টর্চলাইটের লাইট | আনিফ রুবেদ

টর্চলাইটের লাইট | আনিফ রুবেদ

🌱

মাংসগুলোর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত, জিভ দিয়ে ঝরত লোভের লালা। দুএকটা রগের টুকরো ছুঁড়ে মারলে এসে খপ করে ধরে নিয়ে স্বস্থানে গিয়ে আয়েশ করে খেয়ে আবার তাকিয়ে থাকতো বা ঝিমুতো। কুকুরটা আজ আসেনি।

পিলারে হেলান দিয়ে হিরু কসাই বসেই থাকে। এতক্ষণ তার বাড়ির দিকে রওনা দেবার কথা কিন্তু ওঠার নাম কথা নাই। হিরু কসাই বসে আছে ফুলির জন্যে। ফুলি হাড়কুড়–নি। প্রতিদিন এই সময়ের মধ্যেই আসে। হিরু কসাই কোনোদিন কথা বলেনি ফুলির সাথে। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। বড় ভালো লাগে। ওর সরু মাজাটা ধরে বড্ড আদর করতে ইচ্ছে করে। সাহস করতে পারে না হিরু। সে কসাইগিরি করে কিন্তু মেয়েদের কাছে ভেজা বিড়াল।

হিরুর বউ ইয়া মোটা, শুধু গোশত, রূপ বলে কিছু নেই। যেখান ধরবে সেখানেই স্তনের স্বাদ। হিরু মজা পায় না। তার চাইতে বড় কথা, বউটা খুব জালিম, কসাইয়ের মতো, নরম করে কথা বলতে পারে না। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঝগড়া করে। হিরু মড়ার মতো শুয়ে থাকে, রা কাড়ে না। কখনো কখনো তার ব্যক্তিগত ইঁদুর সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত হয় কিন্তু বউয়ের কণ্ঠস্বরের আঘাতে ইঁদুর মারা পড়ে। মরা ইঁদুর মরে পড়ে থাকে। ঐ যে গল্পে মার্জার নিধনের গল্প আছে তেমনই। এখানে গল্পটা বাসর রাতে ইঁদুর মারার।

বসে থাকতে থাকতে হিরুর মন খারাপ হয়ে আসে। নাহ্ এত দেরি তো ফুলি করে না এতক্ষণ হাড় কুড়োতে চলে আসে। বসেই থাকে হিরু।

খালেক কসাই সাইকেল নিয়ে আসছে। সে আরো একটু দূরে কসাইগিরি করে। তার এক হাত ঠুঁটা। কয়েকবছর আগে গরু জবাই করার সময়, গরুটা কেমন করে লাফিয়ে ওঠে, ছোরাটা হাত থেকে পড়ে যায়। ছোরাটা গরুর ক্ষুরের ফাঁকে আঁটকে যায়। খালেক কসাই চিৎ হয়ে পড়ে গেছিল। গরুটা পালায়। খালেকের হাতের ওপর গরুর পা পড়ে এবং ক্ষুরে আঁটকে থাকা ধারাল ছোরায় হাতের রগ কেটে যায়। পরে ডাক্তার বাকি খানিক কেটে দেয়। খালেক কসাই এখনো গরু কাটে। জবাইয়ের আগে ঠুঁটা হাতে দড়ি দিয়ে শক্ত করে ছোরা বেঁধে। খালেক কসাই সাইকেল চালানোর সময় এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে থাকে, ঠুঁটা হাত পাঞ্জাবির পকেটে ভরে রাখে। হিরুর কাছাকাছি এসে, খালেক কসাই হলদে দাঁত বের করে হাসে ‘কী খবর কসাই বাড়ি যাব্যা না। গোশ তো সব শ্যাষ হেগেছে। কিসের লাইগ্যা বস্যা আছ।’ হিরু কষায় অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তার মনে হচ্ছে খালেক কসাই মনে হয় বুঝতে পারছে সে কেন বসে আছে। মনে হয় সে ধরা পড়ে গেছে। হিরু অপরিপূর্ণভাবে খালেক কষায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ‘না, এই মানে, এখনি চল্যা যাব।’ ক্রিং ক্রিং করতে করতে খালেক কসাইয়ের সাইকেল চলে যায়।

পৃথিবীর বুকে পালের মতো সন্ধ্যা নেমে আসে পশ্চিমাকাশে। শুধুমাত্র একটু মেয়েদের পায়ের আলতার মতো আভা লেগে আছে। ছোট থাকতে কার পায়ে যেন এমন আলতা দেখত, সেই মেয়ের পায়ে দেখা আলতাটা, তার মুখটা মনে পড়ে না। বারবার সে চেষ্টা করে মনে করার। মনে পড়ে না। বারবার ফুলির আলতা মাখা পা দুটো মনে পড়ছে।

যে সংখ্যক কাক ছিল তাদের কয়েকটা বাদে সবাই চলে গেছে। যারা আছে তাদের বাসা হয়ত এই কাছের গাছগুলোতেই কোথাও। অথবা এরা হিরুর মতো কোনো ফুলির জন্য অপেক্ষা করছে।

হিরু কসাই রামদা, ছোট ছুরি, বড় ছুরি, শানপাথর সবকিছু ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। শহর ছেড়ে বেশ কিছু দূরে ওর গ্রাম। রিক্সা করে কালিনগর পর্যন্ত যাওয়া যাবে, তারপর পায়ে হাঁটা ধুলার এবড়ো খেবড়ো পথ। নদীর কোল ঘেঁষে কিছু দূর গিয়ে পথটা নদীকে ছেড়ে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। আজকে হিরু রিক্সা নিল না। ২-৩ কিমি পথ হেঁটেই চলে যাবে।

সে ভালো নেই। তারপরেও লোকজন জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেয় ‘ভালো আছি।’ নিজের মনের সাথে ছলনা করে সে ভালো থাকে। শহরের মধ্যে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ হলুদ মনে হয় চারদিক। শহর ছেড়ে হিরু বেরিয়ে ব্রীজের উপর উঠে। সোডিয়াম লাইটের আলোয় সব মানুষকে বানরের মতো লাগে। সবাই এক। পোশাকের চাকচিক্য কারো নেই। ভিখিরির মতো সবারই পোশাক। হিরুর মনে পড়ে তাদের অবস্থা কত খারাপই না ছিল। দুবেলা ঠিক মতো খাবার জুটত না। বাপ করত ইটের ভাটায় কাজ। বুকের ব্যথায় কয়েকদিন পড়ে থেকে কয়েকদিন পর মরে গেল। হিরুই একমাত্র ছেলে। তার উপর সংসারের ভার। প্রথমে সে খালাই দলে যোগ দিয়েছিল। তারপর কসাই। এখন অনেকটা জাত কসাই।

ব্রীজটা পার হলেই হঠাৎ করে আঁধারের খালে পড়ে যেতে হয় তাকে। ব্রীজের আলো আর শহরের হলদেটে আলোর কারণে রাতের আসল চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। চাঁদ উঠেনি। যদিও সারা আকাশময় সাবানের বুদবুদের মতো ছোট ছোট তারা উঠেছে। কাঁচা রাস্তার দুপাশে বাবলাগাছ, আমগাছের সাথে রাতটা লেপ্টে লেগে আছে। রাস্তাটা বেশ অন্ধকার। সূঁচের মতো জোনাকমাছির আলোগুলো গাঢ় রাতের মধ্যে নক্সীরাত বুনতে ব্যস্ত। কাপড়ের রক্তগন্ধী ব্যাগটার মধ্যে হাত ঢুকায় হিরু। টাকা, ছোরা, রামদা টর্চলাইট সব সহাবস্থান করছে। অন্ধকারে ব্যাগের মধ্যে হাতড়ে টর্চ বের করতে গিয়ে ছোরার আগার খোঁচা লাগল। ‘আহ্’। খোঁচা খেয়ে হাতটা জ্বলছে। টর্চটা বের করে জ্বেলে দেখল খুব অল্প কেটেছে। খোঁচা খাওয়া জায়গা হতে বেশ বড় একটা লাল টকটকে রক্তফোঁটা বেরিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আছে। রক্ত ফোঁটা চকচক করছে। ছোট লাল ঘাসফুলের মতো রক্তের ফোঁটা। গরুর রক্ত মাখা কালচে ব্যাগটাতে হিরু রক্ত মুছে নিল। কম কেটেছে কিন্তু খুব জ্বলছে। জ্বলার দিকে আর মন দিল না, টর্চটা সামনে ফেলে হাঁটতে লাগল।

টর্চের আলো পড়তেই রাতটা চমকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। নিভতেই আবার জোয়ারের জলের মতো অন্ধকার এসে কালো দেয়াল তৈরি করছে। টর্চটা আলো দ্যায় খুব। ভালো লাইট। এভারেডি, তিন ব্যাটারি। শ্বশুরের কাছে হতে পাওয়া। শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছুই পায়নি হিরু। শুধু এই টর্চটা। রাগ করে শ্বশুরকে বলেছিল ‘কী দরকার আব্বা’। ‘এই এমনি, আন্ধারে অসুরে কামে লাগবে’ অভিমানের আশপাশ দিয়েও হাঁটেনি শ্বশুর মশাই। ফলে তার রাগ অভিমান আরো বেড়ে গেছিল। লাইটটা শ্বশুর চলে যাবার পর ছুঁড়ে ফেলেছিল। বউটাই কুড়িয়ে এনে তার ব্যাগে ভরে রেখেছিল। হিরু আর কিছু বলেনি। টর্চ প্রতিদিন ব্যাগে আসে ব্যাগেই ফিরে যায়, কোনোদিন ব্যবহারও করেনি। আজকেই প্রথম বের করল। আজকেই জ্বালালো, নিভালো।

টর্চের আলোটা লাঙলের ফলার মতো রাত জমিনের বুকে হাল বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই হালের আঁচড়ে কী যে ফলবে তা কে জানে। হাঁটতে হাঁটতে হিরুর খুব প্রস্রাবের বেগ আসে। এখানেই প্রস্রাব করা যাবে না। আট দশ বাড়ি পার হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তার ধার ফাঁকা আছে। ওখানে কোনো বাড়িঘর নেই। সে ফাঁকাস্থানের মধ্যেই কোথাও প্রসব করে নেবে মনে করে হাঁটে। টর্চ জ্বলে। আঁধার পালায়। প্রস্রাবের বেগ বাড়ছে। টর্চ নেভে। আঁধার আসে। প্রস্রাব ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে তার জন্য। শিশ্নের মাথার কাছে মনে হচ্ছে প্রস্রাব চলে এসেছে। তাহের হাজির বেড়া দেওয়া লিচু বাগানের কাছে এলে সে প্রস্রাব খালাস করবেই বলে মনে করে। পগার দেয়া বেড়া। মূল রাস্তা থেকে পগারের দিকে সে দ্রুত এগিয়ে যায়। টর্চ মেরে যেখানে প্রস্রাব পড়তে পারে সে জায়গা দেখে নেয়। প্রস্রাব ছাড়ার সকল প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল হিরু কিন্তু যেখানে প্রস্রাব পড়বে সে জায়গাতে খালেক ব্যাপারি আর ফুলিকে দেখে প্রস্রাব যে পথ ধরে আসতে চেয়েছিল হতচকিত হয়ে সে পথেই ঘুরে মুত্রথলিতে গিয়ে হাজির হয়। হিরু নড়তে পারে না, প্রচ- প্রস্রাবচাপ তাকে নড়তে দিচ্ছে না। খালেক নড়ছে না লজ্জায়। ফুলি নড়তে পারছে না খালেক কসাইয়ের শরীরের চাপে।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ওয়ালেস স্টিভেন্স | মুম রহমান

Mon Sep 7 , 2020
ওয়ালেস স্টিভেন্স | মুম রহমান 🌱 আমেরিকার আধুনিক কবি ওয়ালেস স্টিভেন্স হার্ভার্ডে পড়াকালেই সেখানকার ‘এডভোকেট’ পত্রিকায় বাবার উৎসাহে লেখালেখি শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘এডভোকেট’ এবং ‘হার্ভার্ড মান্থলি’ পত্রিকার সম্পাদকও হন। পত্রিকার প্রয়োজনেই তিনি নিয়মিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। কিন্তু হার্ভাড ছাড়াও পর স্টিভেন্স বাস্তব জগতের মুখোমুখি হন। তিনি নিজেকে […]
Shares