নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার

🌱

 

পর্ব

 

মীমাংসা হয়ে গেছে।

 

ভাল কইরা বুঝ— 

মীমাংসা মানে হইল দ্যাশভাগ। হয়্যা গ্যাছে—   

কন কি—ভাগ ক্যামনে!

বুঝ না—মাছ কাইট্যা যেমন ভাগ হয়, তেমন দ্যাশ কাইট্যা ভাগ অইছে—        

, কি কন—দ্যাশ আবার কাটন যায় নাহি— 

ক্যান—এইতো তোর হাতে—এই পতাকাডাই তো কাটনের চিহ্ন। এইডা হইল গিয়া পাকিস্তানের পতাকা। আর একটা ভাগের নাম হিন্দুস্তান—হিন্দুস্তান অইল গিয়া কইলকাতা, দিল্লি, হেন তেন—এইতা লইয়া—তার পতাকা আরেক রহম। আমরা পাকিস্তানের, আমরার পতাকা হইল এইডা।   

সুদাম হাতে ধরা ভাঁজ করা পতাকার উপর হাত বোলালো, বললো—হ, মাবুদ ভাই কয়দিন আগে আমাগো হগলের বাড়িত একখান কইরা দিয়া গেল। তয় দ্যাশটা হাছাই স্বাধীন হইল—-

, দ্যাশটা হাছাই স্বাধীন হইল। তোর আমার দ্যাশ আইজ থাইক্যা পাকিস্তান। অহন যা, বাড়িত গিয়া ওইডা কঞ্চির আগায়  লাগাইয়া ঘরের বেড়ার গায়ে আটকাইয়া দেগা, যা। 

এই কথা শুনে সুদাম চলে গেল। খুব যে বুঝতে পেরেছে তা না, তবু চলে গেল।

 

সুদামের সরষের তেলের ঘানি আছে। এই তেলের ঘানির সূত্রে সুদামকে সকলে চেনে। ১৯৪৭ সনের ১৪ অগস্ট সকালে সে ধলা মজুমদারের বৈঠকখানায় এসে বসে ছিল।   

বেলা দশটার দিকে ধলা মজুমদারের বাঁশঝাড় থেকে একটা লম্বা বাঁশ কেটে আনলো বংশী। বংশী মজুমদারবাড়ির পুরনো কাজের  লোক। সে কর্তার নির্দেশ মত বাঁশের আগায় পাকিস্তানের পতাকা  লাগিয়ে  বাড়ির সামনে পুঁতে দিল। তাই দেখে এ বাড়ির, ওই বাড়ির বাচ্চাকাচ্চারা পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে হৈ চৈ করতে গিয়ে সুবিধা করতে পারলো না। ধলাবাবুর স্ত্রী হাতে একটা কঞ্চি নিয়ে সব কটাকে বাড়ির ভেতরে খেদিয়ে নিয়ে গেলেন। তাতেও তাদের দমানো গেল না। বাড়ির ভেতরের উঠোনে তারা হরিণের বাচ্চার মত ছোটাছুটি করতে লাগলো। কঞ্চি হাতে ধলাবাবুর স্ত্রী, বাসন্তী এদের কাণ্ড দেখে না হেসে পারল না।      

 

আরেকটু বেলার দিকে ওমর আসলো ধলাবাবুর বৈঠকখানায়। আজ বৈঠকখানায় ভিড় নাই। হৃদয়পুর    আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম  জুড়ে চারদিকে আজ স্বাধীনতা উৎসবের আয়োজন, মাহফিল  চলছে। মানুষেরা উৎসব খুবই পছন্দ করে। আজ কেউ এসব মিস্‌   করতে চাইছে না। কোথায় যেন সিরাজদ্দৌলা যাত্রা পালা হবে—কোথায় যেন রাতে আবার কাওয়ালী গান হবে বলে শোনা যাচ্ছে।   

ওমরের দোস্ত ধলাবাবু ওরফে ধলা। পাশাপাশি দুই গ্রাম তাদের। ধলাবাবুরটা হৃদয়পুর আর ওমর মাস্টারেরটা কাঞ্চনপুর।  বলতে গেলে  বাল্যবন্ধু তাঁরা। বাল্যবন্ধুদের ভিড় কমতে কমতে এই পরিণত যুবাবয়সে তারা দুজনে এসে ঠেকেছে। বন্ধু বলতে মনের কথা খোলসা করে কওয়া যায় এমন বন্ধু। ওমর জানে ধলাবাবু আজ বাড়িতেই থাকবে। গতকালই এমন কথা হয়েছিল দুজনের মধ্যে। তাই স্কুলশিক্ষক ওমর তাঁর স্কুলে গিয়ে স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন ও অন্যান্য  অনুষ্ঠানাদিতে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে  সেখান থেকে চলে এসেছে বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা ছাড়াও তাঁর আর একটা কারণ বন্ধুপত্নীর হাতের চা। তাদের সকলেরই ইদানীং নতুন চায়ের অভ্যেস  হয়েছে। ঘরে ঘরে নতুন কাপ পিরিচ কেনা হয়েছে। তাছাড়া বন্ধুর বাড়িতে পর্দার তেমন কড়াকড়ি নেই। অন্যকেউ না থাকলে বন্ধুপত্নী বাসন্তীবৌদি নিজেই চা করে নিয়ে আসেন বৈঠকখানায়।    

আজও তাই হল। ওমরের গলার আওয়াজ পেয়ে বাসন্তীবৌদি কিছুক্ষণের মধ্যে চা নিয়ে এসে হাজির। দুই বন্ধুর থেকে কিছুটা তফাতে  একটা মোড়ার উপর বসলেনও  তিনি। বাসন্তীর পঁচিশ ছোঁয়া বয়স। দুই সন্তানের মা। সে নেত্রকোণা শহরের লেখাপড়া জানা পরিবারের মেয়ে। নিজেও মেট্রিক পাশ।  বৈঠকখানায় বাড়ির মহিলাদের সাধারণত আসা বা এসে বসার চল নেই। তবে সেখানে শুধু ধলাবাবু আর ওমর মাস্টার থাকলে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। বাসন্তীদের সঙ্গে ওমর ও তাঁর স্ত্রী রেহানার বেশ খোলামেলা সম্পর্ক।  নিজের বাড়িতে তেমন খোলামেলা আবহাওয়া না থাকলেও ওমর মাস্টার ও তাঁর স্ত্রী রেহানা এই বাড়িতে এসে যেন একটা মুক্তির স্বাদ পান। তাই প্রায়শই এখানে এসে খোলামেলা কথাবার্তা, খাওয়াদাওয়া নিয়ে তাদের দিন ভাল কাটে। উৎসব অনুষ্ঠানে ধলাবাবুরাও ওমরদের বাড়িতে যান কালে ভদ্রে।    

আজ বন্ধু দুইজন বেশ নীরবে চা খেয়ে যাচ্ছে। পাশে যে বাসন্তী বসে আছে তা যেন আজ কেউ  খেয়াল করছে না। ধলাবাবুর কথা গতকাল রাত থেকেই কমে গেছে। কথা বলতে ভালবাসে যে ওমর, সে-ও আজ চুপচাপ। বাসন্তী এই নীরবতার নাড়ি টিপছেন অনেকদিন থেকেই। কর্তার মনমেজাজ, বাসি খবরের কাগজ বা রেডিওর খবর—এ-সবের মধ্যে তারও তো দিন কাটে। সে জানে কীসের থেকে আজ কী হয়ে গেল, আর কেনই বা নীরবতা।

তো নীরবতা ভাঙলেন বাসন্তীই, ওমর কে জিজ্ঞেস করলেন—স্বাধীনতার চা কেমন লাগতাছে ওমর ভাই—কথা নাই ক্যান

স্বাধীনতার চা পরাধীনতার মত অইতে গিয়াও অইল না বৌঠানের হাতের গুনে– 

ধলার দিকে চেয়ে কথাটা বলল ওমর। বাসন্তী এবার স্বামীর দিকে চেয়ে—কি গো, কিছু কও না যে—

না, ঠিক আছে—স্বাধীনতার চা আমার তো স্বাধীনতার মতই লাগতাছে। কথা শুনে ওমর ও বাসন্তী দুজনেই হেসে উঠলো। বাতাসে গুমোটটা একটু কাটলো মনে হয়। ধলা ওমরের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো—স্বাধীনতার কী কী হইল ইশকুলে—তুই কি বক্তৃতা দিছস–

না না বক্তৃতা আমার আসে না। যা কওয়ার হেডমাস্টারই কইল।

হেডমাস্টার তো লীগের—হের তো খুশি অওনের কথা—

হ্যায় খুশি অইছে—খালি হ্যায় কেন—দেশ দিগালেই তো দেহি খুশির জোয়ার  

তালে তুইও খুশি অইছস ক—

তা অইছি ঠিকই–হেইডা তুই নিজেই জানস—কেমনে খুশি অইছি—

বুঝছি—আইচ্ছা থ এইসব—আইজ আর এইসব ভাল লাগতাছে না।

দোস্ত—মনডা শান্ত কর— বুঝি তো সবই—

 

বাসন্তী শুনছিল দুই বন্ধুর কথা। এবার উঠতে উঠতে ওমরের দিকে লক্ষ্য করে বলল—দেখেন তো আফনের দোস্তরে শান্ত করন যায় কিবায়—কাইল থাইক্যাই দেখতাছি—কথা কম, মন খারাপ— 

বৌঠান আফনে ভাইবেন না, বন্ধু ঠিকই আছে—ছুডু বেলা থাইক্যা অরে চিনি তো—ও ঠিক অইয়া যাইব—   

বাসন্তী পর্দা সরিয়ে ভিতর বাড়িতে যেতে যেতে ওমরের দিকে চেয়ে আর একবার বলে গেল—রেহানারে লইয়া আরেক দিন আইয়ুন যে—অহন যাই।   

বাসন্তী চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর ওমরও চলে গেল।   

ওমর চলে যাওয়ার পর এলেন জ্ঞানবাবু। গ্রামের তিনঘর ব্রাহ্মণের মধ্যে তিনি একঘর। বাকি দুই ঘর গতবছর নোয়াখালি দাঙ্গার পর আতঙ্কে কলকাতা চলে গেছেন। এখন রইলেন শুধু জ্ঞানবাবু। ধলাবাবু তাঁকে জ্ঞানকাকু ডাকে। বয়স অনেক। ঘরে অবিবাহিতা তিন  মেয়ে। শোনা যায় তাদের কলাগাছের সঙ্গে বিয়ে হবে। সবার ছোটজন ছেলে। সামনেরবার মেট্রিক দেবে। সামান্য জমির আয় থেকে কষ্ট  করে চলে। পৈতাধারী ব্রাহ্মণ। বচ্ছরভর পূজাটুজা করে কিছু আয় হয়। ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন—বাবা তুমরা ত খবরাখবর রাহ—এইডা কি অইল—দ্যাশটা ভাগই অইল শেষমেশ। মীমাংসা কি হইয়া গ্যাছে—   

, কাকু, মীমাংসা অইয়া গ্যাছে। দ্যাশ ভাগ অইছে। কইছে দুই ভাগ। আসলে অইছে তিন ভাগ।        

কও কি

মীমাংসার পরে আবার কথা কি কাকু—মীমাংসা তো মীমাংসাই। মীমাংসার পরে খুব বেশি অইলে পইড়া থাকব মরণ। মরণের পরে আর কি—কারোর থাকব ছাই, কারোর থাকব মাডি। 

রায় বাইর অইয়া গেছে। রায় বাইর অইয়া গেলে চিল্লাচিল্লি কইরা লাভ নাই।

রায়ে আমরা জিতছি, আবার রায়ে আমরা হারছিও।

তো এইডা ক্যামুন মীমাংসা? বেকটা কও হুনি—-

কাকু আইজ শইলডা ভালা না। পরে কইয়াম নে—

আইচ্ছা বাবা, আইচ্ছা—তুমি বিশ্রাম লও—খাওন দাওন কর—হা ঈশ্বর, হা ঈশ্বর—! 

বলতে বলতে জ্ঞানকাকু ঘর থেকে নেমে বাড়ির পথ ধরলেন।

 

দেশরাষ্ট্রএই কথা দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।

এই দেশরাষ্ট্রকথা দুটি পরস্পর নিকট আত্মীয়  হলেও তাদের পার্থক্য কোনোদিন বিলীন হয় না । 

কারণ একটির থেকে আরেকটির জন্ম হয়। অর্থাৎ দেশের থেকে  রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের থেকে দেশের জন্ম হয় না কখনো। দেশ স্থায়ীরাষ্ট্র অস্থায়ী। দেশের সঙ্গে মানুষের সত্তার সম্পর্ক, রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের আইন তথা সংবিধানের সম্পর্ক। 

রাষ্ট্রের বাইরে গেলে মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্র থাকে না, দেশ থাকে। দেশ তার জাতককে কখনো ছেড়ে যায় না। জাতক কখনো ভুলে গেলে দেশ কখনো ভোলে না। একজীবনে মানুষের রাষ্ট্র বদল হলেও দেশ বদল হয় না।—

পরদিন সকালে লেখার খাতাটা খুলে বিছানায় বসেই ধলা এই পর্যন্ত লিখলো। চোখের কোণ ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের সমস্যা না মনের সমস্যা বোঝা মুশকিল। খাতা বন্ধ করে খাট থেকে নেমে এলো। বাসন্তী উঠে গেছে আগেই। রান্নাঘরের বারান্দা থেকে বাসন্তী আড়চোখে দেখলো ধলা বড় উঠোন লম্বালম্বি পাড় হয়ে বাইরবাড়ি ছাড়িয়ে পুকুরপাড়ের দিকে হাঁটছে।

🔅

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

চার্লস বুকোস্কি | মুম রহমান

Sun Oct 4 , 2020
চার্লস বুকোস্কি | মুম রহমান 🌱 হেনরি চার্লস বুকোস্কি (১৯২০-১৯৯৪) জাতে জার্মান হলেও, মার্কিন নাগরিক ছিলেন। উপন্যাস, ছোটগল্প লিখলেও আধুনিক আমেরিকান কবি হিসাবেই তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত। লস এঞ্জেলেসে বসবাস করা বুকোস্কি’র লেখা একই সঙ্গে যেমন আদৃত, আলোচিত, তেমনি সমালোচিতও। তার লেখা এবং চালচলন উভয়ই ছিলো ভীষণ বিতর্কের। বহু নারীর […]
Shares