ঘড়ি বৃত্তান্ত | তপন রায়

ঘড়ি বৃত্তান্ত | তপন রায়

🌱

এখন সকাল সাতটা বেজে বাইশ মিনিট। মুঠোফোনের ডিসপ্লে থেকে আমি সময়টা দেখে নিলাম। হাতঘড়ি, টেবিলঘড়ি বা দেয়ালঘড়ির জায়গা তাে এখন মুঠোফোনের কব্জায়। হাতঘড়ি, প্রায় ব্রাত্যই বলা চলে। তবু ঘড়ি ব্যাপারটা থেকেই যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত। শারীরিক আর মানসিক অভ্যাসের ভিতর বহুদূর পর্যন্ত সেঁধিয়ে গিয়ে কেবলই টিকটিক ক’রে বাজছে। যন্ত্রঘড়ি, জলবড়ি, বালুঘড়ি বা সূর্যঘড়ি নয়। এই ঘড়ি, চিহ্নঘড়ি। এই চিহ্ন স্মৃতির অন্ধকারে আলপনা এঁকে রাখে। অভ্যাসের ভিতর সুইচ টিপে আলাে জ্বালায়, নেভায়। ভােররাতে অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। কলঘর থেকে ডাক আসে। ক্ষুধার রাজ্য থেকে ডাক আসে। ঘুমের দুনিয়া থেকে ডাক আসে। এ-সবই প্রাকৃতিক ঘড়ি। স্মৃতিগুলাে কখনও আবার চিহ্ন হয়ে ওঠে। তখন এই ঘড়ির নাম স্মৃতিখড়ি। 

ছেলেবেলার সন্ধ্যাগুলোতে আমি আর দিদি তারস্বরে চেঁচিয়ে দুলে দুলে পড়া মুখস্ত করতাম। কখনাে ঢুলুনি এলে দিদি অন্য একটা পড়া বের করতাে। আত্মজীবনী। বিদ্যাসাগর। ওখানে কোথাও একটা লাইন ছিল— সেই সময় দরজায় খুঁট করিয়া শব্দ হইল…’, …সত্যি সত্যি তখন আমাদের বাড়ির দরজাতেও খুট ক’রে একটা শব্দ হ’ত আর সেই সঙ্গে দরজা ঠেলে অবিকল সেই আত্মজীবনীর পৃষ্ঠার মতাে প্রবেশ ঘটতাে হরকালী কাকুর। লাজুক-লাজুক হাশি-হাশি মুখ। কাকু এবার বাবার সঙ্গে গল্প জুড়বে। তখন রাত ঠিক সাড়ে আটটা। হর কাকুর এই প্রবেশটা আমার ও দিদির কাছে ছিল একটা জলজ্যান্ত ঘড়ি। আমরা ব্যাপারটা প্রায় প্রতিদিনই পরীক্ষা করে দেখতাম। কেউ টেরই পেত না। দেখতাম… মানে শুনতাম, ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে আট। কারণ হাবুদের বাড়ির বিশাল পেন্ডুলাম-ঘড়িতে ঠিক তখনই ঢং ক’রে একটা সিংগল বেল বেজে উঠবে। কিছুক্ষণ আগেই তাে ঢং ঢং ক’রে আটটার বেল বেজেছিল। তার কিছুক্ষণ রান্নাঘরে কুপির আলােয় মা আমাকে খাওয়াতে বসালে আমাদের গৃহপালিত গরু মঙ্গলি গােয়ালঘর থেকে বেরােবে। পায়ে পায়ে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়াবে। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত আমার খাওয়া দেখবে। আবার খুট ক’রে একটা শব্দ। জুতাে মশমশিয়ে হর কাকু বেরিয়ে যাচ্ছে। মানে সাড়ে নটা বাজলো। গভীর কোনাে কোনাে রাতে শ্যাম ভটচাজ পাশেরবাড়ির ভাওয়ালকে ডিউটির কলবুক দিতে আসতাে। নিশুতি রাতের অন্ধকার আর ঘুম তছনছ ক’রে ভটচাজ চেচাতাে…ডা-উ-ন ট্রে-ন…ভাওয়াল ঘুমের ঘােরে পাশ ফিরতে ফিরতে গালাগাল দিয়ে উঠতো। মানে, আমি বুঝে যেতাম, রাত প্রায় দু’টো বাজে। সকাল বেলা ভাওয়াল যখন ধরাচুরা পরে বেলচা কঁধে গটগট করে বেরিয়ে যাবে, তখন সাতটা বেজে বাইল… আটটা দশে তাে তার শাটেল ধরার কথা। 

হাবুদের পেন্ডুলাম-ঘড়ি আমাদের সময় বলে দিত। ঘড়ি বিগড়ে গেলে এই ঘটনাগুলােই আমাদের কাছে ঘড়ি হয়ে উঠতো। চিহ্নগুলােই ছিল সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘড়ি। বাবার একটা নষ্ট হাতঘড়ি ছাড়া আমাদের বাড়িতে আর কোনাে ঘড়ি ছিলনা তখন।

এই চিহ্নগড়ি আর স্মৃতির ঘড়িগুলাে আজও আ্যালার্ম বাজিয়ে আমাকে জাগায়। তবে পুরনাে চিহ্নগুলাে আবার কখনও পাল্টে যায়। নতুন চিহ্নরা বেশ গুছিয়ে জায়গা ক’রে নেয়। যেমন, ঝকঝকে নীল আকাশ, পেঁজাতুলে মেঘ আর কাশফুলের আবহ ছাড়া কখনাে যদি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ গলায় ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে…’ শােনা যায় তবে গ্রীষ্মের দাবদাহের মধ্যেও আগমনী ব’লে ভুল হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ আসলে আমার কাছে শারদ-কালীন ঘড়ি। তবে নই দশকের গােড়ায় শিলিগুড়ি আসার পর থেকে ধীরে ধীরে চিহ্ন বদলেছে এই ঘড়ি। দেবেশ রায়ের বছরের শারদীয় উপন্যাসগুলো কালে কালে হয়ে উঠেছিল আমার সেই চিহ্নঘড়ি। দেবেশদার সেই একক একটি উপন্যাস পাঠ না করা পর্যন্ত শরতের আকাশটাকে যথেষ্ট নীল মনে হতনা। পেঁজাতুলাের মতাে মেঘ আর কাশফুল-টাশফুলকে মনে হত নিতান্তই ডেকরেটার্সদের কুকীর্তি। হ্যাঁ। দেবেশ রায়ের উপন্যাস আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাসটাকে, চিহ্নটাকে, ঘড়িটাকে বদলে দিতে পেরেছিল।

পুজোসংখ্যার লেখালেখি তথা শারদীয় উপন্যাসগুলােকে আর ততোটা ঝিঁক-চোখে দেখা সম্ভব ছিলনা শুধুমাত্র দেবেশ রায়ের উপন্যাস গুলোর জন্যই। সারা বছর জুড়েই আমাদের অপেক্ষা জমে উঠতাে। নতুন, টাটকা, শরতের গন্ধমাখা অনতি-ঢাউস শারদীয় পত্রিকাটির ভিতরে এবছর না-জানি কী খেলা অপেক্ষা করে আছে? কী ধরনের টুইস্ট অপেক্ষা করে আছে এবছর দেবেশদা’র ভাষা-ব্যবহারে, চিন্তায়, আখ্যানে আর আখ্যানটির বয়নে-বুননে? সব থেকে বিলম্বে, পূজোর প্রায় গা ঘেঁষে পত্রিকাটি বেরােলেই, কৃষ্ণদার (গবেষক-কবি কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য্য ) ফোন, ‘তপন, বেরিয়েছে। তুমি কিনেছ?… ‘এই তাে সবে কিনলাম…’ ঠিক আছ়ে,পড়া শুরু কর। পরে কথা হবে।’

তারপর সদ্য-পড়া দেবেশীয় আখ্যাটাকে নিয়ে খুলে যেত আমাদের গােপন পাঠশালা। প্রতি বছর। এবং বলতে গেলে প্রায় সারা বছরই। মনে পড়ে, গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে বহুল প্রচারিত এক বাংলা দৈনিকের উত্তর-সম্পাদকীয় পুজো-সংখ্যার লেখালেখি তথা শারদীয় উপন্যাস নিয়ে দেবেশদা লিখেছিলেন চমৎকার এক নিবন্ধ। লেখাটি আদতে ছিল পুজো-সংখ্যার লেখা নিয়ে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের সন্দেহ আর ঠাট্টার তীব্র প্রতিবাদ। পুজো-সংখ্যার উপন্যাস ধরে ধরে দেবেশদা প্রমান করতে চেয়েছিলেন, শারদীয় উপন্যাস মানেই শুধু হাল্কা বিনােদন আর বাণিজ্য-বায়ুর হাতছানি নয়; পূজো-সংখ্যাগুলােতেই বরং একে একে প্রকাশিত হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ, সিরিয়াস আর সর্বকালের সেরা সমস্ত উপন্যাস। হােক-না-তা বিগ-হাউজ কিম্বা লিটল, যা খুশি। যথারীতি সেই লেখায় দেবেশদা তাঁর নিজের মহৎ সৃষ্টিগুলােকে বাদ দিয়ে রেখেছিলেন। যদিও আমরা জানি, বছর-বিয়ানি একঘেয়ে শারদীয় সংখ্যাগুলােতেই দীর্ঘদিন যাবৎ একের পর এক অসাধ্য-সাধন করে গেছেন অনন্যসাধারন এই কথােয়াল। শুধু ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ নয়, আমরা দেখেছি, শারদীয় পত্র-পত্রিকাগুলোতেই একের পর এক খন্ডে খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘তিন্তাপুরান’, ‘মানুষ খুন করে কেন’, ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’, ‘সময়-অসময়ের প্রতিবেদন’, আপাতত শাস্তিকল্যান’, ‘শিম্পায়নের প্রতিবেদন, উচ্ছিন্ন উচ্চারণ’, ‘লগন গান্ধার’, ‘যৌনলেখ’, ‘রতিলেখ’ বরিশালের যোগেন মন্ডল’ বা ‘স্বপ্নপুরুষের সন্ধানে’-র মতাে বৃহদায়তন আর হ্রস্বকায়, গুরুত্বপূর্ণ আর সিরিয়াস চিন্তনে ভরপুর সব আখ্যানমালা। অগনন মণিমুক্তা ভরা একেক টুকরো চিন্তামণি সব। সেই অর্থে উপন্যাস’ তাে তিনি লেখেন নি। আজীবন সন্ধান ক’রে গেছেন উপন্যাসের কিকল্প পথ, বিকল্প ভাষা। ইউরােপীয় নভেলের বিভিন্ন ধারার মধ্যে যে বিশেষ ধরন বা মডেলটি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা নভেলের ভগীরথ হ’য়ে উঠলেন, দেবেশ রায় সচেতন ভাবেই সেই ভাগীরথী শ্রোত থেকে সরে এসেছেন। বা, এটাই ছিল হয়তাে দেবেশ রায়ের নিয়তি। তিনি তা তিন্তাবুড়িকে নিয়েই স্বপ্ন দেখবেন, সুর বাঁধবেন। তিনি তাে তিস্তার পাকে পাকেই ঘুরে মরবেন আজীবন। সেই অর্থে প্রথাগত উপন্যাসিকও তিনি হাতে চান নি। তিনি তাে কথােয়াল। তাঁর রচনাগুলো, তাই, পরিচিত উপন্যাসের বদলে হয়ে উঠেছে আখ্যান আর বৃত্তান্ত আর প্রতিবেদন। নভেলের চেনা ছক, চেনা পরিধি আর কাঠামােকে যে তিনি গােড়া থেকেই ভাঙতে ভাঙতে চলেছেন, শুধু তাই নয়, ভেঙেছেন সমর্থ আর নিপুণ হাতে নিজের মডেলকে। বারে বারে ভেঙেছেন। তাই আখ্যান থেকে বৃত্তান্তে আর বৃত্তান্ত থেকে প্রতিবেদনে পাল্টে পাল্টে গেছে তাঁর ভাষারীতি, চিন্তাপরিধি আর কাহিনী-সুজন। কোনাে পুনরাবৃত্তি নয়। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই বদলে ফেলেছেন তাঁর খেলা। প্যাঁচ। কৌশল। বদলে গেছে সুর, লয়, ছন্দ। কখনাে সেখানে তিস্তার বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর চা-বলয় থেকে উঠে এসেছে পুরান-কথকের বিষাদঘন বিলাপ। আবার কখনাে প্রত্যক্ষ করেছি ধ্রুপদী সংগীতের কুটতাল আর বিষম ছন্দের কৃত-কৌশল। সৃজনের আঙিনায় তিনি সব সময় থেকেছেন ঝকঝকে, নতুন। আর ফ্লেশ।

দেবেশদা-র উপন্যাসগুলাে আপাতপাঠে এক একটা রাজনৈতিক আলেখ্য বলে মনে হয়। মনে হয় রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া উপন্যাসের চরিত্রগুলাের আর বুঝি কোনাে পরিচয় নেই। আদ্দিকালের মার্কসবাদী দেবেশদা লােকটা বুঝি মার্কসবাদ আর রাজনীতি ছাড়া আর কিছুটি বুঝতে চাইতেন না। আদতে তা কিন্তু নয়। রাজনীতি তাে এখানে বর্ম মাত্র। সমাজকে, মানুষকে দেখার একটা জানালা। উপন্যাস লেখার টুলস বা কৌশল। আসলে মানুষের শাশ্বত আবেগ আর সহজ অবস্থার চেহারাই আঁকতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই মানুষ বা সমাজ বা সময় কোনাে পূর্ব-নির্দিষ্ট বা কাল্পনিক চেহারা নিয়ে এন্ট্রি পেতনা দেবেশ রায়ের উপন্যাস-চিন্তায়। উপন্যাস বা আখ্যানের সেই সমাজ খুব প্রত্যক্ষ। সেই সমাজের একটা সুনির্দিষ্ট ভূগোল আছে। যে-ভূগোল জাগ্রত খুব। জাগ্রত সেখানকার জলবায়ু, আবহাওয়া আর মানুষের যাবতীয় খুটিনাটি। সেই নির্মম জাগৃতি নিয়েই কিন্তু সেই প্রত্যক্ষ আর নির্দিষ্ট সমাজ, ভূগোল, জলবায়ু আর তার লােকজনেরা বহুদূরের অনির্দিষ্ট দিগন্তরেখা স্পর্শ ক’রে আছে। কিন্তু উপন্যাসের অন্বিষ্ট সময় বা সমাজ বা ইতিহাসই নয় কেবল, উপন্যাসের অন্বিষ্ট ইতিহাসধৃতব্যক্তিমানুষ। এই সমাজ, সময় আয় ইতিহাস ব্যক্তিমানুষের চরিত্র এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জটিল করে তােলে। ফলে মানুষের সংজ্ঞা বারবারই নতুন করে খুঁজতে হয়। ঔপন্যাসিক পৌছতে চান সেই ব্যক্তিমানুষের কাছে, যে-ব্যক্তি মানুষ সময়ে অন্বিত, হয়তাে-বা সময়ের পাকচক্রে বাঁধা। তার কাছে পৌছতে ঔপন্যাসিককে হাজারটা পথ খুঁড়তে হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রবন্ধে তাঁর উপন্যাসমূলক চিন্তা-ভাবনার এই কথাগুলাে বিবৃত করে গেছেন দেবেশ রায়।

বচ্ছরকার লেখাটি পাঠ ক’রে দূরভাষে কি মােবাইলে প্রতিক্রিয়া জানাতে গেলে কপট বিরক্তি প্রকাশ করতেন, কেন পড়েন ওসব ? আপনার কি আর কোনাে কাজ নেই ?’ আসলে খুশি হ’তেন। কিন্তু মনের আসল ভাব গােপন ক’রে রাখতে ভালােবাসতেন। পরীক্ষা করতেন। এটাও ছিল দেবেশদার একধরনের খেলা। তাঁর রচনা পাঠ করা, সেই চক্রবূ্যহে প্রবেশ ক’রে অক্ষত বেরিয়ে আসা খুব সহজ কম্ম যে নয়, সেটা দেবেশদা মনে মনে জানতেন ঠিকই। যখন ধীরে ধীরে তাঁর শ্রবণেনিন্দ্রীয়টি একেবারেই বিকল হ’য়ে পড়ল, তখন থেকে ফোনালাপ গেলাে চিরতরে বন্ধ হয়ে। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার পথও বের করলেন একটা। শুরু হল মােবাইলের কি-প্যাড টিপে টিপে নতুন ক’রে অআকখ শেখা। মেসেজ চালচালি শুরু হ’ল। শুরু হ’ল চ্যাটিং। কৃষ্ণদা-র মােবাইলে মুল্যবান কিছু চ্যাটিং সেভ করা আছে আমি দেখেছি। এক জায়গায় দেবেশদা লিখছেন “…আপনাদের মতাে পাঠক পেলে লিখে সুখ”। রা্ধতা নয়। রূদ্ধতা নয়। নতুন নতুন দিশা আবিস্কার ক’রে তিনি পথ চলতে তালােবাসতেন। ছিলেন সজাগ। হেরে যাওয়া আর বিষাদখিন্ন হয়ে বসে থাকা ওর ধাতে ছিলনা। এমনকি ওর আখ্যান পাত্র-পাত্রীর কিম্বা নায়কেরা (প্রোটাগনিস্ট বলা কি যাবে ?) কেউই চলমান বাংলা নভেলের নায়কদের মতাে নিলীপ্ত আর বিষাদ কি ছিলনা। সদাজাগ্রত, রসবেত্তা আর উদার মন ছিল তাঁর। ছিল ক্ষুরধার বুদ্ধি, সদা সচল মস্তিষ্ক। আদ্যন্ত রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ তিনি। আদ্যন্ত ধ্রুপদী। ধুতি-পাঞ্জাবীতেই শুধু নয়, এই ধ্রুপদীয়ানা ছেয়ে ছিল তাঁর মননে, মেজাজে, রক্তে; ছিল চিন্তনে আর ভাষাগঠনের দিক থেকেও। ওঁর কাছে গিয়ে বসলে ঝিমিয়ে পড়া, নিন্তেজ, নিভন্ত মনও জেগে উঠতাে। তরুন লেখক/কবিদের কাছে তিনি ছিলেন জ্ঞানাঞ্জন-শলাকার মতে। বাংলা ভাষার সম্ভবত এই শেষ শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী-ঔপন্যাসিক, শেষ গুণিন, শেষ ওঝা, শেষ ভাষা-জাদুকর সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে, লক-ডাউনের আড়ালে কেমন নিঃশব্দে চলে গেলেন, ভাবলে অবাক লাগে। লক-ডাউনের বন্দীদশা আর সামাজিক দূরত্বের কথা আপাতত বাদ দিলেও বিগত দু’এক বছরে তিনি কি ক্রমশ নিঃসঙ্গ আর নির্জন হয়ে পড়েছিলেন? তাঁর এই চলে যাওয়া আমার কাছে আম্ফানে বনম্পতি পতনের মতাে মনে হয়। মনে হয় এই-ই বুঝি আসলে ‘ঐরাবতের মৃত্যু’।

জানি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষাদঘন শােকগাথা আর আনন্দোজ্বল স্মৃতিলেখগুলাে মানুষ দেবেশ রায়কে জিইয়ে রাখবে চিরদিন। তাঁর নতুন নতুনতর মুখ আবিষ্কার করে অবাক হ’ব, পুলকিত হ’ব আমরা নিঃসন্দেহে। অগণন তাঁর গুনগ্রাহী, বন্ধু, আত্মীয়, স্বজন, সহকর্মী, প্রকাশক, সমালোচক, শত্রু (?), বিরোধী কিশ্বা ভক্ত। যাদের কলমে হয়তাে দলিল হয়ে থেকে যাবে ব্যক্তি দেবেশ রায়ের মনুষ্যত্ব ব্যক্তিত্ব, বিরক্তি, ঔদার্য, স্বভাব আর মুদ্রাদোষ আর হাসি আর খুনসুটি আর ক্রোধ…। কিন্তু আমি ভাবছি সেই পাঠকের কথা। কোথায় আছে সেই পাঠক লোকিয়ে? যে-পাঠক দেবেশ রায়ের উপন্যাসগুলাে পাঠ করছে নিভৃতে? ছাত্রের মতাে, নেশারুর মতাে,

সমাজ বা নৃবিজ্ঞানীর মতে, প্রকৃত রসিকের মতে ? যে-পাঠক নির্জনে বসেই হয়তাে সঠিক মুল্যায়ন করছে উপন্যাসগুলোর? অসীম ধৈর্য্যে আর নিষ্ঠায় আর ভালোবাসায় সেই নির্জন পাঠক হয়তাে একা একা আবিষ্কার করে চলেছে দেবেশীয় ভুবনের নব নব দিগন্ত। সেই একলা পাঠকটিকে আজ আমাদের খুঁজে পাওয়া দরকার। সেই পাঠক নিশ্চয় খুঁজে নেবে তার দোসর। সেই দোসর-ও আবার খুঁজে বের করবে তার মতো আর কাউকে এভাবেই সেই লুকিয়ে থাকা পাঠকটিকে ক্রম-আবিষ্কারের পথ ধরেই হয়তাে জন্মে জন্মে বেঁচে উঠবে দেবেশীয় ভুবন। কালবিলম্ব না করে দেবেশীয় রস-সমুদ্রে ডুব দেওয়ার হয়তাে এটাই প্রকৃত সময়। কেননা, কোথায় যেন পড়েছিলাম, লেখকের অনুপস্থিতিতেই লেখাগুলাের আত্মার অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটতে থাকে। 

ঘড়িবৃত্তান্ত একবার চালু হলে চলতেই থাকে। পেন্ডুলামের মতাে। থামতে জানেনা। দেবেশদা-র উপন্যাসগুলাে আগেও যেমন, এখনো, হাবুদের বাড়ির সেই অদৃশ্য পেলাম-খড়িটার মতােই আমাকে আজীবন সময়ের জানান দিয়ে যাবে। প্রহর পরিবর্তনের সংবাদ দিয়ে যাবে। একটা লেখা কখন কিভাবে শুরু হয়ে যায, কখন যে শেষ

করতে হয়, আমার জানা নেই। কম্পিউটার মনিটরে দেখি রাত তিনটে বেঞ্চে বত্রিশ মিনিট পেরিয়ে কয়েক সেকেন্ড হয়ে যাচ্ছে। কোথাও একটা নাম-না-জানা পাখি ডেকে উঠছে। এখন কি থামা উচিত ? এই সময়টাকেই কি ব্রাহ্মমূহুর্ত  বলে? শুনেছি আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা নাকি ব্রাহ্মমূহুর্তে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতেন।

তার বদলে সামনের খােলা বইটা থেকে দেবেশদা-র অনেক পুরনাে এক জবানবন্দির শেষ কয়েকটা পংক্তি এখন মনে মনে উচ্চারণ করব আমি:

আমার মৃত্যুর আগেই যদি চোখ অন্ধকার হয়ে যায়, কান প্রতিধ্বনিহীন হয়ে যায়, গলা শব্দহীন হয়ে যায়, পা চলনহীন হয়ে যায়, সে সবই আমি সইতে পারব যদি তখনাে লিখতে পারি। সব দেখা-শোনা-বলা-চলা তখন সম্পন্ন করতে থাকব। মানুষ হিসেবে জন্মেছি বলেই তো জন্মসূত্রে চোখ-কান-মুখ-পা পেয়েছি। এতে আমার বাহাদুরি কী ? মানুষকে তাে আমি আমার লেখাটুকুই দিতে পেরেছি। ওটুকুই আমার একেবারে নিজের। যা-পেরেছি, আমিই পেরেছি। আর-কেউ পারত না। আর কেউ পারবেও না।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

রবার্ট ফ্রস্ট | মুম রহমান

Fri Sep 4 , 2020
রবার্ট ফ্রস্ট | মুম রহমান 🌱 রবার্ট লি ফরেস্ট বিশ শতকের আমেরিকার অন্যতম আলোচিত ও শ্রদ্ধেয় কবি। আমেরিকার সাহিত্য জগতে তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং শৈল্পিক কবি হিসাবে একক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছেন।  তবে আমেরিকায় নয়, তিনি প্রথমে ব্রিটেনেই তার কবিতা ছাপেন। আমেরিকার গ্রামীন জীবন এবং চলিত ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি […]
Shares