বই পড়া-প্রেমে পড়া | জাহিদুর রহিম | মূলঃ রোজমেরী আর্কুয়িকো

বই পড়া-প্রেমে পড়া | জাহিদুর রহিম 

মূলঃ রোজমেরী আর্কুয়িকো

🌿

রোজমেরী আর্কুয়িকো (Rosemarie Urquico) ফিলিপাইনের তরুণ লেখিকা। বর্তমানে থাকেন বগ্যুইন শহরে থাকেন।  পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে-  World Health Organization Western Pacific কাজ করেন। ২০১৪ সালে তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে – You should date a girl who reads- নামের লেখাটি প্রকাশিত হলে সারা দুনিয়ায় এই নিবন্ধ কিংবদন্তীর মতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।আর যত জনপ্রিয় হয়েছে লেখা তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে চলে  গেছেন। গুগল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি গুড রিডস-এ তাঁর সম্পর্কে তেমন তথ্য নেই। তবে ব্যক্তিগত ব্লগেই তিনি নিয়মিত লেখেন। 

 https://gfmorris.net/2011/08/ এ ২০১১ সালে তাঁর সম্পর্কে সামান্য তথ্য দেয়া আছে- ‘Rosemarie Urquico (Googling her has shown her to be a writer in her late 20s) wrote a piece entitled “You should date a girl who reads.” in response to a Charles Warnke’s paean to illiterate women.’

নিজের সম্পর্কে তিনি বলছেন, I’m an occasional minstrel, even if it’s not the medieval ages. Sometimes slam poet, devoted drinker, slower than usual driver. I love Combos (the snack), video games, movies, books, poems and writing. I occasionally review things. I like to tell stories (kwento).

 অফিসিয়াল মেইল ও ব্লগ এ  ছাড়া তাঁর কোন  তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না। এবং বইয়ের চেয়ে ব্লগে লেখাই তিনি বেশি পছন্দ করেন।  তবে দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় সব রিডিং গ্রুপ ও পত্রিকার মতে- – You should date a girl who reads- লেখাটি পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের জনপ্রিয় লেখা। Date A Girl Who Reads– তাঁর একমাত্র বই ( এখন পর্যন্ত)

 বই পড়া-প্রেমে পড়া

🌱

প্রেম করতে চাইলে বই পড়তে ভালোবাসে এমন মেয়ের সাথেই প্রেম ক’রো। সেই মেয়ের প্রেমে প’ড়ো, যে কাপড়ের বদলে বই কিনে সব টাকা শেষ করে ফেলে। যার কাপড়ের আলনার জায়গা পরিণত হয় বইয়ের তাকে। এমন মেয়ের সাথে প্রেম ক’রো, বারো বছর বয়স থেকেই যার একটা লাইব্রেরি কার্ড আছে এবং সাথে সবসময়েই থাকে বইয়ের তালিকা থাকে। 

কিভাবে খুঁজবে এমন মেয়েকে বই পড়া যার অভ্যাস? – দেখবে তাঁর 

ব্যাগে সবসময়েই একটা না-পড়া বই থাকবে। সুদৃশ্য বইয়ের দোকানের সাজানো তাকগুলোর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকবে সে, যেন মহামূল্যবান রত্ন দেখছে। আর পছন্দের বই হাতে নিলে নিঃশব্দে চিৎকার করে উঠবে

যদি দেখো পুরনো বইয়ের দোকানে কোন একটা বই হাতে নিয়ে গোলাপের পাপড়ির মতো তার পাতা শুঁকছে কোন অদ্ভুত মেয়ে – বুঝে যাবে এই হচ্ছে সেই পড়ুয়া মেয়ে যাকে তুমি খুজেছ যাবত। পুরনো বইয়ের প্রতি তাঁর দুর্মর আকর্ষণ- বই হাতে নিলে বইয়ের পাতার গন্ধ না শুঁকে না শুকে সে থাকতে পারে না –যেন ফুলের সুবাস নিচ্ছে– পাতাগুলো হলদেটে আর ধুষর হলে তো কথাই নেই! 

দেখবে রাস্তার ধারের কফির দোকানটায় অপেক্ষা করতে করতে বই পড়বে সে– নিরবে উপেক্ষা করে যাবে চারপাশ । তার কফির মগে উঁকি দিলে দেখবে – সেখানে কেবল ক্রীম ভাসছে, কারণ মেয়েটি তখন হারিয়ে লেখকের তৈরি আরেক পৃথিবীতে। 

যদি হঠাৎ সেখানে বসে পড়ো, তোমার দিকে অপরিচিতের কঠিন চোখে তাকাবে সে – পড়ার মাঝখানে কোন ধরণের বিরক্তি পছন্দ করে না যে ওরা! 

তুমি তখন কি করবে? কিভাবে শুরু করবে কথা? শুরু করো বই নিয়েই। বইটা তার ভাল লাগছে কিনা জানতে চাও। এবং তাঁর জন্য 

আরেক কাপ কফির অর্ডার দিও।

তাকে জানিয়ে দিও তোমার প্রিয় লেখকদের কথা। মুরাকামিকে তুমি কেমন লেখক ভাবো সেটা তাকে জানিও। ‘ফেলোশীপ’–এর প্রথম অধ্যায় সে শেষ করতে পেরেছে কিনা জেনে নিও। যদি বলে যে সে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ বুঝতে পেরেছে – কিভাবে বুঝবে সে নিজেকে বুদ্ধিমতী প্রমাণ করার জন্যই কেবল এ কথা বলছে না

মৃদু হেসে জিজ্ঞেস ক’রো – সে কি এলিসকে ভালবাসে, নাকি এলিসের মত হতে চায়

বই প্রেমিক সাথে প্রেম করা আনন্দের ও সুখের । জন্মদিন, উৎসব, বার্ষিকী – যে কোন উপলক্ষ্যেই তাকে বই উপহার দেয়া যায়। হিরার মালার বদলে কথার মালায় গাঁথা উপহার দিতে পারো তাকে – গান, কবিতা, ইতিহাস, দর্শন বা সিনেমার

উপহার দিও তাঁর রুচি মতো, তাঁর পছন্দের বই। নেরুদা, পাউন্ড, সেক্সটন, কামিংস-এর বইও দিতে পারো। কথা মানেই ভালবাসাআর আর প্রেমের মানে গল্পতোমার এই বিশ্বাস তাকে বলে দিও শুরুতেই। 

বই আর বাস্তবের পার্থক্য যদি সে সচেতন থাকে – এটুকু বুঝে নিও; – নিজের জীবনকে সে একটু হলেও তার প্রিয় বইয়ের মত করে গড়ে নিতে চাইবে। এবং যদি চায় – তাতে তোমার কোন দোষ বা কৃতিত্ব নেই ! তাকে কোন না কোনভাবে সুন্দরকে ধরার চেষ্টাটুকু তো করতে হবে! 

তার সাথে যদি মিথ্যে ব’লো, তবে বই নিয়েই বলো। মিষ্টি কোন গল্পের মতো। সে যদি ব্যাকরণ বোঝে, তাহলে এটাও বুঝে নেবে যে তোমার মিথ্যে বলার প্রয়োজন ছিল। বাস্তবের এই নির্মম জগতের চেয়ে গল্পের কল্পনার মিথ্যে অনেক মায়াময়। প্রেমের কথার বাইরেও আরো অনেক কিছু আছে জগতে : প্রেরণা, মূল্যবোধ, বিরোধ, সংলাপ। সান্তনার মিথ্যে জাগতিক ক্ষত ঢেকে দিলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে না! 

মাঝে মাঝে তাকে হতাশ করো! কারণ যে পড়ে, সে জানে পরম পাওয়া কাছে আসে ব্যর্থতা থেকে। সে জানে সবকিছুরই শেষ আছে, আর সব শেষের শুরু আছে

জানে, তুমি তোমার জীবনের গল্পে সবসময়েই একটা নতুন পর্ব লিখতে পারবে। জানে, তুমি পরাজিত হয়ে যতবারই নতুন করে শুরু করবে, প্রতিবারই জয়ী হয়ে ফিরে আসতে পারবে। জীবনে একজন-দুজন দুশমন থাকে থাকবেই – যেমন আসবে খারাপ সময়। সে ভুল বুঝবে না তোমাকে। 

এমন মেয়েকে পেলে দেখবে, তুমি যা কিছু হতে পারোনি জীবনে সেগুলোর জন্য ভয় বা লজ্জা নেই। যে মেয়ে পড়তে ভালোবাবাস সে জানে – মানুষও বইয়ের চরিত্র গুলোর মতো গড়ে ওঠে, কেবল ‘টোয়াইলাইট’ সিরিজের চরিত্রগুলো ছাড়া। 

জীবন চলার পথে যদি কোন পড়ুয়া মেয়েকে খুঁজে পাও, তাকে সম্মানের সাথে নিবিড় করে নিও। রাত দুটোয় ঘুম ভেঙে যদি দেখো একটা বই বুকে জড়িয়ে বসে সে কাঁদছে – তাকে সান্তনা দিও-প্রেম দিও

এক কাপ চা বানিয়ে দিও, আর জড়িয়ে ধরে রেখো। কয়েক ঘণ্টার জন্য হয়তো তাকে তুমি হারাবে – কিন্তু সে শেষমেশ তোমার কাছেই ফিরে আসবে। সে হয়তো তখন এলোমেলো, এমনভাবে সে কথা বলবে যেন বইয়ের চরিত্রগুলো সব বাস্তব – কারণ কিছুক্ষণের জন্য তারা আসলেও তাঁর কাছে তাই হয়ে উঠেছিল। মন দিয়ে শুনে নিও সেই কাহিনী। 

তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিও একটা বেলুনে বসে উপত্যকা না নদীর তীরে; কিংবা কোন প্রিয় রক কনসার্ট চলার সময়। অথবা যখন সে অসুস্থ হয়ে পড়বে – তাঁর মুখ পাণ্ডুর আর বিবর্ণ, সেই সময়, খুব সাদাসিধেভাবে বোলো ভালোবাসার কথা । স্কাইপে বসে বা ভিডিও কলে। 

আমি জানি তখন কি হবে। তখন তোমরা এত বেশি হাসতে থাকবে – মনে হবে যেন হৃৎপিণ্ডটা এখনই ফেটে গিয়ে বুকটাকে রক্তে ভাসিয়ে নিচ্ছে ! আনন্দের কান্নার পানি উভয়ের চোখে চিক চিক করছে। 

একসাথে থাকার সময়, তোমরা নিজেদের জীবনের গল্প লিখবে – নিজেদের ফেলে আসা জীবনের কথা। তোমাদের বাচ্চাদের নাম হবে বই চরিত্রগুলোর মতো অদ্ভুত, সুন্দর, মোলায়েম। আরও অদ্ভুত হবে তাদের রুচি। পড়ুয়া মেয়েটি তার সন্তানদেরকে ‘ক্যাট ইন দ্য হ্যাট’ আর ‘আসলান’কে চিনিয়ে দেবে – একই দিনেই হয়তো

যখন বুড়ো হবে, শীতকালে একসাথে হাঁটতে যাবে তোমরা – তুমি হাটবে ধীরে, সে কথা বলবে বাতাসের মতো নিচু স্বরে। জুতার তলা থেকে তুষার ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে শুনবে নিচু গলায় কীটসের কবিতা আবৃত্তি করছে সে। 

যদি প্রেম করতেই হয়, এমন এক মেয়ের সাথে প্রেম ক’রো যে পড়ে, পড়তে ভালোবাসে – তোমার জীবনটাকে সবচেয়ে বেশি রাঙিয়ে দিতে পারে এমন সঙ্গীই তো তোমার প্রত্যাশা করা উচিৎ

তবে তোমার যদি তাকে নির্বোধ বিনোদন, ফালতু কথা বা ইতর- আনাড়ি প্রস্তাব ছাড়া আর কিছু না দেওয়ার থাকে – তবে তোমার একা থাকাই মঙ্গল

তুমি যদি একই সাথে পার্থিব আর অপার্থিব সৌন্দর্যকে ছুঁতে চাও – এমন মেয়ের সাথে প্রেম ক’রো পড়ার সাথে যার প্রেম। এটা স্বপ্নের মতো সুন্দর হবে, যদি এমন মেয়ের সাথে প্রেম করতে পারো যে লিখতে ভালবাসে।”

🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅🔅

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শফিক হীরা'র কবিতা

Fri Aug 28 , 2020
শফিক হীরা’র কবিতা 🌱 পরিবর্তিত গৃহকোণ আত্মার অবিনশ্বরতা তত্ত্ব পাঠের পর সন্ধ্যা নামে চোখের কোনে আর বুলবুলির ঝাঁক নেমে আসে পাকা টমেটোর বুকে রঙিন ক্ষত সৃষ্টির প্রত্যাশায়। আলবোলা টেনে টেনে ক্লান্ত প্রেমিক মাথা গুঁজে সুনীলের অমীমাংসিত কবিতার নাভিকুন্ডে। বটফল ঝরে প্রবল ক্লান্তিতে। ভাঙা কালভার্ট পেরিয়ে ধূলিমলিন জামার কংকালসার আকৃতি অবেলায় […]
Shares