লাফাঙ্গার টাইমলাইন | শেখ লুৎফর

লাফাঙ্গার টাইমলাইন | শেখ লুৎফর

🌱

সাকেরের এয়ার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে তবু সে ভাব নেবার জন্য সেটা সারাক্ষণ কানে ঝুলিয়ে রাখে। লাম্পট্য ও রাহাজান চর্চিত এই সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সে জেনেছে, বর্তমান জামানা চলে ভঙ্গি ও বলে। যেহেতু তার রাজনৈতিক-বড় ভাই আছে তাই তার বলিয়ান হাত আগ্রা থেকে দিল্লীর তখতে তাউস পর্যন্ত লম্বা। সে মনে করে এই ডিজিটাল লাইফ ভাবে কাত, ভঙ্গিতে মাত ! 

সাকেরদের ভাব ভেতো-বাঙালির মতো নয়। তারা শিশুকালে হামা থেকে দাঁড়াতে গিয়ে হাত বাড়িয়ে ভাই-বোনের হাত নয়, ধরেছিল মোবাইল সেট। হয়ত তাই তাদের শিশু মন মানবিকমন্ত্রে দীক্ষিত না হয়ে বাঁধা পড়েছে তড়িৎচুম্বকিয় তরঙ্গের আবেশে। সেজন্য তারা মানবীয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও ভালোবাসা নামক শব্দগুলাকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে জানে না। চোখ মেলে দেখে না চারপাশ, বুঝতে চায় না মানুষ ও পশুতে ভেদ কী। তারা দেখেনি বঙ্গবন্ধু-ভাসানিকে। কখনো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেনি বায়ান্ন কিংবা একাত্তরকে। তারা দেখেছে সিরিজ বোমা হামলা, অগ্নীসন্ত্রাস, হলি আর্টিজান থ্রিল, বিডিআর বিদ্রুহ, রক্তাক্ত পিলখানা। বাবার হাতে খিরানো গাভির কাঁচা দুধের ঘ্রাণ নয়, টেস্টিসল্ট, ফরমালিন কালচার আর ইয়াবার নীল ধূাঁয়ায় বিকৃত, বিষাক্ত হয়ে গেছে তাদের মনন-মগজ, বিশ্বাস, নিশ্বাস। বোধকরি তাই তারা জীবন-জগৎকে স্মার্টফোনের সংকির্ণ পর্দায়, ইমু-মেসেঞ্জার আর ফেসবুকের রঙিন পাতায় দেখতে অভ্যস্থ ! 

সাকেরের খিদায় পেট জ্বলছে। কিন্তু বাড়িতে যেতে তার ভাল্লাগে না। ঘরে ঢুকলেই মা ঘ্যানর ঘ্যানর করে, এই যুগে কেউ বেকার থাহে ? আর যুদিন কোনো চাকরি কপালে না জুডে তাইলে গারমেন্সে যাস না ক্যায়া ?

বাপ্ তাকে দেখলেই খাউ খাউ করে ওঠে। মা-বাপের দিকে তাকালে সাকেরের মনে হয় ওরা তাম্র যুগের প্রাণী। তাদের চিন্তা-চেতনা এখনো নূহনবীর যুগে ঘুরপাক খায় ! এসএসসির দুই বছরে সে পঞ্চাশ দিনও ক্লাস না করে, বইয়ের একটা পাতাও ভালো করে না পড়ে দিব্যি কলেজে ওঠে গেছিল। শুধু ভর্তি আর ফ্রমফিলাপ বাবদ দুই-তিনদিন কলেজের অফিসে ঢুকেছিল। তাবাদে কলেজের মাঠে আর গেটের সামনের স্টলগুলাতেই হারুমতারুম করে সে বিএ পাশ করে ফেলেছে !  

সাকের মনে মনে এইসব ভাবতে ভাবতে বাজারের দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকে। ধীরে ধীরে হাঁটার মাঝেই সে ইরনকে লিখে, আমি বাইজিদ্দ্যার টাইমলাইনে আছি, তুই লিক্সনরে নিয়া চলে আয়।

ইরন আর লিক্সন তার প্রতিবেশি। এই বাজারের পশ্চিম সীমায় দাঁড়িয়ে জোরে একটা ডাক দিলে আবু মুন্সির বাঁশঝাড়, পন্ডিতের বাপের কলা ক্ষেত পেরিয়ে তার মায়ের কানে বাজবে সেই ডাক। তবু সাকের পারতপক্ষে বাড়িতে যায় না। বাড়ি মানেই ফালতু কতকগুলা মুখ,  নানান কিছিমের দায়-দ্বন্ধ, আবেগিয় জটিলতা। মান্ধাতারি আমলের এইসব পুঁতিগন্ধ সাকেরের অসহ্য।

তো এই বাজারে বাইজিদ নামে মোডাগাডা একজন মানুষ আছে। কালো আর খসখসা চামড়ার পেটমোটা মানুষটা একটা রেস্টুরেন্ট চালায়। ওটার কোনো নাম ছিল না। সাকেররা নিজেদের দরকারে নাম দিয়েছে টাইমলাইন। কারণ এখানে সবসময় তাদের গ্রুপের কেউ না কেউ আড্ডা জমিয়ে রাখে। সে হাঁটতে হাঁটতে বাইজিদের হোটেলে চলে আসে। হোটেলের ক্যাশে বসে বাইজিদ দূর থেকে নীরবে সাকেরকে দেখছিল : চুলে মিনিভি স্টাইলের কাট, বিরাট কোহলি স্টাইলের দাড়ি। পরনে গোলগলা টি-শার্ট-হাফপেন্ট। গেঞ্জিটার সারা বুকজোড়ে একটা ঘোড়ার ছবি। ঘোড়াটা পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে হিংস্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের পা দুইটা শূন্যে ঝাঁপটা মেরে প্রাণিটা মহাশূন্যে লাফিয়ে উঠতে চাইছে !

মাথা নুয়ে মোবাইল টিপতে টিপতে অন্ধের মতো ধীর গতিতে হোটেলে এসে ওঠে সাকের। এইসব ছেলেদেরকে দেখলে বাইজিদের শরীর-মনে অশান্তি হয়। তার গায়ে-পায়ে কে যেন এক লোটা গু ঢেলে দেয় ! সে জানে, এই আপদটা এক্ষণি ফোনে ডেকে ডেকে আরো কতকগুলা জঞ্জালকে জড়ো করবে। এই জ্বালায় বায়জিদের বুকটা জ্বলছে। তবু সে হাসি হাসি মুখকরে বলে, বস্ দেখা যায় আজকুয়্যা সকাল সকাল আইয়া পড়ছে !

সাকের মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ না তুলেই নাকটা একটু ফোলায়। যেন তার পাশে একটা দূর্গন্ধময় চিকা খামাখা চুকচুক করল ! বায়জিদ চেঁচিয়ে ওঠে, এই বছির দক্ষিণের টেবিলটা বসের লাগি ছাফ কৈরা দে।

বছির নামের হোটেলবয় পাশের টেবিল থেকে দৌড়ে আসে। জানালার পাশের টেবিলে যে দুইজন ছিল তারা তিন টেবিল দূরে গিয়ে বসে। যারা চা-নাস্তা কিংবা আলাপে ছিল তারাও সাকেরকে ভয় মেশানো ঘৃনার চোখে এক নজর দেখে। কিন্তু সাকের কাউকে দেখে না। এই না দেখাটাই হলো তার ভাব।

সাকেররা তিনজনে কড়াভাজা পোয়ারুটা-ডিমপোজ দিয়ে নাস্তা শেষে বছিরকে ডাকে, এই জাফরের দোকান থাইক্যা পাঁচটা বেনসন নিয়া।

বাইজিদ মনে মনে জাফরের টং দোকানটা দেখে। সকালেই যদি ছেলেটার পাঁচটা বেনসন ফাউ চলে যায়, তাইলে সারাদিনে কয়টা যাইবো ?

এই সকাল বেলাতেই বাইজিদের এক-দেড়শ টাকা নাই হয়ে গেলো ! এই শোকে লোকটা ঝিমধরে বসে বসে পাছা চুলকায়। সবাই জানে ভাদ্দরের গরমে তাল পাকে। গেরামের লোকজন পিঠাওঠা খায়। কিন্তু এখন তো আর সেই যুগের গেরামও নাই তালগাছও নাই, তাই বাইজিদের পেকেছে পাছার ঘামাচি !

ডাল-রুটি-ডিমপোজ গেছে কিন্তু সিগারেটের জন্য ক্যাশ থেকে বাড়তি ষাট টাকা দিতে হচ্ছে না দেখে বায়জিদের বুকটা হালকা লাগে। সে মন দিয়ে ওদেরকে দেখে: চুল-দাড়ি, হাফপেন্ট-গেঞ্জিতে সবকটা তার কাছে পচনধরা পায়ের গ্যাংগ্রিন এর মতো। 

বছির সিগারেট নিয়ে ফিরে আসে। ভয়ে ভয়ে প্যাকেটটা টেবিলে রেখে ছেলেটা নিঃশব্দে কাজে ফিরে যায়। এদেরকে সে কেন ভয় পায় ? বছির জানে না। গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়ালের মতো বছিরের অবোধ মনটাও এমনি এমনি বুঝে, এদের কাছে ভিড়তে নাই ; এরা বাপ-ভাই চিনে না, মা-বোন বুঝে না !

সাকের তার সামসং জে-থ্রি সেটের পর্দাটা ইরনের সামনে এগিয়ে ধরে। লম্বা-ঢ্যাঙা চেহারার ইরনের মুখভর্তি বড় বড় দাঁত। তাই সে সবসময় কালো মোটা মোটা ঠোঁট দুইটা চেপে বেতছর দাঁতগুলা লুকিয়ে রাখতে চায়। ইরন দেখে, সাকেরের ইমুতে রিমঝিম নামের মেয়েটা লিখেছে, তোমার কথা মতো আমি রেডি হয়েই আসছি। আজ রাতেই আমরা বিয়ে করব ইন্শে আল্লাহ !

ইরনের বড় বড় দাঁতগুলা আপনা থেকেই কড়মড় করে ওঠলে সে মুচকি হাসে। ইরনের হাসি দেখে লিক্সনও সামসং জে থ্রি এর পর্দায় টেক্সটা পড়ে। সাকের সেটটা পকেটে রেখে দাঁড়ায়। ল…

ভাদ্রের খাঁ খাঁ রোদ আর বাজারের অগুনতি মানুষকে ওপেক্ষা করে রহিমের দোকানের কোনায় দুইটা কুকুর-কুকুরি জট লেগে গেছে ! লিক্সন হাসে। ছোট ছোট কুতকুতে চোখ দুইটা তার বিষাক্ত কামনায় খাঁ খাঁ, শালা দ্যাহি হেব্বি চামে আছে !

ইরন সাকেরকে তাড়াদেয়, পিক ল। ইরনরা পিকচারকে পিক বলে। আত্মিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলার মতো তাদের মুখের শব্দগুলাও কেটে-ছেঁটে এই এতটুকু করে নিয়েছে ! সাকের ওচাং ওচাং করে বিভিন্ন এ্যাঙ্গেল থেকে সঙ্গমরত প্রাণী দুইটার অসংখ্য ছবি তুলে ! আদিম আমুদে আটখানা লিক্সন সতেরটা সেলফিই তুলে ! ইরন সব কটা দাঁত বেড় করে হাসছে আর জোরে জোরে হাত তালি দিয়ে ভালোবাসায় মগ্ন দুই জীবাত্মাকে উত্ত্যক্ত করে।

সাকের দৌড়ে গিয়ে নদীপারের জঙ্গল থেকে কড়াতের মতো ধারালো দাঁতওয়ালা ছয়-সাত হাত লম্বা বেতগাছের একটা জাঙ্গি কেটে নিয়ে আসে। তারপর নিজের সেটটা লিক্সনকে দিয়ে বলে, টাইমমত পিক লইবে। 

চারপাশের সবাইকে হতবাক করে দিয়ে নিরাপদ দূর থেকে সাকের জাঙ্গিটা কুকুর-কুকুরির ঠিক সংযোগস্থলে বসিয়ে একটা হ্যাঁচকা টান মারে। মুহূর্তে পৃথিবীর অকৃত্তিম প্রেমটা ছিন্ন হয়ে যায়। অবোধ-জীবটার কাটা লিঙ্গটা মাটিতে পড়ে ছিটপাড়ে আর কুকুরটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খায় ! মরণউন্মুখ অবলা জীবের বিলাপে বাজারের সব মানুষ একেবারে পাথর বনে যায় ! 

হত্যাযজ্ঞের নিপুন শৈলিতে সাকের মুগ্ধ। সে বেতের জাঙ্গি দিয়ে কুকুরের লিঙ্গ কেটে ফেলার ছবিগুলা মোবাইলে দেখতে দেখতে সামাদের বিকাশ সেন্টারে চলে আসে। তার বিকাশ একাউন্ট থেকে তিন হাজার টাকা উঠায়। রিমঝিম তাকে একটু আগে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশ করেছে বিয়ে বাবদ। মেয়েটা একটা ক্লিনিকে নার্সের চাকরি করে। সর্ম্পকের পর থেকেই সে ভালোবেসে মাসে মাসে বেকার সাকেরকে হাত খরচা বাবদ কিছু টাকা দিয়ে আসছে। গত কয় মাস ধরেই মেয়েটা বিয়ে বিয়ে করে একেবারে পাগল ! তাই সাকেরের মেজাজও বিগড়ার মতো বিগড়েছে। এইসব ফালতু বন্ধন তার ধাতে নাই। সে টাকাটা পকেটে রাখতে রাখতে বিরবির করে, একবার খালি আয়, দেখবে ফাইনাল চাট্ দিয়াদিছি !

তারা একটা রিক্সাগ্যারেজে চলে আসে। গ্যারেজের মেকার কালি-ঝুলি মাখা কালু হাতের ডালরেঞ্জটা রেখে কাছে আসে। সাকের পাঁচশ টাকার চারটা নোট লোকটার দিকে মেলে ধরে। কালু বিনাবাক্যে আলগোছে নোটগুলা নিয়ে চলে যায়। লিক্সন গ্যারেজের একটা নোংরা গামছা দিয়ে মাটিতে বিছানো চাটাইটা ঝেড়ে দেয়। এবং কিছুক্ষণ পর ইয়াবার আসর জমে ওঠলে সাকের তার মোবাইলের ইউটিউব চালু করে দেয়। ইংরেজি ও হিন্দি মিশ্রিত গানের বয়ান খুব উচ্চ ও কর্কশ। যে গাইছে, সে বুঝি মাতাল হয়ে খিস্তির খৈফুটাচ্ছে !

ট্রেনটা রাত দশটার দিকে প্লাফর্মে ইনকরে। গ্রামঘেরা ছোট্ট স্টেশানের বাজারটা আরো ছোট। সন্ধ্যার পরে এই একটা মাত্র ট্রেন এখানে থামে। তাই প্রাণহীন স্টেশানে-বাজারে হাতেগনা কয়টা বাল্ব জ্বলছে। সাকের আরেকবার ইমুতে দেখে নেয়, কম্পার্টমেন্ট ও সিট নাম্বার। জানালার পাশে আনন্দ, ভয়-আতংঙ্ক নিয়ে রিমঝিম বসে আছে জুপথুপ। সাকের এতকিছু দেখে না। সে আলাপ চালায়। অপুষ্ট মেয়েটা ফ্যাকাসে মুখের অতল থেকে গভীরকালো চোখ দুইটা তুলে ধরে। সাকের আশপাশের যাত্রিদেরকে শুনিয়ে বলে, ঝটপট লও ; স্টেশানে আপা-দুলাভাই তোমার জন্য সেই সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছে।

রিমঝিম অসহায় ভঙ্গি করে। এতদিন ফোনে ফোনে সাকেরের গলার যে সুর ও উত্তাপে তার অবোঝ হৃদয়টা ডানা মেলে ভালোবাসার আকাশে উড়াল দিতো, প্রেমের সেই সুনীল গগন আজ কৈ? 

মেয়েটার মনের খটকা পুক্ত হবার আগেই লোডশেডিং এর ধকলে স্টেশানটার ভূ-চিত্র পাল্টে যায় ! সাকের রিমঝিমের একটা হাত ধরে বলে, এই চলো, একটা সিএনজি নিলে আমরা বিশ মিনিটের মধ্যে চলে যাবো বোনের বাড়ি।

হা-করে তাকিয়ে থাকা যাত্রীদের সামনে দিয়ে তারা ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। ইরনরা স্টেশানের নির্জন কোনায় দাঁড়িয়ে মহামউজে সিদ্ধিভরা সিগারেট টানছিল। ট্রেনটা হুইসাল দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেলে অচেনা পৃথিবীর তামাম অন্ধকার রিমঝিমকে চৌদিক থেকে রাক্ষসের মতো ঘিরে ফেলে ! মেয়েটা সাকেরকে দেখেই ভয়ে আঁতকে ওঠেছিল। চোয়ালভাঙা লম্বা চেহারায় গর্তেবসা অভিব্যাক্তিহীন চোখের এই ছেলেটা সত্যিই তার কাছে অচেনা !

জনমানবহীন ছোট্ট স্টেশনটা খুনি, তস্করের মতো আত্মগোপন করে আছে কপট অন্ধকারের গরলে। অসহায় মেয়েটা উত্তাপ-আন্তরিকতাহীন সাকেরের একটা হাত আঁকরে ধরে চমকে ওঠে। আউটসিগনালের দিক থেকে লাইনম্যান টিমটিমা আলো হাতে প্লাটফর্মে এসে ওঠে। সাকেরদেরকে দেখে সে ভুত দেখার মতো চমকায়। একদম কাছে এসে হাতের আলোটা তুলে ধরে। এক নজরে সে ইরনের মুখভর্তি দাঁত, লিক্সনের খুনি খুনি কুতকুতে চোখ আর সাকেরের দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখে, দেখে মেয়েটার চোখে-মুখে মৃত্যুর হিমছায়া কম্পমান। সে ঝটাং করে আলোটা নামিয়ে নিঃশব্দে টপাটপ পা ফেলে সরে যায়। কুকুর-বিড়াল কিংবা বছিরের মতো তারও অবোধ মনটা বলে দেয়, সড়ে যা, এখান থেকে সড়ে যা…।

আজাজিলের অট্টহাসিতে খান খান হয় দক্ষিণের মেঘডুম্বুর আকাশ, বিজলির ফটফটা সাদা চমকে ঝলসে ওঠে সারা দুনিয়া, গর্জনে গর্জনে চুরমার করে দক্ষিণ থেকে এগিয়ে আসছে ঝড় ! সাকেররা দৌড়ে গিয়ে পরিত্যাক্ত মহিলা বিশ্রামাগারের বারান্দায় ওঠে। রিমঝিম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, তুফান আসছে !

শীতল অন্ধকারে সাকের হাসে।

আসুক। 

সাপের ফোসফোসানির মতো সাকেরের নিঃশ্বাস লাগে মেয়েটার ঘাড়ে !

ইরন আর লিক্সন সারা স্টেশান তন্ন তন্ন করে দেখে; কোথাও একটা কুকুরও নাই। শেষ ট্রেনটা বিদায় করে বুকিংবাবু চলে গেছে বাসায়। ভোর পাঁচটার আগে কোনো ট্রেন নাই। তাই লাইনম্যানও ভাত খেতে চলে গেলো। তাবাদে বৃষ্টি শুরু হয় অঝর ধারায়। ইরনের বড় বড় বাঁকা-ত্যাড়া দাঁতগুলা আড়াল থেকে এক লাফে বেড়িয়ে আসে, ল যাই, শালা আছে শর্ট লইতাছে।

হেব্বি চার্জ অইয়া রইছে শালা।

এই কথা বলে লিক্সন আড়মোড়া দিয়ে মড়মড় শব্দে শিরদাঁড়া ফুটায়।

 তোমার পায়ে পড়ি, আমার সব্বনাশ কৈর না !

এই রোদন শোনে ইরনরা স্টেশনের উত্তর মাথা থেকে ছুটে আসে। মেয়েটা মাটিতে পড়ে সাকেরের পা জড়িয়ে ধরে মিনতি করছে, আমারে ছাইড়া দ্যাও। তুমি আমার জন্মের ভাই। এই নেও ট্যাকা। তিরিশ হাজার আছে। তোমারে বিয়া করার জন্য তিল তিল কৈরা দুই বছরে জমাইছিলাম। 

কান্নায় মেয়েটা ভেঙে পড়ে, বিয়া লাগত্ না, সব লইয়া যাও; তেও আমারে ছাইড়া দ্যাও।

সাকের মেয়েটার চুল টেনে ধরে মাথাটা তার উরুর সাথে আটকে রাখে। লিক্সন ধরে রাখে শিকারের দুই হাত। ইরন তার পকেটের রুমাল মেয়েটার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। লিক্সন সর্টস এর পকেট থেকে গামছা বেড় করে টাইট করে মেয়েটার মুখ বেঁধে ফেলে। তারপর নাইলনের দড়ি দিয়ে পিছমুড়া বাঁধে হাত দুইটা। অঝর বৃষ্টিধারার রোদনে রোদনে সাকেররা পালাক্রমে তাদের লাফাঙ্গা জীবনের দীর্ঘ মচ্ছব শেষ করে !

এবার নিষ্পত্তি পর্ব। অধিক রক্তক্ষরণে অজ্ঞান মেয়েটা এখন একদলা মাংসপি- ছাড়া আর কিচ্ছু না। তবু সাকের একটা পা দিয়ে মেয়েটার গলা প্রাণপন শক্তিতে চেপে ধরে। ইরন একটা চাকু নিয়ে মেয়েটার নিন্মাঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নারীর যে অঙ্গ দিয়ে পৃথিবীর সবপুরুষ জীবন পায়, মাটির সংসারে আসে, ভালোবাসে, ইরন মেয়েটার সেই অঙ্গটা চাকু দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। চেতনাহীন মাংসের দলাটা কয়েকবার কেঁপে কেঁপে থেমে গেলে ইরন পশুর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে আসে।

পরদিন অনেক দেরিতে সাকেরের ঘুম ভাঙলে সে প্রথমেই মোবাইলটা অন করে। ফেসবুকে দেখে একজন স্ট্যাটাস দিয়েছে, প্রেম হলো জীবনের আইফেল টাওয়ার ; যত উপরে উঠা যায় মানবাত্মার মহত্ব্য ততই পরম প্রাপ্তিতে গভীর হয়।

বিকৃত হাসিতে সাকের মুখ ভেটক্যায়, তুমি অইলা আচুদা দেবদাস। 

তারপর গতকালের ছবিগুলা বেছেটেছে সঙ্গমরত কুকুর-কুকুরির একটা ক্লোজশর্ট তার টাইমলাইনে আপলোড করে নিচে লিখে দেয়, প্রেমের শেষ চূড়া এই নয় কী ?

 

ইসহাকপুর। 

আগস্ট–২০১৯

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সুরেশ | সমীরণ দাস

Sat Aug 1 , 2020
সুরেশ | সমীরণ দাস 🌱 বহুবছর চাকরি করে অবসর নিয়েছি। এখন কর্মহীনের জীবন যাপন করা ছাড়া আর তেমন কাজ নেই। শুধু দিনগত পাপক্ষয়। সকালে বিকেলে চায়ের দোকানে বসি। চা খাই। আড্ডা মারি। বাড়ি ফিরে আসি।  একদিন সুরেশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।  ওকে দেখে চমকে গেলাম।  সুরেশ আমার ছোটবেলার বন্ধু। কৈশোরে […]
Shares