ব্রহ্মপুত্রের নেপথ্য ঢেউ | নীহার লিখন

ব্রহ্মপুত্রের নেপথ্য ঢেউ | নীহার লিখন 

🌱

ব্রহ্মপুত্র কাব্যটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে, এবং এটাকে আমি বলবো কেবল মাত্র মলাটবন্দী একটা বইয়ের আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিক ক্ষণ বা কালটি,যদিও সাধারণ অর্থে,বিশেষ করে একটি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলো বহুমাত্রার আর বিষয় বা নন্দনের একটি সন্মিলিত প্রয়াস হিসেবেই আমরা দেখে থাকি, এবং যার জন্যে,অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি কবিতাগুলো একত্রীকরণে একটি মলাটবদ্ধ হওয়ার নেপথ্যে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে, এবং এই লাগাটাই সমীচীন,তাহলে অন্য আট দশটা কাব্যের সাথে ব্রহ্মপুত্রের নেপথ্য গল্পটির কী আদৌ কোনো প্রার্থক্য আছে, বা নেই? এক্ষেত্রে আমি নিশ্চুপ থাকলেও কেন যানি ব্রহ্মপুত্র কাব্যটির বিন্যাস, বিশেষ করে একটি নদকে আশ্রয় করে অনেকটা মহাকাব্যিক ধাঁচের এই সমস্ত কাব্যটিতে এই নদকে ঘিরেই সমস্ত চলন ও বলন, কাব্যটিকে ভিন্ন একটি ভাবনাতে ভাবার উপলক্ষ গড়ে দিয়েছে বলেই আমার মনে হয়।যেহেতু এই কাব্যটির পরে আমার আরও চারটি কাব্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পরও ব্রহ্মপুত্র নিয়ে আজও পাঠকের সাড়ার জায়গাটি টের পাই, পাচ্ছি অনবরত। 

কবি সরোজ মোস্তফা যখন আমাকে অনুধ্যান সাহিত্য পত্রিকার জন্যে আমার কাব্যগ্রন্থ ব্রহ্মপুত্রের নেপথ্যে গল্প নিয়ে আমার অনুভবের জায়গাটি লিখতে বললেন,আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী লিখবো, আর কোত্থেকে লিখবো বা শুরুটাই করবো কোত্থেকে; এক্ষেত্রে আরও একটু বড় ভাবনার কারণ হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছিলো বইটির পাঠক প্রিয়তা, এবং কাব্যমোদীদের কাছে কাব্যটির প্রতি ক্রমবর্ধমান আবেদনও আমাকে খুবই যে ভাবায়, পুলকিত করে সেটিও মাথায় রাখতেই হয়, কিছু বলতে গেলে, কারণ নিজের একটি প্রকাশিত কাব্য নিয়ে নিজের অনুভুতির প্রকাশটি অনেকেই হয়তো সাফাই হিসেবে নিয়ে নিলে বিব্রত হওয়া ছাড়া উপায় বিশেষ কিছু বাকি থাকবে না বলেই আমার মনে হয়, তবু কবি সরোজ মোস্তফার আহবানটি বেশ আন্দোলিতই করলো যেনো , আর একেতো আমার এটি ডেব্যু বই, তাই ব্রহ্মপুত্র নিয়ে বলা বা ভাবাটা আমার খুব প্রিয় একটি বিষয়ই বলা যায়; যদিও ইতোমধ্যে আমার পাঁচটি কাব্য বেড়িয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র সহ, তবু ব্রহ্মপুত্রের আবেদন আমার কাছে বরাবরই অন্যরকম এক ভালো লাগার বা ভিন্ন একটি মাত্রা বা মার্গের,যেহেতু এই কাব্যটিই আমাকে নতুন অভিধায় অভিহিত করেছে পাঠক তথা সকলের কাছে, এবং ইতোমধ্যেই ব্রহ্মপুত্রের কবি হিসেবে উপাধিও জুটে গেছে নামের সাথে, এবং এটি আমার অজান্তেই কিভাবে যেনো প্রতিষ্ঠিতও হয়ে গেলো;  অনেক সময়ই এই এতোসব বিস্ময় লুকাতে পারি না আমি। ব্রহ্মপুত্রের কবি হিসেবে যখন কেউ আমাকে চেনেন তখন প্রথম প্রথম লজ্জিতও হতাম, কিন্তু এটা যেন এক প্রকার ঐ প্রকাশিত দীর্ঘ একটি কাব্যের মতোই সত্য হয়ে গেলো, এবং কিভাবে যেনো, এবং  নিন্দুকদের ফিসফিসানি উড়ে গেলো কাব্যটির উদ্ভাসে, আর এটি আমাকে এনে দিলো এক নতুন পরিচয়, নতুন দায়টিও, যা বয়ে চলতে হচ্ছে, চলছি। 

 

ব্রহ্মপুত্র নদ আমার যাপনের একটি বিশাল অংশ, এটা সত্য যে, এরকম যাপনে এই নদ আরও অজস্র জন, অজস্র ভূগোলকে জড়িয়েছে,সেই মানস সরোবর থেকে শুরু করে আমার জীবন পর্যন্ত আসতে,আর এটা নিছকই বাহ্যিক বা ভৌতিক ব্রহ্মপুত্রের কথাটি ধরলে খুবই সত্য, কিন্তু আমার সাহিত্যিক বিবেচনায় এটি নিশ্চই ততোটা কাজের কিছু না,বিশেষ করে  ব্রহ্মপুত্র কাব্যটিকে বিবেচনা করলে।ইতোমধ্যে বইটির বেশ কিছু রিভিউতেও এই সত্যটি অনেকাংশেই উন্মোচিতও হয়েছে বলে মনে করি; খ্যাতনামা কবি মুজিব মেহদী’র একটি রিভিউ ছিলো ২০১৭এর বইমেলা চলাকালীন তাঁর পঠিত সেবার মেলার কিছু বই নিয়ে, যেখানে ব্রহ্মপুত্র নিয়ে তার পাঠমুল্যায়নটিতে তিনি যা বলেছিলেন তা এ যাবতকালের অনেকের লিখিত বা মৌখিক রিভিউওয়াল মন্তব্যের মধ্যে আমার নেপথ্যের চিন্তাটিকে বহুলাংশে পড়ে ফেলার মতোই ছিলো যেন;  ব্রহ্মপুত্র নিয়ে যেখানে তাঁর একটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ মানি, যা আমাকে পুলকিত করেছে যারপরনাই এই জন্যে যে তাঁর মতো একজন কবি যিনি কীনা নিজেও এই ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই এক দীর্ঘ জীবন পাড় করেছেন, তো তিনি যখন বলছিলেন এরকম কথাটি যার সারমর্ম এমন যে, ব্রহ্মপুত্রকে আশ্রয় করে এক ভিন্ন সম্পর্ককে কবি নীহার লিখন চিত্রিত করেছেন এই কাব্যে, যেখানে জল ও জলজ শব্দ ও জীবন উঠে এসেছে মূহর্মূহূ।কথাটি আমার মনোভূমকে, বিশেষ করে এই কাব্যের জন্যে খুব করে ছুঁয়েছে; এখানে জল জীবনের আশ্রয়টি কাব্যটির বাহ্যিক প্রতিবেশের স্বাক্ষর, পাশাপাশি সেই ভিন্ন একটি সম্পর্ক বলতে যে জগতটিকে তিনি নির্দেশ করতে চেয়েছেন সেটিও এই বাহ্যিক প্রতিবেশেরই প্রনোদনার একটি অন্তর্গত নন্দনতত্ত্বের জগত, যা এই কাব্যটির সারবত্তা, এবং এখানে খুব অবধারিতভাবেই তাড়িত হয়েছি বলতে অন্য কোনো গল্প যার কুশিলব হিসেবে এসেছে এতদঅঞ্চলের লোকাচারের নানান অনুষঙ্গ ও মিথ, বা স্থানিক অনেক কিছুই, আর ব্রাত্য জীবনের মানুষ ও তাদের সম্পর্কায়নের গাঙটি ও সর্বোপরি তাদের জীবন ও যাপনের অর্থ ও শব্দ-নৈশব্দ।সত্যি বলতে ব্রহ্মপুত্র কাব্যে আমি কেবল একটি যেনতেন কোনো নদী বা জলজ জীবনের ধারাবিবরনীর দায়িত্বের প্রজেক্ট হিসেবে নিতে চাই নি কখনোই, আর এমনও চাইনি যে একটি সচরাচর বিমুগ্ধতার অতি ব্যক্তিগত ভঙ্গিমার প্রেমাস্পদ চিত্রাবলীর বাখানে পাঠককে রোমাঞ্চ দিতে; অনেকেই যেটা খুব প্রাথমিক চিন্তায় ধরে নিতে চায়, যেহেতু বিষয় হিসেবে একটি নদী, আর যেটিকে আবর্ত করেই পুরোটা কাব্য, তাই পাঠকের এমন ভাবনাটাকে একেবারে অমূলকও বলা যাবে না; এক্ষেত্রে কপোতাক্ষ নিয়ে মাইকেলের ব্যাক্তিগত বিচ্ছেদের পরিক্রমায় যে আকুতির বিষয়টি ফুটে উঠেছিলো আর সেই সেন্টিমেন্টকে মাইকেল যেভাবে প্রবাহিত করে দিতে পেরেছিলেন পেট্রিয়টিক একটি খাতে, ব্রহ্মপুত্র নিয়ে আমার সে সুযোগটি ছিলো না ততোটা, এটাতো বেশ সত্যই, তবে এক্ষেত্রে আমাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে আরেকটি মাত্রায়,সেটি হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক ঘেরটোপে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের শরীর দেখে সামান্য দূরের অতীতে ফিরে দেখা তাঁর সৌষ্ঠব,খড়তা ও বিশালতা, এবং তাকে ঘিরে গড়ে উঠা নানাবিধ কিংবদন্তি ও জীবন আর তার সংলগ্নতায় একটা তল্লাটের সংস্কৃতি ও বৈভব।

 

আর একটি বিষয় দ্বিতীয় দশকের, তথা কনটেমপোরারি এই কাল খন্ডের একজন কবি হিসেবে আমার প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা চ্যালেঞ্জতো সর্বোপরি ছিলোই যখন আমার  সমকালের অধিকাংশ কবির কাজেই প্রত্যক্ষভাবেই এবসার্ড ভাব ও ভাবনা,  বা উত্তরাধুনিকতাসহ কীসব ভাবনা ও নির্মানের অনুরণন চেতনে অবচেতনে ক্রিয়ারত বলেই মনে হয় সেখানে ব্রহ্মপুত্র ও নীহার লিখন যেনো সবার থেকে একটু আলাদা বা ব্যতিক্রমই;  বিষয় নির্বাচন ও আঙ্গিকে স্ব-বোধ ও স্ব-কৃতিকে বরাবরই আমি পাথেয় মানি আমার ভাবনা ও কর্মে, তাই সমকালীন নানান অপভ্রংশ ও অস্পষ্টতার চর্চাকে পাশ কাটানোটাকেই খুব সচেতন দায় বা দায়িত্ব হিসেবে মানি আমি,যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ  ব্রহ্মপুত্র এবং মনে করি একজন আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন যে কোনো শিল্পীরই এটা মানা উচিত। স্বজাতিয় সংস্কার, আচার, মিথ, জীবন, রাজনীতি, ইতিহাস,ভূগোল বা সবকিছুর প্রতি একজন কবিকে আজীবন দায়বদ্ধ থাকতে হয়, এবং প্রকৃত সংবেদ ও সংলগ্নতা আর ভালোবাসায়ই সে দায় ফিরিয়ে দেবার তাগাদাটি প্রকারান্তরে তার কর্মকে সত্ত্ব দান করে, সত্য দান করে।  এক্ষেত্রেও ব্রহ্মপুত্র হতে পারে যার একটি উজ্বল উদাহরণ; সমকালীন ডামাডোলের প্রলোভনকে পাশ কাটিয়ে এখানে আমি খুব সচেতনেই নির্মিতিতে প্রাধান্য দেই নব্য-রোমান্টিকতার আশ্রয়কে, যা আধুনিক কাব্যপ্র‍য়াসের কিছুটা বাইরের প্র‍য়াস বলেই অনেকের মনে হয় যেনো, আর প্রকরণের দিক থেকে প্রচলিত ছন্দের অক্ষরবৃত্তের খুব কাছাকাছিই স্বরটিকে রাখতে রাখতে ভেঙ্গেছি অন্য এক স্বরে, যেখানে প্রায়শই শোনা যায় স্বরবৃত্তিয় দোলা; এই কাব্যটির প্রকরণ নিয়ে কবি মুজিব মেহদীর চোখ এই বিষয়েও খুব যথার্থভাবেই পড়েছে, পাশাপাশি দৈনিক জনকন্ঠের সাহিত্য পাতায় সম্প্রতি কবি অরূপ কিষান এই কাব্য নিয়ে একটি রিভিউতে বিস্তর আলোচনা করেছেন তাঁর পাঠে ধরা পড়া অভিনব বলে মনে হওয়া অনেক উপমা ও আলঙ্কারিক দিক নিয়ে, যা ব্রহ্মপুত্র নিয়ে আমার নেপথ্য গল্পের খুব কাছাকাছিই বলা চলে। 

 

এই কাব্যটি লেখার অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছি ভারতীয় পুরানের এক উজ্বল চরিত্র পরশুরামের কাছে থেকে,আমার ব্যক্তিমননে এই নদী শুধুই যে কেবল একটি নান্দনিক জলাধারটিই নয়, তা আমাকে টের পাইয়েছেন স্বয়ং পরশুরামই। মাতৃ হন্তারক পরশুরামের হাতে সেঁটে যাওয়া কুঠারটি ছাড়াতেই তিনি হিমালয়ের ব্রহ্মকুন্ডের পবিত্র জলে হাত ধুয়ে শাপ মোচিত হয়ে এই ব্রহ্মপুত্রকে পৃথিবীর কল্যানে পবিত্র জল ধারা হিসেবে বাহিত করে আনলেন, এই ঘটনাটি আমার ব্রহ্মপুত্র কাব্যটি রচনার মূল শক্তি হিসেবেই কাজ করেছে। পরশুরামে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমি এই কাব্যটি শুরু করেছিলাম যেখানে পবিত্র ব্রহ্মপুত্র কেবল একটি নদ না, আরও অনেক সত্তার মানব বা মানবী হিসেবেও ধরা দেয়, আর যেহেতু কবিতায় লিখেছি এবং পুরোটা কাব্যে এই ব্রহ্মপুত্রকেই, এবং যার জন্যে আমাকে প্রায় একটি দশক কাল এই নদকে অনুভব করতে হয়েছে, তাই  খুব স্বভাবতই এই নদের ইতিহাস,ঐতিহ্য,সমকালিন জীবন ও মানুষ অবধারিতভাবেই এসেছেই, কল্পনার পাশাপাশি, এবং তা বলা বাহুল্যই মনে করছি।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শহীদ কাদরীর কবিতা: নাগরিক চেতনার ভিতরে এবং বাইরে | কাজী নাসির মামুন

Fri Sep 11 , 2020
শহীদ কাদরীর কবিতা: নাগরিক চেতনার ভিতরে এবং বাইরে | কাজী নাসির মামুন 🌱 বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশের ধূসর পান্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা কালে বলেছেন, ‘কবিদের গায়ে লেবেল আঁটা থাকলে ডক্টরেট ডিগ্রীকামীদের সহায়তা হয়, কিন্তু রসোপলব্ধিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’ কথাটা বহুলাংশে সত্য। কেননা যে-লেভেলে কবিকে আবদ্ধ করা হলো, তার বাইরে কবি বহু […]
Shares