নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | ধারাবাহিক পর্ব ৩

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | ধারাবাহিক পর্ব ৩

🌱

একটি পারস্পরিক ভৌতিক কথাবার্তা এভাবেই শুরু হয়—–

—-দ্যাশটা কি শকুনের হাতে পড়ছে নাহি—

—-শকুনের থাইক্যাও বড় শকুন—মানুষের হাতে পড়ছে—   

—-কও কি —-

—-তয় ল একবার ১৯৪৬ এর নোয়াখালি যাই—যাই একবার ১৬ই অগাস্টের কইলকাতা যাই—-   

—-কী কও এই সব কথা—অহন ১৯৪৭—–তুমি পিছাইয়া যাও কেমনে—  

—-একবছর পিছাইতে পার না—ভুতের ভয় পাও নাকি

—-ভুতের ভয় পাইনা—ভুতের থে বড় ভয় মানুষের রে পাইরে—মানুষরে পাই— 

—-১৯৪৭। দেশভাগ। স্বাধীনতা। উৎসব। দাঙ্গা। ধর্ষণ। আগুন। রক্ত । রক্তের আলপনা। তার উপর দিয়ে টানা স্তব্ধ সীমান্তরেখা। তার উপর দিয়ে মানুষ হাঁটে। বিধ্বস্ত রক্তাক্ত মানুষ হাঁটে। অবাক প্রশ্নার্ত মানুষ হাঁটে। সীমান্ত রেখা মাড়িয়ে হাঁটে। তৈরি হয় মিছিল । পারাপারের মিছিল। এই উৎসবের বছরে কোথায় যায় মানুষগুলো! এখন তো আনন্দ করার সময়! নেতা মন্ত্রীগণ ঘোরেন।  ঘুরে ঘুরে অভ্যর্থনা গ্রহন করেন। কিন্তু দেখেও দেখলেন না পোড়াঘরবাড়ি। দেখেও দেখলেন না ধূঁয়ার  কুণ্ডলিময় আকাশ। দেখলেন না আকাশের দিকে উড়তে উড়তে হাত নাড়ছে ভবিতব্যের ছাই। কেউ কেউ মনে মনে ভাবলেন জিতে গেলেন। কিস্তিমাত করে জিতে গেলেন।  হ্যাঁ, সত্যি কিস্তিমাত করে জিতে গেলেন। দেশটা চমৎকার ভাগ করে ফেলতে পারলেন। 

যুদ্ধ অথবা বড় আকারের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে একটা দেশ তথা ভূখণ্ডের এক শ্রেণীর মানুষের জীবনে এমন সার্বিক বিপর্যয় নেমে আসতে  পারে না। অথচ এ-সব ছাড়াই সেদিন নেমে এসেছিল বিপর্যয়। সন ১৯৪৭ । উপলক্ষ্য স্বাধীনতা ও দেশভাগ। 

রাতে ঘুম নেই ধলাবাবুর। অনেক গুলো দুঃস্বপ্ন একসাথে আসে। বাসন্তী আজ হঠাৎ এই খাটে শুতে এসেছে। ছেলে মেয়ে একটু বড় হওয়ার পর থেকে তাদের খাট আলাদা। আজ দুটোই তাদের ঠাম্মার সঙ্গে শোয়ার বায়না ধরেছে। বাসন্তীর বারণ শুনলো না। ছোট মেয়েটা এখনও মাঝে মাঝে রাতে বিছানা ভেজায়। শাশুড়ি বুড়ো মানুষ, রাতবিরেতে এসব ঝামেলা করা—। 

বাসন্তী শুতে এসে দেখে ধলাবাবু জেগে আছে। বোঝা যাচ্ছে বেশ উদ্বিগ্ন। 

কী গো ঘুম আইতাছে না—বইয়া আছ যে

এমনেই

শরীলডা ঠিক আছে তো?

মইধ্যের বাড়ির ছুডু কাকা তোমারে একবার যাইতে কইছে—

আর কিছু কইছে–

কইল ধলা কি ভাবতাছে একটু কথা কওন দরকার।

কথা আর কি—দেশছাড়নের পরামর্শ—সেই এক কথা—নোয়াখালির ঘটনার পর থাইকাইত এক কথা—তোর বাপে থাকলে   এতদিনে কবে যাইতাম গা—

দেশ কি ছাড়নই লাগব?

ছাড়ন লাগব ক্যান—দেশ কি ছাড়ার জিনিস নাকি—দেশ কি   ভাড়া করা বাসাবাড়ি নাহি—

কিন্তু চাইরদিকে যা শুনন যাইতাছে, ভয়ও তো লাগে—

হুন–ভয় লাগন স্বাভাবিক। একবছর আগে নোয়াখালির দাঙ্গায়  দশ হাজার খুন, পঞ্চাশ হাজার নিখোঁজ, হাজার হাজার ধর্মান্তরকরণ আর অসংখ্য ধর্ষণ—তারা সব হিন্দু—এইডারে অবশ্য দাঙ্গা কয় না, কয় গণহত্যা—কারণ দাঙ্গা অয় দুইপক্ষের মইধ্যে—এইহানে একপক্ষ মারছে আর একপক্ষ মরছে—দাঙ্গা অইছে তার আগে কইলকাতারডা—সেইখানেও পাঁচ হাজারের বেশি মরছে—সেইখানে মরছে ও মারছে দুই পক্ষই— আর এই নরহত্যার রক্ত লইয়া একবছর পর স্বাধীনতা—ভুক্তভোগী মানুষ এই স্বাধীনতারে বিশ্বাস করে কেমনে—করলেও কতটুক করব—

ধলাবাবুর কোনো কিছু বলা বা ব্যাখ্যা করা খুবই আচানক। তার কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গীর গুণে, বিশেষ করে এই ধরণের  কথায়, শ্রোতার পক্ষে যেন শ্বাসরোধের ভাব হয়। বাসন্তী যে কখন অজান্তে  ধলাবাবুর ডান হাতটা আকঁড়ে নিজের বুকে চেপে ধরেছে বুঝতে পারে নি। কথা বলতে বলতে ধলাবাবু বুঝতে পেরে বাসন্তীকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল—তোমারে ক্যান এইসব কথা কইতাছি জান—কইতাছি এই জন্যই যে তুমি পড়াশোনা জানা মেয়ে—ভয় তুমি যেমন পাও, আমিও তেমন পাই—তো ভয় পাইয়া ভয়ডারে নিয়ে বিচার বিবেচনা কইরা তো দেখন লাগব—ঘটনা অইছে নোয়াখালি আর কইলকাতায়—আর আমরা এইহান থাইকা ভয় পাইয়া ভাবতাছি দেশ ছাইড়া যাইতাম। আগে দেহি সবটা—খবরাখবর নেই—আমি যেমন তোমার উফরে ভরসা রাখি—এত বড় একটা সংসারের দায়দায়িত্ব তোমার উপর—তেমনি আমার উফরও ভরসা রাইখ—তোমার লগে পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতাম না। 

দিন পর ধলাবাবুর নোট খাতায় লেখা হলো—-

স্মরণকালের মধ্যে দেখতে পাইনা বাঙালি কখনো বাঙালি‘—-এই  বিষয়টি নিয়ে অন্তত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে। কয় দশক আগের  ইতিহাসে দেখা যায় বঙ্গভঙ্গের সময় বাঙালির এমন এক প্রচেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেটা তৎকালীন বাঙালি সমাজের একটি মাত্র অংশে ঘটেছিলো। সেই-সূত্রে বঙ্গভঙ্গ রদও হয়েছিল একসময়, কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীটি কলকাতা থেকে উঠে দিল্লি চলে  গিয়েছিল। বাঙালি, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালি ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে সেদিন হারিয়েছিলো কৌলীন্য। বলা-বাহুল্য ভারতীয় জাতিপুঞ্জগুলোর মধ্যে এই কৌলীন্যপ্রথা ছিলো। ব্রিটিশ রাজশক্তির সান্নিধ্য-সাপেক্ষে ঠিক হত এই কৌলীন্য। ভারতবর্ষের রাজধানী হারানোর মাধ্যমে তখন থেকেই বাঙালির হারানোর পালার শুরু বলা যায়।  বস্তুতপক্ষে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে সেই সময় থেকে বাঙালি  ‘বাঙালিএই জাতি ধারণাটির থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো ও ক্রমশ এক ধরণের ভারতীয়তার দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। বাংলার মাটি, বাংলার জল—এই সকল পদগুলো ক্রমশ  শিশুতোষ হিসেবে গণ্য হতে লাগলো। ফলে বঙ্গভঙ্গ-পূর্ব বাঙালির  তৈরি বাঙালিধারণাটি ক্রমে দুর্বল হতে হতে ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় দেশের পূর্বাংশে তার একটি দুঃসহ, ভগ্ন-রূপ চোখে পড়তে লাগলো। বাঙালি নিজেই নিজের ভিতর বিভক্ত হতে লাগলো। ধর্মে, জাতপাতে, কুলীনে, অকুলীনে, ইত্যাদি  বহুভাগে ছড়িয়ে  পড়তে লাগলো। এই  বিভক্তিকরণ নেহাতই  চলে আসা সামাজিক গঠন বিন্যাসের সহজাত চলন ছিল না, বরং এই বিভক্তি ছিল পেরেক ঠুকে স্থায়ীকরণের এক অবিমৃষ্যকারীতা। যার সূত্রে বাঙালি পেতে লাগলো দেশভাগের নামে  ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার এক পরিণতি।

তো সেই বাঙালিকে  ভাগ করা হয়েছে। ভাগ করার প্রেক্ষাপট বানানো হয়েছিল ১৯৪৬ এর কলকাতা ও নোয়াখালী দুটো ভয়াবহ দাঙ্গা দিয়ে। তখন সেই বঙ্গভঙ্গের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিরা কোথায়তখন স্বাধীনতাকামী সেই বিপ্লবী বাঙালিরা  কোথায় ? যারা ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করেছেন তারা? কিছু ধর্মীয় মৌলবাদীর বিরুদ্ধে  কেউ কেন দাঁড়াতে পারে নি সেদিন, সেই প্রশ্ন তো অমীমাংসিতই থেকে গেল !!

ইতিহাসের কিছু বিচার থাকে। নির্মম হলেও সেই বিচারের সম্মুখীন একদিন সবাইকেই হতে হয়। 

 

স্বাধীনতা লাভের দশদিনের মাথায় অখিলবাবুর পদার্পন ঘটল ধলাবাবুর বাড়িতে। অখিলবাবুর নামে ব্রিটিশ সরকারের জারি করা  হুলিয়া আছে। এখন পাকিস্তান আমলে সেটা কার্যকর কি না কেউ জানে না। অখিলবাবু তবু সাবধানেই চলাফেরা করেন,বললেন। এর আগেও কয়েকবার তিনি এই বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। অখিলবাবু পার্টির হোলটাইমার। তেভাগা আন্দোলনের নেতা । এখন স্বাধীনতা লাভের মাস চলছে। অনেক কিছুরই পরিবর্তন হচ্ছে। সবচে বড় কথা মানুষের মনেরও পরিবর্তন হচ্ছে। কখন কোথায় কী ঘটে যাবে কেউ বলতে পারছে না। তবে যারা বিগত কয়েক দশক রাজনীতির সঙ্গে ঘর করছেন তাঁদের ধারণা থাকার কথা। অখিনবাবু সেরকমই একজন মানুষ ধরা যায়। 

অখিলবাবুর শোয়ার জায়গা হয় ধলাবাবুদের বৈঠকখানাতে। আগেও হয়েছে। এবারও হলো। সেখানে বংশী ও তারসঙ্গে আরেকজন কাজের মানুষ আফজল, তারাও বৈঠকখানার একটা ঘরে থাকে। এ ছাড়াও সেখানে আরো দুখানা শোয়ার ঘর আছে। তার একটাতে  অখিলবাবু থাকেন। অখিলবাবু এলে ধলাবাবু অনেক রাত পর্যন্ত বৈঠকখানাতে থাকে। তাদের নানা বিষয়ে কথাবার্তা ও মতবিনিময় হয়। বংশী আর আফজল সেইসব দুর্বোধ্য কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে। 

 

তো এবারই প্রথম কথায় কথায় পাকিস্তান প্রস্তাব ও গঙ্গাধর অধিকারীর থিসিস নিয়ে কথা শুরু হয়। এর দুদিন আগে ধলাবাবুর তার খাতায় লেখেন—

১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সময়কালটা ছিল ভারতের রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রে বেশ জটিল একটি সময়। কারণ তখন দেশভাগের মতো একটা দূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছিলো। একসময়কার ভাবনা চিন্তার মূল্যায়ন পরবর্তী কাল-প্রবাহের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে হয়। এক্ষেত্রেও তা হয়ে চলেছে। যাকে ইতিহাসের নির্মোহ বিচারও বলা যেতে পারে। কোনো ভাবনাচিন্তা সেই বিচারে উতরে গেলে তাকে কালোত্তীর্ণও বলা হয়। বাঙালিদের  মধ্যে কমিউনিস্টদের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা একটু বেশি ছিল। বা এখনও আছে হয়তো। কারণ বামপন্থী ভাবনা বিকাশের কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতবর্ষের বাংলা-ভূখণ্ড। সচেতন মানুষ স্বভাবতই আশা করতো বামেদের কাছ থেকে ভালো কিছু। কিন্তু সংশয় তৈরি হয়ে যায় দেশভাগ নিয়ে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নিয়ে। আর  সেটা প্রাকস্বাধীনতা আমলের ওই কালখণ্ডে ঘোষিত হয় গঙ্গাধর অধিকারীর তৈরি প্রস্তাবটি নিয়ে। যেখানে তিনি বিভিন্ন জাতিসত্তার সমষ্টি এই ভারতবর্ষের জন্য যে রাষ্ট্র-কল্পনাটি করেছিলেন তা ছিল আধা স্বাধীন কিছু রাজ্যমণ্ডলী এবং তাদের এই অপশন থাকুক যাতে ইচ্ছে হলে আগামী দিনে কেউ কেউ স্বাধীন সার্বভৌম হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস যেহেতু ব্রিটিশ প্রশাসনিক লিগ্যা্সির বান্দা, ফলে সেখানে একটা কিন্তুতৈরি হয়ে যায়। আর এই কিন্তুটা আর কিছু না, ভারত এক জাতি, এক প্রাণ । যেন জোর করেই ভারত এক জাতি, এক প্রাণ । যুগ যুগ ধরে যে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন শিক্ষা সংস্কৃতি নিয়ে একটি জাতিপুঞ্জ যে, কেবল মাত্র প্রশাসনিক সূত্রে বাঁধা একটি বৃহৎ ভৌগলিক অংশকে ভারতবর্ষ বলা হত, সেটি ভুলে যাওয়া । কারণ কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার আকর্ষণ। সুতরাং কংগ্রেসের মতে এখানে বিভিন্ন জাতি ভিত্তিক  স্বশাসিত রাজ্য গঠনের প্রশ্ন উঠে না।

ভারতবর্ষের জাতি ধারণার এই জাতিগুলোর রাজনৈতিক ভাবনাতে তখনও ধর্ম এসে উদয় হয় নি। কিন্তু মুসলিম লীগ সরাসরি ধর্মের ভিত্তিতে  জাতীয়তার কথা বলে নিজেদের  ঘোষণা করে বসলো। দাবী করে বসলো আলাদা ভূখণ্ডের। এবং তার সপক্ষে খুব দ্রুত মুসলমানদের সমর্থনও আদায় করে ফেলল। এখান থেকেই গঙ্গাধর অধিকারীর প্রস্তাবটি সেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করে পাকিস্তান প্রস্তাবের সারবত্তা খুঁজে পেল। পার্টিতে তা গৃহীতও হলো। তিনি শুধু প্রস্তাবটি নির্মাণই করেন নি, পাঞ্জাবের  নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের নির্বাচনী ইস্তাহারও রচনা করে দিয়েছিলেন। তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি মুসলিম লীগের  পাকিস্তান প্রস্তাব সমর্থন করেছিল।  কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় তা একসময় স্থগিতও করা হলো। এখানে রজনীপাম দত্তের একটি জোরালো ভূমিকা ছিল। উনি এমন বলেছিলেন যে মুসলিম লীগ যতটা না পৃথক জাতিসত্তার কারণে পৃথক রাষ্ট্র চাইছে, তার চেয়ে অধিক একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভাবনা থেকে পৃথক রাষ্ট্র চাইছে। অর্থাৎ,শুধু ধর্ম দিয়ে তো কোনো জাতি হয় না। আরো অনেক কিছু  লাগে ।

কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাবের সারবত্তার প্রশ্নটি নিয়ে ইতিমধ্যে নেতাকর্মীদের কথাবার্তার সূত্র ধরে হিন্দু মহাসভা বা ঐ জাতীয় গ্রুপগুলো বিষয়টি প্রচারে নিয়ে আসে। অথচ পার্টি থেকে এসবের কোনো পরিষ্কার সিদ্ধান্ত বা দিক নির্দেশ আসে না। এর একটি বড় কারণ হলো তৎকালীন পার্টি পুরোপুরি সোভিয়েত রাশিয়া তথা স্ট্যালিনের নির্দেশের বাইরে যেতে পারতো না। ফলে গোটা স্বাধীনতা প্রাপ্তির  সময়কাল জুড়ে দেশভাগ নিয়ে একটা দিশাহীন নৌকার যাত্রী হয়ে রইলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা। এখানে দেশভাগ তো শুধু বর্ডারের লাইন টানাটানি নয়, দেশভাগের অব্যবহিত ফলাফল অর্থাৎ বিভক্ত-খণ্ডের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়টাও ছিল । যা খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে আজ। যারা দেশ, ভিটেমাটি হারিয়ে অন্য ভূখণ্ডে আশ্রিত হবে বা হচ্ছে, তাদের এই কষ্টের জন্য আগাম কোনো ভাবনা বা চিন্তা অন্যদের মতো কমিউনিস্ট পার্টির ভাবনা চিন্তায় তখনও ধরা পড়ে নি। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ চেয়েছিল ক্ষমতা। কমিউনিস্ট পার্টি কী চেয়েছিলো–এই প্রশ্নটা তো থেকেই গেল।

অখিলবাবুকে একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল যে স্বাধীনতার লাভের প্রাক  মুহূ্র্তে পার্টি এই ঘোষনা কেন দেয় নি যে, ভিটেমাটি ছেড়ে কেউ যাবে না বা কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। উচ্ছদের বিরুদ্ধে পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতা কী ছিল?

আসলে অখিলবাবুকে প্রশ্নটি করার আগে ধলাবাবুর বক্তব্যটা ছিল ওই সম্প্রতি লেখা তার নোটটা। যে-রকম সে প্রায়শই লিখে থাকে।

অখিলবাবু বয়স্ক মানুষ। ধলাবাবুর কথাবার্তার মূল কেন্দ্রবিন্দুটা ধরার জন্য বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুঝে থাকলেন। তারপর একসময় মুখ খুললেন।

ভাইরে তোমার আক্ষেপ, অভিমানের জায়গাটা বুঝি। আমাদের নিয়তি বল আর ভাগ্য বল, আমরা বাঙালিরা এই ভারতীয়  উপমহাদেশের  সঙ্গে বহুকাল আগের থেকে জড়িয়ে আছি । বলতে গেলে ভৌগলিক ভাবে তো আছিই, আছি ঐতিহাসিক বা নৃতাত্বিক—উভয় ভাবেও। হ্যাঁ, তৎসত্ত্বেও আমরা আমাদের স্বাতন্ত্র তৈরি করতে পেরেছি। যুগের আধুনিকতার সুযোগ আমরাই বেশি পেয়েছিলাম ঔপনিবেশিকদের সংস্পর্শে এসে। হয়তো তাই শুধু বাংলাকে নিয়ে পৃথক ভাবনাটা কখনও, বিশেষত ব্রিটিশ শাসনের প্রায় দুই  শতাব্দীকালে তেমন করে ভাবা হয় নি, বা ভাবার সুযোগও হয় নি। কারণ তখন গোটা ভারতই ব্রিটিশ পদানত। বাঙালি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার কালটা কিন্তু খুব বড় নয়।  তাই দেখবে একটা সময় আমাদের শিক্ষাদীক্ষা অন্যের থেকে এগিয়ে ছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে এও ছিল বা আছে যে আমরা স্বার্থপর, বর্ণহিন্দুর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের নানা অহিতকর কাজও সমানে করে চলি। মধ্যযুগে এই বঙ্গভূমিতে যখন ইসলামের প্রসার শুরু হয় তখন নানা ভাবেই তার মধ্যে আমাদের বর্ণবাদী সমাজেরও অবদান থাকে এবং তাতে একটা উল্লেখ করার মত ঘটনা হলো বাঙালি হিন্দু মানুষের অংশ ধর্মান্তরিত হয়। এসব ইতিহাসের কথা। আরও বিশদ ভাবে আলোচনা করতে পারলে ভালো হত। তবে তোমার প্রশ্নের উত্তরের ভূমিকা স্বরূপ এটাকে উল্লেখ করলাম।   

ধলা বলল—আরেকটা কথা মনে করায়া দিতাম যে পাকিস্তান  প্রস্তাবে পার্টির নাকি সমর্থন আছিল—

প্রথমেই একটা কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিই যে, আমাদের পার্টি শ্রমিক কৃষকের পার্টি। হিন্দু মুসলমানের পার্টি না। বাঙালি অবাঙালির পার্টি না।  আমরা  শ্রেনীবিভক্ত সমাজের শোষিত মানুষদের পক্ষের শক্তি। সেখানে জাত পাত ধর্ম কোনো ভাবেই বিবেচ্য  ছিল  না।  কংগ্রেস যখন স্বাধীনতা আন্দোলন করছে আমরা তখন সেটা সমর্থন করেও লক্ষ রাখছিলাম যে এই  স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যাতে শ্রমিক কৃষকের শোষনের অবসান হয়। না হলে, এই স্বাধীনতা তো শুধু ক্ষমতার হাত বদল হবে মাত্র। সেই  দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের মতাদর্শের কিছু মানুষ কংগ্রেসের অভ্যন্তরে থেকেও কাজ করে যাচ্ছিল। আমাদের লাইন অব য়্যাকশান ঠিকই চলছিল। কিন্তু মুসলিম লীগের ধর্মীয় সম্প্রদায় ভিত্তিক রাজনীতি আমাদের প্রয়াসউদ্যোগকে অনেকটা পিছিয়ে  দেয়। স্বাধীনতার আন্দোলনে আন্দোলনরত মানুষের মধ্যে হঠাৎই প্রশ্নটা উঠলো,অর্থাৎ কেউ কেউ তুললো যে আমরা মুসলমান, আমরা আলাদা, আমারা আলাদা জাতি—ইত্যাদি। স্বাভাবিক ভাবেই স্বাধীনতার প্রশ্নে তখন অনেক প্রশ্ন উঠতে শুরু করলো। আর এরমধ্যে সবচেয়ে অসুবিধায় পড়লাম আমরা। আমরা সমাজের সর্বস্তরের জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রমজীবী মানুষকে যখন সংগঠিত করছিলাম তখন এই ধর্ম নিয়ে উঠা প্রশ্নটা আমাদের ক্ষতিই করেছিল। গঙ্গাধরবাবুর থিসিসটা নিয়ে বেশ জলঘোলা  হল। আমার মতে জিনিসটা মোটেও বাস্তবতার নিরিখে হয়েছিল বলে মনে হয় নি।  একটি হাজার বছরের সভ্যতার জাতিপুঞ্জের একটি অংশকে ধর্মের নামে পৃথক করে, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতির মর্যাদা দিয়ে জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারএর এই  ফরমূলার প্রয়োগটা ঠিক হয় নি বলেই আমার মনে হয়। যাকগে সেটা শেষপর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছিল।  

আমি পার্টির ভেতরের কথা তোমাকে বলতে পারি না, বলতে পারি না আন্তঃপার্টি বিতর্কগুলোর কথাও। তবে এটুকু বললাম এই জন্য যে তুমি একজন সমাজ সচেতন শিক্ষিত মানুষ। তবে শেষ পর্যন্ত ভাগটা যখন হয়েই গেল— আমরা সেটা নিয়ে কিছু বলার মত  প্রতিনিধিত্বমূলক অবস্থানে ছিলাম না।

আফনেরা তো সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ লইয়া কাজ করতাছেন—নিম্নস্তরের মানুষের মধ্যেই তো শ্রমজীবীর অংশটা বেশি—তালে নোয়াখালির এই লম্বা সময় ধইরা যে দাঙ্গাডা অইল সেইখানে আফনাদের তরফ থেকে কোনো প্রতিরোধ করা গেল না ক্যান? বা দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের কাছে গিয়ে দাঁড়ান গেল না ক্যান— 

ঠিকই, এই প্রত্যাশা তো থাকেই—আমরা এই দাঙ্গা সমর্থন করিনা—কলকাতার দাঙ্গায় আমরা দাঙ্গাবিরোধী অনেক কর্মসূচি নিয়েছিলাম। তবে কি জান—এইগুলো হলো যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের নিষ্ঠুরতা—শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাসে পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এমন ঘটেছে।

মাফ কইরেন অখিল দা—আফনের কথার লগে একমত হইতে পারলাম না। ইতিহাসের উদাহরণ লওনের আমার দরকার নাই—আফনে বলেন তো কয়ডা জমিদার মহাজন আছিল আর কয়ডা জমিদার মহাজন খুন অইছে—আর কয়ডা সাধারণ মানুষ খুন অইছে—সবচাইতে বড় কথা হাজার হাজার মহিলার ধর্ষণ, হত্যা, জোর করে ধর্মনাশ কইরা বিয়া করা—-এইডা কি শ্রেনীসংগ্রাম—-এই নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা কোথায়

এরপরেও অখিলবাবুর সঙ্গে ধলাবাবুর অনেকরাত পর্যন্ত কথা হলো। পার্টির অনুগত মানুষ তিনি অনেক কথারই জবাব দিতে পারেন নাই। তবে ওনার দুই দিনের অবস্থানকালে যেটা ধলাবাবু  বুঝতে পারলেন সেটা হলো নতুন করে পার্টির পু্নর্বিন্যাস হবে। আর সেই কাজের উদ্দেশ্যেই ওনার এবার আসা। সেই কারণে উপর থেকে নির্দেশ এসেছে যে পার্টির হিন্দু সদস্য, সমর্থকেরা যেন দেশ ত্যাগ না করে।  সেই সূত্রে ধলাবাবু ও ওমর পার্টির নজরে আছে। আগামীতে তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। অখিলবাবু সেই প্রাথমিক কাজ সারতে বেরিয়েছেন। তিনি আরো কয়েক জায়গায় যাবেন। ওমরের সঙ্গে তাঁর কথা বলার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ওমর তার বিবাহোত্তর জীবনে ব্যস্ত থাকার দরুন সেটা সম্ভব হয় নি।

ধলাবাবুর মন অখিলবাবু যাওয়ার পর থেকেই কিছুটা বিক্ষিপ্ত। স্বাধীনতার নামে এই ভূখণ্ডে যখন একশ্রেণীর মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন  উঠছে  তখন অখিলবাবুদের কথাবার্তাতে তো কোনো ভরসাই নেই। রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া এই ভরসা আর কে দিতে পারে ! এই কদিনে ধলাবাবুর যেন বয়স বেড়ে গেছে। তার বৈঠকখানাটি হয়ে গেছে এই অঞ্চলের সালিশি করার জায়গা। তার বাবা বা ঠাকুরদাদের আমলেও এটি এইভাবেই ব্যবহৃত হত। তখন শোনা গেছে ব্যাপারটা আরো জমজমাট ছিল। ধলাবাবুর নিজের আমলে সেই রমরমা আর নেই। তাদের শরিকী ভাগবাটোয়ারায় সেই রমরমাও হ্রাস পেয়ে গেছে। তবে তাদের এই এজমালী বৈঠকখানার ভাগ ধলাবাবুদের ভাগে পড়াতে ধলাবাবু এটা এখন নিজের বিবেচনামত ব্যবহার করে থাকে। সালিশী উপলক্ষে মানুষের আসাযাওয়া আগের থেকে কম। তবু সেদিন ঘুম থেকে ওঠার পরই শোনা গেল যে, দশবারজনের মত লোক বৈঠকখানায় এসে বসে আছে। কী একটা মারামারি নাকি হয়েছে। 

কিছুসময় পর ধলাবাবু বৈঠকখানায় এসে দেখলেন যে একটা মোটামুটি ভিড়ই জমেছে। সবাই প্রায় ছিটের ভিটার চেনা লোক। জেলে মাঝি ভাগচাষী সবাই আছে তার মধ্যে। কথা প্রসঙ্গে জানা যায় যে লাগোয়া কুলবাইড়া গ্রামের একদল মানুষ এসে ওদের চার পাঁচটি ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে, মারধরও করেছে কাউকে কাউকে। আর তার মধ্যে কথা যা ভেসে উঠলো, সেটা হলো—দেশ অহন  আমরার—মুসলমানের—তরা হিন্দু কাফের—তরা অহন তরার দেশ হিন্দুস্থান যা গিয়া—বুঝছস হালার পো রা—কয়দিন দেখবাম—এরপর সারা গাঁওয়ে আগুন দিয়া তরারে শুদ্ধা পুড়াইয়াম—

ধলাবাবু এইসব কথাবার্তা শুনে খুব অবাক হলেন না—তবে এত দ্রুত মানুষের মন পরিবর্তন হবে এটা ভাবেন নি। তিনি কিছুক্ষণ  চিন্তা করে সবাইকে বললেন যে—ঠিক আছে তুমরা যাও—আমি দেহি—আমি এরমধ্যেই ছিটের ভিটায় যাব—তুমরা অহন যাও—কারোর লগে বিবাদে যাইও না।

লোকজন উঠে চলে গেল। একসময় ধলাবাবুরাই এই অঞ্চলে শেষ কথা ছিল। আজ আর সেটা আছে কিনা কে জানে। মীমাংসা কতদূর হবে সংশয় আছে। খালের পাড়ে ছিটের ভিটার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা জলের সঙ্গে যুক্ত। তারা জল বোঝে, জল চেনে, কিন্তু হিন্দুস্থান চেনে না। কী এমন হয়েছে যে দেশ আলাদা হয়ে গেল রাতারাতি। দেশ আবার বদলায় কীভাবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে তো কী এমন হয়েছে—এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ধলাবাবু দেখল দলটা ছিটের ভিটার দিকে চলে গেল। 

ধলাবাবু একটু বেলার দিকে বের হলো। এই সময় হৃদয়পুর গ্রামের  দক্ষিণদিকে বিস্তির্ণ ধানক্ষেতের দিকটায় ভরা বর্ষার জল থাকে । বর্ষার জল খাল বিল নদী উপচে ফসলের মাঠে ঢোকে। মাস দুই তিন এই জল থাকে। বৈশাখ জৈষ্ঠ মাসে আমন ধানের চাষ হয়েছে। জলের সঙ্গে সঙ্গে সেই আমনের চারাও বড় হয়েছে। এখন উপরে ধানের শীষ মাথাচারা দিচ্ছে আর নিচে আট নফুট গভীর জল।  এরমধ্যে দিয়েই ছোট ছোট নাও, যেগুলোকে কুন্দাবলা হয়, নিয়ে কাজে কম্মে মানুষের যাতায়াত। আফজলকে নিয়ে ধলাবাবুও তাদের কুন্দা খানি নিয়ে ভাসলেন। আফজল জানতে চাইল কোনদিকে যাবেন। শ্রাবণ ভাদ্রের চিট চিটে রোদ। ধলাবাবু কুন্দার মাঝখানে ছাতা মাথায় বসে বললেন—যা না ওই বিলের দিকে মুখ কইরা যাইতে থাক। একটু জল হাওয়া লাগাই গায়ে। আফজল জানে বাবু মাঝে মাঝে বিনা কামে জলের উপর ঘুরে বেড়ায়। আফজল দাঁড়িয়ে লগি দিয়ে ঠেলে ঠেলে কুন্দা নিয়ে এগোয়। যেতে যেতে কিছুক্ষণ পরই তারা বিলে পড়ে। বিলের জল কিছুটা গভীর। বর্ষার নতুন জলে টই টুম্বুর। আফজল এবার লগিটা কুন্দার পাটাতনে নিচে ঠেলে দিয়ে গলুইয়ে বসে বৈঠা নেয়। এই সময় ধলাবাবু বলে—কীরে আফজল এইবার মাছ মারছ নাই বিলে—-

মারি ত কত্তা—গেল বিস্পতিবারই তো একটা বড় রৌ (রুই) মাছ পাইছিলাম

অ–

ধলাবাবুর মনে পড়লো রুই মাছ খেয়েছেন। ভাল ছিল মাছটা।

আইজ একটা বর্শি আনলে অইত—অনেকদিন মাছ মারি না

কইলেন না তো —ভালা একটা বর্শি বানাইছিত এইবার—লইয়া আইতাম—

থাউক আরেকদিন অইবনে

ধলাবাবু ছাতাটা বন্ধ করে বিলের জল দিয়ে চোখমুখে জলের ঝাপটা দিলেন। আরাম বোধ হল।

আসলে ধলাবাবু মনে মনে খুব চিন্তিত। বিগত কয়েক মাসের চিন্তা মাথায় নিয়ে আজ  এই প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেকে যেন খুব অকিঞ্চিতকর মনে হতে লাগলো। কুন্দা বিল ছেড়ে খালে গিয়ে পড়লো। গ্রীষ্মের সামান্য খাল বর্ষায় বড় নদীর আকার নিয়েছে। এইসময় আফজল দিক নিশানা জানতে চাইলে ধলাবাবু বলে দিল—কুলবাইড়ার দিকে যা।

কুন্দাখানি শৌখিন বটে, তবে বেশ ছোট। বর্ষার ভরা খালে সাবধানে বাইতে হয়। আফজল অভিজ্ঞ। জানে কীভাবে যেতে হয়। সে তাই একদিকের পাড় ঘেঁসে চললো।

 

কুলবাইড়ার মমিন মিয়া মান্যগন্য মানুষ। স্থানীয় বিবাদআবাদের মীমাংসা তিনিই সাধারণত করে থাকেন। হৃদয়পুরের ধলাবাবুকে তিনি চেনেন ভালোমতই। শহরের তেভাগার কম্যুনিস্টদের সঙ্গে তার উঠাবসা আছে। এর ফলে একটা নৈতিক বিরোধ ভেতরে ভেতরে কাজ করলেও শিক্ষিত ভদ্রজন হিসেবে সুনাম আছে বলে তিনি যথাসম্ভব আপ্যায়ন করে তাকে বাইরের ঘরে বসালেন। প্রীতি সম্ভাষনের পর ধলাবাবু পাশের ছিটের ভিটার ঘটনা তুলতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলেন। 

আগে হুইন্যা লন‘—বলে মমিন মিয়ার বক্তব্য হলো যেছিটের ভিটার মালিক ছিলেন অমলেন্দু রায় । তিনিই এই জেলে মাঝিদের এখানে বসিয়ে ছিলেন তার আমলে। তিনি আমার কাছে সম্পত্তি বিক্রি করে চলে যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলেন যে, এদের যেন কিছুদিন অন্তত থাকতে দিই। সেই কিছুদিন তো এখন প্রায় আট দশ বছর হয়ে গেল। এরা তো আর ওঠে না। অনেক কথা বাক্য  বিনিময় হয়েছে ওদের সাথে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি। তাই এখন যখন দেশ ভাগ হয়ে হিন্দুদের দেশ আর মুসলমানে্র দেশ আলাদা হয়ে গেল, তখন ওদের বলা হলো যে, তোমরা হিন্দু তোমরা তোমাদের দেশে চলে যাও—-এই নিয়েই ঝগড়া ও খানিক মারামারি—ইত্যাদি হয়েছে।

এইবার কন আফনের কিতা কওনের আছে— 

মমিন মিয়ার বক্তব্য শুনে ধলাবাবুর ভেবে রাখা কথা সব এলোমেলো হয়ে গেল। তবু সুবক্তার গুণ এখনও যেহেতু কিছুটা তার মধ্যে  আছে, তাই তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলা শুরু করলেন—মিয়া সাব, আপনার কথার উফরে আমার কথা কওন শোভা দ্যায় না। তবু দুইডা কথা আফনের বিবেচনার লাইগ্যা পেশ করতাম চাই যে, দেশ আইজ কাইল ভাগ অইছে মাত্র—এর আগে কোনোদিনও  ভাগ হয় নাই—আমরা কইতে গেলে কত পুরুষ ধইরা যে পাশাপাশি আছি তার হিসাব করতে পারতাম না—অহন দেশটা ভাগ অইছে ঠিকই—রাজনীতির মুরুব্বীরা ভাল বুইজা যা করছেন হ্যায় নিয়া কুন কথা কওনের কিছু নাই—তয় অই যে কইলাম আফনেরা আমরা একলগে ত আছিলাম এদ্দিন—এইডা কি মিছা অইয়া যাইব—ঝগড়া বিবাদ মারামারি পাশাপাশি থাকলে অইব, এইডা আচানক কিছু না—আবার তার মিল মীমাংসাও অইব—কিন্তু মানুষরে ভিডা ছাড়া— মাডি ছাড়া—দেশ ছাড়া করনের মত এত কঠিন কাজটা করা কি ঠিক অইব— এই  মানুষগুলান চইলা গেলে আফনের যে খুব বেশি লাভ অইব বা না গেলে যে খুব ক্ষতি অইব তা কিন্তু না–আফনে মুরুব্বী মানুষ— আফনে আমার থাইকা ভাল বুজেন—

এই পর্যন্ত আসতেই ধলাকে থামিয়ে দিলেন মমিন মিয়া।

বললেন—থামেন কত্তা অনেক কইছেন—আফনে চালাক চতুর শিক্ষিত মানুষ—কথা ভালা কইরা কন—তয় আমার সাফ কথা যে ওরারে উডনই লাগব—পুলাপানে কইছে আর কি একটা কথার কথা যে দেশ ভাগ অইছে—হিন্দুর দেশ আর মুসলমানের দেশ—ওরার কথা বাদ দ্যান—আমার জমিত ওরারে আর থাহনের দিতাম না—এইডা আমার সাফ কথা—আফনে হেরার লাইগা কওনের আইছেন কেরে হেইডা হুনি আমি জিগাই নাই—তয় আইছেন ভালা কথা—আমিও আমার সাফ কথা কইয়া দিলাম—আফনে হেরারে কইয়া দিবাইন—

মমিন মিয়ার স্ট্যান্ড খুব শক্ত। এই মুহূর্তে ধলাবাবুর পক্ষে এই স্ট্যান্ড নাড়ানো খুব কঠিন। তবে এই যে কথাটা বলা হলো এটা অন্তত এদের কয়েকটা দিন সময় দিল। যাক চিন্তা করার সময় পাওয়া গেল। আজ আর বেশি না ঘাঁটানোই ভাল। এই ভেবে  ধলাবাবু ওঠার উদ্যোগ নিল।

চাচা আমিত আগেই কইছি আফনের কথার উপর কথা নাই। আমি খালি ওদের হইয়া একটা অনুরোধ রাখছিলাম—ওরার মইধ্যে তিন জন আমার জমিতে বছরভর কামলা দেয়। তাই আমার একটা কর্ত্যব্য মনে কইরা আফনের কাছে আইছিলাম—যাই হোক আফনের মতামত হুনলাম—অহন উডি—আদাব চাচা।

এই  বলে  ধলাবাবু উঠে দাঁড়ালেন। মমিন মিয়াও উঠে দাঁড়ালেন । তবে কোনো কথা আর বললেন না।

 কুলবাইড়ার ঘাটে এসে ধলাবাবু তার কুন্দায় উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। খাল বেয়ে এসে বিলে প্রবেশ করার পর ধলাবাবু আবার বিলের জল দিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা দিলেন। এই সময় আফজল বলে উঠলো—ছুডু কত্তা কি মমিন মিয়ার লগে কথা কইবার গেছিলেন?

, ক্যান রে—

ওনার মতলব হুনি ভালা না

ক্যান

ঘাটের এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি কইরা যা হুনলাম, তাতে মনে লয় হেরা ছিডের ভিডা সাফ কইরালবই— খালি ছিডের ভিডা না এই অঞ্চলের হিন্দুদের সাফ করারও কথা হুনলাম।

হু

বাড়ি ফিরে ধলাবাবু ওমরকে খবর পাঠালেন বংশীকে দিয়ে—সন্ধের দিকে যেন আসে একবার। 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

খালেকদাদ চৌধুরী: প্রসন্ন অভিভাবক | গোলাম ফারুক খান

Fri Oct 16 , 2020
খালেকদাদ চৌধুরী: প্রসন্ন অভিভাবক | গোলাম ফারুক খান 🌱 তাঁকে জানতাম খুব ছেলেবেলা থেকেই। তখনো স্কুলে নিচের ক্লাসে পড়ি। কিন্তু প্রতিমাসের শুরুতে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম ‘উত্তর আকাশ‘ পত্রিকার জন্য। সে পত্রিকার তিনিই ছিলেন কাণ্ডারি। জানতাম তাতে থাকবে তাঁর উপন্যাস ‘চাঁদবেগের গড়‘ কিংবা ‘রক্তাক্ত অধ্যায়‘ কিংবা ‘সাপমারির […]
Shares