বাদল বরিষন | ইমরান উজ-জামান

বাদল বরিষন | ইমরান উজ-জামান

🌱

বাদল বরিষন, শুনতেই কেমন রোমান্টিকতা ভর করে মনে। তবে বৃষ্টি দেখার যে চিরাচরিত বিলাস তা দেখেছেন রবীকবি, নজরুল, জসিমউদ্দিন আর যারা প্রকৃতির মাঝে বাস করেছেন। দুধের স্বাদ গোলে মিটানোর মতো আজকাল কেউ ঘটা করে বাগান বাড়িতে কিংবা বাড়ির ছাদে বৃষ্টি বিলাস ঘর করে। বড় জোর শহুরে অভিলাষী মানুষ রিক্সায় বসে বৃষ্টির সময় হুডটা একটু নামিয়ে দিয়ে উপভোগ করে বরিষন। ব্যাপারটা যেন ‘অভিলাসী মন চন্দ্রে না পাক, জোৎসনায় পাক সামান্যটাই।’ বৃষ্টিতো প্রকৃতির বান্ধব। বৃষ্টি দেখতে যেতে হবে গাঁয়ে, প্রকৃতির মাঝে। বৃষ্টিতে বসতে হবে টিনের ঘরে, টাপুর-টুপুর বৃষ্টির মাঝে ঘরে বসে মুড়ি মুখে পুরে কুচমুচ করে খেতে হবে। তবেই না বৃষ্টি উপভোগের ষোলকলা পূর্ন হবে।

‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, 

এসো করো স্নান নবধারাজলে।’

বাংলা ভাষায় সম্ভবত এটাই সব চেয়ে বেশি পঠিতব্য বৃষ্টি বিষয়ক শ্লোক। এছাড়া ‘আয় বৃষ্টি চেপে, ধান দিব মেপে’র মতো ছড়া এখনো পড়া হয়। সেই প্রাচীনকাল থেকে বৃষ্টি নিয়ে যতনা কাব্য রচিত হয়েছে, বৃষ্টির প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে। অন্য কিছু নিয়ে এত বেশি সাহিত্য বা সংস্কৃতি চর্চা হয়নি। সিনেমায় বৃষ্টির ব্যাবহার আরো কিয়দ সরস। সেই ‘দ্যা রেইন’ ছবিতে বৃষ্টির ঝাপটায় নায়িকা অলিভিয়ার গায়ে লেপ্টে থাকা শাড়ি সকলের মনে আলোড়ন তুলেছিল, আজো গেথে আছে। দেয়ালে সাটানো সেই পোস্টার সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিষিদ্ধের দাবিও উঠেছিল সেই সময়। এখন তো বৃষ্টি না হলে বাংলা সিনেমাই জমে না। নায়িকা কাঁদবে বৃষ্টি ঝড়াও। নায়িকা হাসবে, বৃষ্টি ঝড়াও। নায়িকা নায়কের সঙ্গে দেখা করবে, ঝড়াও বৃষ্টি। আর রাস্তায় ছেলে সঙ্গে সুন্দরী মেয়ের দেখা হলে নির্ঘাত প্রেম। প্রথম দেখায় মনে মনে বৃষ্টিপাত, সেই বৃষ্টিতে ভিজে তারা গান গায় , গানের সঙ্গে প্রকৃতিতে বৃষ্টি নামে। দর্শকের হাতে তালি। হয়ে গেল সিনেমার কাহিনী।

রোদ-বৃষ্টির লুকোচুড়িতে ‘খেকশিয়ালের বিয়ে’ বৃষ্টি সব চেয়ে বিরক্তিকর বৃষ্টি। ঠিক যেন পাতা ছাড়া গাছ। চারদিকে অন্ধকার করে ঝুম বৃষ্টি নামবে। তবেই না বৃষ্টি দেখে প্রান ভরবে। এই রকমের বৃষ্টিই সব চেয়ে সার্থক ও মজার বৃষ্টি। যৌবনবতী বৃষ্টির রুপ খুবই মোহনীয়। শহরে তার কিয়দ পরিমান আমাদের গোচরিত হয়। যেমন টিনের চালে অজর ধারায়, ছন্দে মূর্ছনায় বৃষ্টি পড়ছে। আহা কি সে বাজনা। কর্নকুহরে সেই সুর বিমোহিত করেছিল গুরু কবিকে, বিমোহিত করেছিল বিদ্রোহী কবি ও যার জন্মই কাকচক্ষুজলের নদীর ধারের সেই পল্লী কবিকে। বৃষ্টি যে বিলাসিতার নিয়ামক তা প্রথমে আমাদের চিন্তায় স্থান করে দিলেন হুমায়ুন আহমেদ। তবে গ্রাম বাঙালার জীবনে বৃষ্টির জন্য আছে বিশেষ জায়গা।

‘উলুনিলো ভাই, দুলুনিলো ভাই,

কচু ক্ষেতে হাটু পানি গড়াগড়ি বাই।’

চরম গরমে নাভিশ্বাস উঠে গেলে এক সময় অতিষ্ট মানুষ বিভিন্ন উপায়ে বৃষ্টি নামানির আয়োজন করত। গ্রাম বাংলার শিশু-কিশোররা এক সময় বৃষ্টি নামানি গান গেয়ে পাড়া ঘুরত। এক মায়ের এক মেয়ে দেখে তার মাথায় ধান -দুর্বা-আম পাতা-কাঁচা হলুদ দিয়ে কুলা ভরে দেয়া হতো। গ্রামের প্রত্যেক উঠুনে গিয়ে কুলার উপর পানি দিয়ে কুলা সুদ্ধ একটা চক্কর দিত সে , সে সরে গেলে দলের সঙ্গে থাকা অন্যরা সেই পানিতে গড়া-গড়ি খেতে খেতে এই ছড়া কাটত। মাঝ খানে গৃহস্থ বধু তার ঘরের মাটির কলসি কাঙ্খে করে উঠুনের মাঝখানে উলুনি-দুলুনি করা বালক-বালিকাদের ঠেলে দিয়ে সেই গড়াগড়ি আরো ও সহজ করে দিতেন। সেই পানিতে হাছরে-পিছরে গড়া-গড়ি খেয়ে একসময় অন্য বাড়ির উঠোনে গিয়ে আবার শুর হতো বৃষ্টি নামানি আয়োজন। সঙ্গে একজন বালক বেতের আগুলে গৃহীনীর কাছ থেকে চেয়ে নিতেন চাল-ডাল। দিন শেষে একত্রিত হয়ে খিচুরি রান্না কওে সবাই মিলে খাওয়ার আয়োজন। সেই আযোজনে অবশ্য ছোট-বড় সকলের অংশগ্রহন থাকত। খিচুরি রান্না বারা শেষ হতে না হতেই কাকতালীয় ভাবে শুরু হতো বৃষ্টি। জুম বৃষ্টি। এতো গেলো কিশোর বয়সের বৃষ্টি।

আর গ্রামে একটা সময় ছিল মানুষের কৃষিকাজ জীবন ব্যবস্থা ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হলে। কাঙ্খিত বৃষ্টির জন্য মানুষ বিধাতার স্মরনাপন্ন হতেন। কাটখোট্টা না হয় রোমান্টিক, কোন পর্বে পরে বৃষ্টি সেই তর্ক বৃথা। আগে তিতা পরে মিঠা। বৃষ্টির গল্প তা হলে বলি-

চারদিক থেকে চাপা কান্নার স্বর। দুই হাত সামনে ধরে, সবাই কাঁদছে। মোনাজাত পরিচালনা করছেন চেয়ারমেন বাড়ি মসজিদের বাইট্টা হুজুর। হুজুরের ফরিয়াদের ভেলা সপ্ত আসমান পর্যন্ত পৌছে দিতে সকলকে উচ্চ স্বরে প্রার্থনায় অংশ নিতে বলছেন। সকলের উচ্চস্বর প্রকম্পিত করছে এলাকা। বৃষ্টি নামানি নামাজ পড়া হচ্ছে। দুই হাত সামনে প্রসারিত করে বাবার পাশে আমিও বসে। চোখে কান্নার পানি আনার চেষ্টা করছি, হচ্ছে না। আশ-পাশে চোখ ঘুড়িয়ে দেখছি, কই কারো চোখে তো পানি নাই। ঐ যে লাইনের শেষ মাথার বারেক কাকার চোঁখে পানি দেখা যাচ্ছে। আর সবাই শুধু মুখ-ঠোট বাঁকা করে, চোখ বন্ধ করে অভিনয় করছে কান্নার, কাদঁছে না। ইস! হাত আর এভাবে উঠিয়ে রাখতে পারছি না, হুজুর আমিন বললেই বাঁচি। বৈশাখ কিংবা জৈষ্ঠ মনে নেই। এক সকালে বৃষ্টির প্রত্যাশায় টরকী গ্রামের সব পুরুষ মানুষ একত্রিত হয়েছিল বাতাকান্দির চকে। আমার মতোন অনেককেই তখন পুরুষের দলে ফেলা যায় না, বলা যায় ভবিষ্যত পুরুষ। বাবা বলেছিলেন শিশুরা ফেরেস্তা তাদের কথা আল্লাহ শুনেন, তাই আমার মাথায় টুপি পড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে। বিশাল এলাকা জুরে ফসল তোলা বকনা মাঠ। মাঠ বোঝাই মানুষ, আল্লাহর কাছে নামাজ পড়ে, দোয়া করে বৃষ্টি নামাতে। বাড়ি ফিরে আসার পথে গল্প চলছে জানু কাকা বলছেন, ‘আহা কি দিন গেছে, তাদের সময় নাকি বৃষ্টির নামাজ পড়ে মোনাজাত শেষ করার আগেই বৃষ্টি নেমে যেত। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে বাড়ি ফিরতেন বৃষ্টি নামানি নামাযিরা। আমি ছোট্ট করে বলি কাকা আপনার সময় এমন ঘটেছে? কাকা বলেন- না , তোর দাদর সময় ঘটেছে। দাদা কি এমন ঘটনার স্বাক্ষী? নারে তোর দাদাকে তার বাবা বলেছে। কাকার সঙ্গে কথপোকথন থাক। বৃষ্টির কথায় আসি।

বাঙালির গ্রামীন জীবনে যদিও বৃষ্টি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আষার-শ্রাবন তো বটেই হাওর অঞ্চলে প্রায় ছয়মাস বৃষ্টিপাতের সঙ্গে মানুষের দিনযাপন। গেরস্থ বৌ যাবে বাপের বাড়ি বৃষ্টি ঝড়ছে তো ঝড়ছেই, বর তার বৃষ্টির ছুতোয়, নিয়ে যাচ্ছে না। গেরস্থ বৌ তখন রসুই ঘরের পাটখড়ির ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে বাড়ির পার ঘেষা থৈ থৈ পানিতে বৃষ্টির ফোটা পানিতে পরে তৈরি হওয়া বুদ বুদের দিকে তাকিয়ে মনের কষ্টে প্রকাশ করে।

তোরা কে যাস রে , ভাটির গাং বাইয়া

আমার ভাইজানরে কইও নাইওর নিতো বইলা ,

তোরা কে যাস কে যাস।

বরের মন গলল অবশেষে। ঘাটের কোষা নৌকায়, গাছের উপরে টানিয়ে রাখা ছই জুরে দিয়ে, ছইওয়ালা নৌকা বা নাইওর নৌকা প্রস্তুত করে বধুকে হাঁক ছাড়ে। এবার সিথানের কাপড়ে, পৈথানের সম্বল গয়নাপাতি নিয়ে নাইওর নৌকায় চড়ে বসে বধুয়া। বর তার মাথায় মাথাল পড়ে বৃষ্টিতে উথাল-পাথাল জলরাশিতে বৈঠা ধরে আর বধু সহযোগে মনের হরসে গান ধরে –

হাসি হাসি বউ, হাতে তোমার কদম গাছি,

তোমার রুপে আমি অথৈ দরিয়ায় ভাসি।

পানিতে বৃষ্টির ফোটা পড়ে বুদবুদ ঘোষণা করে জলের প্রেম পর্বের কাহিনী। চারদিকে পানি থৈ থৈ আর বৃষ্টি গ্রামের মানুষের জীবন ব্যবস্থায় খুব প্রভাব ফেলে। এই রকম সময়ে বিক্রমপুরের চরাঞ্চলে মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে। এই অবস্থা উত্তর বঙ্গের মঙ্গার চাইতেও বেশি ভয়াবহ। ছোট বেলায় আমাদের কয়েকবাড়ি পরের বাড়িতে বিলাপের কান্না শুনছি প্রায়ই। মাকে প্রশ্ন করতেই মা বলতেন ওদের খাবার নাই, এই জন্য কাঁদছে। কখনো কখনো মা খাবার দিয়ে আসতেন।

বৃষ্টির প্রস্তুতি পর্বের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্ণনা খুবই কৌতুহলউদ্দীপক। যেমন সাগর থেকে সূর্যের তাপে জলীয়বাষ্প, জলীয়বাষ্প আকাশে এক সঙ্গে জমা হয়ে মেঘ। আহা মেঘ সে আরেক মহাকাব্য। মেঘ হিমালয় চুড়ায় ধাক্কা খেয়ে বৈজ্ঞানিক ‘এমইটিআর’ কোডের আওতাধীন ‘আরএ’ বা বৃষ্টি নাম নিয়ে মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। এই সব ধারনা মাথায় নিয়ে পৃথিবীতে ইদানিং কৃত্রিম বৃষ্টিপাতও ঘটানো হচ্ছে। মার্কিন বিজ্ঞানী ভিনসেন্ট শায়েফারের কার্বন ডাই-অক্সাইড এর টুকরা বা ড্রাই আইস দিয়ে মেঘ জমিয়ে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের ঘটনা এখন আর অলীক নয়। একদিন কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের অনুভূতিও নিয়ন্ত্রন করবে অনুভূতিক কোন পদ্ধতি। তার উদাহরন তো কিছু আছেই, যেমন ৩ডি, ফোর ডি কিংবা ৭ডি চলচ্চিত্র। বৃষ্টির বহুমাত্রিকতা কিন্তু কল্পলোককেও হার মানিয়ে দিচ্ছে আজকাল।

যেমন রূপকথার গল্পের মতো সব কিছুকে হার মানিয়ে গেছে শ্রীলংকার মাছ বৃষ্টি। শ্রীলঙ্কার চিলাও জেলার একটি গ্রামে ঘটেছে একটি , মজার ঘটনা। ঐ গ্রামের লোকজন এক বৃষ্টির দিনে অনেক জোরে ছাদে কিছু পড়ার শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখেন আকাশ থেকে মাছ বৃষ্টি হচ্ছে। সকলে মহানন্দে পথের ধারে, মাঠে মাছ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রামের মানুষ। যার খবর বিবিসি দিয়েছিল গত বছর। মাছ বৃষ্টির অন্দরমহলের গল্প যাই হোক না কেন? সেটা আমাদের বিষয় না । বিষয় হল আজকাল মাছ বৃষ্টিও হয়। এর আগে ২০১২ সালে শ্রীলংকাতেই চিংড়ি বৃষ্টি হয়েছিল। এমন এক গ্রহের সন্ধান মিলেছে যেখানে কাচ-বৃষ্টি হয়। সম্প্রতি এইচডি ১৮৯৭৩৩বি নামের গ্রহতে ঘটে এমন ঘটনা।

বৃষ্টিকে যেভাবেই বিশ্লেষন করি না কেন, বাস্তবতার নিরিখে যতই বিচার করি না কেন। কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি যতই ঝড়াই না কেন। চিরায়ত বৃষ্টির বিকল্প কিছু কি উদ্ভাবিত হবে ? কি জানি হতেও পারে, আজকাল তো কন্টাক্টের নামে নকল প্রেম, সিনথেটিক সবজি ও ফল, সয়া মিট নামে নকল মাংশ পাওয়া যায়। তবে আষাঢ়ের বৃষ্টি বিলাস আর কদমের বিভোর করা গন্ধ কোন ভাবে পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ত্রিস্তান জারা | মুম রহমান

Sat Aug 8 , 2020
ত্রিস্তান জারা | মুম রহমান 🌱 ত্রিস্তান জারা রোমানিয়-ফরাসী কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, শিল্পী, বুদ্ধিজীবি ত্রিস্তান জারা বরাবর শিল্প-সাহিত্যে নতুন ঘরাণা সৃষ্টিতে বিশ্বাসী ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ত্রিস্তান চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন এবং প্রথাবিরোধী শিল্প আন্দোলন করেছেন। দাদাইজম এবং স্যুরিয়ালিজমের মতো শিল্প আন্দোলন সমূহের অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন তিনি। জীবনের […]
Shares