নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | ধারাবাহিক পর্ব ২

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | ধারাবাহিক পর্ব ২

🌱

ধলা মজুমদারের আসল নাম কার্তিক মজুমদার। দেখতে সে বরাবরই কার্তিকের মত সুন্দর। ধলাতাঁর ঠাকুরমার দেওয়া  নাম । ধবধবে  ফর্সা দেখে ঠাকুরমা অনেক সময় আদর করে ধলাবাবুবা ধলাকর্তাডাকতেন। সেই নামই বড় হয়ে ধলা বা ধলাবাবু তার ডাক নাম হয়ে গেল।

ছোট্ট ধলা দেখতে দেখতে কত্ত বড় হয়ে গেলো। লম্বায় বাড়ির সকলকে ছাড়িয়েও গেল। বড় হওয়ার পরেও ঠাকুরমা তাকে আমার সোনাবাবুবলে আদর করতেন। বলতেন—দেইখ্য সোনাবাবু কলেজে পড়—হুনছি  কলেজে নাহি মাইয়ারাও পড়ে—হেরার লগে কই তুমি হুনি কথা কইয়ো না ভাই। দূরে দূরে থাইক্য কইলাম। 

 

তর বাপের এইসব কাম—কুন দরকার আছিল কলেজে পড়ানোর—কী সুন্দর একটা টুকটুকে  হইলদা পখ্যির লাহান মাইয়া দেইখ্যা বিয়া করাইব—তা না—আরো পড়াইব—

ধলা বড় বড় চোখ করে বলে উঠলো—কী কও ঠাম্মা—মাইয়াদের লগে তো এক বেঞ্চিতেই বসি—কথাও কই—দুএকজন তো খুবই  দেখতে ভাল—

রাখ রাখ ভাই আর কইস না। পড়ালেখা করতে গিয়া কী না কী কীর্তি অইব কেডায় জানে—ঠাকুর বাঁচাইও আমার ধনরে— । বলে ঠাকুর মা চলে গেলেন নিজের কামে। 

 

ধলাবাবুরা হৃদয়পুর গ্রামের অনেক পুরুষের বাসিন্দা। অনেক শরীকের বসবাস । এখন কিছু এদিক ওদিক ছিটকে গেলেও প্রায় অর্ধেক গ্রাম জুড়ে তাঁদেরই সব রক্তের সম্পর্ক। বাপ দাদার আমলের সহায়সম্পত্তি কমে গেলেও এখনও যা আছে কম না। এখনোও তাঁদের অবস্থা সম্পন্ন বলাই সঙ্গত। শিক্ষাদীক্ষার প্রসার বলতে গেলে বিগত দুই পুরুষের। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে ধলাবাবু মেট্রিকের  পর কলেজে ভর্তি হওয়া। পিতার জীবিত কালের ইচ্ছা ছিল ছেলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে একজন সরকারি চাকুরে হবে। জমি নির্ভর পরিবারগুলোর প্রথম চাকরিগুলো ছিল শিক্ষকতা। কিন্তু ধলাবাবুর পিতার ইচ্ছা একটু অন্যরকম ছিল। কিন্তু তিনি ছেলের কোনো সাফল্যই দেখে যেতে পারেন নি। মাঝখান থেকে ছেলে কলেজে গিয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনের হাতে পড়ে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা বা অবস্থান তখন এতটাই অস্থিতিশীল  ছিল যে, ধলাবাবু সে-সব নিয়ে মেতে থাকার কারণে পড়াশোনার বেশ ক্ষতি হতে লাগলো। রাজনীতি বিষয়ক পড়াশোনা, বক্তৃতা বা সংগঠন সবদিকেই ধলাবাবু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন আকর্ষণীয় ছাত্রনেতা হয়ে উঠতে লাগলো। আর এই সময় বাল্যবন্ধু ওমর হয়ে উঠলো তাঁর একান্ত সহযোগী। একই বছর পাশ করে তাঁরা কলেজে ঢোকে। কলেজে পড়তে তো তখন সেই ময়মনসিংহ যেতে হয়। পাশাপাশি দুই গ্রাম থেকে ওমর ও ধলাবাবুই সে বছর কলেজে পড়তে গেল।

কলেজের ছাত্রফ্রন্টে এই জুটি তখন উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র। কিন্তু অচিরেই পুলিশের নজর পড়ে তাঁদের উপর। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেই   ধলাবাবুর পিতৃবিয়োগ ঘটে। এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই পুত্রশোকের ধাক্কা সামলাতে না পেরে ধলাবাবুর ঠাকুরমাও দেহত্যাগ করলেন। এককথায় হৃদয়পুরের বাড়িতে বিপর্যয় ঘটে গেল। একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়ার দরুন ধলাবাবুর পড়াশোনায় এখানেই ছেদ পড়ে গেল। অতঃপর বাড়িতে তাঁকে অনেকটা সময় দিতে হয়। শুধু সময় নয়, বিষয় আশয় সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ হয়েও তাঁকে সে-সবের ভেতর যেমন আত্মনিয়োগ করতে হলো, তেমনি আত্মীয়, আশ্রিত ও স্বজন মিলিয়ে বাড়িতে অনেক কজন মানুষের ভরণপোষণের দায়দায়িত্বও তাঁর অনভিজ্ঞ কাঁধে তুলে নিতে হলো। তখন শহরের দিকে তার কালে ভদ্রে যাওয়া হয়। ফলে তখন থেকেই দেশকাল ও নিজেদের শহরের খবারাখবরের  একমাত্র সূত্র ওমর। ওমর তারপর কলেজের পড়াশোনা শেষ করে বিএ পাশ করে।     

এদিকে ঘরের সব কাজকর্ম ধলাবাবুর মা সুমতিদেবী একা হাতেই সব সামলাচ্ছেন। বড়মেয়ে রাধিকার বিয়ে হয়ে গেছে। অতসী  ছোট। ঘরে কাজের দুজন বউ  থাকলেও সুমতির কাজের অন্ত নেই। তারমধ্যে  মাঝে মাঝে ছেলেকে পরামর্শ দিচ্ছেন জমিজিরেতের ব্যাপারে। কলেজে পড়া ছেলের কীইবা বয়স—এই বয়সে এত বড় দায়িত্ব—সুমতিদেবীর কষ্টও লাগে ছেলেকে দেখে। স্বামী ও শাশুড়ির মৃত্যুর বছর দেড়েকের মধ্যেই তাই তিনি ছেলের বিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন। ছেলেকে বিষয়-আশয়মুখী করে তোলার  জন্য এ ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পেলেন না। তাই তাঁর  আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে খোঁজখবর করানো শুরু করলেন। ধলাবাবু এ-সব টের পেয়ে একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে মাকে বললো যে—এত তাড়াতাড়ি তুমি এইসব করতাছ ক্যান মা—সব কিছু একটু স্থির অইতে দেও—  

কী স্থির অইব বাবা 

ক্যান, একটা স্বাধীনতার আন্দোলন চলতাছে দ্যাশটাতে, জান না—কখন কী অয়—তার উপরে আবার হুনি দ্যাশটাও নাহি ভাগ অইব–    

সুমতিদেবী ছেলের চিন্তা ভাবনার ধার কাছ দিয়েও গেলেন না। বরং হেসে হেসে বললেন—এই তা তো সগল সময় দ্যাশ দিগালেই হইতে থাকব—এর লাইগা কি বাবা সংসার ধর্ম করা থাইম্যা থাকব—-জীবের ধর্ম জীবের পালন করাই লাগব বাবা—আর তুই আমি চিন্তা কইরা কি করতাম ক—মাথার উফরে যিনি আছুইন, তিনি দেখবেননে—প্রাণ ধন জীবজগৎ– সবেরেই রক্ষাকর্তা কইলাম উনি— 

ছেলে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে বুঝল যে এই মাকে বোঝানোর সাধ্য তার নেই। তাই তাঁর সংসার ভাবনার সূত্রে পুত্রবধূ ঘরে আনার   স্বপ্নটাকে আঘাত করতে চাইল না। মনে মনে ভাবলো, আমরা যে কত সামান্য একটা সুতোর উপর ঝুলছি—সেখানে আমাদের  ভবিষ্যৎ যে কত বড় অনিত্যতার মেঘে আচ্ছন্ন—তা জানিয়ে মায়ের এই স্নিগ্ধ স্বপ্নটাকে  ভাঙা কি ঠিক হবে—ভবিষ্যৎ না জেনেও তো কত কাজ আমরা করি—দেখি না, জীবন তো আসলেই রহস্যময়—কোথায় কতদূর নিয়ে যায়, দেখি! আমার উপর মায়ের  ভরসাটাকেও না হয় একটু সম্মান দিই। আমি যে একেবারেই ভরসাযোগ্য নই–তা তো না—

ধলাবাবু মায়ের কথার উত্তরে মাথা নিচু করে বলে—আইচ্ছা তুমার যা মনে লয় কর। বলেই সে মায়ের সামনে থেকে উঠে যেতে গিয়ে বাধা পেল—আরে র র বাপ যাচ কই—

বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ঘুরতে দাঁড়ালো ধলাবাবু—ধূতি আর ফতুয়া পরা একটি ছেলে—চওড়া কাঁধ, ফর্সা সুগঠিত দীর্ঘ শরীর—কী অনিন্দ্য রূপবান ছেলে তাঁর—মা যেন চমকে উঠলেন।  

ছেলে মেয়ের উপর মায়ের নজর লাগা নাকি ভাল না—তবু কয়েক মুহূর্তের জন্য সুমতি তাঁর ধলাবাবুকে দেখে যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। নতুন করেই যেন দেখলেন এক দিব্যকান্তি যুবক, যেন মর্তে নেমে আসা কার্তিক। তার দাদুর রাখা নাম কার্তিকযেন সার্থকতায় ঝলমল করছে। ছেলে বড় হলে মায়ের কাছে আর কতক্ষণ থাকে। দিনে দিনে যে সে একটি পরিপূর্ণ যুবক হয়ে উঠছে তা যেন মায়ের অগোচরেই ঘটে গেছে। 

স্থির চোখে ছেলের দিকে চেয়ে আছে দেখে ধলাবাবুই নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলো—ও মা কী কইবা কও—ডাকছ যে—আমার বর চাইয়া আছ যে—কী দেখতাছ—

সম্বিত ফিরে পেয়ে মা যেন ছেলে কথায় একটু চমকে উঠলেন। বললেন—খাড়ো বাপ—আয় কাছে আয়—

ছেলে কাছে গেলে মা তাঁর বাঁপায়ের ধুলো নিয়ে ছেলে মাথা ও শরীরে একটু বুলিয়ে দিলেন।

ছোটবেলা থেকে মায়ের এইসব তুকতাক নিয়ে ধলাবাবুর কোনো কৌতূহল নেই। তাই সে জিজ্ঞেস করল—কি কইবা কও—আমার কাম আছে যাওন লাগব।

সুমতিদেবী উঠে গিয়ে ঘর থেকে ভাঁজ করা একটি কাগজ নিয়ে এসে ছেলের হাতে দিলেন। বললেন–রাধু চিডি পাঠাইছে—

রাধু ধলাবাবুর বছর চারেকের বড় দিদি। বিয়ে হয়েছে নেত্রকোণায়। সে-ই এই সম্বন্ধের ঘটকালি করছে।

ধলাবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে ভুরু কুঁচকে এক ঝলক দেখে মাকে ফেরত দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় মাকে বলে গেল— দিদিরে আওনের জন্য খবর দেও।

 

শেষ পর্যন্ত নেত্রকোণার কন্যা বাসন্তীর সঙ্গেই ধলাবাবুর বিয়েটা হয়। সেই বিয়েও কয়েক বছরের পুরনো বিষয়। সেই নব্য যুবক ধলাবাবু এখন সংসারের দায়িত্বশীল কর্তা। দিন দিন দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। 

 

এরমধ্যে শোনা যাচ্ছে কিছুদিন যাবত পাকিস্তান প্রস্তাবনিয়ে ঢাকা কোলকাতা বা অন্যান্য বড় শহরে  বেশ কিছু শোরগোল শুরু হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে হঠাৎ করে এই পাকিস্তান প্রস্তাবযেন অনেকটা ছন্দপতনের মত ঘটনা। কিন্তু এই বিষয়ে খবরের অপ্রতুলতা দেশগাঁয়ে বড় বেশী। তাই ধলা ছট ফট করে। যদিও সে জানে যে, প্রান্তিক অঞ্চলে থেকে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ধরতে পারা তখনকার দিনে খুব সহজ নয়।  যোগাযোগ বলতে মানুষের মুখের খবর বা সাত দশদিনের বাসি খবর ।

ধলার তখন বাড়িতে থেকে খবরের একমাত্র জীবিত সোর্স ওমর। ওমর ততদিনে বিএ পাশ করে কাছের এক হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। প্রায় ছুটির দিনে ওমর এসে  ধলাবাবুর সঙ্গে লম্বা সময় কাটায়। এইরকম এক ছুটির দিনে ওমর এসে বসতে না বসতে ধলাবাবুর প্রশ্ন—কী রে ওমর পাকিস্তান প্রস্তাবনা লাহোর প্রস্তাব‘—বিষয়টা কি—খুইলা ক ত।

ওমর ধলাবাবুর মাঝপথে কলেজ ছাড়ার পর  ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছিল। তার কাজকর্মে সন্তুষ্ট হয়ে কলেজ ছাড়ার মুখে পার্টি  তাকে প্রাথমিক সদস্য পদের জন্য আবেদন করতে বলে। ওমর এড়িয়ে যায়। কারণ কলেজ জীবনে তাদের দুজনেরই চিন্তা চেতনায় স্বাধীনতা, দেশীয় রাজনীতি তথা কংগ্রেস, লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির উত্থান ও ভূমিকা সম্পর্কে অনেক কটা প্রশ্নের জন্ম হয়ে যায়। কথা প্রসঙ্গে সে-সব কোনো সিনিয়রকে জিজ্ঞেস করলে অস্বস্তি তৈরি হত। তারা এমনও বলেছিল যে, বেশি প্রশ্ন নয়, অন্তত পাকিস্তান প্রস্তাব নিয়ে পার্টির কি মত? এটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এই বলে যে, এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নয়। এখন আমাদের সব লড়াই-ই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই। তাকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করতে হবে। এ-রকম আবছা উত্তরের বেশি আর কিছু পায় নি তারা  তাদের কলেজ জীবনে। এমতাবস্থাতেই তারা আগে ও পরে কলেজ ছাড়ে।   

আজ ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে ধলার প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওমর বৈঠকখানার চেয়ারটায় বসলো।—ভাই যদি অনুমতি থাকে  তাইলে ক, দুই চাইর খান গাইল দিয়া শুরু করি— 

ক্যান কী হইল—চেতা ক্যান—কনা, মুখে যা আছে ক—অহন কেউ আইত না এইবর—তার আগে সিগারেট দে–  

দেখ একটা সিধা কথা কই—আমি অত বড় দেশের, অত বড় একটা উপমহাদেশের কেউ না—আমি তারার লগে লাভের হিস্যা বা  অধিকারের হিস্যা লইয়া দরদাম করতে যাইতাম না। আমি বাঙালি, আমারে বাঙাল ক, গাবর ক, বা যা-খুশি তাই ক, আমি সব সবার আগে  বাংলা ভাষার মানুষ—আমি বাংলা নামের ভূ-খণ্ডটার হিসাব বুঝি। ব্রিটিশরা—তার আগে মুঘলরা—তার আগে তাদের বাপের বাপেরা যাই বানাউগ্যা, ভারত টারত বুঝি না—আমি বাংলা ভাষা বুঝি—বাংলা ভূখণ্ড বুঝি—মাথায় তো ঠাডা পড়ে যহন হুনি হক  সাবে পাকিস্তান প্রস্তাবের নামে লাহোর প্রস্তাব মিটিং এ পেশ করছে। এই একটা মানুষকেই তো ভাবতাম—যতই কংগ্রেস কমিউনিস্ট লীগ দেখিনা কেন—বাংলার জন্য যে কিছু করবে—হেই হক সাবে কিনা  বাঙাল, বাঙালি ভুইলা হঠাৎ পাকিস্তান নিয়া পড়ল— ক্যান   হেইডাই তো বুঝতাম পারতাছি না—কৃষক প্রজা পার্টির দাফন কইরা—হে এইডা কী করল ক—লীগের মধ্যে কি দেখছে হে ,আমারে বুঝা—  

থাম থাম দম ল বেডা—এত চেতলে কি আর রিপোর্ট রাখন যায়—থাম থাম—আরেকটা সিগারেট খা—   

নারে ভাই, খুব দুঃখের মইধ্যে আছি—মুসলমান ঘরের পোলা ত আমিও—আরে হালার পুত, লীগারদের কি তিনডা ঠ্যাং গজাইছে, না দশটা হাত গজাইছে—হাজার বছর একলগে থাইক্যা অহন আলাদা হওনের লাইগ্যা মরে ক্যান বেডারা—ক—

আলাদা হওনের লাইগ্যা মুসলিম লীগ মরে আর আলাদা করনের লাইগ্যা যে কংগ্রেস মরে—আর এইডা সাপোর্ট করে যে কম্যুনিস্টরা—হেইডাও ক

কী কস—রাজনীতি কি এতডাই খারাপ হইয়া গ্যাছে— 

এখন পর্যন্ত তাই দেখতাছি

তোর অখিলবাবু কি অহনও আয় নাহি—দেখ না একদিন কথাটথা কওন যায় কি না—কলেজে পড়ার সময় অনেক স্বপ্ন দেখছিলাম—এইতার মধ্যে যে এত প্যাচ কেডায় জানত—সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, বিপ্লব—এই সকল কথাগুলোর অর্থ যেন দিন দিন কেমন জটিল মনে অইতাছে—

অংক না জানলে সব অংকই জটিল লাগব। রাজনীতিও পড়ার বিষয়, জানারও বিষয়, অভিজ্ঞতারও বিষয়—এর কতটুক আমরা জানি—একটু ধৈর্য রাখ—সব কিছুই ত আর হুট কইরা অয় না–বা বুঝন যায় না

হুম—ঠিকই কইছস

 

ওমর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। ধলাবাবু বংশীরে দিয়া বাড়ির ভেতর থেকে দুকাপ চা আনিয়েছেন। চা খেতে খেতে এতক্ষণ উত্তেজিত হয়ে বলা কথাগুলো নিয়ে নিজেরা আবার চর্চা শুরু করলো।  

ধলাবাবুর বক্তব্য এমন যে দেশটার মধ্যে রাজনীতিটা ঠিকঠাক আর হচ্ছে  না। 

ব্রিটিশ ভারতে ভারতীয় রাজনীতির জন্ম হইলেও জন্মগতভাবেই তা ঘুণগ্রস্থ আছিল। কইতে গেলে কংগ্রেস তো একটা ব্রিটিশের তাঁবেদারি করার সংঘ আছিল। যেখান থাইকা তারা রাজনীতি করতে আইছে। তাঁবেদারি আর রাজনীতি যে একলগে করন যায় না এইডা বুঝানোর জন্য হেরা তাঁবেদারি আর রাজনীতি একলগে কইরা দেখাইল—-সত্যি কথা বলতে এই দলটার দেহার মত চেহারাডা হইল তো গান্ধীজী আওনের পর। ছাত্ররাজনীতির দিনগুলাতে আমরা হয়তো এসব খেয়াল করি নাই—

হ ঠিকই কইছ দোস্ত—আরে হুন—কথায় কথায়—মাথাডা গরম আছিল আর কি—হুন খবর হইল গিয়া—আমার বিয়া—সামনের শুক্কু্রবার—

কও কি মিয়া—এইরম এক্কান গরম খবর—আগে দেও নাই—  

ধলাবাবু উত্তেজনায় প্রায় দাঁড়িয়ে ওঠে। বংশীকে ডেকে আরো দুকাপ চা আনতে বলে।

অহন দিলাম আর লগে দাওয়াতও দিলাম—যাওন লাগব হুনি–

যাইয়াম যাইয়াম—যাওনডা বড় কথা না—বড় কথা অইল দাওয়াত খাওন

এইডা আবার বড় কথা কিয়ের—হিন্দুগো লাইগা পৃথক ব্যবস্থা থাকব

আমি তরারডাই খাইয়াম—আমার পৃথক লাগত না—

খাইছ্‌—গরুর গোস্ত বারণ কইরা দিছি—খাসী অইব–

তোর বাপে রাজি হইল?

রাজি করাইছি—এইডা আমার শর্ত আছিল—বিয়াতে হিন্দু মুসলমান হগলের জইন্য ব্যবস্থা করতে অইব

হিন্দুরা যাইব?

যাইত না কেরে—আমার বন্ধু বান্ধব—গাঁও প্রতিবেশী—বেকেই যাইব

দোস্ত তোর কথা হুইন্যা আমার তো বেদম আনন্দ লাগতাছে

তুই আনন্দ কর—আমি অহন উঠবাম

আরে উঠতে কিতা—আসল কথাই তো শুনা অইল না—শ্বশুর বাড়ি কুনহানে?

আমরার গ্রামেই

কস কি—আগে থাইক্যাই চিনস নাহি

হ চিনি ত—

এট্টু প্রেমটেমও আছিল নাহি

না না হ্যায় থাকলে তুইন জানতি না—তয় তাইনরে দেখছি—মামুদপুর ইশকুলে পড়ার সময়—এইট পাশ করার পর আর পড়তে দেয় নাই —বুঝসই তো —গ্রামের মানুষ নানান কথা কয়—-মেট্রিক পর্যন্ত পড়তে অইলে দূরের ইশকুলে যাওন লাগত—যাউগ্যা–যা অইছে অইছে—আইজ উঠি—বিস্যুদবার আইয়াম—তুই আম্মাজান আর ভাবীরে এট্টু জানায়া রাখিস—ওইদিন আইয়া তারারে কইয়াম আর দোয়া নিয়াম—-   

 

ওমর চলে যাওয়ার পর ধলাবাবু একা একাই হাসতে লাগলো। ওমর বড় হলো, শিক্ষক হলো, কিন্তু ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাস এখনও যায় নি। সম্পন্ন গৃহস্থ ঘরের সন্তান। ধর্মের পাশাপাশি বাড়িতে শিক্ষারও চর্চা আছে। তবে বাড়িতে লিগের প্রভাব আছে বয়স্কদের মধ্যে। অথচ ওমর এর বিপরীত। রাজনীতি নিয়ে তার খুবই আবেগপূর্ণ মনোভাব। লিগকে এখনো সে ঘোরতর শত্রু মনে করে। আক্ষেপ করে বলে, সর্বভারতীয় একটাই দল এই বাংলার মাটিতে  জন্ম নিয়েছিল রে, আর সেটাই হল কিনা মুসলিম লীগ‘! আক্ষেপের কথাটা খুব যথার্থই মনে হয়েছিল। তবে এর শিকড়ের সন্ধান চালানোর জন্য আমরা দুজনেই একমত হয়েছিলাম যে বাস্তবের এই ঘটনার একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি নিশ্চয়ই আছে।  

কথায় কথায় তো আমরা একমত হয়েইছিলাম যে ভারতবর্ষের প্রায়োগিক রাজনীতিতে ধর্মের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত প্রত্যক্ষত লিগের  দ্বারা হলেও প্রধান দল হিসেবে কংগ্রেস এই রাজনীতির পরোক্ষ সূত্রপাত অনেক আগেই শুরু করে। এর সবটাই ওমর জানে এবং স্বীকারও করে। দশজনের সামনে কথাও খুব হিসেব করেই বলে। কিন্তু আমরা দুই বন্ধু একসাথে হলে ওর মুখের অর্গল যেন খুলে যায়। বিস্তর মুখ খারাপ করে খুব অধৈর্যপানাও করে। 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শৈশবের সাদা পাখি | সৌমিত্র শেখর

Fri Oct 9 , 2020
শৈশবের সাদা পাখি | সৌমিত্র শেখর 🌱 আমার বাল্যবন্ধু বাবলা। ওর পোশাকি নাম দিলীপকুমার বসাক। স্কুলে পড়তাম একই সঙ্গে। ও কবে ভর্তি হয়েছিল মনে নেই, কিন্তু প্রায় দশটি বছর একই সঙ্গে, একটি ছোট্ট শহরে কাটিয়েছি। স্কুলের কাছাকাছি ওর বাড়ি। সময় পেলেই চলে যেতাম। ওর মাকে বলতাম জেঠিমা। দারুণ আচার বানাতেন। […]
Shares