দরদির একদিন | শেখ লুৎফর

দরদির একদিন | শেখ লুৎফর

🌱

     জীবাত্মার কথা তার আচরণে পাওয়া যায়। উদ্ভিদকে আঘাত করলে সে নীরবে কাঁদে; রক্তপাতও হয়। আমরা বলে থাকি গাছের কষ ঝরছে। মানুষকে আঘাত করলে কমবেশি সকলেই কাঁদে। আবার কেউ কেউ কাঁদে না। কষ্ট হজম করতে ভেতরে ভেতরে প্রাণপণ লড়াই করে। কষ্টের এই অনুভব থেকে অনেকেই মানবিক হয়ে উঠে। সংসারের সমস্ত সৃষ্টির মাঝে শান্তি ও কল্যাণ খোঁজে। দশজনের সুখটাকেই নিজের সুখ মনে করে তৃপ্তি পায়। সম্ভবত এটাকেই বাউলরা মানবধর্ম বলে মানে।    

কনক বসা থেকে উঠে পড়ে। সেই দুপুর থেকে ট্রেনের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষমান মানুষের দিকে তাকায়। মানুষের চোখমুখ দেখতে দেখতে তাদের মনের ভেতরটা সে তালাশ করতে চেষ্টা করে। সম্ভবত খোঁজাখোঁজির এই পথটাকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘গভীর নির্জন পথে।’

কনকের সাথে একটু পরিচয় হওয়া দরকার। অইযে স্টেশানের দুই নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে একহারা লম্বা একটা ছেলে। তার চোখে চশমা, মাথা ভরতি উসখুখুসকু চুল, গালে চার-পাঁচদিনের না-কাটা দাড়ি, কাঁধে ক্যানভাস কাপড়ের একটা ব্যাগ, সে একটা এনজিওতে কাজ করে। নাম কনক। তার পরিচয় ও অতীত জীবন নানান জটিলতায় ঠাঁসা। তাই সে হতাশ হয়ে মরমি পন্থায় শান্তির সন্ধান করে। গল্পের জন্য এইটুক হলেই চলবে। কারণ ছোটগল্পের শুরু কিংবা শেষ বলতে কিচ্ছু নাই। গঠন কাঠামোও নির্ভর করে গল্পের ভাব ও বিষয়ের উপর। অর্থাৎ স্বভাবে সে স্থিতিস্থাপক। সময় মোতাবেক অ্যামিবার মতো চেহারা বদলায় বলে বহুবর্ণা আর ইঙ্গিতধর্মী। এইযে আপনি এই লেখাটা পড়ছেন। এখন যদি আপনার পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে? কিংবা পড়শি বাড়ির কারো যদি হার্টঅ্যাটাক হয়? চোখ বোঁজে একটু দেখুন, এই দুই-একটি শব্দের চারপাশে গল্পের কত সম্ভাব্য মুখ উঁকি মারছে! এইত ছোটগল্প।

তো কনক চেয়ে চেয়ে স্টেশানের মানুষের ভোগান্তি দেখে। ইংরেজ আমলে বানানো স্টেশানটার ধারণ ক্ষমতার চাইতে চল্লিশগুন মানুষ উপস্থিত আছে। বসা তো দূরে থাক দাঁড়ানোর মাটি নাই। কী আজাব! প্রত্যেকটা নারী-পুরুষের চেহারায় চাপা অসন্তুষ আর অস্থিরতা। তাদের চোখ-মুখে অসহায়, অনিশ্চিত জীবনের করাল ছায়া। সমাজের-রাষ্ট্রের-জীবনের এইসব অস্থিরতা দিনে দিনে ব্যক্তি জীবনকে অবচেতনে কঠিন বিকারের দিকে ঠেলে দেয়। কনকের মনে পড়ে সিলেটের সেই পাহাড় কাটা শ্রমীকদের কথা। পাহাড় কাটতে কাটতে ওরা যখন গভীরে চলে যায়। তারপর হঠাৎ ধ্বস! এইভাবে বছরে অন্তত শ’খানেক মানুষ মরে। সে দেখেছে ওদের সবকিছুতেই ‘এখন আছে তো তখন নাই’ এইরকম একটা ভাব। তাদের চোখে জীবন পাতের সামনে থালার ভাতের মতো। তবু তারা সারাক্ষণ আমুদে আছে। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই গোল হয়ে বসে থালি-বাটি, কলসি বাজিয়ে দুম গায়।

‘কফালর মা রে চুদি চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ি,

এই জীবনে যা যোয়াইলাম সব খোয়াইলাম খানকিবাড়ি।’ 

সুনামগঞ্জ থেকে বাউল মকদ্দস আলম উদাসী’র সাক্ষাৎকার নিয়ে আসার পর থেকে কনক আরো শুকিয়েছে। জোরে বাতাস দিলে তার হ্যাংলা-পাতলা শরীরটা এখন উড়িয়ে নিতে পারবে। মাথার চুলগুলো বেশ লম্বা লম্বা। বিষন্ন চেহারার ছেলেটা এখন খুব নিঃশব্দে চলাচল করে। সব সময় উদাস চোখের দৃষ্টিতে ভাবনার ছায়া। একটা সিগারেট ধরিয়ে কনক আবার ভাবনায় মগ্ন হয় : মানুষ সব সময় নিজের চোখে নিজেকে দেখতে ভালোবাসে। তাই তার মনে শুধু আমি। দুনিয়ার সব আমার চাই। আমারচে বড় কে? আমিত্মের এই অগভীর গর্তে দাঁড়িয়ে মানুষ তার পায়ের তলার মাটিকে করে তুলে কর্দম, চারপাশটা হয়ে ওঠে অসহ্য দুর্গন্ধময়। সে যদি অন্তত জীবনে একবার অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে পেত তবে নিজের উপর ঘিন্নায় নিশ্চয়ই শিউরে উঠত। মানুষ নিজের অবচেতন মনেই হয়তো তার আমিত্মের দুষ্টক্ষত, দূর্গন্ধ লুকিয়ে রাখার জন্য নানান রকম পারফিউম ব্যবহার করে। মনের পচা-গলিজগুলো আড়াল করে রাখার জন্য মেলা টাকা খরচ করে দামী দামী ফুলের তোড়া কিনে। হাসি হাসি মুখে দশজনের সাথে হাত মেলায়, বুকে বুক মেলায়, কুশল বিনিময় করে, আল্লা-খোদা-ভগমানের ভরসার কথা বলে। তাই পৃথিবীতে আজ বিলিয়ন বিলিয়ন কোটি ডলারের ফুলের বাজার। তাই আমরা আজ আরো বেশি নিষ্ঠুর। অমানুষ। সম্ভবত বিধাতারও ধারনা ছিল না মানুষের বুদ্ধি আর নির্বুদ্ধিতার ব্যাপ্তি কতটুকু হতে পারে। তাই মানুষের মতো এই দুরন্ধর প্রাণীটির প্রতি বিরক্ত হয়ে বিধাতা মাঝে মাঝে কুটনৈতিক চাল দেন। বোধকরি এই জন্যই বাউল মকদ্দস আলম উদাসীদের মতো মানুষেরা দুনিয়ার কা-কারখানাকে বলেন , ‘সব ভবলীলা। সব হে কৈরা যায়।’

কনকের এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ প্লাফর্মের উত্তর দিক থেকে দীর্ঘদেহী, কালো আর উলঙ্গ এক তরুণ পাগল বুক চিতিয়ে এসে স্টেশানে ঢুকে পড়ে। মাথা ভরতি ধূলাবালি ভরা ধূসর বাবরিটা তার হাঁটার তালে তালে নাচছে। প্লাফর্মের শতশত নারী-পুরুষের সামনে দিয়ে উলঙ্গ উন্মাদ দুই হাত নাচিয়ে নাচিয়ে ঝড়ের বেগে হাঁটছে আর চিৎকার পারছে, মান্… হুঁশ! মান্…হুঁশ! 

চুল-দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখটা নির্বিকার। শীল-নোড়ার মতো কালো আর পেটানো শরীর তার। মাথা উঁচু করে দূরে, সেই অসীমের দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে যাচ্ছে । তার চিৎকারে উপচেপড়া স্টেশানের মানুষগুলো প্রথমে ঢেউয়ের মতো একবার দোলে উঠে। তারপর নিঃশব্দে দু’ভাগ হয়ে পাগলকে মহারাজের মতো পথ করে দেয়। কারো মুখে কোনো কথা নাই। সবাই হা-করে পাগলকে দেখছে। হনহন হাঁটার গতিতে দোলা দিয়ে দুলছে তার লিঙ্গটা। কালো চকচকে আর বিশাল! পুরুষেরা বিস্ময় ভরা চোখে জিনিসটা এক নজর দেখেই তার সাথের নারীর দিকে তাকায়। শুধু একজন না। প্রত্যেকেই তার নিজের পাশে দাঁড়ানো কিংবা বসা মেয়ে কিংবা বউকে তীক্ষ্ণ চোখে এক পলক পরখ করে। স্টেশানের সব নারী উড়না-আঁচল কিংবা বোরকার নেকাব দিয়ে চোখ ঢেকে নিয়েছে দেখে পুরুষেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার পাগলের দিকে নজর দেয়ে। এই ফাঁকে অধিকাংশ নারীর চোখ-ই আবার উড়না-আঁচল কিংবা বোরকার নেকাবের ফাঁক দিয়ে যা দেখার তা দেখতেই থাকে। পাগলের পেটটা পিঠের সাথে লেগে আছে। কোমরটা চিকন আর থামের মতো বলশালী উরু দুইটাও দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে পাগল আবার প্লাফর্মের দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে ফিরে আসে, মান্…হুঁশ! মান্…হুঁশ! 

মান্…হুঁশ কথাটার মানে কি কেউ ভাবে না। যারা বেশি পেট আর চেট নিয়ে ভাবে তাদের মাথা মোটা হয়ে যায়। ভাবতে চাইলেই হাই উঠে, ঘুমে চোখ ঢুলোঢুলো করে। তাই আমজনতার মাঝে কোনো কালেই নিজের পেট ছাড়া কোনো ভাবনা ছিল না। আজও নাই। তবু মানুষের সহজাত স্বভাবের গুনে তারা প্রথম ধাক্কার বিস্ময় কাটিয়ে সচেতন হয়ে উঠে। কিন্তু কেউ কথা বলে না। সবার নজর ও শতভাগ মনোযোগ পাগলের উপর। এই যখন ভেদজ্ঞান ও বাহ্যধ্যাণ তখন সাহস করে এক তরুণ দশটাকার একটা নোট পাগলটার সামনে মেলে ধরে। দেশের রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সিন্ডিকেটবাজির কারণে গত দশ বছরে কৃষিতে বার বার মার খেয়ে তার পিতা এখন নিঃস্ববুড়ো। কৃষক হয়েও সাত-আটজনের সংসারে আজ চিড়া-মুড়িটা পর্যন্ত চড়া দামে কিনে খেতে হয়। কৃষকের সব উৎপাদনের উৎস ও বাজার এখন দেশী তস্কর ও বেনিয়াদের হাতে। তাই এক কেজি মোটা চাল কিনতে লাগে চল্লিশ-পাঁচচল্লিশ টাকা। ধান বেচতে গেলে এক মনের দাম চারশ টাকা! পেটে ভাত থাকুক আর না থাকুক মাস শেষে বিদ্যুতের বিলটা দিতে হয়। ঘরে তিনটা মোবাইল। আজ শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস না হলেও চলে কিন্তু মোবাইলে মিনিট না ভরলে চলে না। তাই নাকের হিৎ (শ্লেষ্মা) শুকাবার আগেই তারা তিন ভাই-বোন গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে গার্মেন্টেসের শ্রমীক হয়েছে। মনের আশা আর স্বপ্নগুলো সব এখনো না মরলেও কাজীমরা। তাই সে এই উছিলায় বিধাতা সাহেবের একটু নেকনজর পাওয়ার জন্য পাগলটার দিকে দশ টাকার নোটটা মেলে ধরে ছিল। তার কপাল মন্দ, পাগল ফিরেও তাকায় না। এইবার পাগলের প্রতি স্টেশানের সবার মনের ভয়টা শ্রদ্ধা হয়ে উঠে। মানুষের কত ধান্ধাবাজী, মনে কত রকম গোপন বিকার, কত কামনা-বাসনা!  জন্মের পর থেকে দুনিয়াদারির চারণভূমিতে সে জ্ঞানার্জন, ধর্মার্জনের বাতাবরণে শুধু চোট্টামীই রপ্ত করেছে। তাই পদে পদে মানুষের কত ঝক্কি, ঝুঁকি। পকেট ভরতি কত টাকা। সুখ সুখ করে ছুটতে ছুটতে ভেতরে ভেতরে কত ক্ষয়! কত ক্লান্তি জমা হয়েছে! তাই কারো পকেট থেকে বেরিয়ে আসে একশ টাকার নোট। কেউ কেউ  বিনীত মিসকিনের অদম হয়ে পাঁচশ কিংবা হাজার টাকার নোট হাতে নিয়ে পাগলের দিকে বারিয়ে রাখে। পাগলের দুই চোখ দূরে, বহু দূরে। 

সারাজীবন ধান্ধাবাজি আর লুচ্চামি করে কাটিয়েছে। তেমনি একজন সাহসী মানুষ হাজার টাকার একটা নোট সামনে মেলে ধরে পাগলের পথ আটকে দাঁড়ায়। পাগল নোটটা না নিয়ে ভুড়িওয়ালা সেই লোকটার মাথার উপর মুখ নামিয়ে এমন জোরে মান্…হুঁশ! বলে হাক মারে যে সেই গর্জন সহ্য করতে না পেরে লোকটা পেন্টেই পেশাব করে দেয়। এই নিয়ে সারা স্টেশানের শতশত মানুষের কি হাসি! কি আমোদ! পাগল কিন্তু উত্তর থেকে আর দক্ষিণে ফিরে না। এবং মিনিটখানেকের মাঝে মানুষ পাগলের কথা ভুলে গিয়ে পান-বিড়ি-সিগারেটে কিংবা আগের আলাপে মজে যায়। কোনো কোনো তরুণ সারা স্টেশান জোড়ে হাঁটে আর মেয়েদের এটা দেখে, সেটা দেখে। পরনে স্টর্স কিংবা হাফপেন্ট, গায়ে ছাপ্পড় মারা গেঞ্জি, কানে ঝুলছে এ্যায়ারফোন, মুখে বাঁদর টাইপ দাড়ি। হাবভাবে সাক্ষাৎ আমির খান! আমির খান! তাই যা যা দেখানো সম্ভব মেয়েরা সব-ই দেখায়। আরো কতকিছু দেখাবার ছিল, চারপাশের এই সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের আদমের গুষ্ঠির জন্য তা পারছে না দেখে কোনো কোনা মেয়ে খামাখাই তার মা কিংবা বাপের দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে থাকে। চারিদিকে এত লুচ্চা-লম্পট, এত পরকিয়ার রসালো ঘটনা দেখতে দেখতে এই কিশোর-তরুণেরাও এখন আল্লার নামে রিহার্সালে নেমে পড়েছে।  

কনক স্টেশানের দুই নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সবকিছুই দেখছিল। শতশত নর-নারীর হাবভাব, পাগলের ভাবসাব। এখন আর কোনো কিছুতেই সে অবাক হয় না। এই ভবলীলার রঙ্গমে  কনক নিজেই এত বেশি নাটক করেছে ও দেখেছে যে এখন সে শুধু একজন অনুতপ্ত দর্শক। প্রকৃতি ও সময়ের নিরিখে স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে যে সূক্ষ্ম একটি ভেদরেখা আছে এখন তাই-ই সে সন্ধান করে।

    একটু পরেই শহরের দিক থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটা জঙ্গি মিছিল এসে প্লাটফর্মে ঢুকে। তাদের মোটাগাটা শরীর আর পরনের দামি পোশাকাশাকের সাথে জবানের ভাষা মিলে না। মাত্র এই চল্লিশ-পঞ্চাশ জন মানুষের গলায় ডালকুত্তার গড়…ড় গড়… আওয়াজ শুনে প্লাটফর্মের শতশত মানুষ ভয়ে তটস্থ হয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে বিড়ালের মতো চিপাচাপায় সেঁধিয়ে পড়ে। মানুষগুলো গর্জন করে বলছে, জুলমত হত্যার বিচার চাই, খুনি আব্বাসের ফাঁসি চাই।

জুলমত হলো এই শহরের একজন কুখ্যাত কমিশনার। তার নামে খুন-ধর্ষণ, ভূমি দখল ও চাঁদাবাজীর কয়েক ডজন মামলা আছে থানায়। থানার রিপোর্ট মতে সে পলাতক। তাকে খোঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। আর আব্বাস হলো এক-ই রাজনৈতিক দলের শহর সভাপতি এবং এই শহরের একচেটিয়া মাদক ব্যবসার প্রধান গুরু। জুলমত কমিশনার হয়ে তার পাতে ভাগ বসাতে চেয়েছিল। এই নিয়ে গত কয় মাস ধরে দুই গ্রুপের মাঝে বেশ আফাল-তাফাল গেছে। আজ সকালে জুলমতের লাশটা নতুন বাজারের ড্রেনে পড়ে থাকতে দেখে সবাই।

    শকুন যখন মরা গরু খায় তখন একলা খায় না। তার একটু পেছনে অপেক্ষায় থাকে কুকুর। আরেকটু দূরে কাক। রাতে আসে শিয়াল, হায়ানারাও। সবাইকে ভাগ দিতে হয়। তা নাহলে কারা জানবাজি রেখে চিৎকার দিবে, দেশদরদি জুলমত হত্যার বিচার চাই, খুনি আব্বাসের ফাঁসি চাই। 

মিছিলটা দেখতে দেখতে রক্তপিপাসু হয়ে ভাঙচুর শুরু করে। কনক এক দৌড়ে গিয়ে চার নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়ানো খালি একটা মালগাড়ির ওয়াগনে ঢুকে পড়ে। তিন নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল মোহনগঞ্জ কমিউটার। পেসেঞ্জার ভরতি সেই ট্রেনেও হামলা হয়। তাদের ছুঁড়ে মারা পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয় অনেক নিরিহ যাত্রী। ইঞ্জিনে আগুন দেওয়া হয়। সারাটা ট্রেন জোড়ে ভাঙচুর চলে। সব ফেলে যাত্রীরা প্রাণ হাতে পালিয়ে যায়। সেই সুবাদে একটা সফল লুটপাটও চালানো হয়। দেশদরদি জুলমত ভাই’র হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে যারা এই শহর তছনছ করছে তারাই উত্তরের একটা স্টেশনে আটকে রেখেছে ঢাকাগামী দুইটা ট্রেন। আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আটক আছে জামালপুরগামী আরেকটা ট্রেন। নারী ও শিশুদের চিৎকার, ডাকাডাকির মাঝে চার-পাঁচটা ট্রেনের যাত্রীরাও এক মিনিটে স্টেশান থেকে হাওয়া হয়ে যায়!             

    ভাঙচুর শেষে ওরা মিছিল দিতে দিতে শহরের দিকে চলে যায়। লোভি, লম্পট আর দুঃখী, দূর্বল, পেট সর্বস্ব বিকলাঙ্গ প্রাণের শতশত সাধারণ মানুষেরা একটু পরেই আবার স্টেশানে ফিরে আসে। কেউ কেউ আসে না। তারা শহরের দিকে চলে গেছে। বাকিরা স্টেশনে ফিরে আলোচনায় মত্ত হয়। এই খুন, এই ভাঙচুরের ভিতরের নাড়িভুড়ি, কলকাঠি। গেটের ডান পাশে দুই কানা ভিক্ষুক বসেছিল তারা আলাপ করে, শহরকুতুব আইয়া আগেভাগে মান্…হুঁশ কৈয়া হুঁশিয়ার কৈরা গ্যালো পুঙ্গির পুতেরা কিচ্ছু বুঝল না।

অন্ধবুড়োর পাশের জন বলে, হ্যারা আছে ট্যাহাকামানি, মাগীচুদানির তালে এইসবের মর্ম তারা ক্যামনে কৈব?

কনক আর দাঁড়ায় না। ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। রিক্সা, সিএনজি, ভিক্ষুক মুক্ত খালি ময়দান। একটা কুবাতাসে সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। কনক মনে মনে হাসে, আল্লার আশরাফুল মাকলুকাতেরা চিরকাল শক্তের ভক্ত, নরমের যম। কনকের নজর পড়ে পাশের সাইনবোর্ডে, ‘আল্লাহর দান।’ সে হোটেলে ঢুকে পড়ে। মানুষে গমগম করছে। আলাপের বিষয়, ঠেলাওয়ালার ছেলে থেকে জুলমত হয়ে উঠা। তারপর জুলমত হায়দার কমিশনার। কোনার দিকে একটা চেয়ার খালি পেয়ে কনক বসে পড়ে। আলাপ চলছে। কনক আর শুনে না। বাইরে বাইরে কত কথা। এই চায়ের কাপ, চাপাতার গন্ধ, বনের একটা গাছের কাঠ হয়ে উঠা, চেয়ার-টেবিল হয়ে উঠা। মানুষ মানুষকে কেন খুন করে? বিধাতা চাইলেই তো সব মানুষের অন্তর সমূহ, মায়ামমতায়, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে পারে? এই আমি কনক আবার যে কোনো দূর্বল মুহূর্তে লম্পটের জীবনে ফিরে যেতে পারি। এইযে পারাপারিটা, এইটাই কী আত্মা আর পরমাত্মার খেলা না?

কনক বুক ভরে দম টানে। রুটি-ডাল-চায়ের গন্ধে কনকের পেটটা কড়কড় ঢাকে। পাশ দিয়ে একটা বয় যাচ্ছিল, সে হাত তোলে রুটি-ডালের ওয়ার্ডর দেয়। কনক মাথা উঁচু করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ‘কাকে যেন খোঁজছে, এইরকম ভঙ্গিতে সবাইকে সে এক নজরে দেখে নেয়। 

‘মানুষ দেখি, 

জুড়াই আঁখি। 

কার জানি গানটা? কার…কার? মনে করতে পারে না। তারপরেই কনকের মনে বিদ্যুতের চমকের মতো কয়টা লাইন খেলে যায়, 

‘মানুষ হ’মন দুষ্ট পাখি

নিজেরে আর দিস না ফাঁকি।

মানুষেতে বসত খোদা,

বিফল হবি ভাবলে যুদা।

মানুষ হ’মন দুষ্ট পাখি…’

কার গান?

কনক নিশ্চত, এটা লেখা হলে এই হবে তার প্রথম গান। হঠাৎ সে চমকে উঠে, না না আমি গান লেখার কে? বাউল মক্কদস আলম উদাসী ভাই বলেছে, হাতে পরমাত্মার প্রভাব পড়লেই গান লেখা হয়।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

এডগার এলান পো | মুম রহমান

Fri Aug 28 , 2020
এডগার এলান পো | মুম রহমান 🌱 বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্পের রাজা বলা হয় এডগার এলান পো (১৮০৯-১৮৪৯) কে। আধুনিক ছোটগল্পের জনকও বলেন কেউ কেউ। ছোটগল্পের এই কারিগর নাজিল করেছেন অসাধারণ কিছু কবিতাও। অনেক সমালোচকদের মতেই, এনাবেল লি, তাঁর সেরা একটি কবিতা। কারো কারো মতে, জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেন লিখতে গিয়ে এ […]
Shares