কবিতাগুচ্ছ | জহির রিপন

কবিতাগুচ্ছ | জহির রিপন

🌱


অপঘাতে ফোটা ফুল
.
এমন বৃষ্টি ঝরছে মাগো সকাল গেছে ডুবে
জলের বুকে পাটক্ষেত আর কত ভেসে রবে
গাছের পাতার কেঁপে কেঁপে উঠা এই মৃদু ঝড়ে
হাইওয়ের বুকে কার মৃত্যু বলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে
বৃষ্টি যদি ঝরেই এমন, মরণ রাখুক তারে ঘিরে
এ জীবন যেন তার আর ভালো লাগে না রে
কলাগাছের ভেলায় মাগো তারে তুমি রেখে
ভাসায়া দাও না হয় করাঙ্গী নদীর বুকে
ভেসে ভেসে সে যাক যেতে পারে যতদূর
কচুরিপনা ফুল হয়ে ফুটুক গিয়ে বহুদূর


দূরত্ব
.
আমরা দুইটা ভিন্ন মানুষ, সহজ জীবন ভাবি
হইলেও হইতে পারতাম একি বগির যাত্রী
যদিও জীবন সহজ তো নয়, জন্ম থেকেই জানি
তবু রেলগাড়ির দরজায় বইসা পাড়ি দিতাম রাত্রী

ভোরের কোনো স্টেশনে নামতাম ইচ্ছে হইলে
স্টেশন পেরিয়ে চইলা যাইতাম দূরের কোনো ঘাটে
নদীর ওইপারে ঘর বাঁধতাম, চাষ করতাম মাঠে
একটাই জীবন, পাড়ি দিতাম গভীর ভালোবেসে

আমরা দুইটা ভিন্ন মানুষ, একই জীবন কাটাই
রেললাইনের দুই আলগা পাত, দূরেই রয়ে যায়


ভয়
.
তোমার লগে কথা না কয়া থাকি আমি
যেন কথা কইলেই কথা ফুরায়া যাবার ভয়
কথারা ফুরায়া গেলে কী থাকে আর?–
তোমার-আমার; জাইগা ওঠে বিচ্ছেদের ভয়

চুপচাপ থাকি, যেন না থাকলেই গন্ডগোল
তোমার-আমার চিৎকারে বাতাস ভারী
হাঁটব আমি বেপথে আর কাঁদবে তুমি খুব
জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বন্ধ হবে দম

তুমিও চুপ আমিও চুপ কথারা থাক ঘোরে
আমাদের প্রেম অমর হোক নীরবতার সুরে


মৃতের প্রতি
.
এই যে দুপুরবেলায় বৃষ্টি হইতাছে
বৃষ্টির শব্দ কানে বাজতেছে
বৃষ্টির ফোটা ভিজায়া দিতেছে
এসবের অনেক দূরেও বৃষ্টি হইতাছে নাকি

এই যে দুপুরবেলায় অনেক দূরে বৃষ্টি
নিকটবর্তী বৃষ্টি ভেদ করে বাজতাছে না কানে
সেই দূরের বৃষ্টি আইসা পড়তাছে না গায়ে
ওই দূরের বৃষ্টির লাইগা মন খারাপ লাগে

কাছে-দূরের বৃষ্টি যত কী আর আছে মানে
মন খারাপের মানে বুঝি কেউ যাইতাছে দূরে


বিচ্ছেদ
.
আমি কি গমক্ষেতের ভেতর দিয়া যাইতাছি
আমি কি ধানক্ষেতের ভেতর দিয়া
মাঠে মাঠে মসুরির তৃণ আছে ছড়ায়া
আমি কি যাইতাছি সবুজ মাড়ায়া

বৃষ্টিতে ভিজে আছে লতাপাতা-গাছপালা
ঝরে গেছে ফোটা ফুল হয়ে যে কবে উতলা
আমিও কি যাইতাছি উতলার ভেতর দিয়া
সে ক্যান যাইতাছে দূরে অন্য কোনো পথ দিয়া


চিকলি বিলের গাঁয়ে
.
তোমাকে পাবো না জেনেও
নেমেছি আলপথে
আজো এই সবুজ ঘাসে
তোমার পায়ের চিহ্ন হাসে
অদূরে চিকলী বিলের গাঁয়ে
যেন পানের বরজ ভেঙে
গাঢ় নামছে আঁধার
জানি জাগবে রাত্রি
কোথাও বাজবে বাঁশি
তুমি শুনবে সুর
হয়ত নামবে ভোর
তুমি পাবে দেখা নতুন সকাল
তবু তোমাকে পাবো না
জেনেও দাঁড়িয়ে আছি ঠায়
আজো এই চিকলী বিলের গাঁয়


মরণ
.
অনেকটা দূর হেঁটে এসে থমকে গেছে পথ
পথেরই আর দোষ বা কীসে ক্লান্ত যখন পা
পা সফল হাঁটাতেই আর জীবন সফল কীসে
হয়নি জানা, হবে না আর সবি যেন মিছে
তবু তো হায় পড়ছে মনে ছোট্টবেলার কথা
যে সব কথা চোখ ভেজায়, সে সব কথা থাক
অনেক কথার ভারে আজ ন্যুব্জ হলো কাঁধ
ন্যুব্জ কাঁধে চেয়ে দেখি সবুজ-শ্যামল বন
বনের ভেতর ডাকছে পাখি, নাম যে তার মরণ


ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

শীতকালীন সন্ধ্যায়
স্মৃতির টানে আরো একবার ঘুরে এলাম,
ঘুরে এলাম ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স
হরিদ্বার থেকে যোশীমঠের বাস
অলকানন্দার কূল ঘেঁষে ধীর লয়ে চলে
ফুলের উপত্যকায় ভাল্লুক ঘুমিয়ে আছে
তারচেয়েও গভীর ঘুমে হেমকুণ্ড সাহিব, বরফের নিচে
জানি, ঘাংঘারিয়ায় কেউ অপেক্ষায় নেই
তবু দেখা, কোনোদিন দেখা না হওয়া কারো সাথে
তারে জিজ্ঞেস করি, পুষ্পবতীও কি ঢেকে গেছে বরফে
হায়, কারে বলি, চলো ঘর তুলি, বরফের নিচে
শীত চলে গেলে, বসন্ত আসবে
বরফ সরিয়ে আমরাও ফুটবো বর্ষায়
ফুলের উপত্যকায় ফুল হয়ে


আ্যলবাম
.
পুরোনো আ্যলবাম কি কাঁচ?
নাড়া দিলেই ভেঙে পড়ে স্মৃতি।
স্মৃতিতে আব্বা মরে গেছে, আম্মা কাঁদছে খুব
যেন কাঁচ কেবল প্রতিচ্ছবি দেখায় না, কাটে শরীরও।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

পারসনালিটি | শেখ লুৎফর

Fri Sep 11 , 2020
পারসনালিটি | শেখ লুৎফর 🌱 শীতকালে সবুজে সবুজে সয়লাব হাওরে ঘুরে বেড়ানো আমার পুরানা বাতিক। তাই একটু সুযোগ পেলেই দম নেবার জন্য সংসারের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে যখন-তখন পালাই। সে-বার শুধু নিজের জন্য আস্ত একটাদিন হাতে নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলাম। সারাটা সপ্তাহ মানুষের মুখের জটিল আঁকিবুকি দেখতে দেখতে যখন নিজের নফছ্ […]
Shares