শৈশবের সাদা পাখি | সৌমিত্র শেখর

শৈশবের সাদা পাখি | সৌমিত্র শেখর

🌱

আমার বাল্যবন্ধু বাবলা।
ওর পোশাকি নাম দিলীপকুমার বসাক। স্কুলে পড়তাম একই সঙ্গে। ও কবে ভর্তি হয়েছিল মনে নেই, কিন্তু প্রায় দশটি বছর একই সঙ্গে, একটি ছোট্ট শহরে কাটিয়েছি। স্কুলের কাছাকাছি ওর বাড়ি। সময় পেলেই চলে যেতাম। ওর মাকে বলতাম জেঠিমা। দারুণ আচার বানাতেন। ওদের বাড়িতে ছিল কয়েকটি কুলগাছ। বাজারও কাছে ছিল। জেঠামশাইকে দিয়ে নানান পদের টকফল আনিয়ে জেঠিমা আচার দিতেন এবং এক অর্থে বিলাতেন। এতেই তাঁর আনন্দ। কুল ঢেঁকিতে পিষে চাপ্টা-জাতীয় অতি টক এক ধরনের শুকনো আচার তিনি বানাতেন। সেটা প্যান্টের পকেটে করে বাবলা স্কুলে নিয়ে আসত আর বন্ধুদের দিত। আমি যে কতো আচার খেয়েছি সেই ছোটোবেলায়, মনে নেই। অনেকগুলো বোনের একটি ভাই বলে বাড়িতে আদরও ছিল বাবলার। অর্পদিনেই বাবলা আমার ভালো বন্ধু হয়ে যায়।

বন্ধুত্বের সূত্রে পরিবারে তার অতি আদর কিছুটা চুইয়ে আসত। এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, আমরা যারা সহপাঠীদের ছিলাম সবার প্রতিই। আমাদের আর এক বন্ধু বিশ্বনাথ চক্রবর্তী; আমরা বলতাম বিশু। ওর দাদু ছিলেন শেরপুরের বিখ্যাত গেন্দা কবিরাজ। একনামে চেনা সেই মানুষ। ওদের বাড়িকে বলা হতো ‘কবিরাজ বাড়ি’। বিশু আনত চব্যনপ্রাস; আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলতাম ‘চ্যাবনপ্রাস’। কী চমৎকার গন্ধ আর স্বাদ! একজন স্যারতো ক্লাসেই বিশুর কাছে প্রায় চাইতেন: ‘কীরে বিশু, আইজ আনস নাই?’ বিশু স্যারের জন্য স্পেশাল করে আনা পুটুলি তুলে দিত। এজন্য সহপাঠীদের মধ্যেও বাবলা আর বিশুর সমাদর ছিল বেশি। কিন্তু অন্যরা জানত না, ততোদিনে আমার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাবলাদের বাড়ির অন্দরমহলে। জেঠিমার আদর আমি পাই, সঙ্গে নানা রকমের আচারও। বিশুর সঙ্গে সখ্যভাব থাকলেও ওর বাড়ির ভেতর অবধি যাওয়া হয়নি। কারণ, বাড়িটি স্কুল থেকে একটু দূরেই ছিল। এরচেয়ে বড়ো কথা, বিশুর সুন্দর একটা বোনও পড়ত আমাদের সঙ্গে। ওর সঙ্গে কৈশোরক সংকোচে তখন কথা বলতাম না; শুধু বিশুর সঙ্গে বলতাম। সেই সংকোচ আর লজ্জা স্কুলজীবনে কাটেনি। ফলে, চ্যবনপ্রাস বেশি খেতে পারিনি। বাবলার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা খুব তাড়াতাড়ি গাঢ়তর হয়।

বাবলার পিতার নাম কাশীনাথ বসাক, লোকে কাইশ্যা বসাক বলে ডাকত। তিনি খুব হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। পরোপকারে লাগে এমন নানা টোটকাও জানতেন বলে লোকে সমীহ করত। স্কুলজীবনে একবার আমাকে কুকুরে কামড়ায়। বাবা হাসপাতাল থেকে আমার নাভির চারপাশে চৌদ্দটি ইনজেকশান দেবার আয়োজন করেন এবং আমি সেগুলো গ্রহণ করতে বাধ্য হই। ইনজেকশনগুলো হাসপাতালে ছিল না। হেল্থ ইন্সপেক্টরকে দিয়ে কোথা থেকে যেন ম্যানেজ করা হয়েছিল। কোহিনুরের-মা বলে একজন চিকিৎসাকর্মী ছিলেন সেই হাসপাতালে। তিনি ইনজেকশন দিতেন। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইনজেকশনের সুঁই গরমজলে দিয়ে আগে জীবাণুমুক্ত করতেন; নাভিতে স্পিরিট ঘষে ইনজেকশনের উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতেন; তারপর দিতেন ইনজেকশন। কোনো কোনো দিন ইনজেকশন দেওয়ার পর নাভির চামড়া আলুর মতো ফুলে উঠত। উহ্! এখনও ভয় লাগে ভাবলে। এরই মধ্যে বাবা আবার সিদ্ধান্ত নেন, কোনো চিকিৎসা তিনি বাদ দেবেন না। ছেলেকে বিপদমুক্ত করবেনই। ফলে বাবলার পিতার কাছে, ওদের বাড়িতে, একদিন ভোরে আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন। বাবা জানতেন না, আমি এই বাড়িতে ভালোই পরিচিত।অবশেষে, বাবার সামনে ঔষধ তৈরি হয়। অনেকগুলো গোলমরিচ বাটাসহ আর কী কী যেন! লেইয়ের মতো ঔষধ। আমাকে ভোরবেলায় সূর্য ওঠার সময় পূর্ব দিকে মুখ করে কুকুরের মতো চতুস্পদরূপ নিয়ে কচি কলাপাতা থেকে সে ঔষধ চেটে চেটে খেতে হয়েছে পর পর সাত দিন! ঔষধ খাওয়ার সময় আমার গলা যেন জ্বলে যেত। কিন্তু সঙ্গে থাকত জেঠিমার অমৃত আচার; প্রশান্তি পেতাম বেশ।

সেই বাবলা কিন্তু আমাদের সঙ্গে কলেজের আঙিনায় প্রবেশাধিকার পায়নি। ফলে আপাত বিচ্ছিন্নতা। আমি কলেজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা মাড়িয়ে আবার যখন শেরপুরে আসি একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে, তখন আবিষ্কার করি বন্ধু বাবলা একটি মনোহারি দোকানের অধিপতি। জেঠামশাই বয়সের ভারে খানিকটা কাবু। ছেলেকে আয়রোজগারের সৎ পথে নামিয়েছেন তিনি। বন্ধুটিও পানখাওয়া আর মাছধরা ছাড়া কোনো নেশায় জড়ায়নি। বাবলার সঙ্গে আমার পুনঃযোগাযোগ হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকে কর্মসূত্রে আবার শেরপুর ত্যাগ করলেও সে সংযোগ অব্যাহত থাকে। ছুটিছাটাতে বাড়িতে গেলে বাড়ির মনোহারি দ্রব্যসামগ্রী ওর দোকান থেকেই নিয়ে নিই আর বসে আড্ডা দিই সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় ওর বেচাকেনা একটু কম থাকত। আমাকে দেখেই বলত, ‘আও, বও’। আমি ওর ক্যাশবাক্সের পাশে গদিতে পাগুটিয়ে মজা করে বসতাম। শেরপুরে আমার সেটাই ভালোলাগে। যে শহরে আমি হেঁটেছি, দৌড়েছি, ছোটো থেকে বড়ো হয়েছি, সে শহরের কাছে আমার কী অহমিকা? বাড়িতে গেলে তাই আমি এখানে-ওখানে আড্ডা দিই; আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে চলি। বাবলার দোকানে চা বা কফি আসত, চানাচুর মাখা হতো; আড্ডা দিতাম। চা শেষ হলে গদিতেই পান-সাজাত বাবলা। আমি পানে আসক্ত নই, সে জানে। সুপুরি এগিয়ে ধরে একটু টেনে বলত: ‘খাবাআআ–’? আমি নিতাম ছোট্টো এক টুকরো। স্কুলজীবনে আমরা ঝড়ঝাপটা ‘তুই’ বলতাম, পরে হলো ‘তুমি’। হোক। কিন্তু আন্তরিকতার কমতি ছিল না। কখনো কখনো আমাকে বলত, ‘দুই ভাই একসঙ্গে থাকব’।

এ বছরের শুরুতেই বাবলা আমাকে জানিয়েছিল, আর্থিকভাবে বেশ চাপে আছে সে। আমি বলি, কেন? তোমার দুটো সোনার ছেলে সরকারি স্কুল-কলেজে পড়ে; বৌদির কোনো বাড়তি চাহিদা দেখি না। বাবলা কিছু বলে না। ওর সঙ্গে আমার দেখা হয় এ বছর মার্চ মাসের পহেলা তারিখে। তারপরতো লকডাউন। ফোনে কথা হতো। ইদুল আজহার কয়েক দিন আগে এক সকালে তেমনি ফোনে কথা হলো। আমি ৫ই আগস্ট ইদের ছুটিতে শেরপুরে যাবো বলে ভেবেছিলাম। জানালাম ওকে। ফোনেই শুনলাম প্রচণ্ড কাশির আওয়াজ।
: ‘কী করে হলো?’
বলে, দোকানের হালখাতা করেছে বৃষ্টিতে ভিজে; ঠান্ডা লেগেছে। আমাকে সান্ত্বনা দেয়, চিন্তা নেই, গতকালই ডাক্তার দেখিয়েছে, এন্টিবায়োটিক দিয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে।

সকাল দশটায় ওর সঙ্গে ফোনে কথা হলো: সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ফোনেই জানলাম বাবলা নেই! শুনলাম, ওদের পুরোনো বড়ো টিনের ঘরের বারান্দায় ওকে শুইয়ে রাখা হয়েছে।

কল্পনায় ভেসে উঠল আমাদের শৈশব। এই ঘরের বারান্দায় কতো বসেছি। এর ওপরেই ছিল একটি বড়ো কুলগাছ। আমরা দুজনেই হঠাৎ চালে উঠে কুল পাড়ছি। নিচ থেকে জেঠিমা চিৎকার করছেন–
: ‘এই নাম; পড়ে যাবি; ঘরে আচার আছে; বরই পাড়তে হবে না! নাম।’
সেই গাছটি এখন নেই; জেঠিমাও নেই; ঘরটি পরিত্যক্ত।
বাবলা পড়ে আছে! এখন ওকে কে ডাকে?

চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। সকাল আর সন্ধ্যার এই ব্যবধান?

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

জন এ্যাসব্যারি | মুম রহমান

Thu Oct 15 , 2020
জন এ্যাসব্যারি | মুম রহমান 🌱 শুনেছি, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখের পছন্দের কবি তালিকায় ছিলেন জন এ্যাসব্যারি। তবে তিনি বিশ্বে বহু সাধারণ পাঠক তো বটেই কবিদের প্রিয় কবি ছিলেন। মার্কিন এই কবি বিশটির অধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন এবং পুলিৎজার পুরস্কার সহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। আজকের উত্তরাধুনিক কবিতার জটিলতা […]
Shares