কত রঙ্গের মানুষ | শেখ লুৎফর

কত রঙ্গের মানুষ | শেখ লুৎফর

🌱

উত্তরের বাড়ির বুড়ি বারান্দায় বসে একলা একলাই নানান জাতের প্যাচাল পারে। কেউ শুনেও শুনে না। এই যেমন, 

‘আসমানেতে লক্ষবাতি নাম তার তারা,

মানুষের সংসারে এইযে মানুষ… 

মানুষ আছ কারা কারা?’

বুড়ির ত কাম নাই। নিজের বুড়াটা গেছে সেই কবে। পেটের পুতেরাও এখন থুত্থুরা বুড়া। নাতি-নাতনীদেরও সংসার হয়েছে। বালবাচ্চা আছে, সুখ-দুঃখ আছে, সবচে বড় কথা তুঁষের আগুনের মতো অভাবের ঘুশঘুশানি আছে। তাই সব থেকেও বুড়ির কেউ নাই। ধরতে গেলে দুনিয়ার মতো প্রাচীন এই জীবনটাই এখন তার সবচে বড় বোঝা। তাই পাড়ার গলির লাগোয়া বারান্দায় বসে ঘোলা চোখে সামনের দুনিয়াটা ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সারাদিন দেখে। যতটা সামনে দেখে, পেছনে দেখে তারচে বেশি। আটানব্বই বছর ধরে টেনে টেনে বয়ে চলা জীবনটা এখন আর ভালো লাগে না বলেই কথায় কথায় খোদার কাছে মরবার বায়না ধরে।

সামনের পথ দিয়ে কে জানি দুমদুম হেঁটে যাচ্ছিল বুড়ি ডাক দেয়, ক্যাডা যায়?

দাদি আমি শামছুল। 

ব। অরে…পাঁডা। (পাঁঠা) দাদির কাছে ব। 

না দাদি কাওরাইদ যাইয়াম।

বুড়ি হাতের লাঠিটা সামনে বাড়িয়ে ধরে শামছুলের পথ আটকে দেয়। শামছুল একটা আজব মানুষ। এতযে গরিব তবু তার হাসিমুখ দেখলে একটুও মনে পড়ে না। তিনটা বিয়ে করে ছিল, একটা বউও টিকল না। একবার ঘর থেকে বেরুলে কখন ফিরবে, কবে ফিরবে কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। ঘরের ইঁদুর, তেলচুরা সব উপাস মরে, বউ নামক দ্বিপদী প্রাণীটা বাঁচে কী করে? তাই ক্ষিধার জ্বালা সইতে না পেরে একে একে শামছুলের তিনটা বউ পালিয়ে গেছে। দুনিয়ার হেন কোনো কাম নাই যা শামছুল করে নি। কিন্তু কোনোটাতেই সুবিধা করতে না পেরে এখন সে ফুলটাইম ভেগাবন।

নিরুপায় শামছুল বুড়ির পাশে বসে একটা বিড়ি ধরায়, কও দাদি কি কৈবা?

শামছুলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বুড়ি বলে, আমার দাঁতগুলা দ্যাখছা নাতি।

বহুবার দেখেছে তবু শামছুল আরেক নজর দেখে, একশ বছরের একটা জীবন চাবাইতে চাবাইতে দাদি তোমার দাঁতগুলান এক্কেবারে ক্ষইয়া (ক্ষয়) গ্যাছে!

নাতির কথা শুনে বুড়ি মনে মনে খুব তৃপ্তি পায়। ঠোঁটে ঝিলিক দেয় নিষ্পাপ হাসি। তাহলে তার দাঁতগুলা ভাত চিবাতে চিবাতে ক্ষয় হয়ে মাড়ির সাথে লেগে গেছে। আর কত! একশটা বছর সে এই দুনিয়াটা দেখেছে, চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়েছে। আজ বাঁকা পিঠটা সোজা করে কবরে ঘুমাতে বড় মন চায়। দুনিয়ার কোনো মানুষের সঙ্গ বুড়ির বেশিক্ষণ ভালো লাগে না, সব অবোঝ, সব অন্ধ। তাই বুড়ির কাছ থেকে শামছুলেরও সহজে ছুটি মিলে, কৈ জানি যাইবে যাহ্।

হ দাদি, দোয়া কৈর, আজকোয়া ছাত্রগর লগে মিছিলে যাইয়াম। আগরতলা মামলার বিরিুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল।

বুড়ি কান খাড়া করে, শেখ মুজিবুরের মিছিল?

হ।

কেউ তো আর গলা বাড়িয়ে এসে বুড়িকে জানায় না। চারপাশের হাবভাব আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো মানুষের গলার রবসব শুনে শুনে গত দশ বছরে বুড়ি শেখ মুজিবকে নিজের নাতির মতো ভালোবেসে ফেলেছে। তাই আগরতলা মামলায় তার ফাঁসি হয়ে যাবে এই আতঙ্কে বুড়ি গত মাসে দশটা রোজা রেখেছিল। রাতে উঠে তার সেহেরির জন্য কেউ কী আর রান্না করে দেয়? ডেক-ডেকচির তলায় পানি-পান্তা যা পড়ে থাকে তাই একমুঠ খেয়ে এক চুমুক পানি দিয়ে রোজাগুলা রেখে ছিল। মুজিবের জন্য বুড়ির চোখ ভিজে উঠলে সে আরেকটু শুনতে চায়, মিছিল কৈ ঢাহা, না গফরগাঁও কলেজে?

শামছুল বড় বড় পা ফেলে চলে যাচ্ছিল। তাই হাঁটার মাঝেই সে চেঁচায়, সারা দেশে।

শামছুলের বাপটা ছিল দিনমজুর। ম্যালেরিয়ায় ভোগতে ভোগতে অকালে মরে গেছিল। শামছুল না গেল গিরস্তের বাড়ি রাখালগিরি কামে, না ধরল সংসারের হাল। সে পাড়ায় পাড়ায় টো টো করে ঘুরে, মানুষের গাছতলার আম-জাম কুড়িয়ে খায়, আজিলফাজিলদের গপ্পো শুনে, দুনিয়ার রঙ-তামশা দেখে। শমছুলের মা অলসের শেষ। গিরস্তের বাড়ির কামে হাড়ভাঙা খাটুনি তাই সে বুড়ি হওয়ার আগেই ভিক্ষা করতে শুরু করে। গিরস্তের উঠানে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইলে বাড়ির বুড়িরা খেঁকিয়ে উঠে; আইলস্যা মাগী, কামের ডরে জোয়ান বয়সে ভিক্ষাৎ বারইছে, ভিক্ষা দিছ না।

এইসব কারণে শামছুলের মায়ের কপালে ভিক্ষা জুটে কম। বাড়ি বাড়ি হাঁটতে হাঁটতে দুপুরের দিকে যখন পেটের ক্ষিধায় আর চরণ চলে না তখন সামনে যা পায় শামছুলের মা তাই খায়। হয়তো কেউ পাক ঘরে বসে লাউ কাটছে, শামছুলের মা লাউয়ের খোসাটুকু ধোয়ে কাঁচাই কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। তাই দেখে বুড়িরা অবাক হয়, এইডা কি করছলো মাগী?

শামছুলের মা হেসে জানায়, চাচি আমি সব খাই।

এখন বেশিরভাগদিন সকালটা শামছুলের কাটে কাওরাইদ রেলস্টেশনে। এইসময় উত্তর-দক্ষিণ থেকে তিন-চারটা ট্রেন যাওয়া-আসা করে। স্টেশানে ছাত্রদের ভিড় থাকে। কলেজের ছাত্রদের সাথে শাছুলের সম্পর্কটা সবচে ভালো। তার কোমর সমান বয়েসী ছাত্রগুলার সাথে মিছিলে যায়, হোটেলে বসে রাজনীতির গপ্পোতে দিন কাটায়। দরকার মতো পাঁচ মাইল হেঁটে এক ছাত্র ভাইয়ের খবর নিয়ে আরেক ছাত্র ভাইয়ে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। পিছনে পিছনে হাঁটে, ভালো-মন্দ গপ্পো করে, ম্যাচটা, সিগারেটটা কিনে আনতে ছাত্ররা তাকে টংদোকানে পাঠায়। ট্রেন একটু লেইট করলে ছাত্ররা দল বেঁধে স্টেশানের পাশের স্টলে যায়, শামছুলও তাদের সাথে আলাপ করতে করতে সামনা সমানি বেে  বসে। ছেলেরা পোয়ারুটা, ডাল-ভাজির অর্ডার দিলে শামছুলের সামনেও একটা প্লেট আসে। ছাত্ররাই বিলটিল দেয়; সিগারেট কিনে। তখন শামছুলের কপালেও একটা রমনা সিগারেট জোটে। ট্রেন ছেড়ে দিলে সিগারেট টানতে টানতে শামছুল বাজারের দিকে চলে আসে। অষুদের, কাপড়েরর দোকানগুলা খোলতে শুরু করছে। এখন ঘান্টাখানেক সে খুব ব্যস্ত থাকবে। দোকানের সামনে দিয়ে যেতে দেখে রফিক ডাক্তার হয়তো নরম গলায় ডাক দিয়ে বলবে, দোকানটা একটু ঝাড়– দিয়ে দাও ত।

রফিক ডাক্তারের দোকান ঝাড়– দেওয়া শেষ হলে ওপাশের কাপড়ের দোকান থেকে বিপিন সাহা ডেকে বলবে, শামছুল আমার বাজারটা বাসায় দ্যায়া আওছা।

বাজার নিয়ে বাসায় গেলে কেউ কেউ গুড় দিয়ে চিড়া-মুড়ি খেতে দেয়; কপাল ভালো থাকলে গরম গরম ভাতও জোটে যায়।

ডাক দিলেই হাতের কাছে পাওয়া যায়। একটা কিছু করে দিতে বললে হাসি মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই শামছুলকে কেউ বেগার খাটায় না; দুই আনা-তিন আনা, মন ভালো থাকলে কেউ কেউ আস্ত একটা সিকিও দেয়। কিন্তু এই দুই-চার আনা পয়সায় শামছুলের না ভরে পেট, না ঢাকে পিঠ।

কাওরাইদ বাজারে কোনো মসজিদ নাই তাই বাজার কমিটি মসজিদের দালান তুলতে শুরু করেছে; অনেক টাকা দরকার। বিশ্বস্ত একজন মানুষকে দিয়ে স্টেশানে দাঁড়ানো ট্রেনে ট্রেনে আর বাজারের দোকানদার-খরিদদারদের কাছ থেকে চাঁদার পয়সা তুলতে চায়। যা উঠবে তার তিন ভাগের এক ভাগ তার; এই শর্তে বাজার কমিটি এই মহৎ দায়িত্ব শামছুলকেই দেয়। বাজার কমিটিই তালামারা একটা বাক্স দেয় আর একটা পুরান টুপি-পাঞ্জাবী দেয়। টুপিটা মাথায় দিয়ে, বেমানান পাঞ্জাবিটা পরে, তালামারা বাক্সটা উঁচিয়ে ধরে শামছুল ট্রেনের পাশে পাশে উটপাখির মতো হাঁটে : 

‘আল্লার ঘরে এক পৈসা দিলে গ ভাই,

পরকালে সত্তর পৈসা পাই।’

শামছুলের গলা ভালো, বলার ভঙ্গিটাও ভালো তাই লোকজনে এক পয়সা, দুই পয়সা কেউ কেউ পাঁচ পয়সা বাক্সে ফেলে।

এশার নামাজের পর মসজিদের ইমাম-মুতল্লির কাছে সব বুঝিয়ে দিয়ে, নিজেরটা বুঝে নিয়ে তবে মুক্তি। নিজের ভাগে কোনোদিন পড়ে এক টাকা, কোনোদিন বারো আনা! শামছুলের জন্য অনেক পয়সা। তবু মন ভরে না। দিনটা যে কীভাবে যায়, কীকষ্টে যায় শুধু সে-ই জানে। সে বুঝি কীএক জালে আটকে গেল! এইসব ভাবতে ভাবতে বুকটা খাঁ খাঁ করে। তাই হাঁটতে হাঁটতে ল ঘাটে চলে আসে। লে র খালাসিদের সাথে তার গোস্তে গোস্তে ভাব। তাই বিনা খরচে লে র ডেকে শুয়ে রাতে ঘুমাতে পাড়ে। সন্ধ্যাটা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেলে আশপাশের ছাত্ররা নিরালা ঘাটে বসে গাঙের হাওয়া খায়, বিড়ি-সিগারেট খায়। কেউ কেউ সিদ্দিও টানে। শেষ হয় হয় স্ট্রিকের মোথাটা এগিয়ে দিয়ে কেউ কেউ বলে, নেও শামছুল ভাই; এক টান খাও।

রাত একটু বাড়লে বাজারের বড় ব্যবসায়ী আর ঘাগু মাতাব্বরদের কেউ কেউ বোতল নিয়ে বসে। সেখানেও শামছুলকে দেখা যায়। তার দায়িত্ব হল পান-পানি, সিগারেট আর তপনের হোটেল থেকে খাসির ভুনা মাংস যোগান দেওয়া। এবং এইসব উজ্জ্বল প্রেরনায় এক সপ্তাহের মধ্যেই তালা না খুলে বাক্সের পয়সা উদ্ধারের পথ আবিষ্কার করে ফেলে শামছুল। এশার পরে সব বুঝিয়ে দিয়ে সে সোজা মদের দোকানে চলে আসে। তারপর ছ’আনা দিয়ে এক গ্লাস মেরে নদীর ঘাটে গিয়ে ঝিমধরে বসে থাকে।

পরের সপ্তাহেই শামছুলকে নিয়ে বাজার কমিটি বিচারে বসে; গ্যাছেকাইল কয় ট্যাহার মদ খাইছস, ক?

শামছুল নির্বিকার। এখানে যারা বিচারে বসেছে, কাল রাতেও তারা পাঁচজনে মিলে তিরিশ টাকার বোতল টেনেছে, তপনের হোটেলের ভুনা মুরগীর হাড় মড়মড় করে চিবিয়েছে। সব তার সমানেই। তাই সে ভয়-ডর না রেখেই বলে, ছয় আনার।

মসজিদের পয়সায় মদ কিনে খায় আবার স্বীকারও করে! এই নিয়ে সবাই হাসতে হাসতে মরে। তাই বিচারটিচার তেমন জমে না। শুধু বাজার কমিটির সভাপতি কিছু তর্জন-গর্জন করে বলে দেয়, কাইল থাইক্যা তুই আর আইছ না।

শামছুল আবার ফুলটাইম ভেগাবন। তাই ব্যস্ততা আগেরচে বহুগুন বেশি। সকাল সকাল পথে নামতে হয়। 

জংলার পৌখপাখালির মতো বুড়িও চিরকাল সকাল সকাল বারান্দায় এসে পাশে লাঠিটা রেখে, চিল-শকুনের মতো অনেক উপর থেকে দুনিয়াটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মশা-মাছির মতো সেই একইরকম ভনভনানি, ঘ্যানঘ্যানানি! বুড়ি সামনের দিকে লাঠিটা বাড়িয়ে দেয়, ক্যাডা যায়?

গরিব শামছুল! অধম শামছুল!

বুড়ি শিশুর মতো খিল খিল করে হাসে, অতদিনে বুচ্ছস?

সেই বিচারের পর থেকে শামছুল মনের কষ্টে ভোগছে। বিচারিদের রায়টা সে মেনে নিতে পারে নি। তাদের টাকা আছে তাই তারা রোজ রোজ শ’টাকার মদ খায়। আর তারাই শামছুলের ছ’আনার মদ খাওয়ার জন্য চেয়ারে বসে আসামীর প্রাণদ- ঘোষণা করে!

শামছুলের নীরবতায় বুড়ি আবার জিগায়, অতদিনে মর্ম পাইছস? 

হ দাদি এট্টু এট্টু।

দাদির সাথে সরল মনের শামছুলের একটু একটু করে অনেক দিনে একটা ভাব গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক মানুষের মতো শামছুলের মাঝেও একটা শিশু আছে। সংসারের ফের-ফাঁক্করে পড়ে অনেকেরটা মরে যায়। শামছুলের মরে নি। আর বুড়ি তো শিশুই। তাই শিশুর সাথে শিশুর ভাবের বলেই শামছুল দাদির পাশে বসতে বসতে নিচু গলায় বলে, মরছিদের পৈসায় ছয় আনার মদ খাইছলাম কৈয়া আমারে তারা দুষী করল!

ঠোঁটের দুই পাশ দিয়ে নেমে আসা পানের রস মুছতে মুছতে বুড়ি হেসে গড়িয়ে পড়ে, অবাক কতা! পৈসার মরছিদ-মন্দির কীরে পাঁডা? ব্যাডিমাইনশ্যের মতন যহন যার তহন তার।

শামছুল বিড়ি ধরায়। বুড়ি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে অনেক উপর থেকে দুনিয়াটা দেখে, অপ্রয়োজনীয় ভাবে বেঁচে থাকার অবসাদে, তিক্ততায় খোদার প্রতি সে মহাবিরক্ত। তাই শামছুলকে বলে, খুব ছোডু থাকতে একবার নাও দ্যায়া বাপের লগে মেলায় যাইতাছি। নাওয়ের সামনের দিকে পুরুষেরা। পিছনে ব্যাইট্ট্যাইন। এক সুন্দরী আধাবুড়ি আছিল এক্কেবারে পিছনে। পিছা গলইয়ে হালের মাঝিডা আছিন রসিক-বুড়া। মাঝি নাও বায় আর ব্যাডির লগে ঢংঢাং করে। তে ব্যাডির উডছে রাগ। হেলিগ্গ্যা মাঝিরে হুনায়া হুনায় কয় : 

আগের আল্লা নাই,

হক্কলের মরে বাপ,

আমার মরছে হাই। (স্বামী)

আগের আল্লা নাই।’

বুড়ি হাসে, শামছুলও হাসে। খুব হাসাহাসি চলে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে আবার হাঁটা দেয়। সেই রেলস্টেশান, দোকানদারদের ফুট-ফরমায়েশ। কয়দিন পরেই ঈদ তাই কাপড়ের দোকানগুলাতে ভিড়। কবিরদ্দি একা মানুষ। সে খরিদদারদের সাথে কথা বলবে না ভিড়ের দিকে চোখ রাখবে। তাই তার দোকান থেকে প্রতিদিন শাড়ি চুরি হয়। পরেরদিন সকালেই সে শামছুলকে চেপে ধরল, তরে ত আর কম চিনি না; বতুল-টতুল ছাড়। গদির হেই কোনাৎ বইয়া বইয়া কাস্টমারগর উপর চৌখ রাখবে। যদি চুরি বন্ধ অয় বেতন বিশ ট্যাহা, দুই বেলা ভাত।

মানুষে পাগল-ছাগল যাই বলুক তলে তলে দুনিয়াটা সে কম দেখে নি। তাই শামছুল আকাশ থেকে পড়ে না। নির্বিকার গলায় বলে, তিনদিন সময় দেইন আম্মার শরিল খারাপ।

বাড়িতে এসে শামছুল দেখে তার মা জ্বরে পুড়ছে; বুকে কফের ঘড়ঘড়ানি। শামছুলের ডাকে হাড় জিরজিরে মা চোখ খুলে না, খালি বিরবির করে কিসব বলে। শেষ রাতের দিকে ঘুমে শামছুল মায়ের পাশেই ঢলে পড়ে ছিল। বুড়ি উঠে বসে। জ্বরটর নাই। কফের ঘেড়ঘেড়ানিও কম। তাই বুড়ি শামছুলকে ডেকে তুলে, উড বাজান, আমার যাইবার টাইম অইছে।

শামছুল ধড়ফড়িয়ে উঠে। এই বড় বড় চোখ করে মা তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে ইশারা করে পানি চাইছে। এক চুমুকে এক গ্লাস পানি খেয়েই বুড়ি ঢলে পড়ে।

শামছুলের ডাকা-ডাকিতে ভোরেই দুই-চারজন এগিয়ে আসে। তারা বলাবলি করছে, শামছুইল্ল্যার মা মৈর‌্যা গ্যাছে।

বিশ-কুড়িজন গরিব-দরিব মানুষের উপস্থিতিতে সকাল সকাল শামছুলের মায়ের দাফন-কাফন হয়ে গেল। হুঁজুর ‘মাইয়াতে…মাইয়াতে করে মিনিটখানেকের মাঝে মোনাজাতটাও শেষ করে দিল। এই ঘটনা শামছুলকে খুব কষ্ট দেয়। টাকাওয়ালা মানুষের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হুঁজুররা নাক টেনে টেনে কত কাঁদে, কবরবাসী মানুষটার জন্য বেহেস্ত চেয়ে খোদার কাছে কত ইনাই-বিনাই আবেদন-নিবেদন পেশ করে।

শামছুলের মুখের সেই হাসি নাই। সে খালি মনে মনে যপে, ধনীরা মরলে অয় মরহুম আর গরিব মরলে হিয়াল-কুত্তা।  

গম্ভীর, টান টান গতরের শামছুলকে যদি কেউ জিগায়, তর মা নাকি মৈর‌্যা গ্যাছে?

শামছুল আর হাসে না; মুখবিষ করে বলে, গরিব ত মরে না ভাইয়ো, খালি চৌখ দুইডা বন্ধ কৈর‌্যা একটা টানা মারে।

সেই টুপি-পাঞ্জাবি আর নাই। সেটা সে ঘরের পিছনের পাগারে ফেলে দিয়েছে। আগের সেই সার্টটা পরেই শামছুল কাওরাইদ রওনা দেয়। কবিরদ্দির দোকানের চাকরিটা সে করবে। বারান্দা থেকে বুড়ি লাঠি তুলে, ক্যাডা যায়?

আমি।

শামছুল না?

হ।

ব।

শামছুল বুড়ির পাশে বসে। ত্যানা ত্যানা একটুকরা কাপড়পরা বুড়ি কচ্ছপের মতো হাড়ের পিঞ্জরের ভিতর থেকে দুনিয়াটা দেখে, মরবার সময় তর মা’র মুহে পানি দিছলে?

হ। টিনের গেলাস দ্যায়া আস্তা এক গেলাস পানি খায়া ঢইল্যা পড়ছিন।

কানের কাছে মুখ ন্যায়া কলিমা কৈছলে?

হ। জুরে জুরে অন্তত দশবার কৈছি।

অনেকক্ষণ বুড়ি আর কিচ্ছু বলে না। শামছুলও না। তারা দুই পৃথিবীর দুই বাসিন্দা হলেও মনের দিক থেকে মাঝে মাঝে এক দুনিয়ায় বিরাজ করে তাই তাদের কথা না কওয়াটাই অনেক কথা। লোভ-কাম-কুটিলতাহীন মুহূর্তগুলা দিয়ে তারা দুইজন পরস্পরের সঙ্গটুকু ভোগ করে। সুখ-দুঃখের জীবনটাকে ভাগাভাগি করে। 

আইলস্যা হইলেও তর মা’র মনডা ভালা আছিন। অনেক ভালা।

এই কথা বলে বুড়ি ছোট্ট একটা দম ফেলে। শামছুল নীরবে চোখ মুছে, আমি ত কোরআন-কালাম কিচ্ছু চিনি না, দাদি তুমি আম্মা’র লাগি দোয়া কৈর।

হ। করাম। ভাই তুমিও আমার লাইগ্গ্যা খাস দিলে দোয়া করবা, ঈমানে ঈমানে যেন খুব শিঘ্র মরতারি। অহন মরলে আর ভালা।

শামছুল উঠে পড়ে। তার মনে মরাটরার কথা বেশিক্ষণ টিকে না। মরার কথা শুনতেও ভালো লাগে না। কাওরাইদ হোটেলের গরম গরম ছানার ডাল আর পোয়ারুটির গন্ধ তার খুব প্রিয়। মাঝে মাঝে ছ’আনার এক গ্লাস মদে গোঁফ ভেজাতে কী অসম্ভব ভালো লাগে!

পথে দেখা হয় কুদরত সাহেবের সাথে। রেলের বড় কন্ট্রাকটর। শহরে বাসাটাসা আছে। প্যান্ট-সার্ট পরে, চামড়ার জুতায় মচ মচ শব্দ তুলে হাঁটে। শিক্ষিত মানুষের সাথে ইংরেজিতে আলাপ করে। বাড়িতে বুড়া মা-বাপ থাকে, আরস্তি-গিরস্তিও আছে। তাই মাঝে মাঝে এদিকে আসতে হয়। তার সাথে চামড়ার একটা ভারী ব্যাগও থাকে। শামছুল কতদিন নিজ থেকেই ব্যাগটা বয়ে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। শামছুলকে দেখেই কুদরত সাহেব দাঁড়িয়ে পড়ে, ভালো আছ?

শামছুল আর আগের মতো হাসে না। এই একমতো আছি, বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আজ আর বলে না, দ্যাইন ভাইয়ো, ব্যাগটা আমারে দ্যাইন।

তাই অস্বস্থি কাটাতে কুদরত সাহেব বলে, শুনলাম তোমার মা নাকি মারা গেছে?

বিষণœ-ভারী গলায় শামছুল বলে, জি, গতপরশু বাদ ফজর আমার আম্মা ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন। 

কুদরত সাহেব শামছুলের ভাষা শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, শামছুল হনহন করে কাওরাইদ বাজারের দিকে হাঁটছে।

সামনের বাঁকটা পেরিয়েই শামছুল সার্টের পকেট থেকে কুঁকড়া-মুকড়া একটা সিগারেট বের করে ধরায়। মাথার চুল, সার্টের কলার ঠিকঠাক করে সিগারেটে আরামছে দম দেয়। এই ধূলা-মাটির পচা সংসারটা এখন তার কাছে খুব স্বস্থির লাগছে, তকতকে তাজা লাগছে, নিজেকে একটু মানুষ! মানুষ! ভাবতে শামছুলের বড় ভালো লাগছে।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৪

Sun Oct 25 , 2020
নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৪ ৬ সন্ধ্যার দিকে বৈঠকখনায় যখন ওমরের আসার অপেক্ষায় ধলাবাবু অপেক্ষা করছে, তখন এলো মল্লিকপুরের রতন চক্রবর্তী । প্রায় সমবয়সী না হলেও তারা তুই তুকারি করে। রতন বয়সে বছর তিনেকের ছোট হবে। স্কুলজীবনে সে সে-রকমই নিচের ক্লাসে  পড়ত। স্কুলজীবন শেষে তারা যেমন ময়মনসিংহে […]
Shares