনা আমরা এই ক্রান্তিকালে দেখলাম। সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দেখলাম, পণ্য সভ্যতা আর ভোগবাদের হাহাকার। দোকানে দোকানে, শপিং মলে মানুষ লাইন দিয়ে জিনিস কিনতে লাগলো। কোনটা তার লাগবে কোনটা তার লাগবে না তা বুঝতেনাবুঝতেই দোকান থেকে পণ্য উধাও। আমরা যখনই একটা কিছু কোন অহেতুক কিনে বসি তখনই কিন্তু যার জন্য জিনিসটা ভয়ানক প্রয়োজনীয় ছিলো তার ভাগে টান পড়ে। ফলে সংকট তৈরি হয়। ওষুধ, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেলো মানুষের লাগামহীন কিংবা বিবেচনাহীন পণ্য খরিদের স্বভাবের কারণেই। এই সুযোগে মুনাফালোভীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেও কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করতে লাগলো। সব মিলিয়ে বিদ্যমান ভারসাম্য টলে গেলো। আর বাজারে অস্থিরতা মানেই কিন্তু একটা বড় রকমের সামাজিক সংকটের সম্ভাবনা। 

একদিকে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, কাজ হারাচ্ছে, নিয়মিত উপার্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি খরচের চাপ সইতে পারছে না। একটা সাধারণ জ্বর কিংবা ব্যথা নাশক ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। ধরুন, একজনের সাধারণ সর্দিকাশি হয়েছে কিংবা আকস্মিক হৃদরোগই হয়েছে। তাকেও কিন্তু এখন চিকিৎসাক্ষেত্রে বাড়তি ঝামেলা খরচ বইতে হবে। এরমধ্যে আছে আবার অবিশ্বাস, ভুল চিকিৎসা, ওষুধের সংকট। ওষুধ কেনা, টেস্ট কিট কেনা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ব্লিচিং পাউডার, লিকুয়িড সোপ, টিস্যু পেপার, টয়লেট পেপারআরো কতো কিছু কেনার তালিকাকে বাড়িয়ে যেতে লাগলো। আর কিনতে গেলেই কেনাবেচার চক্করে পড়তে হবে। পণ্য কেনা মানেই কয়েক হাত হয়ে সেটা আসা, একটা ব্যবসায়িক চক্র পার হয়ে আপনার হাতে আসা। তাই, এই ক্রান্তিকালে যখন আপনার নিয়মিত আয়ে বাধা পড়ছে তখন আপনি পণ্য কেনাবেচার ফাঁদে আরও নাজেহাল হচ্ছেন। 

এই দিন হয়তো কেটে যাবে। যাবেই। আঁধার যতো গাঢ়ই হোক আলো আসবেই এক সময়। তখন কি আমরা মনে রাখবো, তখন আমরা ভেবে দেখবো, আমাদের জীবন ধারণের জন্য যতো কম পণ্যের দাস হবো ততো ভালো থাকতে পারবো। শেষতক পণ্য কেন্দ্রিক এই পূঁজিবাদী সভ্যতার লাভ লোভের জাল থেকে বেরুতে হবে একদিন আমাদের।  

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। পেশা- লেখালেখি। 

কবিতা, কথাসাহিত্য, অনুবাদ, নাটক, প্রবন্ধ, সাহিত্য-সমালোচনাসহ শিল্প-সাহিত্যের গভীর নির্জন পথে সতত সচল রেখেছেন দৃষ্টি ও মনন।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সাফো | মুম রহমান

Sat Aug 1 , 2020
সাফো | মুম রহমান 🌱 সাফো বিশ্ব কবিতায় নারীর কণ্ঠস্বর খুঁজতে গেলে সবার আগেই সাফো’র নাম আসে। প্রাচীন গ্রীসের এই কবি তার রচনা বৈশিষ্ট্য ও বক্তব্যের ভিন্নতায় নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। সাফো’র অধিকাংশ কবিতাই হারিয়ে গেছে। তবু যেটুকু টিকে আছে তার বৃহৎ অংশই প্রেমের কবিতা। সেই প্রেমও নারীর প্রতি নারীর […]
Shares