বিদেশি সাহিত্য বনাম বাংলা সাহিত্য | মুম রহমান

বিদেশি সাহিত্য বনাম বাংলা সাহিত্য |

মুম রহমান

🌱

বিদেশি সাহিত্য নিয়ে আমার আগ্রহ ও কৌতুহল বরাবরই ছিলো, আছে, থাকবে। শুধু নিজের দেশ নিয়ে পড়ে থাকলে কোন কিছুই ঠিকঠাক হবে না। বিশ্বব্যাপী কি হচ্ছে, হয়েছে তার খোঁজ খবর রাখাটা জরুরি। আপনি ফুটবল খেললেও নানা দেশের ফুটবল সম্পর্কে ধারনা রাখা জরুরি। কিন্তু এখানে একটা কিন্তু আছে। এই ‘কিন্তু’টা নিয়েই কথা বলতে এসেছি। কিন্তু  সবচেয়ে জরুরি  বিষয় হলো, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা। 

বিদেশ নিয়ে আমাদের এক ধরণের আহামরি আদিখ্যেতা আছে। বিদেশি কাপড়, বিদেশি খাবার, বিদেশি মানুষ— সবই যেন খুব ভালো। এই রকম একপেশে ভালো এক ধরণের হীনমন্যতার ফসল।

কথাটা মাথায় এলো, কলকাতার এক সাহিত্যিকের পোস্ট দেখে। তিনি বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে চেয়েছেন। কি কি বই পড়া উচিত জানতে চেয়েছেন। সেখানে দেখা গেলো, বাংলাদেশের কেউ কেউ একেবারে হা রে রে রে রব তুললেন। ভাবটা এমন হুমায়ূন কেন পড়বেন, সে তো জনপ্রিয় লেখক! বরং কাফকা, ক্যামু, জয়েস পড়ুন। সমাজের এই ‘কেউ কেউ’ লোকগুলা গুরুত্বহীন  হলেও তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা গণ আর ক্লিসে ধারণার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। গণ আর ক্লিশে ধারণাগুলো ভেঙে ফেলা জরুরি বিবেচনায় এ লেখা। 

যখন আজিজে যেতাম (শাহবাগে) তখন থেকেই দেখেছি, আমাদের সাহিত্য পণ্ডিত আছে (সাহিত্যিক নয়) মার্কেজ, জয়েস, কাফকা, ক্যামু, বোর্হেসের নাম শুনলেই কেমন যেন এলিয়ে পড়েন। ঢুলু ঢুলু ভাব। যেন কি নামের নেশায় মত্ত। কাপড়চোপর এলোমেলো হয়ে যায়, দৃষ্টি ঘোলা। এমন ঘোরে আপাত কোন সমস্যা নেই। পীর কিংবা দেবদেবীর ভক্তের কোন অভাব নেই এ দেশে। তো আমার কথা হলো হে আবিষ্ট হয়ে নিজের বংশ পরিচয়টাও ভুলে যাবেন না। স্বদেশের ঠাকুর রেখে এতো বিদেশ বিদেশ করলে কিন্তু আপনার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ জাগে। 

আমার এমনও সন্দেহ হয়েছ, যারা কথায় কথায় দেরিদা, ফুকো, লাকা, মুরাকামি, কোহেলহো প্রমুখ নাম আওড়ান তারা কতোটা এদেরকে পাঠ করেছেন, আয়ত্ব করেছেন? প্রায়শই মনে হয়, শুনে শুনে (মসজিদের হুজুর বলেছেন) মুসলমান হওয়ার মতোই জ্ঞানী এরা। আদতে বুঝেশুনে কোরান শরীফ,  হাদিস পাঠেও ব্যক্তির চিন্তা প্রসারিত হয়। তেমনি কাফকা, ক্যামু, দেরিদা, ফুকো পাঠ তো কোন সমালোচককে সংকীর্ণ করবে না। স্বদেশের শিল্প-সাহিত্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মধ্যে একটা আলগা ভাব ছাড়া আর কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। আর যারা এটা করতে গিয়ে বিদেশি তথ্য, পথ্য,  তত্ত্ব জাহির করেন তারা নেহাতই জাহেল। আমি মনে করি তাদের আত্ম সম্মানবোধ কমই আছে। তারা আত্ম প্রতারক।

তুলনার কথা যদি বলি, একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলনা সারা বিশ্বে পাওয়া দুস্কর। ছোটগল্প, গান, কবিতা, নাটক,  উপন্যাস আরো যে কতো কি তিনি লিখেছেন। শুধু কি লিখেছেন? ছবি আঁকা, অভিনয়, গান করা… তিনি এক বিস্ময়কর বিশ্ব প্রতিভা। আমাদের গর্ব তিনি বাংলা ভাষার। তাই বলে কাউকে আমি রবীন্দ্রনাথের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করবো না। নজরুল তার মতো করেই আলাদা। তেমনি সার্ত্র, ক্যামু, মার্কেজ  সবাই যার যার মতো করে আলাদা।।বড় শিল্পীরা সবাই যার যার মতো আলাদা।।তো আমরা কেন একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেকজনকে ছোট করবো!

রবীন্দ্রনাথেরও দূর্বল কবিতা আছে। বিশ শতকের অন্যতম মহান প্রতিভাবান  জেমস জয়েসও কোথাও দূর্বল। জয়েসের ‘এক্সাইল’ তো দূর্বল নাটকই, অন্তত ব্রেখট, শেখভ, রবীন্দ্রনাথ, ইবসেনের ধারেকাছেও নয়। বোর্হেস, কাফকার সবগল্পই এক্কেবারে বিশ্বসেরা নয়। সব লেখকেরই ভালো মন্দ কাজ আছে। তো তোমরা যারা মনে করি বিদেশি লেখকরাই সেরা আর বাংলার মানিক, বিভূতি, তারশঙ্কর, জীবনানন্দ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সৈয়দ মুজতবা থেকে শুরু করে  শহিদুল জহির, ইলিয়াস, হাসান,  হুমায়ূন, সুনীল, সঞ্জীব, শীর্ষেন্দুরা কেবল সেকেন্ড গ্রেডের লেখক তাদের আদতে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে বলে মনে করি।  

এ লেখার মাধ্যমে আমি দায়িত্ব নিয়েই বলতে চাই, 

এই বাংলাদেশ (এবং পশ্চিমবঙ্গে) এমন অনেক লেখাই আছে যা বিশ্বসাহিত্যের কাতারে জ্বলজ্বল করার যোগ্যতা রাখে। আমরা অনুবাদ করতে পারিনি, আমরা প্রথম বিশ্বের নাগরিক নই, বিশ্ব সাহিত্য বাজারে আমরা ঢুকতে পারেনি সেটা আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু আর একশ বছর পরেও বাংলার বহু লেখা অনূদীত হলেও বিশ্বে হইচই পড়ে যাবে।

যারা নাকটাক ফুলিয়ে বলার চেষ্টা করেন, বাংলা সাহিত্য পড়ার সময় নেই, বিশ্বসাহিত্যের উপলখন্ডে তারা ব্যস্ত, তাদের জানা উচিত, বাংলা সাহিত্য বিশ্বমানের। হুমাযূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়ি না বলার মধ্যে মনে হয় বাঙালি সুলভ উন্নাসিক টানাটানিই প্রধান কারন হিসাবে রয়েছে। লুঙ্গি বা ধূতি টেনে ধরে নিজের জাতকে  ফেলে দেই আমরা, আর কোট টাই পরা দেখলেই ভাবি না জানি কি আইলোরে। নিজের এলাকার কুকুরকে আমরা ঘৃণা করি, নূন্যতম মায়া দেখাই না, তার গায়ে গরম ভাতের মার ঢেলে দেই। অথচ তুলতুলে বিদেশি কুকুর দেখলিই ঠোঁট বাঁকিয়ে ইংরেজি বলি,  টমি,  সিট ডাউন, কাম হিয়ার বলতে থাকি।  এ আসলে হীনমন্যতা। দুশ বছর শাসন করে ইংরেজরা বিদায় হয়েছে, কিন্তু আমাদের সাহেব/স্যার প্রীতি যায়নি।  উপনিবেশিক চিন্তা আর মাণদণ্ড ধরে আমরা এখনও বাংলা সাহিত্যকে তুলনা করি। ইতিহাস বলে পরজীবি শিল্প তোষনের এমন ঘটনা রোমেও ঘটেছিলো। তারা গ্রীকদের পরাজিত করেছিলো যুদ্ধে, কিন্তু নিজেরা পরাজিত হয়েছিলো শিল্পে সাহিত্য। বিশাল রোম সাম্রাজ্যের সাহিত্য ভাণ্ডার আদতে গ্রীক শিল্প সংস্কৃতির দাস হয়ে ওঠে। পরজীবী মনস্কতা আদতে দাসত্য তৈরি করে। এই দাসত্য আমি মানি না। 

 এ পরজীবী হীনমন্যতাকে কষে চড় দেয়ার সময় এসেছে। পশ্চিমি সংস্কৃতির দিকে হেলে পড়লে আর যাই হোক নিজের মেরুদন্ড সোজা হবে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন শিক্ষক, পত্রিকার বাধা সমালোচক, কথিত তাত্ত্বিকগণ এখনও সমালোচনার ক্ষেত্রে বিদেশি কিছু নাম, ধাম কচলিয়েই দুটো করে খাচ্ছেন। হয়তো তাঁদের উদ্দেশ্যেই জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন—

পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ‘পর

ব’সে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর

অধ্যাপক, দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;

বেতন হাজার টাকা মাসে— আর হাজার দেড়েক

পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি :

মৃতদের কৃমি খুঁটে দুটো কামাই করে যারা চলেন তাদের আয় রুজি নিয়ে আমার কোন কথা নেই। কথা হলো, তাদের মতামতকে গুরুত্ব  দেয়ার কিছু নেই। সে তারা যতোই নামী দামী নাম আর পরিভাষা ব্যবহার করুন, মনে রাখতে হবে,  তারা ভাড়া করা বিদ্যায় চলে, তাদের নিজের সৃষ্টিশীলতা নেই। তারা যদি বিশ্বসাহিত্য থেকে দুচারটা গপসপ কপচায় তাদের জিজ্ঞেস করুন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ভূগোল কতটুকু পড়েছেন তারা। 

আমার মূল কথাটি হলো, বাংলাভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলার লেখক কোনভাবেই দ্বিতীয় কাতারের নয়। এ দেশের অনেকে বিদেশি গিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। করুন।  কিন্তু আমাদের সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীর। আমি পুনরায় বলছি, বাংলা সাহিত্য বিশ্বের যে কোন সাহিত্যের তুলনায় প্রথম শ্রেণীর। আপনারা কথায় কথায় কাফকা, বোর্হেস, জয়েস আওড়ান সমস্যা নাই। বিদেশ প্রীতি খারাপ না। তবে স্বদেশ আর স্বভাষাকে দূর্বল প্রমাণ করতে বিদেশি উদাহরণ টানবেন না। আমরা যারা বাংলা সাহিত্যপ্রেমী তারাও দুচার পাতা কাফকা,  ক্যামু পড়েছি। তবে নিজের দেশের, সমকালের একজন সাথে মোজাফফর হোসেন, ইমতিয়াজ মাহমুদকেও সযত্নে পাঠ করি। এবং বিশ্বাস করি কারো স্বিকৃতি বা গণহণযোগ্যতার ধার ধারেন না তারা। তাদের লেখাই তাদের পরিচয়। 

তোষামদি করে, ধর্না ধরে আর বিদেশি সাহিত্যের রেফারেন্স টেনে জাতে ওঠার চেষ্টা কেউ কেই করতেই পারেন। সেটা সব দেশেই আছে। তেমনি খাঁটি লেখকও সব দেশেই আছে। আর আমার বাংলাদেশের  কোন লেখককে খারিজ করতে আসলে উদাহরণ দিয়া কথা বলতে হবে। আমি পড়ি না, আমার এইগুলা পড়ার টাইম নাই এইসব ক্লিশে মন্তব্য বালখিল্যতাই মনে করবো।

মোদ্দা কথাটা কান খুলে, চোখ খুলে, মন খুলে শুনে রাখুন। মোদ্দা কথা হলো, সকল দেশে (এমনকি বাংলাদেশেও) ভালো লেখক আছেন, বস্তাপচাও কম না। শেকসপিয়র, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ ডজন কি হালি হিসাবে পয়দা হয় না। প্রতিভা সব দেশেই হাতে গোণা। হাতে গোণা প্রতিভারে আপনার চুলের বিচার দিয়ে মাপতে যাবেন না। স্বর্ণকেশীও সুন্দরী বা কুৎসিত হতে পারে, দীঘল কালো চুলের শ্যামা মেয়েও অপরূপ  হতে পারে। আপনি একচোখা হলে স্বর্ণকেশী স্বপ্নদোষেই দিন কাটাবেন। মৌলবাদীর মতো এক কিতাবই জগতের সব সমাধান খুঁজতে যাবেন না। 

এতে নিজেই বঞ্চিত হবেন চারপাশের মধুরস থেকে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে সিনে আড্ডা! - শফিক হীরা

Sat Aug 22 , 2020
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে সিনে আড্ডা! – শফিক হীরা 🌱 কেমন আছেন, বস? – আছি ভালোই। এই সময়ে যতটুক ভাল থাকা যায় আর কী! তোমার কী খবর? – ভালো, বস! একটা ইন্টারভিউ লাগবে আপনার বস। অনুধ্যান নামে একটা ওয়েব পোর্টালের জন্য। আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকের ইচ্ছা! – হা হা হা…. […]
Shares