খালেকদাদ চৌধুরী: প্রসন্ন অভিভাবক | গোলাম ফারুক খান

খালেকদাদ চৌধুরী: প্রসন্ন অভিভাবক | গোলাম ফারুক খান

🌱

তাঁকে জানতাম খুব ছেলেবেলা থেকেই। তখনো স্কুলে নিচের ক্লাসে পড়ি। কিন্তু প্রতিমাসের শুরুতে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতামউত্তর আকাশপত্রিকার জন্য। সে পত্রিকার তিনিই ছিলেন কাণ্ডারি। জানতাম তাতে থাকবে তাঁর উপন্যাসচাঁদবেগের গড়কিংবারক্তাক্ত অধ্যায়কিংবাসাপমারির অভিশাপে নতুন কিস্তি। তখন কীইবা বুঝতাম সেসবের! বোঝা না বোঝায় মিলিয়ে পড়তাম, কিন্তু তাঁর লেখার তীব্র আকর্ষণ কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারতাম না। অবশ্য পরে, সত্তর দশকের মাঝামাঝি, তিনি বের করেছিলেনসৃজনীনামে আরেকটি সুন্দর সাহিত্যপত্র। ততদিনে প্রায়কিশোর আমি নিজেইসৃজনী লেখকসূচিতে সামান্য জায়গা পেয়ে গেছি।

মাঝেমাঝে তাঁর প্রসন্ন মুখচ্ছবি চোখে পড়ত উত্তরের সেই নির্জন ছোট শহর নেত্রকোনার রাস্তায়। দেখতাম ষাট কিংবা সত্তরের নেত্রকোনার খোয়াওঠা পথ ধরে তিনি ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছেন শহরের এদিক থেকে ওদিকে। নিমগ্ন চোখ নিচের দিকে, হাতেউত্তর আকাশকিংবাসৃজনী প্রুফ। কিংবা তাঁর নিজের কোনো বইয়ের। কখনো দেখতাম বসে আছেনসিদ্দিক প্রেসে।বন্ধু আলী উসমান সিদ্দিকীর সঙ্গে।নজরুল প্রেস,’ ‘স্কুল লাইব্রেরিএবং অন্য দুএকটি জায়গায়ও মাঝেমাঝে দেখা যেত তাঁকে। সঙ্গে হয়ত থাকতেন অধ্যাপক শামসউদ্দিন আহমদ, আইনজীবী দুর্গেশ পত্রনবীশ, রাজনীতিবিদ আব্বাস আলী খান। কখনোবা থাকতেন কমরেড সুকুমার ভাওয়াল, ডা. জগদীশ দত্ত, অধ্যাপক শাহজাহান কবীর অথবা এরকম অন্য দুএকজন। কথাবার্তা হতো সাহিত্যসংস্কৃতি সমাজরাজনীতি নিয়ে।

তিনি, খালেকদাদ চৌধুরী, ছিলেন নেত্রকোনা শহরের এবং গোটা মহকুমার সাহিত্যসংস্কৃতির প্রধান অভিভাবক। প্রতিভার রত্নসন্ধানী এবং তরুণ কবিলেখকদের উষ্ণ, উদার আশ্রয়। তাঁর প্রসারিত ডানার ছায়ায় নিবিড় পরিচর্যা পেয়েছেন এমন অনেক তরুণ পরে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছেন আমাদের সাহিত্যের বৃহত্তর অঙ্গনে। রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, নূরুল হক, শান্তিময় বিশ্বাস, মলয় ভৌমিক, হেলাল হাফিজ, প্রণব চৌধুরী, খালেদ মতিনএমনি আরো অনেকের আত্মপ্রকাশের জন্য তিনি উন্মুক্ত রেখেছিলেনউত্তর আকাশে পাতা।

যখন তাঁকে দেখেছি তখন তিনি এক দীর্ঘ, বিচিত্র, ঘটনাবহুল ইতিহাসের পথ পেরিয়ে এসে থিতু হয়েছেন নিজের শহর নেত্রকোনায়। এই সহজসরল, লাজুক মানুষটিকে দেখে কিছুতেই বোঝা যেত না যে, এত রোমাঞ্চকর ঘটনা উজ্জ্বল কীর্তি ছিল তাঁর জীবনে। 

১৯০৭ সালে নেত্রকোনার হাওর এলাকার এক গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলে যান কলকাতায়। কলকাতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল পিতা নওয়াব আলি চৌধুরীর এক ব্যতিক্রমী ব্যবসার সুবাদে। তিনি যুক্তপ্রদেশের দুই ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলে চীন, হংকং মধ্য এশিয়ায় উদবিড়ালের চামড়া রপ্তানি করতেন। পিতার বন্ধুদের আশ্রয়ে থেকেই খালেকদাদ চৌধুরী প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য কিছুদিন পরে পরিচিতদের টানে চলে যান রিপন কলেজে। আবারও কলেজ পরিবর্তন করে ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। পিতার আকস্মিক মৃত্যু নানারকম পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটে। 

১৯২৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কাজ করতে গিয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যানযে ঘটনার এক নতুন রূপ দেখা গিয়েছিল ১৯৫২ সালে। বাংলাভাষী উর্দুভাষী মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে নির্বাচনে দুটি ভাষাভিত্তিক প্যানেল হয় এবং তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে বাংলাভাষীদের প্যানেল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ভাষা আন্দোলনের অনেক আগেই বাংলা উর্দুর এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে তিনি ছিলেন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। উর্দুভাষী প্যানেলের যে সহসভাপতি পদপ্রার্থী পরাজিত হন, তিনি পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ব্যক্তিটি বগুড়ার মোহাম্মদ আলী।

পড়াশোনা, সাহিত্যচর্চা, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা সাংগঠনিক কাজকর্ম মিলিয়ে খালেকদাদ চৌধুরী এক তুমুল, টালমাটাল জীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী কবি বেনজীর আহমদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে একবার তিনি ব্রিটিশ সরকারের পুলিশের হাতে নাকাল হয়েছিলেন। খালেকদাদ চৌধুরীর নামলেখা ম্যাক্সিম গোর্কিরমাবইটি বেনজীর আহমদের ঘর থেকে পুলিশের হাতে পড়ায় এই বিপত্তি ঘটে। 

১৯৩১ সালেপরিশীলন সমিতিনামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক হন চৌধুরী। সে সংগঠনের সম্পাদক কে ছিলেন? আর কেউ নন, ‘বিদ্রোহীকবি কাজী নজরুল ইসলাম! এই সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ডলি আহমেদ বেটি আহমেদ নামে দুই মুসলিম কিশোরী নৃত্যগীত পরিবেশন করে। অবিভক্ত বাংলায় কোনো মঞ্চানুষ্ঠানে সেই প্রথম মুসলিম মেয়েদের অংশগ্রহণ। এতে কলকাতার মুসলিম সমাজের উর্দুভাষী প্রতিক্রিয়াশীল অংশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঘটনার সূত্রেই খালেকদাদ চৌধুরী কবি আবদুল কাদির কিছু ভাড়াটে গুণ্ডার হামলার শিকার হন। কিন্তু তাঁরা দমেননি। নিজের আত্মজীবনীশতাব্দীর দুই দিগন্তেখালেকদাদ চৌধুরী লিখেছেন, ‘এই সম্মেলনের মাধ্যমে সেদিন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মুসলিম মেয়েদের অংশগ্রহণ সাংস্কৃতিক জীবনে মুসলিম মহলে যে পথ প্রদর্শন করেছিল তাই পরবর্তীকালে মুসলিম নারীসমাজের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশের অনুপ্রেরণা যোগায়।

খালেকদাদ চৌধুরীবঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজে সহকারী সম্পাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিতদৈনিক কৃষকএবং কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিতদৈনিক নবযুগেসহকারী সম্পাদক ছিলেন।নবযুগে কিশোর বিভাগআগুনের ফুলকিপরিচালনা করতেন। কবি নজরুল অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তেতাল্লিশের মন্বন্তরের বীভৎসতা আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রচণ্ড অভিঘাত দেখে ১৯৪৪ সালে তিনি নেত্রকোনায় ফিরে আসেন।

তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে, ‘বিকাশনামে কলকাতার একটি পত্রিকায়। ত্রিশ চল্লিশের দশকে মাসিকমোহাম্মদী,’ ‘সওগাত অন্যান্য পত্রপত্রিকায় অনেক ছোটগল্প, প্রবন্ধ বিদেশী গল্পের অনুবাদ প্রকাশ করে সুসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তিরিশের দশকে বিশ্বসাহিত্য, বিশেষত রাশিয়া স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সাহিত্য নিয়ে প্রকাশিত তাঁর কিছু প্রবন্ধ বেশ সমাদৃত হয়। কারো কারো মতে, খালেকদাদ চৌধুরীর ওই লেখাগুলো বিশ্বসাহিত্যের প্রতি কবি নজরুলের মনোযোগ বাড়িয়ে দেয় এবং তিনিবর্তমান বিশ্বসাহিত্যনামে বিখ্যাত প্রবন্ধটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হন। অনুবাদেও খালেকদাদ চৌধুরীর কুশলতা ছিল। তাঁর অনূদিত মির্জা নাথানেরবাহারীস্তানগায়বীএকটি বড় মাপের কাজ।

নেত্রকোনায় ফিরে আসার পর তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে চাকুরি নেন এবং সেই সুবাদে দুর্গাপুরকলমাকান্দা এলাকায় তেভাগা টংক আন্দোলনের রক্তাক্ত দৃশ্যপটের প্রত্যক্ষদর্শী হন। আরো অনেক ঘটনাদুর্ঘটনা পেরিয়ে ষাটের দশকেউত্তর আকাশএবং সত্তরের দশকেসৃজনীপত্রিকা সম্পাদনা করেন। ইতিমধ্যে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি নিজে তাঁর পুত্ররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উত্তরাঞ্চলের বিখ্যাত মহিষখোলা শরণার্থী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের অন্যতম পরিচালক।

এক বিচিত্র কর্মিষ্ঠ জীবন নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনের আলোড়নের মধ্যেও তাঁর সৃজনশীলতায় কখনো ভাটা পড়েনি। তিনি অনবরত লিখে গেছেন। লিখে গেছেন ভাটির হাওর আর বনপাহাড়ের মানুষের জীবনের কথা। জল, অরণ্য এবং পাহাড়ের অন্তর থেকে উৎসারিত সব স্বপ্ন স্বপ্নভঙ্গের কথা। জলচর বেদে আর মৎস্যজীবী প্রান্তিক মানুষজনের বাঁচামরার কথা। কৃষকচৈতন্যের রূপরূপান্তরের কথা। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে চাঁদবেগ টিপু পাগলের মতো লোকনায়কদের বিদ্রোহ এবং স্বাধীন রাজ্য স্থাপনের কথা। ঔপনিবেশিক সরকারের ষড়যন্ত্র নিষ্ঠুরতা এবং বিশ্বাসঘাতকদের প্রতারণার মধ্য দিয়ে কী মর্মান্তিকভাবে সেসব জনপ্রতিরোধের অবসান হয়েছিল তার আখ্যান। 

শেষবার তাঁকে দেখেছিলাম ১৯৮০ সালে। সেবার তাঁর নেতৃত্বে নেত্রকোনায় একটি সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন হয়েছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি সম্মেলনের প্রধান অতিথি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন অগ্রজপ্রতিম অঞ্জন ভদ্র আমাকে। এর আগে ১৯৬৮ সালে তাঁর নেতৃত্বেই নেত্রকোনায় সপ্তাহব্যাপী এক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অন্যতম সংগঠক ছিলেন আমার পিতা খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম, যিনিউত্তর আকাশেনিয়মিত লিখতেন। আমার পিতামহ জালাল উদ্দীন খাঁর সঙ্গে খালেকদাদ চৌধুরীর গভীর হৃদ্যতা ছিল। পিতামহের বইজালালগীতিকা একটি খণ্ডের ভূমিকা লিখেছিলেন তিনি। আমার ব্যক্তিগত পারিবারিক স্মৃতির পাতায় তাঁর নামটি কৃতজ্ঞতার সোনালি রেখায় চিত্রিত। কিন্তু তাঁর কাজের গুরুত্ব তো ব্যক্তি পরিবারের স্মৃতির সীমা ছাড়িয়ে আরো বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত।

নিজের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় পদকপুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর নিজের নামেও একটি পুরস্কার চালু রয়েছে। এসবের মূল্য আছে অবশ্যই। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার অর্থবহ হয়ে উঠবে তখনই, যখন তাঁর স্বপ্ন এবং আরব্ধ কাজ পরিণতির দিকে যাবে। কৃষক সমাজের যে স্মৃতি, শ্রুতি, লুপ্ত ইতিহাস জীবনসত্য তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে খুঁজে ফিরছিলেন, সেই মানচিত্র যখন আরো স্বচ্ছ প্রসারিত হবে। যেসব কথা কাহিনি তিনি লিখে যেতে পারেননি, সেগুলো এখনো চাপা পড়ে আছে পূর্বময়মনসিংহের বিলীয়মান অরণ্য জলাভূমির নিচে। কে উদ্ধার করবে এইসব মাটিচাপা, লুপ্তপ্রায় কথাউপকথাকিংবদন্তি? আবার কবে আসবেন জলজঙ্গলের আরেকজন কথাকার? আবার কবে দেখা দেবেন সাহিত্যসংস্কৃতির এমন একজন সহৃদয় অভিভাবক?

১৯৮৫ সালে এই দিনে তাঁর জীবনাবসান হয়েছিল। তাঁর স্মৃতি উত্তরাধিকার আরো বিস্তৃত হোকএই কামনার উচ্চারণ দিয়েই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।

🔅🔅🔅🔅🔅

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কত রঙ্গের মানুষ | শেখ লুৎফর

Sat Oct 17 , 2020
কত রঙ্গের মানুষ | শেখ লুৎফর 🌱 উত্তরের বাড়ির বুড়ি বারান্দায় বসে একলা একলাই নানান জাতের প্যাচাল পারে। কেউ শুনেও শুনে না। এই যেমন,  ‘আসমানেতে লক্ষবাতি নাম তার তারা, মানুষের সংসারে এইযে মানুষ…  মানুষ আছ কারা কারা?’ বুড়ির ত কাম নাই। নিজের বুড়াটা গেছে সেই কবে। পেটের পুতেরাও এখন থুত্থুরা […]
Shares