হলুদ পঙ্খী বৃত্তান্ত | অমর মিত্র

হলুদ পঙ্খী বৃত্তান্ত | অমর মিত্র 

🌱

অতীন সরকার নেত্রকোণার মানুষ। মেঘালয়ের পারে, মৈমনসিংহ গীতিকার দেশ সুসঙ্গ দুর্গাপুরে বসে  নতুন  উপাখ্যান  শোনাচ্ছেন সুবুদ্ধ প্রবুদ্ধ দুই ভাইকে। তারা খবর পেয়ে এসেছে নাকি গারো পাহাড় থেকে। লোক মুখে  শুনেছে কিছু একটা হবে সিমসাং নদীর ধারের সুসঙ্গ দুর্গাপুরে। কী হবে তা জানে না। কিন্তু হবে। তাদের কাজ হলো কোথায় কী হচ্ছে তা দেখে বেড়ান। তারপর দেখে ফিরে গিয়ে বলে বেড়ান। তারা সত্তর বছর আগে হাজং চাষাদের হাতিখেদা বিদ্রোহ আন্দাজ করে দেখে গিয়েছিল নাকি। গড়গড় করে সব বলতে পারে।

       ওই দ্যাখো হস্তি যূথ, খেদাইসে কারা।

       পাহাড়িয়া হাজং জাতি করেন হাতি ধরা।।  

       হস্তি দ্যাখো মেঘের মতো, বনে ঘুরে ফিরে।

       বনের পঙ্খী বনের জীবে, ডরাইয়া মরে।।

       আসমান গভীর কালো, আসমানে উয়ার ছাও।

       গারো পাহাড় সিমসাং নদী, দলেন হস্তির পাও।।                  

তারা দেড়শো বছর আগে কমলারানির দিঘি খনন দেখে গিয়েছিল নাকি। হুবহু বলে দিতে পারে সব। সেই দিঘি এখন মজে গিয়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন। শুধু পাড়ে চেনা যায়। 

       কমলা সায়র খনন করে হাজার ল’কে শুধু।

       পানি নাই পানি নাই, অন্ধকার ধুধু।

   তাহলে তোমাদের বয়স কত? 

  সুবুদ্ধ বলে, ভাইয়ের যা বয়স আমার তা, আমরা                        দুই দণ্ডের তফাতে জন্মেসিলাম। 

   প্রবুদ্ধ তোমার বয়স কত? 

   ঠাকুদ্দা জানত, পন্ডিত ছিল তো। 

   ঠাকুদ্দা আছেন? অতীন জিজ্ঞেস করেছিলেন। 

না, হারাই গেসেন। সুবুদ্ধ জবাব দেয়।

   সে কি কবে? অতীন জিজ্ঞেস করলেন। 

  জানা নাই, শুনিসি তাই। বলল সুবুদ্ধ, অনেক আগে হতি পারে, আবার এই কিসুদিন হতি পারে, কুয়াশা তো জাড়ের কালে হই থাকে, পাহাড় পর্যন্ত মুছে দেয় জগত থেকে।

   কুয়াশা মানে? অতীন জিজ্ঞেস করেন।

   ধরা যায় না কিসুই। বলল প্রবুদ্ধ, কুয়াশায় মিলায়ে গেসেন মনে হয়, আপনি কহেন টঙ্কর কথা, শুনতি এয়েসি মনে হয়, এখেনে কিসু ঘটবে। 

   দুই ভাই  আন্দাজ করে এসেছে শুনতে কী হবে, কিংবা হয়েছে তা শুনতে। এবার কী শুনছে, না মৈমনসিংহ গীতিকার দেশের জমির ধানের কথা। রাজায় দিয়েছে বিনি নজরানায় জমি, চাষা তা নিয়ে ফেঁসেছে। চুক্তিটা ধান কিংবা টাকার। সেই প্রথা টঙ্ক প্রথা।  ফসল হোক না হোক, বানায় ভাসুক, খরায় পুড়ুক, একরে সাড়ে সতের মন দিতে হবে, কিংবা তার দামে টাকা। এতে মরেছে চাষা। ধান যা ওঠে জমি থেকে সব চলে যায় রাজার খামারে। নিজের কিছু থাকে না। বরং বকেয়া থেকে যায় টঙ্ক।  সুসঙ্গ দুর্গাপুরের রাজার ভাগিনেয় কমরেড মণি সিং এর বিপক্ষে ডাক দিয়েছে। 

         ধান দিব না ধান দিব না,  

         কবির ভূমি নেতরক’না।  

আগের দিন মিটিং, পরেরদিন জমিতে নেমেছিল টঙ্ক জমির চাষা। খবর বলা  খবরিয়া সাইকেলে ঘুরছিল এ গ্রাম সে গ্রাম। দেখছিল মিটিঙের পর আর কোনো খবর নেই। রাজার বাড়ি খুব চুপচাপ। গাঁয়ের পর গাঁ চুপচাপ। চাষারা বলছে ধান দেবে না, কিন্তু তা আর উচ্চৈঃস্বরে নয়। গুনগুন করছিল, ধান রুইতে রুইতে বিড়বিড় করছিল, মণি সিং ডাক দিয়েসে, ধানের দখল চাষা নিয়েসে। এখন খবর হলো, অত বড় মিটিং হলো, কিন্তু রাজার বাড়ি থেকে কিছুই হলো না। চাষারাও সব অবাক হয়েছে। ভেবেছিল লেঠেলরা লাঠি পেটা করবে। মত্ত হাতি লেলিয়ে দেবে, মুখে কালো কাপড় বেঁধে মাহুত তাকে ঢুকিয়ে দেবে জনতার ভিতর। হাতির পায়ের তলায় আবার ক’জন থেতলে যাবে। তখন কেউ বল্লম দিয়ে হাতিকে প্রতিরোধ করতে যাবে। কেউ বল্লম ছুঁড়ে দেবে মাহুতের দিকে। হায় হায় কত রক্তপাত হতো।  কত মানুষ মরত। তখন হাজং চাষা  আর সব জমিনের চাষারা ছুটত রাজার বাড়ির দিকে। রাজার বাড়ির মস্ত ফটক বন্ধ থাকত। ফটকে  ধাক্কা দিয়ে ফিরত মানুষ।   হয়নি , কিছুই হয়নি। হয়নি মানে কি রাজবাড়ি মেনে নিল সব। টঙ্ক প্রথা উঠে গেল এক মিটিঙে। কিন্তু তা কী করে হবে? তাহলে রাজার ঘরে বাতি জ্বলবে কী করে ? রাজার বাড়ি যদি আদায় না পায়, রাজার হাতির খোরাক হবে কী করে? গুমস্তা আমিনের বেতন হবে কী করে? 

খবরিয়া ঘুরছিল। গাঁয়ে গাঁয়ে খবর বলে বেড়াচ্ছিল। দুদিন গেল এমনি করে, তিন দিনের দিন খবরিয়া শুনল গাড়ি গাড়ি সেপাই এসেছে লাল পাগড়ি।  সেপাইদের পিঠে বন্দুক। মৈমনসিঙের কালেক্টর বাহাদুর পাঠিয়েছে। সিপাইরা চোঙা ফুঁকে বলছে, টঙ্ক না দিতে পারলে বকেয়া রেখে দাও, পরের সালে দিও, টঙ্ক নিয়া চিন্তা নাই, চাষারা আরো জমিন নিক বিনা সেলামিতে, টঙ্কয় চাষ করতে হবে, টঙ্কয় জমি নিতা হবে।

খবরিয়া এক সিপাইকে ধরল। শাদা জামা শাদা প্যান্টুল, লাল পাগড়ি, কোমরে বেল্ট, ইয়া মোচ।  ঘর তার ডালটন গঞ্জ। গায়ের রঙ মিশকালো। চক্ষু দুটি গোলাকার। সিপাইয়ের নাম হরিশচন্দ্র। বাণেশ্বর তাকে জিজ্ঞেস করে, হাঁ গো সিপাইবাবু, তুমার ঘর অনেক দূর?

     হাঁ, তুম কৌন হ্যায়?

   মুই খবরিয়া বাণেশ্বর, খবর করে বেড়াই খবর নিয়া কাম হ্যায়। 

     সিপাই জিজ্ঞেস করল, ক্যা হুয়া সুসঙ্গ নগরপে ?

            সিপাই জিগাস করে হুয়া কেয়া ভাই।

            ধান না দিব তবুও জমি চষণ চাই ।। 

            শুন হে হলুদ পঙ্খী, সিপাই হুমকি মারে।

            কালেক্টার হুকুম দিসে, মাথা কার ঘাড়ে।।

            টঙ্ক দিইতে হব, না দিব তো বকেয়া।

            বকেয়া পরের সালে, হাল সাবেক  মিলায়া।।

সিপাইরা জনা পঞ্চাশ। সিপাইরা রাজবাড়ির ধারে তাবু ফেলল। গুড়ুম গুড়ুম আকাশে গুলি ছুড়ল। তাতে মেঘ ভেঙে জল নামল চাষের মাঠে, দিগ দিগন্তে। আকাশে মেঘ ছিল কিন্তু জমিতে জল ছিল না। জল নামতে চাষের ধুম পড়ে গেল। আহা, সিপাইয়ের ভালো হোক। কিন্তু সে কথা কি সিপাইয়ের কানে যায়। সে তো চোখ রাঙায়। চোখ না রাঙালে তার চাকরি থাকে না। তা জেনে সব কথা মনে মনে বলতে  হয়।   

সিপাই থাকতে কেউ কোনো কথা বলে না। সিপাইরা গাঁয়ে গাঁয়ে ঘোরে। বউ-ঝি, সোমত্ত মেয়েরা কিছু লুকিয়ে যায় ঘরের বাইরে বনের ভিতর। কিছু গেছে ধান রুইতে। ভিটেয় বসে আছে বুড়ো বুড়ি।  সিপাইরা দ্যাখে গাঁ শুনশান। সিপাইরা ক’দিন চোঙা ফুঁকলো তারপর চলে গেল সাড়া না পেয়ে। চাষার ধান পরের অঘ্রানে চাষার খামারে ওঠে। টঙ্ক বন্ধ করে দেয় চাষারা। ভাগের ভাগ সিকি ভাগ দেব, বাকি তিন সিকি নেব। চাষার পণ এই হলো। সে এক দিন এল। 

    এই পর্যন্ত বলে অতীন থেমেছেন। তখন সুবুদ্ধ জিজ্ঞেস করে, কিন্তু  হলুদ পঙ্খীর কী হলো?

    হলুদ পঙ্খী! বাণেশ্বর খবরিয়ার বিবি হলুদ পঙ্খী।  কংস নদীর ধারে পূর্বধলায় ঘর। 

     হলুদ পঙ্খীর কি কিসু হইসিল? জিজ্ঞেস করে প্রবুদ্ধ, হলুদ পঙ্খী একটা পঙ্খীই জানতাম, তার আবার কী হবে, সে খবরিয়ার বিবি, তার খুব গর্ব তাই, সে পড়শির ঘরে গিয়ে সব চুপিসাড়ে বলে আসে  শুধু।   

    কথক অতীন সরকার  বললেন, হ্যাঁ,  মুর তো জানা নাই আর কিসু  কিসু। 

     সুবুদ্ধ বলে, কিসু নিশ্চয় হইসিল, না হয়ে যায় না।

কী হবে হলুদ পঙ্খীর, সে পড়শির ঘরে গিয়ে শুধু টঙ্ক না দিবার কথা বলে। মণি সিং রব তুলেছে, টঙ্কের ধান ঘরে তুলেছে। খবরিয়ারে ডাক দিল রাজবাড়ি। পঙ্খীর কাছে ফিরে আবার ধান কাটার খবর নিতে চলে গিয়েছিল সে। তখন অঘ্রান মাস। ধান পেকেছে। জাড় নামছে। ধান কাটা শুরু হলো। মণি সিং আর ললিত হাজং জমিতে জমিতে ঘুরছে, ধান আগে নিজের খামারে উঠুক। মা লক্ষ্মী নিজের ঘরে উঠুন, তারপর টঙ্ক। টঙ্ক হবে না,  এক সিকি ধান দিলেই হবে। টঙ্কে তোমাকে দিতে হবে সাড়ে সতের মন এক একরে। ধান হয়েছে সতের মন। সবটা দিয়ে দিলেও কুড়ি  সের বকেয়া থেকে যায়। আর নিজের ঘরে অন্ন থাকে না। ভুখা থাকি ছেলে মেয়ে মা বাপ আর ভাই বোন নিয়ে আমরা। মণি সিং বলে,  যা ফলেছে, তার সিকিটা দাও। সতের মনের এক সিকি দাও, চার মন দশ সের। কিন্তু রাজা চায় টঙ্ক। জমিদারে টঙ্ক। কালেক্টরে বলে টঙ্ক দাও। গাঁয়ে গাঁয়ে খবরিয়া ঘুরছে। ঘুরছে কেন ? না খবর নিচ্ছে আর খবর দিচ্ছে। সেই খবর সুসঙ্গ বার্তায় ছাপা হয়ে বের হচ্ছে, আবার নিরক্ষর চাষার কানেও পৌঁছে যাচ্ছে। অমুক গাঁয়ে টঙ্ক দিচ্ছে না। সিকি ভাগ। তা শুনে চাষারা বলে তা হলে আমরাও দেব ফসলের এক সিকি। 

রাজার বাড়ি খবর যায়। খবরিয়া বাণেশ্বর খবর করে বেড়াচ্ছে। কী খবর করবে, কী করবে না, তা তাকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। খবর সে রাজার কথামতো করবে। কেন সে রাজার বাড়ি আসেনি ?  এইটা গর্হিত কর্ম। রাজার বাড়ি থেকে খবর নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল তার। খবরিয়া তার ধর্মচ্যুত হয়েছে। খবরিয়া রাজার দালাল ছিল মিটিঙের আগে। খবরিয়া মণি সিঙের দালাল হয়েছে মিটিঙের পরে। খবরিয়ার বাড়ি পেয়াদা এল লাঠি ঘুরিয়ে, হেঁকে উঠল, কুথায় বাণেশ্বর, বাণেশ্বর খবরিয়া। 

বিবি  হলুদ পঙ্খী বাইরে এল, তিনি নাই।

পেয়াদা অবাক হলুদ পঙ্খীরে দেখে, আহা, এ কেমন নারী, বেতস লতার মতো ছুঁয়ে আছে ভুঁই, লাবণ্যে থর থর করি। সে অবাক হয়ে দেখতে থাকে হলুদ পঙ্খীর রূপ।

   হলুদ পঙ্খী জিজ্ঞেস করে, খবরিয়ারে কী দরকার।

  পেয়াদা বলল, খবরিয়া নাই তো নাই, সুন্দরী তুমার নাম কী ? 

   নাম দিয়া আফনের হব কী ? হলুদ পঙ্খী হাত নাচিয়ে বলে, খবরিয়া নাই, আফনে বসেন কেন হাতনেয় ?  

   এমন সুন্দর মুখখানি, এমন তুমার যৈবন, নাম কি তুমার কইন্যা কহ, কী নাম মু কইবন ? 

    হলুদ পঙ্খী বলল, খবরিয়া জানে নাম, মুরে কয় পঙ্খী, মুই জানি মুর নাম পেঁচি,পেঁচিও এক পঙ্খী,  পেঁচিরানি বলে, আর কী? 

    পেঁচি কহ কেন, এমন যে রূপ, পঙ্খী তুমি কোন পঙ্খী, টিয়া কি ময়না, নাকি হও কবুতর, বকম বকম কয় না ! পেয়াদার খুব পছন্দ হয়েছে হলুদ পঙ্খীকে। আহা কেমন সুন্দর এর গড়ন, কত সুন্দর বলন। নিয়া যাই  গুমস্তাবাড়ি, করিবে  পালন।  

    পঙ্খী বলে, পেঁচি এক পঙ্খী, পেঁচি পঙ্খী মুই, পেঁচি ডাকে খবরিয়া, এই তার ভুঁই।

    খবরিয়ার জাত গিইসে, সুন্দরীর নাম এই দিইসে। পেয়াদা বলে। 

   হলুদ পঙ্খী কথা ঘুরিয়ে  জিজ্ঞেস করে, পিয়াদা ভাই ঘর কোন গাঁ হইলো? 

   পেয়াদা বলে, এদিক না সেদিক না, সে অন্য দিক, পশিমে গিয়ে উত্তরে যাও, হচ্ছে সেই দিক।

   হলুদ পঙ্খী বলে, গাঁর নামটা কী, কোন গাঙের পারে?

      পেয়াদা বলে, কংস নদীর উজানে, গাঁয়ের নাম নীলপুর, হাওরের ধারে ঘর, ঐ হাওরে মলুয়া বিবি হারাইসে চরাচর,  শুনো সুন্দরী, গুমস্তা কইসে যদি খবরিয়ারে না পাই, তার বিবিরে যেন নিয়া যাই।

     হলুদ পঙ্খী বলে, আফনে পানি খান, খই বাতাসা খান, তারপরে বিদায় হন। 

     মু হই বচন পেয়াদা, গুমস্তা করে পেয়ার, ক্ষমতা আমার কম নাই, পেঁচি ময়না, কে আর। 

হলুদ পঙ্খী ভিতরে ভিতরে ভয় পায়। এই দ্যাখো অঘ্রানের আকাশে মেঘ হলো কখন? কু লক্ষন। পাকা ধান নষ্ট হবে।  আকাশ গুরগুর করছে, মেঘে ছেয়ে ফেলছে। হায় ভগবান, যদি বৃষ্টি নামে, এই পেয়াদা তার ঘরে এসে না ঢোকে। কত মেঘ এসেছে আর কত পানি ধরেছে সে, পঙ্খীর দিন নষ্ট করল বচন পেয়াদা এসে। সে বলে, পানি আর বাতাসা খাইতে হবে না, আকাশ ডাকতেসে, আফনে যান। 

    পেয়াদা কুপিত হয়, চোখ লাল করে বলে, আইসি খবরিয়ারে নিতি, না নিয়া পেয়াদা যাবেনি পঙ্খী।

   খবরিয়া ঘরে নাই, কেমনে নিবে তারে, বুঝিসি অবলা রমনী কেন পেয়াদারে ডরে। পঙ্খী ভয় লুকিয়ে বলে। 

    ডরিবার কারণ নাই, তুমি পঙ্খী ময়না, শিখান কথা কহি দাও, বিশ্বাস মুর হয় না।

    মেঘ ডাকল গুরুগুরু। আকাশে বিজলী হানে। পঙ্খী ঠিক করে, পেয়াদার হাতে ভিটা ছেড়ে সে গাঁয়ের ভিতর আশ্রয় নেবে। উপায় নাই, উপায় নাই। উপায়হীনা নারী মরে তাই।

     পেয়াদা বলে, পানি নামতেসে।

    হলুদ পঙ্খী বলে, লক্ষণ ভালো না, আঘুনে মেঘ, পেয়াদার দোষ নাই, দোষ এই পেঁচির, আঘুনে পানির মেঘ আসা যাওয়া করে, সেই মেঘ দেখে পঙ্খী বানার ভয় করে। 

    পেয়াদা বলে, খবরিয়ার বিবি দেখি মুখে শোলোক বলে, খবরিয়ার সঙ্গে তবে কেন পীরিত করে ?

    হলুদ পঙ্খী বলে, আসমান ভরিসে মেঘে, আসমান হইসে কালো, পেয়াদাজি ফিরা যাও, পেয়াদা মুর ভালো। 

     হ, পেয়াদা ভালো বটে, পেয়াদা ভালো যদি হয়, পেয়াদার কথা শুনো।

    যে কথা পেয়াদা বলে, পেয়াদার তা নয়, গুমস্তা মুন্সি কাউর কথা তা হয়। হলুদ পঙ্খী বলে।   

    সুন্দরী  নারী, এত সময় বাতচিত করছে, তাতেই আশ মিটছে যেন পেয়াদার, সে  কোপ প্রকাশ না করে বলে, খবরিয়ার বিপদ খুব, গুমস্তা তারে ডাকে, তুমু গৈলে গুমস্তার রোষ, একটুখানি কমে।

     হলুদ পঙ্খী বলে, শুনহ পিয়াদাভাই, কত ক্ষমতা ধর, হলুদ পঙ্খী কী করিসে, তাহারে কেন ধর?

     হয়েই গেল। পেয়াদা জেনে গেল খবরিয়ার বিবির নাম হলুদ পঙ্খী। আহারে হলুদ পঙ্খী। হলুদ পঙ্খী ! এ কেমন নাম। 

            এমন সুন্দর কন্যা তুমু এমন সুন্দর নাম, 

            হলুদ পঙ্খী হলুদ পঙ্খী, কদমতলে শ্যাম।

পেয়াদা কোনোদিন শ্লোক বলেনি। শ্লোক বানানো তার সাধ্য নয়, কিন্তু কেমন মুখে মুখে এসে যাচ্ছে। মাটির গুণ। আর  হলুদ পঙ্খীর গুণ। তার  জন্য হচ্ছে। আহা, হলুদ পঙ্খী। কত সুন্দর নাম। পেয়াদা বলে, তুমি হলে হলুদ পঙ্খী, হলুদ পঙ্খী তুমি, হলুদ পঙ্খীরে গুমস্তা ঘরে না নিব গো আমি।

       হলুদ পঙ্খী হলুদ পঙ্খী, বচন পেয়াদা হই।

       খবরিয়া যেখেনে থাউক, সাবধানে রইতি কই।।

       রাজার রোষ ভীষণ রোষ, রাজায় তারে ডাকে। 

       হাতির পাওয়ে চিপা দিবে, কইসে সব্ব  ল’কে।। 

      পেয়াদা তুমু বড় ভাই, চিড়া দৈ সবরি কলা দেই। হলুদ পঙ্খী বলে। 

    পেয়াদা বলে, কিসুই লাগব না, কিসুই দিও না, হলুদ পঙ্খী শুনো, খবরিয়ার সমুখে বিপদ, ই কথাটি জেনো।

     আহারে পেয়াদা দাদা, কেমনে বাঁচবে সে, পলায়ে যাব গারো পাহাড়, বনেয় পথ গেসে। 

    পেয়াদা বলে, টঙ্ক দিব না টঙ্ক দিব না, কইসে চাষা ল’কে, টঙ্ক না পাইয়া রাজা খবরিয়া খুঁজে।  

   কিন্তু পেয়াদা হরণ করল কী হলুদ পঙ্খীরে? সুবুদ্ধ জিজ্ঞেস করে শুনতে শুনতে, সে এই কিসসা শুনতেই তো এসেছে। নারী ধর্ষণ হবে এবার। শ্লোক সব মুছে যাবে। কবির ভূমি রাজার ভূমি হবে। 

    না, হরণ করল না। বললেন অতীন সরকার, হরণ হইসিল সীতা, মহুয়া, মলুয়া, রামায়ণ আর গীতিকাব্যের নারী, হলুদ পঙ্খী না।                       

     মাথা নেড়ে সুবুদ্ধ বলে, পেয়াদা তারে হরণ করল না, এ কেমন হলো ?

      ঠিক হলো না। একটু থেমে সুবুদ্ধ আবার বলে। 

      হরণ করার খবর নাই। অতীন বললেন। 

     বচন পেয়াদা খারাপ ল’ক, কে না জানে এ কথা? বলল সুবুদ্ধ, সে তো হরণ করতা গিইসে। 

      কে বলল? জিজ্ঞেস করেন অতীন। 

      সুবুদ্ধ বলে, মুর ঠাকুদ্দা কইসিল। 

      কী কইসিল? জিজ্ঞেস করেন অতীন।

বচন পেয়াদা বলে এক পেয়াদা ছিল, সেই পেয়াদা খবরিয়ার বিবিরে হরণ করে গুমস্তার ঘরে নিয়া যাবে  এমন হইসিল, আফনে তা কইসেন না। বলে সুবুদ্ধি মাথা  নাড়তে থাকে, বচন পেয়াদার চ’খ রাঙা, হলুদ পঙ্খীর অঞ্চল ধরে টানে, আসমান চিরা কড়াক্কর মেঘের চিকুর হানে।

      তাই? অবাক হয়ে অতীন জিজ্ঞেস করেন।

   হ্যাঁ, পেয়াদা ধর্ষণ করে হলুদ পঙ্খীরে। সুবুদ্ধ বলল, খবরিয়ারে শিক্ষা দিল এই ভাবে। 

           কুথা তুমু খবরিয়া, কুথা প্রাণনাথ।

           তুমার পঙ্খী লইয়া যায়, লৌহ কঠিন হাত।। 

       ঠাকুদ্দা ইকথা কইসিল?  প্রবুদ্ধ এত সময় নির্বাক শ্রোতা ছিল, এবার স্তব্ধতা ভাঙল, বলল, বচন পেয়াদার নাম মু শুনি নাই, ঠাকুদ্দা কইসিল কবে? 

       কবে তা কে মনে রাখিসে, কিন্তু কইসিল, হলুদ পঙ্খী নিয়া বড় কিসসা হইসিল। সুবুদ্ধ বলে, বচন পেয়াদা তা করসিল, এইডা শুনতি আইসি আমি।   

    ঠাকুদ্দা কয় নাই। প্রবুদ্ধ মাথা নাড়তে থাকে, কইলে মু কেন জানব না?  

     তুই জানিস কিন্তু কইসিস না। সুবুদ্ধ বলে।

    কেডা কইসে মু জানি ইসব আগডুম বাগডুম কথা? প্রবুদ্ধ খুব ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করে। 

   মুই কইসি, ঠাকুদ্দার মুখে মুরা কি হলুদ এক পঙ্খীর কথা শুনি নাই? সুবুদ্ধ বলে। 

    সে কথা অন্য, হলুদ পঙ্খী বনের ভিতরে কত! প্রবুদ্ধ বলে, বনে নিয়া গিয়া পঙ্খী চিনাত ঠাকুদ্দা। 

    সুবুদ্ধ বলে, আমার কথা খবরিয়ার বিবি নিয়া, তার কী হলো, পেয়াদা তারে লুট করে নিয়া গেল।

     প্রবুদ্ধ বলে, না, তা হয় নাই, ই পেয়াদার নীলপুরে ঘর, ই পেয়াদা যেন মলুয়ার ভাই, ই পেয়াদা মলুয়া গাইত, ই পেয়াদা নিরলইক্ষ্যার ময়দানে গিয়া চান্দ বিনোদেরে উদ্ধার করল কাজীর লেঠেলের হাত থেকে।

     সুবুদ্ধ বলে, ভুল, একদম ভুল, পেয়াদা অবলা নারীর কেশাকর্ষণ করে, সেইডা তার কাজের ভিতর পড়ে, নইলে তার বেতন হয় না। 

      প্রবুদ্ধ বলে, ভুল, সব পেয়াদা এমন হয় না।

     সুবুদ্ধ বলে, আমার কথা ঠিক, তুই  ভুল কইবি না, ঠাকুদ্দা কইসিল।

    প্রবুদ্ধ বলে, ঠাকুদ্দা কয় নাই, মুই কখনো শুনি নাই।

      শুনিসিস, ভুলে গিসিস। সুবুদ্ধ গর্জন করে ওঠে। 

    না, কেন ভুলব। প্রবুদ্ধ তার উরুর পরে চাপড় মেরে বলল, মুই কিসুই ভুলি নাই। 

     সুবুদ্ধ বলল, না, তুই ভুলি গিসিস।

     ভুলি নাই, মলুয়ার ভাই ছিল পেয়াদার পাঁচ পুরুষ আগের ল’ক, পেয়াদা তাই  শোলোক বলে। বলল প্রবুদ্ধ।

   আরে তুই ভুলিসিস, শোলোক বলা সত্যি না। সুবুদ্ধ বলে ওঠে। 

       প্রবুদ্ধ ক্রুদ্ধ হয়, কে বলল সত্যি না? 

    সুবুদ্ধ বলল, তার চরিত্তর লুকাতি  শোলোক লিখেসে কবি, আসলে সে শোলোক বানায় নাই।

        তুই মিথ্যে কইসিস। প্রবুদ্ধ হেঁকে বলে উঠল। 

        সুবুদ্ধ বলল, তুই কইসিস মিথ্যে। 

        না, তুই ! বলে প্রবুদ্ধ উঠে দাঁড়ায়।

      তখন অতীন বললেন, আরে থামো, চুপ করে বস, আমাকে বলতে দাও। 

        প্রবুদ্ধ বলল, ওরে থামান, ঘেঁটে দিল সব, এমন সুন্দর লিখসিলেন, শুধু শুধু সব নষ্ট করে দিল।  

     আরে তুই পেয়াদার দালাল, গুমস্তার দালাল, পেয়াদা অমন ধম্মোপুত্তুর হয়? সুবুদ্ধ গর্জন করে ওঠে। 

         মুখ সামলাই কথা কইবি। রুখে যায় প্রবুদ্ধ

        তুই মুখ সামলা। সুবুদ্ধ বলল, দালাল যে তারে দালাল কইতা হবে।

অতীন সরকার যেন ছায়াচিত্র দেখছিলেন  চুপ করে বসে। প্রবুদ্ধর উপর সুবুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়েছে।  সুবুদ্ধকে প্রতিহত করতে চাইছে প্রবুদ্ধ। তারা বেরিয়ে গেল গর্জন করতে করতে। কী ভীষণ গর্জন। মাঘের শীতে  যেন মেঘে মেঘে চিকুর হানা শুরু হয়ে গেল  অন্ধকারের ভিতর। অতীন বাইরে এসে দাঁড়ালেন, ব্যালকনিতে। দেখলেন দুইজন একে অন্যের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে। রাস্তা শুনশান। শুধু দুইজন। ্মেঘ ডাকছে। তারপর ভীষণ বজ্রপাত হলো দূরে কোথাও। রাস্তা নির্জন। কেউ নেই। লড়তে লড়তে সুবুদ্ধ প্রবুদ্ধ শীত কুয়াশা অন্ধকারে মুছে   গেল। কুয়াশায় তারা হারায়। পিতামহর পথে হেঁটে যায় কুয়াশায়।  ঝিমঝিম স্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল চারদিকে। যারা ছিল তারা নেই। নেই কিংবা ছিলই না। অতীন এবং কুয়াশা অন্ধকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এখন অতীন কাকে  শোনাবেন নেত্রকোণার কথা, টঙ্ক বিদ্রোহের কথা ? বিপ্লব বিদ্রোহের সত্য  এমনি করে মিলায় আবার ফিরেও  আসে।   

         

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

এজরা পাউন্ড | মুম রহমান

Sun Sep 13 , 2020
এজরা পাউন্ড | মুম রহমান 🌱 এজরা ওয়েস্টন লুমিস পাউন্ড সবার কাছে এজরা পাউন্ড নামেই পরিচিত। আধুনিক মার্কিন কাব্য ও সমালোচনা জগতে তিনি সুপরিচিত। বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে আধুনিকতাবাদ ও চিত্রবাদ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত তিনি। মূলত চীনা ও জাপানীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তারা কম কথায় অধিক স্বচ্ছ ও স্বচ্ছল চিত্রময়তা তুলে […]
Shares