নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৪

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৪

সন্ধ্যার দিকে বৈঠকখনায় যখন ওমরের আসার অপেক্ষায় ধলাবাবু অপেক্ষা করছে, তখন এলো মল্লিকপুরের রতন চক্রবর্তী । প্রায় সমবয়সী না হলেও তারা তুই তুকারি করে। রতন বয়সে বছর তিনেকের ছোট হবে। স্কুলজীবনে সে সে-রকমই নিচের ক্লাসে  পড়ত। স্কুলজীবন শেষে তারা যেমন ময়মনসিংহে কলেজে পড়তে যায়। রতনও তাদের পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী অন্যান্যদের মত পড়তে যায় ঢাকায়। সেই কারণে ঢাকায় তাদের নিজস্ব বাসস্থানও ছিল শোনা যায়। তখন থেকেই তারা দেখা হলে পরস্পর নাম ধরেই ডাকে।  রতন চক্রবর্তী এতদঞ্চলের জমিদার হিসেবে খ্যাত, মাধব  চক্রবর্তীর ছেলে। যদিও এটাই তার একমাত্র পরিচয় নয়, সে একজন শিক্ষিত, সাহসী ও বলশালী মানুষ। শোনা যায় সে লাঠি খেলা বা ছোরা খেলাতেও নাকি পারদর্শী। বাংলার চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একজন অন্তিম  প্রজন্ম  সে । বাংলার অতিপ্রান্তিক অঞ্চল বলে হয়তো ইংরেজ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে নি। লোকশ্রুতি আছে যে, ডাকাত দলের লোকেরাও তাকে ভয় করে রীতিমত এইটা জেনে যে, রতন চক্রবর্তীর সঙ্গে পিস্তল থাকে।    

সেই সন্ধ্যায় রতন চক্রবর্তী খুব খোলা মনে ধলাবাবুর বৈঠকখনায় এসে বসল।  বসে বলল—কীরে ধলা, হুনলাম ছিডের ভিডায় নাহি মমিন মিয়ার লোকেরা গোলমাল করতাছে—তুই জানছ না

, জানি—

তরার ঘরের কামলারারে নাহি মাইরধর করছে

খালি হ হ করতাছস—খুইল্যা ক হুনি

—-ব-না—কইয়ামনে —অত হরবরের কিতা—ব—তামুক খাইবে

কই তামুক

ধলাবাবু বংশীর উদ্দেশ্যে হাঁক দিলেন। 

কিছুক্ষণ পরে ওমর যখন ঢুকলো তখন রতন মনের সুখে ডাবা হুকোয় তামাক টানছে। ওমর রতনকে দেখে অবাক হয়ে জড়িয়ে ধরলো।—আরে রতনবাবু যে–কদ্দিন পর—আছিলা কুনহানে—- 

ওমরের সঙ্গে রতনের প্রতিবেশী গ্রামের সম্পর্কের বাইরে আর একটা সম্পর্ক হলো যে তারা উভয়েই ছিল এই অঞ্চলের খুব নামকরা  খালি পায়ের ফুটবলার। এক দলেই খেলত। এতদঞ্চলে বর্ষাকালে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরাট উত্তেজনার ব্যাপার ছিল। অতঃপর কালে কালে তারা বড় হয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়াতে বোধহয় বহুকাল দেখা হয় নাই।

যাই হোক ওমরকে ডেকে পাঠানোর উদ্দেশ্যটা ছিল ছিডের ভিডার ব্যাপারটা নিয়ে ওমরের সঙ্গে পরামর্শ করা। এদিকে রতন ঘরে ঢুকেই সেই ছিডের ভিডা নিয়ে কথা তুলে বসে আছে। ধলাবাবুর চিন্তা যে তিনজনের মধ্যে আলোচনাটা কীভাবে তোলা যায়। শুধু ওমরের সঙ্গে আলোচনা করলে অনেক খুটিনাটি, অনেক খোলামেলা আলোচনা করা যেত। কিন্তু রতনের সঙ্গে আলোচনা বেশি  না করে বরং তার মতামতটা নেয়া যাক।

ধলাবাবু এ পর্যন্ত ছিডের ভিডা নিয়ে যা যা ঘটেছে বা হয়েছে তা বিস্তারিত ভাবেই উপস্থিত দুই জনের সামনে রাখল। রেখে সে প্রথমেই রতনকে জিজ্ঞেস করল—- তাইলে রতন অহন ক এইডা লইয়া কিতা করন—

তুই তো ধলা অনেক কিছুই করছস—তয় আসল কামডা করছ নাই—

আসল কামডা কিতা

আসল কামডা অইল যে—আর যদি কেউ ওরার ঘর বাড়িত হামলা করে তাইলে কাউরে ছাড়ান দিতাম না—বাড়াবাড়ি করলে কুলবাইড়ার কাউরে গ্রামের বাইরে আওনের দিতাম না—এই কথাডা মমিন মিয়ারে কইয়া আওনের দরকার আছিল। 

ধলাবাবু রতনের কথায় কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো—এই সময় কি এই ধরণের কথা কওন ঠিক অইত?

আরে এই সময় আর ওই সময় না—হঠাৎ দেশটা ভাগ অইছে বইলা কি এই দিগের হিন্দুরা অপরাধী হইয়া গেল—আরে দেশটা ভাগ করছে কয়ডা লোক মিল্যা—কয়ডা অইব—ধর পঞ্চাশটা এই দিগের আর পঞ্চাশটা ওই দিগের—এইডাতো ক্ষমতার চেয়ারডাত কে কার আগে বইব তার কিচ্ছা—

তর মনো নাই গেল বছর যখন ক্যাবিনেট মিশনডা আইল— নেতারার কেমত ফাল ফারন— আইজ এইডা মানি, কাইল ওইডা মানি  না—জিন্নাসাবে অনেক কষ্ট কইরা তাঁর লোকেরারে মানাইল ত নেহেরুসাব ঝাইড়া কাশলেন না—হেষে ত তারার ওয়ার্কিং কমিটিতে দেশভাগডা মাইনাই লইল—

আমার মাথাত একটা কথা ঢুকল না যে—হেরা শিক্ষিত মানুষ অইয়া এইডা ভাবলনা ক্যান যে, যে দেশডাত হাজার বছর ধইরা হিন্দু মুসলমানরা এক লগে থাকতাছে—ভালবাসতাছে, কাইজ্যা করতাছে আবার মারামারি খুনাখুনিও করতাছে—কিন্তু দেশটারে ভাগ করনের কথা আগে কেউ কয় নাই—অহন মুসলিম লীগ চাইল আর বেকটি মিল্যা মাইন্যা লইল—কী কারণ—না, দেশটা নাহি দাঙ্গায় শেষ অইয়া যাইব—আরে হালারা একটা দলের কয়ডা লোক—তরার বেকটিরে ঘোল খাওয়াইল—আরে তরা দেশপ্রেমিকের দল দাঙ্গারে ভয় পাছ—এক গান্ধীজি ছাড়াত আর কোনো বাপের বেডারে  দেখলাম না যে, দাঙ্গার মইধ্যে নোয়াখালিতে আইয়া থাকতে  লইছে—বাকি নেতার পুতেরা তহন আছিল কই—  

একটা নেতা বুক চেতাইয়া খাড়োইল না—

একটা নেতাও একবার ভাবলো না যে পাকিস্তানের অংশটাতেও হিন্দুরা আছে   আর হিন্দুস্তানের অংশডাতেও মুসলমান আছে—তারার কী অইব—তারা কই যাইব—কিবায় যাইব—দেশ ছাড়ন—ভিটা ছাড়ন কি একটা কথা অইল—তাইলে আর দেশকিতা—দেশ ছাড়া মানুষ তো বর্বর, জংলি, যাযাবর—

এইডারে কয় জনগনের উফরে বইয়া ডাকাতি—

তরার দল একটা কথা  কইছিল —ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়‘ —কিন্তু এই ঝুটাটা হুনি দেশটারে টুকরা করনের বিরুদ্ধে কয় নাই—এইডা তারা কিয়ের লাইগ্যা কইছে হেইডা তারাও ঠিক মত জানে কিনা আমার সন্দেহ আছে—-

ধলাবাবু আর ওমর অনেকক্ষণ অবাক হয়ে শুনছিল রতনের বয়ান।

একসময় ধলাবাবু রতনকে থামিয়ে দিয়ে বলল—তর কথা ঠিক—তয় এই কথা লইয়া আমরা আরেকদিন বইয়ামনে—আইজ আমরা ছিডের ভিডা লইয়া কথা কই—

হ হ ঠিকই কইছস—রাগের মাথায় কইলাম এইসব কথা—আর কারেই বা কওন যায় দুঃখের কথা—যাউক, ছিডের ভিডা লইয়া কী করতে চাছ ক—

ভাইরে তোর কথা মানি, কিন্তু যে মানুষগুলার উপর হামলা অইল তারার কথাতো ভাবন লাগে—মারামারি কইরা কি হেরা আর অইহানে থাকতে পারব—

—-বুঝজি তুই পারতে না—ঠিক আছে—এইডা আমার উফরে ছাইড়া দে দেহি কি করতাম পারি—

 

ওমর এতক্ষণ চুপচাপ বসে শুনছিল। এইবার সে রতনকে বললো—রতন—ওইডা তর উফরেই থাকল—তয় তুইন দুইডা দিন দেরি কইরা যা করার কর—এই দুই দিনের মইধ্যে আমরা একটা সভা করতাম চাই—সভা কইরা দেখতাম চাই যে অত্র অঞ্চলের মানুষজনের মনের ভাবডা কেমন। শক্তি প্রয়োগ দরকার অইলে অবশ্যই করন লাগব— অন্যায় ত মাইন্যা লওন যায় না—তয় আগে খানিক দেইখ্যা লওন আর কি— 

ওমরের কথা শুনে ধলাবাবু ও রতন ওমরের দিকে চেয়ে রইল। শান্তশিষ্ট ওমর তাহলে মনে মনে যথেষ্টই ভেবেছে। এই সময় ওমরের কথাটা ভাবার মত।

এরপর আসন্ন মিটিং, যা স্থানীয় স্কুলমাঠে হওয়ার কথা—তা নিয়ে তারা কিছুক্ষণ আলোচনা করে যে যার বাড়ির দিকে চলে গেল।

 

বিগত প্রায় বছর পাঁচেক ধরে  দৈনিক বাংলা ইংরাজি খবরের কাগজ  ও কয়েকটি সাময়িক পত্র ও মাঝে মাঝে এক দুটো বইয়ের মোটাসোটা বান্ডিল সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ধলাবাবুর বাড়ির ঠিকানায় বংকু পিয়ন  দিয়ে যায় । স্বাধীনতা ঘোষণার দশদিনের মাথায় দেখা গেল পত্রপত্রিকার একটা ডাক মাত্র এসেছে। অন্যান্য চিঠিপত্র নিয়ে বংকু পিয়ন এলেও খবরের কাগজের ডাক বা বই আর আসছে না। কী ব্যাপার?

একদিন ওমর ধলার কাছে এসে তারও একই সমস্যার কথা বলল।

একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে না যে ডাক ব্যবস্থায় কিছু অন্যথা ঘটতে শুরু হয়েছে।

এরমধ্যে লোকমুখে অনেক খারাপ খবর। কোনো কোনো জায়গায় আবার দাঙ্গা । দলে দলে মানুষ ভিটা ছাড়ছে, ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে—পাঞ্জাবের দিকে খবর ভয়াবহ—

 

মিটিং এর জন্য দুই তিন দিন উদায়াস্ত পরিশ্রম করেছে মূলত ওমর। ধলাবাবু স্কুলের মাঠের বন্দোবস্তটা করেছে। বক্তা হিসেবে এই সময় কাউকে রাজি করানোটাই ছিল মুশকিলের। তবু মান্যগণ্য নাগরিক দুজন ও একজন মুসলিম লিগের নেতা পাওয়া গেল।

মিটিং এর দিন দেখা গেল গোটা পঞ্চাশ ষাটজন শ্রোতা । হিন্দু মুসলমান মেশানো। কুলবাইড়ার লোকজন আছে। তবে মমিন মিয়া আসেন নি।

মিটিং এর শুরুতে প্রথমে ওমর একটি ছোট ভাষণের মাধ্যমে মিটিং এর উদ্দেশ্য বর্ণনা ও সভাপতি হিসেবে প্রবীন শিক্ষক কুতুবুদ্দিন বিশ্বাসের নাম প্রস্তাব করলো। সমর্থণ করলো ধলাবাবু।

এতদঞ্চলে বিশেষ করে এই স্কুলের মাঠে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মিটিং আগেও হয়েছে। কোনোদিন কংগ্রেস, কোনোদিন মুসলিম লিগ বা কোনোদিন কমিউনিস্ট পার্টির । মানুষজনের উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল। কিন্তু গত ১৪ আগস্টের পর থেকে আর কোনো মিটিং হয় নি। এটাই স্বাধীনতার পর প্রথম মিটিং। প্রথম বক্তাঃ ধলা মজুমদার ওরফে ধলাবাবু। 

ধলাবাবু তার বক্তব্যে একটা উক্তিকে বার বার উল্লেখ করে বক্তব্য রেখে গেলেন। সেটা হল  ভারতবর্ষের দুটি পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে  পাকিস্তান  স্বাধীনতা লাভ করলো। আর স্বাধীনতা লাভের পূর্ব মুহূর্তে কায়দে আজম মহম্মদ আলী জিন্নাহ—পাকিস্তানের গণপরিষদে দেয়া ঐ ভাষণে বলেছিলেন, “পাকিস্তানে জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ৷ ধর্মীয় অর্থে একজন হিন্দু বা মুসলিম হতে পারেন, তবে রাজনৈতিক অর্থে সকলেই পাকিস্তানের নাগরিক৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আজ এর অন্যথা দেখা যাচ্ছে—-

ধলাবাবুর বক্তব্যের সময় মুসলিম লীগ নেতা ঘাড় ঘুরিয়ে ধলা  মজুমদারকে দেখছিলেন বার বার। পরবর্তী বক্তা হিসেবে তিনি যখন বলতে ওঠেন তখন তিনি তাঁর পূর্ববর্তী বক্তার বক্তব্যের প্রশংসা করলেন। কিন্ত পাকিস্তান গঠনের প্রশ্নে চিরাচরিত হিন্দু বিদ্বেষকেই  প্রাধান্য দিলেন । বর্তমান এই মিটিং এর বিষয়ে বলতে গিয়ে একথা বললেন যে, আমাদের এখন এই সব ছোটখাট বিষয় নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করার মত সময় নাই। আমাদের এখন নতুন দেশ গঠনের সময়। স্বাধীনতার পর এই পূর্ববাংলায় হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে বা তাদেরকে ভিটামাটির থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে যে সকল খবর শোনা যাচ্ছে তার বেশির ভাগই আসলে অপপ্রচার। তবে হ্যাঁ আমাদের এই অঞ্চল আজীবন শান্তিপূর্ণ অঞ্চল বলেই জানি। এখানে আমরা হিন্দু ভাইদের সঙ্গে মিলেমিশেই থাকি এবং থাকবও। কেউ কোনোরকম অপ্রীতিকর কিছু করবেন না বলেই আমি বিশ্বাস রাখি—।  

 

মিটিং মোটামুটি সফল।

রাতে বাড়ি ফিরে ধলাবাবু লিখলেন—

আগুন নিয়ে অনেক খেলেছি আমরা। ১৯৪৬ থেকে শুরু করেছি এই খেলা। তারপর থেকে—

আর তার ফল হিসেবে পেয়েছি ভারতীয় জাতিপুঞ্জের মধ্যে বাঙালি, বলা ভালো বাঙালি হিন্দুবা আরো বলা ভালো বাঙালি উদ্বাস্তু হিন্দু নামক একটি অভিশপ্ত জাতিখণ্ড। তার ভাগ্যবিপর্যয়ের সেই শুরু, ১৬ই আগস্ট ১৯৪৬ এর Direct Action Day তথা The Great Calcutta Killings ও ১০ই অক্টোবর ১৯৪৬ এর নোয়াখালী রায়ট দিয়ে।

তবে একটা ধন্দ আজও কাটলো না। তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতা জিন্না সাহেবের  ভারত জুড়ে ডাকা Direct Action Day শুধু কলকাতায় এতো বীভৎসভাবে পালিত হয়েছিলো কেন। যাই হোক, এর অনতিপূর্বে ভারতভূমিতে পোঁতা দেশভাগের বীজ সে-দিনই বুঝি সূর্যের মুখ দেখেছিলো।

এটুকু লেখার পর পৃষ্টা উলটে আবার লিখলেন—

নদীর পাড়ে ঘর যার, দুঃখ তার বারোমাস ।

আমরা এক নদীর পাড়েই বাস করি। পাড় ভাঙার শব্দ শুনি। কিন্তু কীভাবে পাড় ভাঙে তা জানি না। আমরা জলের দিকে সেইভাবে তাকাই না। যে ভাবে তাকালে জলের স্বভাব বোঝা যায় সেই ভাবে তাকাই না। আমরা জলের মাথা দেখি, জলের হৃদয় দেখি না। আমরা জলের উল্লাস দেখি, জলের ক্রন্দন দেখি না। 

 

উর্বর মস্তিষ্কের বাংলার রাজনীতিক। মাত্র মাস ছয়  সাত আগেই কলকাতা ও নোয়াখালিতে দুটো ভয়াবহ দাঙ্গা হয়ে গেল হিন্দু  মুসলমানে। উদ্দেশ্য ছিল দ্বিজাতিতত্বকে প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশভাগকে অনিবার্য করা। তাতে তারা সফলও হয়েছে। দেশভাগের জন্য ভয়াবহ সেই দাঙ্গা দুটো হল বাংলায়ই। এরপর সেই দাঙ্গার রক্ত শুকনোর আগেই বাংলার মুসলিমলীগের কজন নেতার ও কংগ্রেসের কজন উদারপন্থী নেতার হঠাৎ বাংলাভাগ আটকানোর জন্য স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব আনা ও ব্যর্থ হওয়া। তারা কি কেউ মানুষকে  মানুষ হিসেবে ভেবেছিলেন? দাঙ্গায় যে মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেগুলোকে কি ছেলেখেলা ভেবেছিলেন? এদের কেউ জিন্না সাহেবের তল্পি বইছেন, কেউ দিল্লির কংগ্রেসের তল্পি বইছেন। এরা এই দুই দলেরই ক্ষমতার পিঠে ভাগাভাগির সহযোগী ছিলেন। আজ হঠাৎ কেন স্বাধীন বাংলা !! আজ  কে কাকে বিশ্বাস করে? হাজার বছরের পারস্পরিক বিশ্বাস যখন রক্তাক্ত হয়ে শুকিয়ে কালো রঙ ধারণ করেছে, তখন এই স্বাধীন বাংলা!! কেন এই স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব এই ভাতৃঘাতী দাঙ্গার আগে আসেনি? কেন বাঙালি হিসেবে বাঙলার কথাগুলো আগে বলা হয় নি? কেন জিন্নাহ্‌র ডাইরেক্ট একশন ডের বিরোধীতা আগে করা হয়নি? কেন নোয়াখালির দাঙ্গায় মিলিটারি নামানো হয়নি? করা হয়নি কারণ তারা জানতেন, তখনও জানতেন দেশভাগ হলে বাংলা পুরোটাই  পাকিস্তানে যাবে। কিন্তু মাঝখানে  যখন শ্যামাপ্রসাদ দেশভাগ হলে বাংলাও ভাগ করতে হবেবলে বড়লাটকে চিঠি লেখেন—তখন দ্বিজাতিওলাদের আম ছালা দুটোই যাওয়ার উপক্রম। এখানে আম হলো কলকাতা আর ছালা হলো গোটা বাঙলা ।

ইতিহাস একদিনই ঠিকই দেখবে যে বাঙালির নাম করে বাঙালির পিঠে দুই ধর্মের ছুরি বাঙালিই কীভাবে মেরেছিল। রাজনীতির ভুল ইতিহাস ক্ষমা করে না।

 

এই মিটিং এর কদিন পর রতন চক্রবর্তী একদিন সকালে মমিন মিয়ার বৈঠকখানায় হাজির। মমিন মিয়া রতন চক্রবর্তীকে দেখে খুবই  অবাক হলেন। নিজে উঠে এসে তাকে আপ্যায়ন করে ঘরে নিয়ে গিয়ে  চেয়ারে বসালেন। এতদঞ্চলে রতন চক্রবর্তীর কারো বাড়ি যাওয়ার অর্থ বিশেষ কিছু। এই খবর আশে পাশেও ছড়িয়ে যায়। ফলে বৈঠখানার বারান্দায় ভিড় জমে যায়। কুলবাইড়া গ্রামের সঙ্গে রতন চক্রবর্তীদের সম্পর্ক তার বাবার আমল থেকে। এই গ্রামের মানুষেরা তাই প্রায় সকলেই রতন চক্রবর্তীকে ভাল মতন চেনে । গত দশ বিশ বছর যাবত মমিন মিয়া বেশ কিছু পয়সাকড়ি  করেছে। সেই সূত্রে এই মুসলমান প্রধান গ্রামটির মাতব্বর হিসেবে এখন তাকে মান্য করা হয়। তার আগে মমিন মিয়া এই গ্রামের অন্যদের মত রতন চক্রবর্তীদের বিশেষ ধরনের খাতক ছিলেন। 

আজকের এই কুলবাইড়া বলতে গেলে রতন চক্রবর্তীর বাবা মাধব চক্রবর্তীর হাত তৈরি। এই গ্রামের লোকেদের মূল পেশা ছিল ডাকাতি। কিন্তু ব্রিটিশ  আমলের  পুলিশের দাপটে এদের একসময় হয় জেলের ভাত, অন্যথায় বৌ বালবাচ্চা সমেত না খেয়ে মরার জোগাড়—এই ছিল পরিস্থিতি। মাধব চক্রবর্তী জমিদার মানুষ হলেও তখনকার দিনে তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছিল অতুলনীয়। তিনি এই গ্রামের দুই চারজনকে প্রস্তাব দিলেন যে— ডাকাতি ছাড়—আমি তরারে গাই গরু কিনে দেব—তরা ওইগুলারে পালবি—দুধ অইলে দুধ বেচবি—কারোর হালের বলদ লাগলে ভাড়া দিবি—বা নিজেরা হাল দিবি—কিন্তু একটাও বেচন যাইত  না। কোনডা মইরা গেলে গেল। মাসে মাসে গরুর  হিসাব দেওন লাগব। আরেকটা কথা বছরে একটা ষাঁড় তরা কুলবাইড়া গ্রামের ঈদের জন্য পাইবে। এ ছাড়া সময় অইলে আমি গরু বেচবাম—দামের  তিনভাগ হইব—দুই ভাগ  আমার—একভাগ তরার—রাজি থাকলে ক—-ডাকাতি কইরা যে আর বাঁচন যাইত না —হ্যাত বুঝতেই পারতাছস— 

 

সেই কুলবাইড়া পরিশ্রম করে এই গরু পালন করেই দাঁড়িয়ে গেল। এখন আর ডাকাতি তারা তেমন করে না। মাঝে মধ্যে পুরনো  পেশার টানে এক আধটা করে ফেলে।

এদিকে ধীরে ধীরে দুধের  ব্যবসাটা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। গঞ্জের পাইকারদের ভীড় থাকে সবসময়। মমিন মিয়া এদের মধ্যে চালাক ও পরিশ্রমী মানুষ। সে ধীরে ধীরে এই গরুপালনের টাকায় জমি জোতও কিনেছে । এখন সে বৃদ্ধ। গ্রামের মান্যগন্য একজন। তাঁর ছেলেরা এখন জমি ও গরু পালনের কাজ কারবার দেখে। 

 

এই সময় মমিন মিয়ার বেশ উচ্চাশাসম্প্রতি তিনি অত্র অঞ্চলের লীগের লিডার হয়েছেন। কুলবাইড়া সংলগ্ন ছিটের ভিটাটা আসলে   খাল ঘেঁষা একটা ছোট্ট গ্রাম। এটা গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা না। গোটা পনের বিশ পরিবারের বাস মাত্র। সকলে নিম্নবর্ণের  হিন্দু। জেলে মাঝি কৃষিশ্রমিক ইত্যাদি শ্রেণীর শ্রমজীবী। ফলে ভিটাটার একটা হিন্দু গ্রাম হিসেবে পরিচিতি আছে। বাড়ির জমিটুকু  ছাড়া এই গ্রামের কারোরই কোনো জমি নেই। মমিন মিয়ার এই ভিটাটার প্রতি লোভ অনেকদিনের । এইবার একটা সুযোগ এসেছে। মানুষগুলো গরীব হিন্দু হওয়াতে এবং সদ্য দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে দেশটা ভাগ হওয়াতে মমিন মিয়া মনে আশার সঞ্চার হয়েছে।

 

রতন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনা খুব সংক্ষিপ্তই হলো। সেই অর্থে মমিন মিয়ার সঙ্গে তার আলোচনার সম্পর্ক নয়। বরং তিনি কিছু নির্দেশ দিলেন যে, যে ঘরগুলো  নষ্ট হয়েছে সে গুলো মেরামত করে দিতে হবে । বাঁশ কাঠ যা লাগে আমার ওখান থেকে নিয়ে আসবে। কেউ কোথাও যাবে না। দেশটা হিন্দু মুসলমান উভয়েরই। —এতবছর পাশাপাশি আছ সকলে—মিল-মহব্বত রাহন লাগব। —আফনে মিয়া মুরুব্বী মানুষ—‌আফনে থাকতে এইতা হওন ভালা না। 

 

রতন চক্রবর্তী চলে যাওয়ার পর তার বয়ান নিয়ে মমিন মিয়ার বাড়ির সামনে জমা ভিড়ের মধ্যে একপ্রস্ত বাদানুবাদ হল। মমিন মিয়া লীগের নেতা না রতন চক্রবর্তীদের এককালের খাতক— এ-সব ভুলে গিয়ে সে সকলকে হাতজোড় করে স্থানত্যাগ করতে অনুরোধ করলো। দলবল চলে যেতে যেতে বলতে লাগল যে—এই মিয়া রতন চক্রবর্তীর হমকে ঠান্ডা মাইরা যায়—হ্যারে দিয়া কিচ্ছু অইব না—যা করন আমরারই করন লাগব—    

 

ইশকুল মাঠের সেই মিটিং এর পর ওমরের সঙ্গে আজই দেখা। এর মধ্যে প্রায় দুমাস সময় পার হয়ে গেল। ওমর তার স্কুল নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ব্যস্ত ছিল তার নববিবাহিত জীবন নিয়েও। বিয়ের পর প্রাণের বন্ধু ধলাবাবুর সঙ্গে তার আর তেমন কথা হয় নি। এরমধ্যে ঘটে গেছে ছিটের ভিটা, স্কুল মাঠের মিটিং ও আরো নানা ঘটনা যা নিয়ে তাদের তেমন আলোচনা হয়নি। আজ সন্ধ্যাবেলায় বৈঠকখনায় আবার তারা মিলিত হয়েছে। ওমরকে দেখে ধলাবাবু হাসি মুখে আপ্যায়ন করল—কী মিয়াভাই প্রেমের দিনকাল কেমন কাটতাছে—ভাবীর লগে ভাবসাব কেমন হইতাছে—

অইতাছে ভাই—সবই অইতাছে—আমার কপাল—বিয়েডা এমন সময় করলাম যে মনডাত ভালা থাকে না রে ভাই—বউরেত আর এত সব কওন যায় না—তাই মনডারে দুই ফালা কইরালাইছি—তার একটা ফালা দিয়া বউয়ের লগে প্রেম মহব্বত, আর একটা ফালা দিয়া মনে মনে দেশোদ্ধার করি—-তো দোস্ত তুইন কেমন আছস ক—নে একটা সিগ্রেট খা—

হাতে সিগারেটটা নিয়ে ধলাবাবু মাথা নিচু কইরা কিছু ভাবল

ঠিকই কইছস—মন আমারও ফালা ফালা করা—মাথার উফরে বাপ নাই—সংসার বিষয় আশয় নিয়া মহা ঝামেলাতেই আছি আর কি–

ক্যান ছিডের ভিডার ঝামেলা মিটছেত– নাহি–

হ তা মিটছে—তা তুইন কি দেশের খবরাখবর কিছু পাইতাছস

না তেমন না

যে দাঙ্গার ভয়ে নেতারা দেশভাগটা মাইনা লইল—সেই দাঙ্গার তো কিছু কম দেখি না—পাঞ্জাবের কথা কই আর কি—হেই ঢেউ দেহাদেহি এদিকে আইতে কতক্ষণ—

, সংকট কাটে নাই—খবরত পাই—গত কয়দিনে কিছু খবরের কাগজ পাইলাম—দেশের খবর মোটে ভালা না—তয় দোস্ত একটা কথা ভাবতাছি যে আমরার এই অঞ্চলডা নিয়া কিছু করন যায় কিনা হেইডা ভাবা দরকার—তর কি মত— 

 

ধলাবাবু এরমধ্যে তার নোট খাতায় এই রকম লিখেছিলেন—–

কথা হলো যে, স্বাধীনতা লাভ হলো ধর্মের নামে দেশ ভাগ করে।  কিন্তু ঠিকমত ভাবলে দেখা যাবে যে এর মধ্যে একটা বড় ফাঁকি ধরা পড়ে। মুসলমানের জন্য একটা আলাদা দেশ চাওয়া হয়েছিল এবং তা পাওয়াও গেছে। কিন্তু সেটা কি সব মুসলমানের জন্য? পাকিস্তান তৈরির পর ভারতের বাকি অংশে যে বিপুল পরিমান মুসলমান থেকে গেল, তাদের দেশ তাহলে কোনটা? বা পাকিস্তান  অংশে যে হিন্দু রয়ে গেল, তাদের দেশ তাহলে কোনটা? এই  ভাগাভাগির দ্বারা কি একটা অশেষ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হলো না?

যাই হোক, যেটাই করা হোক না কেন—তার কোনোটাই দেশের  আপামর মানুষের সম্মতি বা ইচ্ছায় করা হয় নি। কারণ, সাধারণ  ভাবে দেখতে গেলে এর দ্বারা তো কারোর কোনো লাভ হয় নি। হ্যাঁ লাভের প্রশ্ন যখন উঠলো তখন বলা যায় যে, লাভ বা লোভের একটা  গোপন হাতছানি বোধ হয় তৈরি করা হয়েছিল  সম্পত্তি দেখিয়ে। সাধারণ ভাবে এইটা দেখানো হয়েছিল যে, হিন্দু মালিকানার এই  বিশাল সম্পত্তি একভাবে না একভাবে আত্মসাৎ করা যেতে পারে। ধর্ম এখানে উছিলা মাত্র। উছিলা এই জন্য যে হাজার বছর ধরে এই দুই ধর্ম পাশাপাশি থাকতে পারছিল। সেখানে সম্পদের বৈষম্য নিয়ে রাজনীতিও ছিল। কিন্তু কখনো সেই রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের নিদর্শন এর আগে দেখা যায় নি। এবার দেখা যাচ্ছে। যদি ধরাও যায় যে, পূর্ব বাংলার অধিকাংশ ভূসম্পত্তির মালিক ধর্মে হিন্দু—তো সেই মালিক শ্রেণীর হিন্দু সংখ্যায় কত জন? আর সাধারণ খেটে খাওয়া দরিদ্র হিন্দু কতজন, যাদের সঙ্গে খেটে খাওয়া মুসলমানের শ্রেণীগত মিল দেখা যায়? আসলে এগুলো কোনোটাই দেশ ভাগ করার প্রকৃত যুক্তি হতে পারে না। আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও পরে তার বিরোধীতায় নামা মুসলিম লীগ কেউ সমাজের শ্রেণীস্বার্থ নিয়ে মাথা ঘামায় নি। মাথা ঘামিয়েছে ক্ষমতার ভাগ কে কতখানি পাবে তা নিয়ে। কিন্তু তার জন্য এই দেশটা ভাগ করে যে কত বড় ক্ষতি করা হল, তা উপলব্ধি করার মত মেধা এদের কারোরই ছিল বলে মনে হয় না।

 

, —তর ভাবনাটা ভাইবা দেখার মত—দেশভাগ কইরা বাঁধ ভাইঙ্গা দিছে—অহন হুড় হুড় কইরা জল ঢুকতাছে—আমরার আর কি করন—যতটা সম্ভব জল আটকানো—- ত তুইন ক পরিকল্পনা কিছু ভাবছস?

ভাবছি—আমরা এই ধর গিয়া আশপাশের দশ পনরটা গাঁওয়ের হিন্দুপরিবারগুলার লগে প্রথম দেহা করি—তারার মনোভাবটা জাইন্যা লই—তারপর আমরার বক্তব্যটা রাখি যে—দেশছাড়াডা কামের কথা না—চৌদ্দপুরুষের ভিডা ছাইড়া যাওনের মত কোনো কারণ এই অঞ্চলে ঘটে নাই—দূর দেশে কোথায় কোথায় কি অইতাছে, তা নিয়া ভাইবা কাম নাই। আরেকটা খুব কইরা বুঝান লাগব যে একজন গেলে হুনি অন্যজন দুর্বল অইয়া যাইব—এইহানে আমরা একটা কমিটি বানাইতাছি যাতে কারোর কোনো বিবাদ অসুবিধা অইলে আমরা তার সমাধান করতাম—-

হ—ভাবনাটাতো ভালাই মনে অইতাছে—-তয় প্রথম কি আমরা দুইজনেই যাইতাম—না আরো কাউরে লইতাম—

আরে না—দুই জনে গেলে কেউ বিশ্বাস যাইত না—চাইর পাঁচ জনের একটা দল বানানোর লাগব—

তয় আয় ঠিক করি কার কার নাম থাকব—

ধর আমরা দুই জন আছি—তারপর—

রতন

, রতন—তারপর ধর খলিলুর—-

খলিল্যা যাইব—হে ত লীগের হবু নেতা

লীগের নেতা অইলেও যাইব—-আমার লগে কথা অইছে—

আর কেডা—

শিশির ধর

শিশির মাস্টার ত হুনছি হে নিজেই দেশ ছাইড়া যাইতগা চায়—-

ঠিকই হুনছস—তয় আমরার কথায় ভরসা পাইলে যাইত না–

আইচ্ছা—তাইলে ত পাঁচজন অইল—-পাঁচজনই থাউক নাহি কছ 

পাঁচজনই থাউক—

 

পরের দিন পাঁচজনের নাম শুনে খলিলুর আপত্তি জানাল রতন  চক্রবর্তীকে নিয়ে। খলিলুর কুলবাইড়া গ্রামের একমাত্র মেট্রিক পাশ ছেলে। তার বাবা এখনও রতন চক্রবর্তীদের গরু পালনের ব্যবসাটা করে।  তার উপর সে ইদানীং সেখানকার উঠতি লীগ নেতা হয়েছে।

তার বক্তব্য সেদিন মমিন মিয়া যেভাবে রতন চক্রবর্তীর কাছে  ভেজা বেড়াল হয়ে গিয়ে ছিটের ভিটার পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করে দিল, তাতে তো আগুন লাগানোর দায় কুলবাইড়া  গ্রামের উপরেই পড়লো। এসব তো সে নিজের স্বার্থেই করছিল। তো তার দায় সারা গ্রামের হবে কেন? মানুষে তো কুলবাইড়ার নামই বলে। এই ঘটনা বলে দেয় কুলবাইড়ার উপর রতন চক্রবর্তীর এখনও কত প্রভাব—আর এটাই  খলিলুরের ক্ষোভ। 

ইদানীং সে কথায় কথায় বলে আমাদের মাথার উপর এখন খাজা নাজিমুদ্দিন স্যার আছেন। তিনি বলেই দিয়েছেন দেশ এখন শান্তিপূর্ণ আছে। 

ওমর খলিলুরের আপত্তি শুনে বলে—তর আপত্তির কারণ হুনি পস্ট অইলনারে খলিল—রতন চক্রবর্তী কি কুলবাইড়ার বিবাদ মিটায়া  অন্যায় করছে—মমিন মিয়ার লোকেরা ছিডের ভিডায় আগুন দেওনের সময়তো কইছিলই যে, এইডা অহন মুসলমানের দেশ—তরা হিন্দু, তরা হিন্দুস্থান যা গিয়া—তো মমিন মিয়া তো  দেশভাগের সুযোগডাই লইছিল, নাহি—আর মমিন মিয়া যদি নিজের জমি থাইক্যা উচ্ছেদ করনের চায়, তো তার নিয়ম কি মাইরধর, ঘরে আগুন—এইসব? তো তর রাগডা কার উফর, রতন চক্রবর্তী না মমিন  মিয়া–হেইডা পস্ট কর– 

খলিল ওমরের কথার পিঠে আর কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে।

ধলাবাবু বলে—খলিল ভাই তোর বয়স কম। লেহাপড়া করতাছস। শুনছি রাজনীতিও করছ। এইসব ভালা কথা। তো তরার কুলবাইড়া  গ্রামের পেছেনে রতন চক্রবর্তীদের একটা যে অবদান আছে হেইডা কি মানছ—-আর যদি মানছ তয় রাজনীতির জন্য অন্ধ না হয়ে এই দেশটার সামাজিক ইতিহাসটা তো একটু পড়ন লাগব, জানন লাগব যে সমাজে রতন চক্রবর্তীরার ভূমিকা বা মমিন মিয়ার ভূমিকাডা কি—-রতন চক্রবর্তীরা জমিদার—জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন আরো অইব— সবাই তৈরি—আইজ হোক কাইল হোক ধইরা নে উচ্ছেদ অইবই—-কিন্তু এই সমাজে প্রাচীনকাল থাইক্যা জমিদারী শোষণ যেমন আছে, তেমনি কোনো কোনো জমিদারের অবদানও আছে সমাজে—সেইহানে রতন চক্রবর্তীর লাহান জমিদার বাড়ির কেউ যদি সমাজের জন্য কাম করতে চায় তারে বাদ দেওনডা কি খুব ভালা কাম হয় —-তাছাড়া রতন চক্রবর্তী তো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ছে—হে ত স্বাধীনতা সংগ্রামী— 

খলিল এইবার যেন কথা খুঁজে পেল। বলল—তাইনেরা ত আমরারে শোষন করতাছে—

তাইনেরা কারা

হিন্দুরা—হিন্দু জমিদারেরা—

ভালা কথা—কিন্তু ছিডের ভিডার লোকেরাতো হিন্দু, তারাও?

তারা অইতো ক্যান—তারা তো নমঃশূদ্র—নমঃশূদ্ররারেও তো হিন্দুরা শোষন করে—এর লাইগাইতো হেরার নেতা যোগেন মণ্ডল আমারার লগে যোগ দিছে—

তাইলে হেই যোগেনবাবুর লোকদের—ওই নমঃশূদ্ররারেও দেশ থাইক্যা ভাগাইতে অইব— 

আমিতো এইডা সমর্থন করিনা—এইডা মমিন মিয়ার কাজ—

এই কথাডা মমিন মিয়ারে কইছস

না কই নাই অহনও—তয় কইয়াম  

 

এদের কথার মাঝখানে ওমর বলল—বাদ দে অহন এই সব কথা। খলিল আমরা একটা ভালা কামে নামতাছি—তুইন কি লগে থাকতে?

না ভাইসাব, মাফ করবাইন, আমি পারতাম না—রতন চক্রবর্তীরে বাদ দিয়া যদি—-

ধলা যে এতক্ষণ কইল তারে লইয়া—কিছু বুজজস—

 

খলিলুর আবার মাথা নিচু করে চুপ থাকে।

 

কিছুক্ষণ পর খলিল চলে গেলে ওমর বলল—এই ছেরাডারে আননের কামডা ভালা অইল নারে ধলা। অপরিনত মাথায় ভুলভাল কথা ঢুকছে—

 

পরবর্তী দুই মাসে এই ত্রয়ীর নেতৃত্বে কয়েকজন মিলে প্রায় আট দশটা গ্রাম ঘোরা হলো। কিন্তু ফল খুব আশাপ্রদ নয়। কারণ গত দুই মাসেই এই অঞ্চলের প্রায় পঁচিশটি হিন্দু পরিবার দেশ ছাড়ার জন্য বর্ডারের দিকে চলে গেল। তারা অধিকাংশ শিক্ষিত ও কেউ কেউ শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। তার মধ্যে ওমরের স্কুলের অন্তত দশবারোজন ছাত্র ও তিন জন শিক্ষক আছে। এই তিন জন শিক্ষকের সঙ্গে ওমরের ভাল সম্পর্কই ছিল। দেশের অবস্থা নিয়ে মত বিনিময়ও হয়েছে কখনো। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ওমর তাঁদের এরকম মনোভাব টের পায় নি। 

অনেকে বলছেন সমস্যাটা অনেক গভীরে—বিচ্ছেদটা অনেক প্রাচীন—তবুওতো মানুষগুলো একসাথে ছিল এতকাল। আসলে বাতাসে এখন ভাসছে খবর—-ছাপার অক্ষরের খবরের চাইতে বাতাসে ভেসে বেড়ানো খবর অনেক শক্তিশালী। তার উপর এতদিনে কলকাতা রায়ট ও নোয়াখালির গণহত্যা সহ নানাবিধ ঘটনাগুলো পল্লবিত হয়েছে। এই সবের ধাক্কা মানুষ সামলাতে পারছে না। সামলানোর সাহস পাচ্ছে না। একজন জননেতাও এই গণ নিষ্ক্রমণের প্রতিরোধ করার জন্য একটি পূর্ণবাক্য খরচ করছেন না। সাধারণ মানুষ এই এসময় খুবই অসংগঠিত। ফলে ঝড়ের ঝাপটায় যে যার মত উড়ে যাচ্ছে। রেখে যাচ্ছে পেছনে আরো কিছু ভয়ার্ত মানুষ। 

এই অবস্থার মধ্যেই এই ত্রয়ী একদিন মিটিং এ বসলো। এরমধ্যেই পূর্ববাংলা ও পশ্চিম বাংলা থেকে বেশ কিছু দাঙ্গা হাঙ্গামার খবর আসতে শুরু করেছে। নেত্রকোণা মহকুমাতেই খালি তেমন খবর নেই। রতন চক্রবর্তী তার নিজস্ব যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক বেশি খবর নিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ খবর হচ্ছে পশ্চিমপাকিস্তানের পাঞ্জাব সহ বিভিন্ন শহর ও ইন্ডিয়ার দিকের পূর্ব পাঞ্জাব ও দিল্লী সহ উত্তর ভারত জুড়ে চলছে দাঙ্গা। রতন চক্রবর্তী বললো যে এই রকম দাঙ্গা যদি চলে আর নেতারা যদি রুখে না দাঁড়ায় তাহলে আমাদের জন্য স্বাধীনতাপূর্বের দাঙ্গার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণনাশের খবর অপেক্ষা করছে। একা গান্ধীজি অনশন করে আর কত রুখতে পারবেন !

 

 

বেশ কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করার পর ক্লান্ত ধলাবাবু আজ বাড়িতে। এদিকে আজ  মইধ্যের বাড়ির ছুডু কাকা ধলাকে ডেকে পাঠালেন। শরীকী ভাগ হয়ে গেলেও কাকা জেঠারা ডাকলে ধলাকে দেখা করতে যেতে হয়। তাঁদের আসতে বলাটা অসম্মানের। তাই সকালে খাওয়ার পর ধলা তার ছুডু কাকার সঙ্গে দেখা করতে গেল। ছুডু কাকার বয়স ধলার মনে হয় ষাট ছোঁয়নি। এক সময় গ্রামের স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। চারদিকে তাঁর পরিচিতিও আছে বেশ। কিন্তু ইদানীং তিনি বাড়ির বাইরে খুব একটা যান না। সকাল বিকেল পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে দাঁড়ান। সামনের বন্দের দিকে অলস চোখে তাকান। বর্তমানে সেখানে প্রায় দিগন্ত বিস্তৃত ধান খেতের বেড়ে ওঠা ধান শীষের অগ্রভাগ দেখা যায়। তার নিচে প্রায় কোমর সমান জল। সেই জলে প্রচুর মাছও পাওয়া যায়। ছুডু কাকা মানুষটি এই সেদিনও যেন খুব তৎপর ছিলেন। আজকাল বেশ উদাস।  

 

ধলা ছুডু কাকার বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই শুনতে পেল কাকার গলা। একটি বেশ পুরনো ইজিচেয়ারে বসে থাকা কাকা বললেন–কীরে বেডা, বাপ আমার— সময় অইল তর–

ছুডু কাহা—-এই একটু ব্যস্ত আছিলাম আর কি—তা আফনের শরীলডা ভালা আছে তো— 

আছে বাবা আছে–

কইন তয়—ডাকছুইন কিয়ের লাইগ্যা

ডাকছি কি আর একটা বিষয়ের লাইগ্যা—

কইন না একটা একটা কইরা—আমার আর আইজ কাম নাই তেমন–

ভালা করছস— তো কইতাম চাই যে এই হানে থাহন নিয়া কী ভাবতাছস? বড় ছেরা শান্তিরঞ্জন তো খুব চিন্তায় আছে। কইলকাতা থাইক্যা তার চিঠি ত প্রায় সপ্তাহেই আহে। সে বোধহয় একবার আইব এরমধ্যে। সে তো বিনিময়ের জন্য দুইজনের লগে কথা কইছে—একজন হুগলি জেলার—আরেকজন বর্ধমান জেলার—জমিজমার ব্যাপারস্যাপার তো হে তেমন বুঝে না—তাই একবার আইব এইবর—তোর লগে কথা কওনে লাইগ্যা–

 

কাকার বড় ছেলে বছর তিনেক আগে কলকাতার এজি অফিসে চাকরি পেয়েছে। কলেজের পড়াশোনাও তার ওখানে থেকেই। এই  বংশে বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি সে-ই প্রথম করছে। থাকে টালিগঞ্জে তার মেসোর বাসায়। এই চাকরি করা নিয়ে এক সময় এই বাড়িতে খুব হৈ চৈ হয়। যাই হোক শেষে শান্তিরঞ্জনই জয়ী হয়। তার বড় কারণ, সে যেহেতু কলকাতায় থেকে বি এ পাশ করেছে তাই তার ওদিকেই থাকার ইচ্ছে। তা ছাড়া স্বাধীনতার আগে পরে দেশের যা পরিস্থিতি সে দেখছে, তাতে সে তাদের পরিবারের জন্যও খুব ভরসা পাচ্ছে না। এই সময় অনেকেই বিনিময় করে এই দেশ ওই দেশ করে নিচ্ছে। হয়তো সেও তাই ভেবে থাকবে।

 

কাকা বিষয়ডা আমার মাথাত আছে। কিন্তু আগে তো যাওয়াডা নিয়াই কথা কওন লাগে। আমরা যারা হিন্দু, তারার এই যাওয়াডাই আগে স্থির হওন লাগে। আমরারে কেউ অহনও এইহান থাইক্যা চইল্যা যাওনের হুমকি দ্যায় নাই—বা বাড়ি ঘরে হামলা করে নাই—সরাসরি কোনো দাঙ্গাও এই অঞ্চলে লাগে নাই—কিন্তু এইডা ঠিক যে সারা দেশজুড়ে যে অবস্থা ধীরে ধীরে তৈরি অইতাছে তাতে এইহানে যে এইসব অইত না, তার কোনো গ্যারান্টি নাই। আমরা গেলে আতঙ্কে যাব। দাঙ্গার থেকে দাঙ্গার আতঙ্ক অনেক বেশি শক্তিশালী। এইটা একটা সহজ সমাধান।

কিন্তু কাকা এই মাটিতে আমরা কয়পুরুষ ধইরা আছি আফনে আমার থাইক্যা ভালা জানেন। আমরা এই মাটিতে থাহনের লাইগ্যা আইজ অবধি এই রহম বিপদের মুখে পড়ি নাই। এইবারই প্রথম পড়লাম। আর যে কারণে পড়লাম সেইডা অইল দেশভাগ। কিন্তু এই দেশভাগের জন্য এমন হয় নাই যে, এই নতুন পাকিস্তানের আইন কানুন মোতাবেক আমরা হিন্দুরা পাকিস্তানে থাকতে পারতাম না। আমরার না থাকতে পারার জন্য দায়ী এইখানকার এক শ্রেণীর মানুষ। ধইরা নিলাম তারার পিছনে বড় রাজনৈতিক শক্তি আছে। তো আমরা কি একবার ওই এক শ্রেণির মানুষের প্রকৃত ইচ্ছাডা বা পেছনের রাজনীতির শক্তির ভিতটা কতডা শক্তিশালী একবার না দেইখাই রওনা দিব—  

বাবা তুমার কথায় কোনো ভুল নাই—কিন্তু মানুষ তো যাইতাছে গা—শান্তি লিখল কইলকাতার শিয়ালদহ ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্ম অহন পূর্ববঙ্গের মানুষের মাথা ঘোঁজার জায়গা অইছে—দিনে দিনে সেইহানে ভিড় বাড়তাছে—-সেইহানকার সরকার সাহায্য করতাছে।

ঠিকই শুনছেন। কিছু কিছু আমিও শুনছি। 

আমি ত বাবা বুড়া মানুষ—এইতা কামকাজ কি আর আমার দ্বারা অইব—যা করার তুমরারই করন লাগব—শান্তি আইব লিখছে, হে আইয়ুক—তার লগে বইয়া তুমি ভাবনা চিন্তাগুলা রাখ—দেহ হে কিতা কয়—

হেইডা ঠিকই আছে শান্তির লগে কথা কইব—কিন্তু কাকা আগের থাইক্যা ভাইঙ্গা পড়ুইন্যাযে—বানের জলে ভাসা মানুষত আর না, আমরা তো এইহানেরই মানুষ—কারো লগে বিবাদ মারামারি বা অন্যায় কিছু করি নাই—এইসব মনে রাখন দরকার—

 

কথাবার্তার মধ্যেই শ্যামলী, কাকার বড় মেয়ে আমাদের চা দিয়ে  গেল। বলে গেল —দাদাভাই—যাইওনাযে—চা খাইয়াই উইঠ্যা দৌড় দিও না যে—-লুচি আর আলুর তরকারী অইতাছে—মা কইল তুমি নাহি খুব পছন্দ কর–

বলতে বলতেই খিল খিল করে হাসি— বেনী দুলিয়ে আবার রান্না ঘরের দিকে চলে গেল শ্যামলী ।

 

তিন ছেলের পর কাকার দুই মেয়ে। শ্যামলী বড়। বিয়ের উপযুক্ত। তার ছোটটাও বড় হচ্ছে। কাকার এদের নিয়াই মহা চিন্তা।

চা খাইতে খাইতে কাকা বললেন—বুঝলা ধলা—এই ছেরিডার লাইগ্যা একটা ভাল ঘর পাইছিলাম—কিশোরগঞ্জের।—এই  ডামাডলের মইধ্যে হেই পক্ষ কথা থামাইয়া রাখছে—তারা কয় দেহি এই পারে থাহি না ওই পারে যাওন লাগে—আগে দেইখ্যা লই—আপনাগোর মাইয়া আমগোর পছন্দ—

অহন কওছে বিপদ কিতা—তারা মাইয়া পছন্দ কইরা রাখছে—আবার কথাও থামাইয়া রাখছে—আমরাত অহন অন্য জায়গাতেও কথা কইবার পারতাছি না—

কাকা অহন অন্তত কিছুদিন এইসব বন্ধ থাউক—শ্যামলীর বিয়ার বয়স এমন কিছু অইয়া যায় নাই—দুই তিন বছর দেরী অইলে অইব

বাবারে মাইয়া দুইডারে আমি বিয়া দিয়া যাইতাম চাই—জানই ত ঘরে আব্যাইত মাইয়া রাইখ্যা কি পুলা বিয়া করান যায়–

কাকা আফনের বয়স এমন কিছু অইয়া যায় নাই—আর এইসব বিয়াটিয়ার কাজ কিছুদিন পরে অইলেও ক্ষতি নাই—আর যদি দেহেন হেই পক্ষ রাজি— আমরার এইহানে ত কিছু না–বিয়ার কাজ করার কোনো অসুবিধা দেহি না—যদি বরপক্ষ আইতে পারে আফনে কইয়া দেন এইহানে অসুবিধা নাই। অন্তত ময়মনসিং পর্যন্ত আমরা তারারে আগাইয়া দিতাম পারতাম। ওইহান থাইক্যা কিশোরগঞ্জ তারার ব্যবস্থা—

কইতাছ?

, কাকা। কিন্তু আমার মনে হয় হেরা ওইপারে যাওনের লাইগ্যা বোধহয় বিয়া নিয়া কথা কইতে চাইতাছে না। তাও আফনে দেহেন যোগাযোগ কইরা।

 

কথাবার্তার মধ্যেই কাকিমা ও শ্যামলী দুজনে লুচি তরকারী সঙ্গে মিষ্টির রেকাবি নিয়া হাজির। একটা জলচৌকি টেনে তার উপরে  রাখা হলো। কাকীমাকে যেন অনেকদিন পর দেখলাম। পাশাপাশি থাকা হয়, অথচ দেখা হয় কদাচিৎ।  

কাকিমা ভাল আছেন তো—অনেকদিন পর–

বেডার যে কি কথা—আমি ত তুমারে ফাঁকে ফাঁকে দেখি—তুমি বেডা যে মাথা নিচু কইর‍্যা হাঁট আর কোন দিকে তাকানোর হুশ থাকে না—

শ্যামলী আবার যোগ করলো—দাদাভাইরে আমিও তো দেখি—দাদাভাই মাডির লগে কথা কইতে কইতে হাঁটে ত ওই জন্য কেউরে দেখতে পায় না, হি হি। 

ধলা বললো—কথা ঠিকই কইছেন কাকিমা—আমি মাইন্যা লইলাম—আসলে খুব কাজের চাপ যাচ্ছিলো কতদিন ধইরা—

আইচ্ছা অইছে–এইবার খাও বাবা–

 

উঠে যাওয়ার আগে ধলা আবার কাকাকে বলে গেল—কাকা ভিডামাডি ছাড়ার আগে দশবার ভাবার আছে—ধর্ম, সম্মান , সম্পত্তি —এইগুলা কোনোডাই আমাদের দোষের কারণ অইতে পারে না—দোষের কারণ অইলে অইতে পারে আমরার আচার ব্যবহার বা সহবত—সেইগুলাও ভাবনের বিষয়—আফনে এইতা লইয়া উতলা অইয়েন না—আমি আছি তো—পরে আইয়ামনে একসময়—অহন যাই—

আইয়ো বাবা, আইয়ো।

 

 

একটা সম্প্রীতির মিছিল করা যায় কিনা ভাবার জন্য ত্রয়ীরা আবারও মিলিত হচ্ছে মাঝে মাঝে। কিন্তু সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না। একবার বিশ্বাস উঠে গেলে মানুষের মনে আবার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব?

 

স্থানীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেই চলে আসে দূর দূর থেকে আসা খবর। হানাহানির খবর। মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার খবর। ছিন্নমূল হয়ে মানুষের চলে যাওয়ার খবর। এই সময় নেতারা কোথায়? কেউ একটা বিবৃতি দিচ্ছে না। কেউ কোনো জায়গায় রুখে দাঁড়াচ্ছে না। বিনা বাধায় এগুলো হচ্ছে। যেন স্বাধীনতালাভের সঙ্গে এগুলো যুক্ত ছিল। যেন স্বাধীন হলেই একশ্রেণীর মানুষ ভেবে রেখেছিল কিছু মানুষকে হত্যা করা হবে, কিছু মানুষকে বিতাড়িত করা হবে, কিছু নারীকে যতরকমভাবে সম্ভব নির্যাতন করা হবে, দখল করা হবে সম্পত্তি। তাহলে যে কথায় কথায় বলি হাজার বছরের সম্পর্ক ! তার অর্থ কি ?

ওমর কথা প্রসঙ্গে সেদিন বলেই ফেলল যে—দাঙ্গাহাঙ্গামায় মরা এক জিনিস, কিন্তু দাঙ্গাহাঙ্গামার কারণে যদি মনের দিক থেকে মানুষের মৃত্যু ঘটে যায়–তাহলেই তো সর্বনাশ।

কথাটা ভাবার মত। সত্যিই তো ! অত্যাচারিত মানুষগুলোর মনটাই যদি মরে যায়, তবে সম্পর্কের কথা, সম্প্রীতির কথা আর কার সাথে বলা যাবে !

সেদিন রতন এসে খবর দিল ঝিকরগাছা গ্রামের তিনটি বাড়িতে আগুন দেয়ার কথা। আশ্চর্য ঘরবাড়িগুলো পুড়লো, বাড়ির মানুষগুলোকে বেঁধে রাখলো, বউ ঝিদের উপর অত্যাচার করল—কিন্তু আশেপাশের হিন্দু মুসলমান কেউ এগিয়ে এলো না। ঘরের যা কিছু সব অনায়াসে লুটপাট করে নিয়ে গেল। খবর পেয়ে পরদিন রতন সেখানে যায়। গ্রামের কিছু হিন্দু মুসলমান মানুষ জোগাড় করে মিটিং করে। মিটিং এ ঠিক করা হয় যে, সবাই মিলে সাহায্য  করে পোড়াঘর ঠিক করবে কোনোমতে। ঘর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত  মানুষগুলোকে কারো কারো বাড়িতে থাকতে দেবে।

তার মধ্যে  পুড়ে যাওয়া বাড়ির কয়েকজনকে নিয়ে ধলা থানায়  যায়। ডায়েরি করে। এগুলোর পর সে যে কাজটা করে তাহলো অপরাধীদের সনাক্ত করে ফেলা। 

পুরো বিষয়টা এত সহজে হয় নি। কারণ মানুষের মনে আছে ভয়। সবাই নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ। যারা এসব করেছে তারা যদি প্রতিশোধ নেয়? এই ভয় আছে হিন্দু মুসলমান সবার মধ্যে। তো এই ব্যাপারে ঝুঁকি নিয়ে রতনকে আশ্বাস দিতে হলো যে, এসব হবে না।

আজ এই ত্রয়ীর মিটিংয়ে এটাই বিষয়। ধলার বৈঠকখানার বাইরের দরজা বন্ধ। বংশীকে বলা হল যে কেউ যেন এদিকে না আসে। মিটিংয়ে রতনকেই বলতে বলা হল। রতন সাদা ফুলশার্টের সঙ্গে লুঙ্গি পরে এসেছে।

রতন উপরে বলা বক্তব্যটাই বলল। বলে জানতে চাইল—তাইলে এই দলের গোড়াডা কেডা তরা কি কেউ আন্দাজ করতে পারতাছস?

ওমর বলল—ওই দলটার গ্রামের নামটা কি কইলা—উমেদপুর?

হ–উমেদপুর

আমি থানার দারোগারে উমেদপুরের কথাডা শুনায়া আইছি—দেহি থানা যদি আগের মত থাহে—বদলায়া না যায়, তো কিছু একটা করব মনে হয়—দারোগা বেডাতো আমারে ভালই চিনে—হাইসা হাইসা কইল—গরমেন্ট বদলায়া গেছে নাইলে হুনি—আমি তখন কইলাম আমার কাজ আছিল দেশ স্বাধীন করনের—সেইডা অইয়া গেছে—আফনে অহন স্বাধীন দেশের দারোগা—এখন আফনের বিবেচনা—বেডা হাসে। তবু কইল থানায় আফনের আওনের দরকার নাই—আইনের ঝামেলা আছে—দরকার অইলে আফনের নামডা খালি কইয়া দিবেন যারা আইব তারারে—

 

ধলা বলল—এই ওমরউমেদপুরের করিম পড়ত না আমরার লগে—

ওমর—পড়ত ত—হ্যায় তো এদিকের একটা প্রাইমারি ইস্কুলে  মাস্টারি করে—  

রতন—দলের মাথাডার নাম মাখন শেখ।

ধলা—তুই তো সবই জাইন্যা গেছস।

রতন— আমি তো ভাবছিলাম তরারে লইয়া আইজই একবার উমেদপুর ঘুরান দিয়া আইতাম—রেডি অইয়াই আইছিলাম

এই বলে রতন কোমরে গোঁজা পিস্তল্টা দেখালো—দেখিয়ে বললো—ছয় ঘড়া।

ওমর—রতন এইডা অহনি না—এই সবই জমাইয়া রাখ—কাজে লাগব—আমি ভাবতাছি থানায় যহন কেসটা জানাইছস তহন নিজেরার আগে যাওন ঠিক অইব না—আমি একদিন করিমরে ধরি- –ধইরা ওরার গাঁওয়ের খবরাখবর নেই—মাখন শেখের কোনো খবর যদি পাওয়া যায়—

ধলা—আমরার অহন প্রথম কাজ এই কামের গোড়ায় কেডা আছে তারে বাইর করা।

রতন—তরা খলিলের লগে একটা যোগাযোগ কর—আমার মনে হয় হেই ছেরার কাছে খবর থাকতে পারে।

 

এই সব ঘটনার দুদিন পর মানাবাড়ির সাপ্তাহিক হাটে গোলমাল। গোটা তিনেক হিন্দুদের দোকান ভাঙচুর—মারধর—মাথা ফাটাফাটি হয়ে গেল। দোকান তিনটা সাহাদের। ব্যবসায়ী মানুষ, টাকাপয়সা ব্যবসা ছাড়া তাদের আর কোনো ব্যাপারে সংশ্লিষ্টতা নেই বলেই জানা যায়।

ব্যাপারগুলো এত ঘন ঘন ঘটছে যে এর পেছনে বড় কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা ভাবা দরকার। রতন তার বয়স ও উদ্যম নিয়ে বসে থাকতে পারছে না। ওমর আর ধলা তার উদ্যমের সঙ্গে সঙ্গত করতে পারছে না। একটা বড় কোনো ম্যাসাকার ঘটার এগুলো যে পূর্বলক্ষণ, সেটা বুঝেও কি করা উচিত সেটা ভেবে স্থির  করতে পারছে না। রতন তাদের অঞ্চলের পরেশ আর আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়েছে। পরেশ একজন সাহসী যুবক কৃষক। আলাউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অল্প বয়স। এক হিন্দু কন্যার প্রেমিক। তার উপর  সে দেশভাগের ঘোরতর বিরোধী। রতনদার শিষ্যত্ব নিয়েছে। আপাতত সে তার চাচার বাড়িতে আছে। তার প্রেমিকার বাড়ি নেত্রকোণা শহরে। সে আপাতত নেত্রকোণার আশেপাশে থাকতে চায়।  ধনবান পিতার সন্তান আলাউদ্দিন। গ্রামের বাড়ি ছাড়াও ঢাকায় তাদের বাড়ি ও ব্যবসা আছে। 

রতনের প্রশ্ন সন্ত্রাসের মোকাবেলা সন্ত্রাস দিয়ে করতে হয়। অন্য কোনো পথ নাই। ভারতবর্ষের বর্তমান অবস্থায় বাঁচার জন্য রুখে  দাঁড়াতে হবে। তাছাড়া সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে রতনের সাহস ও হাতযশ দুটোই আছে।

এরমধ্যে গতকাল রাতে জমিদার মাধব চক্রবর্তীর বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেল। ধন সম্পদ লুঠপাটের বদলে হয়েছে মারামারি। জমিদার বাড়িতে  আট দশজনের মত কামলা থাকে। মারামারি মূলত তারাই করেছে। মাধববাবু রতনকে বেরোতে দেন নি। তিনি বন্দুক নিয়ে বসেছিলেন বড় ঘরে। বন্দুক কাজে লাগান নি। বিগত কিছুদিন যাবত তাঁরা প্রস্তুতই থাকতেন। ফলে প্রতিরোধ করতে অসুবিধা হয়  নি। অনেকেই অল্পবিস্তর আহত হয়েছে।  

পুলিশ এসে মাধব চক্রবর্তীর বাড়িতে ঘণ্টাখানেক জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাসী করে চলে যায়। ঠিক হয় যে একটা পুলিশ পোস্ট এই অঞ্চলে করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা হবে।  

কিন্তু রতনদের বাড়ির ডাকাতির ঘটনার দিন সাতেক পর  মাখন শেখ খুন হয়ে যায়। তার লাশ পাওয়া যায় দক্ষিণা বিলের জলে। খুনটা হয়তো রাতে হয়ে থাকবে। কারণ মানুষ খবরটা পায় পরদিন সকালে। খুবই রহস্যজনক খুন। কীভাবে হলো, কে বা কারা করলো কিছুই বোঝা গেল না।

এর ঠিক দিন দশেকের মধ্যে মুনাব্বর খুন হয়ে যায়। সে-ও মাখন শেখের দলের লোক ছিল। মানাবাড়ির হাটে হামলা তার নেতৃত্বেই হয়েছিল বলে লোকের অভিমত।

পরপর দুটো খুন এতদঞ্চলের যাবতীয় সহনশীলতার উপর খুবই  চাপ সৃষ্টি করলো।

কিন্তু একশ্রেণীর মানুষের কাছে চাপা সন্তুষ্টির ব্যাপারও ছিল। তারমধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয়েই আছে।

মাসখানিক পর একদিন সন্ধ্যায় এই সকল নানাবিধ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করতে বসলো ওমর ও ধলাবাবু। বর্তমান পরিস্থিতি্তে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অবশ্য আগেও যে ছিল তা নয়। তবু তারা একটা পজেটিভ ভাবনার মধ্যে ছিল। কিন্তু বিগত দিনগুলিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পর এখন তারা অনেকটা নিরুপায় বলে ভাবছে নিজেদের।

এই সময়ে চোখ পড়ে একেবারে ব্যক্তিগত অবস্থানের উপর। ধলাবাবু তার সম্প্রীতির সংজ্ঞাটিকে একেবারেই দাঁড় করাতে পারছে না। আর এর সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ছে তার ও তাদের পরিবারগুলোর ভবিষৎ। দুই দেশ থেকে ব্যাপক হারে মানুষ দেশ ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছে পাশের দেশে। নেত্রকোণা অঞ্চলেও তার ব্যতিক্রম নেই। এরমধ্যে শোনা যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট চালু হবে। 

তারা সেদিন যখন উঠব উঠব করছে তখন একজন বৈঠকখানার বাইরে থেকে ধলাবাবুকে ডাকে—ধলাবাবু আছুইন নাহি?

ধলাবাবু কেডাবলে উঠতে যাবে এমন সময় ওমর বলল—খাড় আমি দেহি। বলে সে ঘরের বাইরে গিয়ে দেখে কুলবাইড়ার আব্বাস মিয়া। মধ্যবয়সের মানুষ। তার সম্পর্কে ওমর বা ধলার তেমন কিছু জানা নেই। সাধারণ গ্রামবাসী বলেই জানে।  ওমরকে দেখে আব্বাস বলে উঠলেন—-আরে ওমরসাবও আছুইন দেহি—আফনেরারেই খুঁজতাছিলাম—ধলাবাবু কি বাড়িত আছুইন?

, আছুইন—আহেন ঘরে আহেন—

আব্বাস মিয়া ঘরে এসে ঢুকে দেখে ধলাবাবু বসে আছেন। দেখে বললেন—-কেমুন আছুইন কত্তা—একটা দরহারে আইছিলাম—

ধলাবাবু আব্বাসের দিকে তাকিয়ে বলল—বহেন বহেন

আব্বাস মিয়া একটা বেঞ্চিতে বসে বললেন—আফনেরা দুইজনাই আছেন—এইডা ভালা অইল—তো কথাডা অইল যে আমরার গাঁও গেরামের খবর কিতা চলতাছে হুনছুইন বোধকরি

ধলা—কী খবরের কথা একটু কইন হুনি

আব্বাস—কইতাছি যে রতন চক্রবর্তীর লগে আফনেরা আর মিশুইননাযে—হের নামে তো হুলিয়া জারি অইছে

ওমর—নাহি—তো হে কিতা করছে

আব্বাস—হে কিতা করছে গাঁও দিগালে হগলেই জানে—পুলিশও জানে

ধলা—আরেকটু খোলসা কইরা কন হুনি

আব্বাস—খোলসা কইরা কওনের কিছু নাই—খুনখারাবিগুলার লগে তাইনের নাম জড়াইছে বোধকরি—আফনেরার সাবধান হওন লাগব—লীগের নেতারা খোঁজখবর লইতাছে—বলা তো যায় না একটা—দাঙ্গাহাঙ্গামা অইতে কতক্ষণ—

ধলা—আব্বাস ভাই, রতনের হুলিয়ার লগে দাঙ্গাহাঙ্গামার সম্পর্ক কিতা—আর খুন খারাপি যেগুলা অইছে তাতো পুলিশে দেখতাছে—হেয়ানে আফনের আমার করনের কি আছে—পুলিশ যারারে সন্দ করব তারারে ধরব—আফনের আমার কিতা—আর দাঙ্গাহাঙ্গামার কথা যে কইতাছুইন আমরা আফনেরা কি দাঙ্গা করনের মানুষ—এই অঞ্চলের হিন্দুরার লগে মুসলমানদের কি কোনদিন ধর্ম নিয়া কোন কাইজ্যা অইছে—আর কাইজ্যা হওনেরই বা আছেডা কিতা—হগলেই তো ভাই বেরাদর বন্ধু—নাহি কন—লীগের নেতারা  আইয়ুক—তেনারা আসলে ভয়ের কি—তেনারা আসলে মিটিংটিটিং অইব দেশ দশের খবর পাইয়াম এইত—

 

ধলাবাবুর কথা শুনে আব্বাস এক দৃষ্টে ধলার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ধলা সেটা লক্ষ্য করে একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করল—শুনেন আব্বাস ভাই, আফনের বয়স অইছে, আমার থাইক্যা এইসব একটু অইলেও বেশী বুঝেন, ভাল বুঝেন—দেশটা ভাগ হওনের সময় থাইক্যাই একটা কথা হুনতাছি যে, হিন্দুরারে  এই দেশে থাকতে দিত না—কারণ এই দেশটা অহন মুসলমানের—হ এই দেশটা মুসলমানদের জন্যই অইছে—কিন্তু কনতো কয়ডা মুসলমানের জন্য—দেশটা ভাগ হওয়ার পরে ভারতে যত মুসলমান থাইক্যা গেল তাতো পাকিস্তানের মোট মুসলমানের থাইক্যা বেশি তারা—তারা অহন কিতা করত—এই কথা অনুযায়ী তো এইডাও কওয়া যায় যে মুসলমানের জন্য যখন আলাদা দেশ অইছে তখন সবডি মুসলমান পাকিস্তানেই যাইব—তো তহন ভারতবর্ষের সব মুসলমানের জায়গা পাকিস্তানে অইব তো—কি কন—-আসলে সেইডা সম্ভব না। আর পাকিস্তান অইছে বইলা ভারতের সব মুসলমান এইবর হাডা দিব, তা কিন্তু না—-আর হাডা দিয়া এই  দেশে ঢুইকা পড়লে জায়গা দেওন যাইত না—এইডাও সত্য। তো কন এই হিন্দু হিন্দু মুসলমান মুসলমান কইরা লাভডা কার—কারোরই লাভ নাই। মাঝখান থাইক্যা আমি আফেনের মতন প্রতিবেশী হারাইব—আফনে আমার মত প্রতিবেশি হারাইবেন—এর বেশি কিছু না—-

আর রতন চক্রবর্তী আমরার ছোট বেলার বন্ধু—এক লগে পড়াশোনা করছি—তাই হঠাৎ কখনও আসে—সে নিজে রাজনীতি করে—দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে—তার নামে ব্রিটিশ পুলিশের হুলিয়া আছে অনেকদিন ধইরা—অহন স্বাধীন দেশে ওই হুলিয়া নিয়া আবার নাড়াচারা অইতাছে। তার বাবা জমিদার মানুষ,আইন আদালত বোঝেন ভাল—রতন চক্রবর্তীর জন্য আমরার চিন্তা না করলেও চলবে—হের চিন্তা পুলিশে করতাছে—

আচ্ছা যাউক—এইসব নিয়া কথা কইলে অনেক কথাই কওন যায়—আইজ রাইত অইতাছে—আফনে আরেকদিন আয়ুনযে—কথা কওন যাইব–

আমারে আবার আমার ছুডু কাহা ডাইকা পাঠাইছে—বাড়ির ভিতরে যাওন লাগব।

আব্বাস—হ হ ভাই যান, আফনের কথা শুইন্যা যেমন বুঝতে পারলাম তেমন শান্তিও পাইলাম—আইজ উঠি—

পাশ থেকে ওমরও উঠলো। বলল—চাচা আইয়ুনযে আরেকদিন—

আব্বাস—আইয়ামনে, আইয়ামনে—

 

পরস্পর বিদায় জানিয়ে তারা এরপর উঠে পড়লো। ওমরও চলে গেল। যাওয়ার সময় ধলাকে বলে গেল—বড় ভালা কইছ দোস্ত–।

 

ধলাবাবু ভেতর বাড়ির উঠোনে পা দিয়া লক্ষ্য করল তাদের চওড়া বারান্দায় হ্যারিকেন জ্বলছে চড়া আলোতে। সেখানে একটা চেয়ারে বসে ছুডু কাকা। তার একপাশে মা একটা মোড়ায় বসে। অন্য পাশে একটা কুপি জ্বালিয়ে পিঁড়িতে বসে বাসন্তী  কুটনো কুটছে এক মনে। সকলেই খুব নীরব।

কাছে গিয়ে ধলাবাবু জিজ্ঞেস করল—কাকা ডাকছিলেন আমারে—

, বাবা ডাকছিলাম—বাবারে বড় সব্বনাশ অইয়া গেল— গান্ধিজি ত খুন অইয়া গেছে—

কন কি—কখন—কীভাবে—

এই তো রেডিওর খবরে হুনলাম—

খুব খারাপ খবর তো—এই মানুষটাও খুন অইতে পারে!

মনডা খুব ভাইঙ্গা গেছে রে বাপ—ভরসা করার মত একটা মানুষই তো আছিল—। বলতে বলতে কাকা প্রায় কেঁদে ফেললেন।

ধলাবাবু তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠে তার কাকাকে ধরে ফেললবলল—এত অস্থির অইন্যাযে—দিল্লির রাজনীতি ত —কিচ্ছু কওয়ার নাই—আফনে শান্ত হউন—আমি কাইলকের মধ্যে খোঁজখবর লইতাছি—অত ভাইবেন না—-চলেন আফনারে ঘরে দিয়া আসি—

ধলার মা সুমতিও বললেন— হ, একটু ধইরা দিয়ায় তো—অত ভাইঙ্গা পড়ুইন্যাযে ঠাহুরপো—যান ঘরে গিয়া খাওয়া দাওয়া কইরা শুইয়া পড়েন—আর রেডিও শুননের কাম নাই—-ধলা রেডিও বন্ধ কইরা তোর কাকিমারে কইয়া আইস তো—

রাতের খাওয়া শেষ করে ধলা তাদের রেডিও কোলে নিয়া বসে আছে। প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে গেছে।

 

শীতের কি যাওয়ার পালা শুরু হয়েছে? দক্ষিণের বন্দ দেখা যায় অধিকাংশটাই  শুনশান। সামান্য কিছু খেসারি  মুসুরি কিংবা মুগ  কালাইয়ের চাষ হয়েছে। এছাড়া সারা বন্দ যেন হা করে আছে।  একটু একটু হিমেল বাতাস চোখে মুখে লাগে এই শেষ বিকেলের দিকে। ধলাবাবু বছরের এই সময়টা একা একা বন্দে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে। এই অভ্যাস তার উঠতি বয়সকাল থেকেই রয়েছে। গতরাতে গান্ধী হত্যার খবরটা শোনার পর থেকে তার নিজের ভেতরও কেমন একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাব। ছুডু কাকার সঙ্গে আজ আর দেখা করতে যায় নি। আজ আর কারোর সঙ্গেই কথা বলতে ভাল লাগছে না। এই দেশের, সেই অর্থে কোনো ভবিষ্যৎ আপাতত সে দেখতে পাচ্ছে না। তবু যেন এই মানুষটার সঙ্গে এই উপমহাদেশের সন্ত্রস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একটা অন্তরের যোগ ছিল। আজ  হয়তো তারাই মনে মনে  সবচেয়ে বেশি কাঁদছে। বিগত পঞ্চাশ বছরের রাজনীতির চালচিত্রে চোখ রাখলে সবচেয়ে বড় বড়  সংকটগুলো তৈরি হয়েছে তো ধর্মকে ঘিরেই। আবার এই মানুষটিও ছিলেন ধর্মানুরক্ত, বা বলতে গেলে তাঁর সত্ত্বাটি নির্মিতই হয়েছিল ধর্মের অজস্র আবর্জনা আর বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে। ভারতীয় রাজনীতিতে সেই ধর্মই যে একের পর এক অভিশাপ নিক্ষেপ করে যাবে তা বোধ হয় তিনি ভাবতে পারেন নি। এখনও খবর তেমন পাওয়া যায় নি—সেই ধর্মেরই কোনো শক্তিশেল কি তাঁকে বধ করল—জানি না।

 

এইরকম ভাবতে ভাবতে এক সময় ধলাবাবুর চোখ ভিজে উঠলো। সান্ধ্য কুয়াশায় ঘিরে আসছে চারদিক। বরিশালের এক কবির কথা যেন হঠাৎ মনে পড়লো। জীবনানন্দ দাশ, নাম। কবে যেন পড়া হয়েছিল, ময়মনসিং থাকতে বোধ হয়—একটা স্তবক যেন  মনে পড়লো—

 

অনেক রূঢ় রৌদ্রের ঘুরে প্রাণ

পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো

ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,

দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত

ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে;

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;

মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।

 

মনে পড়ছে কবিতাটার নাম সুচেতনা। কলিকাতার কোনো পত্রিকায় ছিল কবিতাটা। সে সময় আমাদের মেসে দুজন কবি ছিল। একজন শেখর পাল, অন্যজন অনুপম বসু। এদের সূত্রেই প্রচুর পত্র পত্রিকার আমাদানী হত মেসে।

হাল্কা একটা অন্ধকার নেমে এসেছে। বাড়ির দিকে মুখ করে হাঁটছে ধলা। হঠাৎ প্রায় মুখের সামনেই একজন দাঁড়িয়ে পড়লো। ধলা  এতটাই অন্যমনষ্ক ছিল যে, শুধু চমকালো না, কিছুটা ভয়ও পেল। সামনে রতন। লুঙ্গি পরনে, গায়ে একটা ছাই রঙের পশমি আলোয়ান।

কীরে আইতকা উঠছস—মনে অয়

, রে বেশ আইতকা উঠছি—তুইন হঠাৎ—কই গেছলি

তুই এইহানে আন্ধারের মধ্যে কিতা করছ

আন্ধারতো অহন অইতাছে—আমি ঘুরতে আইছি বৈকালে—তা ক খবর কিতা—

আমার খবর ঠিকই আছে—থানার দারোগা বাড়িত আইছিল—বাবারে ওয়ারেন্ট দেহাইল—বাবা কইল এই ওয়ারেণ্ট তো ব্রিটিশের—আফনেরা কি এইডা অহনও জারি রাখবেন? পুলিশ কইল—-হ জারি রাহন লাগব—কেসটাতো  এটেম্প টু মার্ডার—পিওর ক্রিমিনাল—পলেটিক্যাল কেস সব মওকুফ অইছে—কিন্তু এইডা হয় নাই—সারেন্ডার করন লাগব—

তো জামিন অইছে গতকাইল। কেস চলব অহন। আর কোনো ঝামেলা নাই। 

আমরা তো চিন্তায় আছিলাম–

চিন্তার কিতা—অহন ধর কিছুদিন আর ঝামেলা টামেলা অইত না—ওই দলডা–ওই মাহন মিয়ার দলডা ত ধরা পড়ছে—আর হেই বেডা ত মইরাই গেছে—

শুনলাম মাহন মিয়া আর মুনাব্বর দুজনেই মার্ডার অইছে

ঠিকই হুনছস—তয় এইতা লইয়া কথা কওনের বেশি কাম নাই

হ। বুঝছি–

পরে একদিন আইয়াম নে ধলা—আইজ যাইগা

এদিক দিয়া কই যাইবে

এই দিক দিয়াই পথ আছে—

তুইন কি একলা

আরে না—একলা অহন চলন যায় নাহি—আছে দুই জন—তুইন যা বাড়িত যা—আমি গেলাম

রতন ভূতের মত উদয় হল, আবার চলেও গেল।

ধলাবাবুর আজ আর যেন কিছুই ভাল লাগছে না। বৈঠকখানায় না বসে সোজা বড় ঘরে চলে গেল। বারান্দার অন্ধকারে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়লো। বাসন্তী রান্নাঘরের বারান্দা থেকে আবছা অন্ধকারে দেখে একটা মানুষ ইজি চেয়ারে বসে। এই সময় তাইনের ত বাড়ির ভিতরে আসার কথা না। বন্ধুবান্ধব না থাকলে বংশী আর আফজলকে নিয়া জমির কাজ কর্ম নিয়ে কথা বলে। আর সেই বদনামের কাজটা করে চাকরদের সঙ্গে  বসে তামাক টেনে  টেনে। মাঝে মাঝে হাসিঠাট্টাও করে।

যাই হোক কয়েক পা এগিয়ে বাসন্তী জিজ্ঞেস করে—কেডা বইসা আছে চেয়ারে—। ধলা উত্তর দেয়—একটু আগাইয়া দেহ কেডা।

গলার স্বরেই বুঝে যায় বাসন্তী। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে—কী অইল বাদশা আইজ দরবারে বসেন নাই?

এক কাপ চা অইব—অইলে কথার উত্তর দিয়াম।

বাসন্তী কাছে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে তাপ দেখল। ঠাণ্ডা। বলল—মন খারাপ?

চা আনতাছি–বও।

 

কিছুক্ষণ পর বাসন্তী চা নিয়ে এসে দেখে একজন কোলে, একজন ঘাড়ে নিয়ে মোট তিনজন এক চেয়ারে বসে আছে। মাকে দেখে তারা আজ আর ভয় পাচ্ছে না। ছেলেটাকে একটা বই দিয়ে শাশুড়ির কাছে বসিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে এসেছিল বাসন্তী। মেয়েটা অতসীর কোলে ছিল। বাসন্তী ওদের তাড়া দিয়ে অতসীকে ডাকল। অতসী দৌড়ে বারান্দায় এসে ছূডু কত্তাকে দেখে লজ্জা পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দুটোকে কোনোমতে নিয়ে ঘরে গেল । বাসন্তী একটা ছোট্ট জলচৌকির উপর চা রেখে মোড়া টেনে বসলো। বলল—কী ব্যাপার কওতো হুনি—

ব্যাপার কিছু না—মনডা শরীলডা দুইডাই কেমন যেন অলস লাগতাছে—

থাউক আইজ আর বাইরের ঘরে যাওনের কাম নাই—চা ডা খাইয়া শুইয়া থাহ গা—পাক অইলে ডাক দিয়ামনে—আর অত চিন্তা কইরনা তো—

আমরার রেডিওডা কই—

অহন রেডিও হুনন লাগত না—একটু চোখ বুইজ্যা শুইয়া থাহ গা

কোনো কথা ছাড়া দুজন কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে থাকল। এইরকমও হয় স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে বসে আছে, কিন্তু কোনো কথা নাই। সবটাই পরিস্থিতির চাপ।

একসময় চা এর কাপ তুলে নিয়ে বাসন্তী রান্নাঘরে চলে গেল।

 

বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছুদিন পর ধলাবাবু আবার বইপত্র নিয়ে বসল। অতসীকে বলল একটা হ্যারিকেন দিয়ে যেতে। একসময় তার নোট খাতাটি নিয়ে লিখতে বসল।

 

মানুষে মানুষে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে হানাহানি মারামারি এই সভ্যতার একটা বড় অনুষঙ্গ। মানুষ তার বিকাশমান সত্ত্বা নিয়ে এর মধ্য দিয়েই যুগ যুগ ধরে চলেছে। কিন্তু চলার গতি থামেনি। ফলে এর মধ্য দিয়ে কিছু মূল্যবোধ তার তৈরিও হয়েছে। যার সবগুলোকে নিয়ে একসঙ্গে বলা যায় মানবিক মূল্যবোধ। আর এই মূল্যবোধের হাত ধরে মানুষের বাঁচার আশা, আশ্রয়ের আশা, দয়া দাক্ষিণ্যের আশা, শত দুর্যোগেও বেঁচে থাকার আশা থাকত। কিন্তু  যেদিন এই ধরনের হানাহানি মারামারির গুলো মধ্যে ঢুকে গেল ধর্ম, সেদিন থেকেই এর নামকরণ হয়ে গেল দাঙ্গা—সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—বা ধর্মীয়সাম্প্রদায়িকতা—ইত্যাদি। আর হানাহানি মারামারি স্বরূপটি হয়ে গেল  দানবীয়।

 

আর এখানে এসেই মানুষের এতদিনের তিলে তিলে নির্মাণ করা মানবিক মূল্যবোধনষ্ট হতে লাগল। ব্যক্তিগতভাবে বা  সম্প্রদায়গতভাবে তার অসহায়তা সীমাহীন হয়ে পড়লো। সম্ভবত এখান থেকেই মানুষ কোনও সমাজে থেকেও নিজেকে অনাথ, অনিকেত ভাবতে থাকল। তাহলে দেখা যাচ্ছে ধর্ম বিষয়টা, যার সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্ক আছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে, তা এতটাই মানবিকতারহিত মনোভাবের জন্ম দিতে পারে! ভাবা যায় না।

 

অনেকেই এদিক দিয়ে বিষয়টাকে না দেখে দেখতে চায় যে, এটা সামাজিক বিষয় বৈষম্যের এক নিষ্ঠুর পরিণতি—সমাজের ধনী দরিদ্রের সংঘাত। কিন্তু আমার মনে হয় এখানে একটা ভুল থেকে যাচ্ছে। কারণ সংঘাতের উপরিপৃষ্টে হয়তো এটা দেখা যায়, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে এটাও দেখা যায় যে, সংঘাত বেশীর ভাগ সময়ই ধনী বিরুদ্ধে ধনীর সংঘাতে দরিদ্রকে কাজে লাগানো হয়। এবং যতটা সম্ভব সংঘাতটাকে নিষ্ঠুরতর করার জন্য দরিদ্রকে উৎসাহিত করা হয়। আর এর শেষে থাকে এক অদ্ভুত ক্ষমতায়নের  দাবাখেলা। আর সেই দাবার ছকের মধ্যেই সাধারণ মানুষের ভাগ্য ঝুলন্ত থেকে যায় বরাবর।

 

আবার আমাদের একটা ছল করার সুযোগ এই উপনিবেশিক শাসনে আমরা পেয়েছিলাম। এই সকল ধর্মীয়সাম্প্রদায়িকতাজনিত দাঙ্গাহাঙ্গামাকে আমরা ব্রিটিশদের সৃষ্ট বলে সকলেই, এমন কি মূল অপরাধীরাও, হাত ধুয়ে ফেলতে পারছি। এতদিন ব্রিটিশরা ছিল  প্রশাসক। তারা তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বহাল রাখার জন্য অনেক কিছু করতে পারে। রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে সে তার লাভ তুলে নিতে পারে। কিন্তু আমরা নিজেদের বিবাদের দায় নির্লজ্জের মত তার উপরে চাপিয়ে কতদিন বোকাচালাক সেজে থাকব?

 

লেখার মধ্যে মাঝে মাঝে বইপত্র ওল্টানো—এসব করেই সময় কাটছিল ধলাবাবুর। একসময় অতসী এসে খাওয়ার জন্য ডেকে গেল। বোঝা গেল রাত হয়েছে।

 

রাতে শুয়ে বাসন্তী একটা অদ্ভুত কথা শোনাল। বলল—অতসীর বিয়াডাত অহন দেওন লাগে—ভাবনা চিন্তা কইর। কথাটা শুনে ধলাবাবু তার সন্ধ্যা থেকে বয়ে আসা চিন্তাভাবনা থেকে যেন ছিটকে বেরিয়ে গেল অনেকদূর।

হ্যাঁ, তাইতো অতসীরত বিয়ে দিতে হয়। বিয়ের বয়স হয়েছেই তো—। দায়িত্ব ত এখন তার উপর। বাবার মৃত্যুর পর যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সমেত সংসারের সকলের দায়িত্বইতো আমার উপর। কিন্তু অতসীর পরিচয়? বিয়ের কথা উঠলেইতো অতসীর পরিচয়ের কথা উঠবে। এই প্রান্তিক সমাজে নানান ধর্মীয় কুসংস্কারের জঙ্গলের মধ্যে অতসীর কথা কীভাবে বলা হবে! হয়তো এতদিন অতসীকে নিয়ে অনেক কথা প্রতিবেশীদের মনে জমা হয়েছে। বাইরের মানুষের কাছে নেহাত কাজের মেয়ের পরিচয়ে সে আছে বলে বা মজুমদার বাড়ির সামান্য যা একটু প্রতিপত্তি আছে বলে কেউ অতসীকে নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলে না। কিন্তু একদিন বিয়ে উপলক্ষে প্রধান বিষয় হিসেবে যখন অতসী উঠে আসবে, তখন কি আর কথা কেউ চেপে রাখবে?

 

১০

নাম তার অতসী হয়নি তখনও। অর্থাৎ নামকরণের অবকাশও পায় নি সে। শোনা যায় একদিন খুব ভোর বেলা ছোট্ট অতসী তাদের হৃদয়পুরের বাড়িতে ভেসে আসে। আক্ষরিক অর্থেই সে ভেসে এসেছিল কুন্দা করে। তারপর কুন্দা থেকে নেমে নকুল মাঝির কোলে করে সে আমাদের বাড়িতে ঢোকে।  

এই নকুল মাঝি ছিল ধলাবাবুর বাবা মোহনলালের পরিচিত ও খুব বিশ্বস্ত । নকুল মাঝির বড় নৌকাও আছে। বর্ষাকালে কাজে কর্মে এদিক ওদিক যাওয়া বা পরিবারের লোকজন নিয়ে যাওয়া আসার  ক্ষেত্রে সবসময়ই নকুল মাঝির ডাক পড়তো। নকুল মাঝিদের গ্রামের নাম হরিপুর। হৃদয়পুর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। শুকনোর দিনে হাঁটা পথে বেশ সময় লাগে। যদিও শুকনোর দিনে নকুল মাঝির ডাক তেমন খুব একটা পড়ত না। তবে বর্ষার দিনে ডাক পড়তো ঘন ঘন। বর্ষায় যোগাযোগ খুব সহজ ।  

তখন বর্ষাকাল। একদিন নকুল তার কুন্দাটা মোহনলালদের পুকুরে দক্ষিণে নিয়ে এসে লাগালো। তারপর একটা কাপড়ের পুটুলির মত জিনিস দুহাতে তুলে বুকের কাছে নিয়ে সে হাঁটতে হাঁটতে  মোহনলালের বাড়ির দিকে রওনা হল। মোহনলালের সঙ্গে নকুলের যেমন অনেকদিনের সম্পর্ক, তেমনি সুমতি বৌঠাকুরানির সঙ্গেও তার আলাপসালাপ আছে। ফলে নকুল মাঝি দুহাতে বুকের কাছে ধরা  কাপড়ের  পুটুলি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়লো। তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে ছিলেন মোহনলাল। নকুলকে দেখে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— কীরে নহুল এই বেইন্যাবেলায় কী ব্যাপার—-তোর হাতে ওইডা কি—

দা-ঠাকুর সব কথা কইতাছি—আগে এই বাইচ্চাডারে একটু  শুয়নের জায়গা দেইন—অহনও ঘুমাইয়া আছে—ভুরের ঠাণ্ডাডা লাগল নাহি কেডা জানে—

এইটুকু কথার মধ্যেই সুমতি ঘরের বাইরে এল এবং  চোখ পড়ে গেল বাচ্চাটার দিকে। জিজ্ঞেস করলেন—তোমার বাচ্চা নকুল—কিতা অইছে–

বৌঠাইন কইতাছি সব—আগে এট্টু এরে শুয়নের জায়গা দেইন

হ হ দিতাছি—দেও, আমার কাছে দেও—বলে সুমতি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘরে গিয়ে ওর সঙ্গে থাকা কাঁথা ন্যাকড়া সব সরিয়ে নিজেদের কাপড় কাঁথা দিয়ে ভালো করে ঢেকে একটা ছোট্টমত বিছানা করে শুইয়ে দিল। ভোরের আলোতে বাচ্চাটার মুখ বেশ করুণ লাগল—হায় কপালের একদিকে আবার একটা কাজলের নজর টিপও দেয়া আছে—মশা মাছির ভয় আছে দেখে সুমতি তাদের বড় মশারির একটা দিক টেনে বাচ্চাটার উপর দিয়ে রাখলো।

এরপর বাইরে বেরিয়ে সুমতি দেখে পিঁড়িতে বসা নকুল মোহনবাবুকে নিচু স্বরে যেন কী কথা একটানা বলে যাচ্ছে। এই  সময় সুমতির  ব্যস্ততা থাকে রান্না ঘরে। কিন্তু আজ সে আর সেদিকে না গিয়ে রান্নার বউ অন্নদাকে ডেকে ভাত বসিয়ে দিতে বলল। তার  আগে কর্তার জন্য চা।

নকুল সকালে এলে সাধারণত ভাত না খেয়ে যায় না। আজও হয়তো খেয়েই যাবে। একটা মোড়া নিয়ে সুমতি মোহন ও নকুলের কাছাকাছি গিয়ে বসলেন। কথাবার্তা শোনা দরকার। বাচ্চাটার কী হয়েছে, ব্যাপারটা কী, জানা দরকার। কিন্তু এরমধ্যেই কথাবার্তা   অনেকটা এগিয়ে গেছে বলে তিনি মাঝখান থেকেই কিছুটা শুনলেন। এরমধ্যেই বাচ্চাটা কেঁদে উঠলো। অনেকদিন পর বাড়িতে বাচ্চার কান্না ! সুমতি আবার উঠে গেলেন। গিয়ে দেখেন বাচ্চা হাত পা ছুঁড়ে জোর কান্না জুড়ে দিয়েছে। কাঁথা কাপড় প্রাতঃকালীন কাজকর্মে ভিজিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে। আবার একপ্রস্ত কাপড়চোপড়ের বন্দোবস্ত করে বাচ্চাকে পরিষ্কার করে কোলে   নিলেন। বাচ্চা আবার ঘুমিয়ে পড়লো। বাচ্চাকে শুইয়ে  সুমতি এবার আর কথাবার্তার ওখানে না বসে সোজা রান্নাঘরে গেলেন। তার নিরামিষ ঘরের উনুনে পাতলা করে খানিক দুধ বসালেন । হালকা গরম দুধ একটা বাটিতে নিয়ে সামান্য চিনি মিশিয়ে এবার ঝিনুক খুঁজতে লাগলেন। অনেকদিন ব্যবহার নেই বলে ঝিনুক আর তৎক্ষণাৎ পেলেনও না। তার বদলে নিলেন একটা চায়ের চামচ। আঁচল দিয়ে দুধের বাটি আড়াল করে নিয়ে এলেন বড় ঘরে। এবার বাচ্চাকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই কোলে তুলে নিয়ে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। বাচ্চা দিব্বি দুধ খাচ্ছে চোখ বুঝেই। খুবই খিদে পেয়েছিল বোঝা যাচ্ছে। খেতে খেতে বার দুয়েক চোখ মেলে তাকালো সুমতির দিকে। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক  তাকিয়ে হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে আবার ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লো। বাচ্চাকে শুইয়ে দিয়ে আবার রান্না ঘরে।  নকুলকে আলুসেদ্ধ আর ঘি দিয়ে ভাত দেয়ার নির্দেশ দিলেন অন্নদাকে। বাইরে এসে নকুলকে বললেন— নকুল আইও চাইড্ডা ভাত খাইয়া লও। রান্নাঘরের বারান্দায় গিয়ে নকুল  খেতে   বসলো। কাছে দাঁড়িয়ে সুমতি নকুলকে বললেন—দুধ খাওইয়া দিছি—নতুন কাপড় চোপড়ও দিয়া দিছি—যাওনের সময় সাবধানে লইয়া যাইও—

কথা বলতে বলতেই নকুলের খাওয়াও হয়ে গেল। হাত ধুতে যাওয়ার সময় বলল—সব কথা দাদাবাবুর কাছে কইয়া গেলাম—আফনে সব শুইন্যা নিয়েন—খুব বিপদে আছি বৌঠান— বাচ্চা দুইডা দিন থাহুক—-আফনেরা ছাড়া বিপদে আর কাছে যাইতাম—আমি আইয়ামনে—চিন্তা কইরেন না।

সুমতি কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। 

নকুল কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। সকালের বাড়ি এখনও শুনশান। মোহনলাল চা খাচ্ছেন। সুমতি কর্তার কাছে গিয়ে বসাতে তিনি  বললেন—অবসর মত কইতে অইব—অনেক কথা—গোয়ালঘর সাফ করুক—কইরা ওরা বাইরে যাউক—বৈঠকখানা ঘরে আইস পরে—আমি ওইহানে থাকবাম—

অইছে, এখন আর আমার অবসর কোনহানে—একে একে সগলে ঘুম থাইক্যা উঠব—বেইন্যা খাওন দাওনের কাম আছে না আমার—

আইচ্ছা—তাইলে অবসর মত আমি তুমারে ডাইক্যা লইয়াম নে—

 

তাঁদের এইসব কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ রাধিকার গলা—মা, ওমা দেইখ্যা যাও তুমার বিছনাতে একটা বাইচ্চা আবু—-মা ওমা—

রাধিকার গলা শুনে তার ঠাম্মা ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালেন বিছানার পাশে।

রাধিকা আবার ডাকে তার মাকে—-মা, ওমা—বাচ্চাডা দেহি চাইয়া আছে আমার বর—কোলে নিয়াম—।

এইসব বলে রাধিকা মায়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় এসে দেখে কেউ নাই। সে বারান্দায় রাখা মোড়াতে বসে বাচ্চা নিয়ে বেশ করে বসে আহ্লাদ করে যাচ্ছে। বাচ্চাও একটু একটু হাসার চেষ্টা করছে।

উঠোন পার হয়ে আসতে আসতে সুমতির চোখ পড়লো বারান্দার দিকে। রাধুর কোলে বাচ্চা। রাধু তার ছোট্ট আঁচল দিয়ে বাচ্চার মুখ থেকে মাছি সরাচ্ছে, আর বাচ্চার সঙ্গে অনবরত বক বক করে যাচ্ছে।

সারাদিনের বিভিন্ন সময়ে টুকরো টুকরো করে মোহনলাল বাচ্চা সম্পর্কিত কথাগুলো সুমতিকে বলেছেন। কথাগুলো শুনে বিভিন্ন ধাপে সুমতির মুখের বিভিন্ন অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল। সুমতি  একবার সন্দেহ করেই বসছিলো যে, বাচ্চাটা মোহনলালেরই কিনা।  যাক শেষ পর্যন্ত পরস্পর জোড়া দেয়া আখ্যানটা এমনই দাঁড়ালো যে— 

হরিপুরের নকুলের মিতারফিক। পাশের গ্রাম, পলাশপুরে থাকে রফিক। গ্রাম সমাজে সকলেই জানে তারা অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। বছর দুয়েক আগে রফিকের বিয়ে হয়েছে। খুবই পর্দানশিন পরিবার রফিকের। তবুও তার স্ত্রী পিয়ারীকে নিয়ে সে নকুলের বাড়িতে  বিভিন্ন অবসরে বেড়াতে যায়। অন্যদিকে নকুলের বড় ব্যাপারী  নৌকায় পাটের চালানের সময় কয় মাস তারা এক নৌকাতেই কাজ করে। তাদের ওখান থেকে খাল বিল নদী বেয়ে তারা পাটের চালান নিয়ে নেত্রকোণা বা ময়মনসিং পর্যন্ত যাতায়াত করে। সেখান থেকে ফেরার সময় গ্রামের হাটের ব্যাপারীদের নানাকিসিমের মাল নিয়ে আসে।

কিছুদিন আগে রফিকের বাবার ইন্তেকাল হয়েছে। তাদের ছয় ভাই ও তিন বোনের পরিবার। বোনদের বিয়াশাদি হয়ে গেছে। রফিকের ছোট দুই ভাইয়ের এখনো বিয়ে হয় নাই। এমতাবস্তায় কৃষিজমি নিয়ে ভাইদের মধ্যে ভাগাভাগির প্রশ্ন উঠল। যা জমি তা ভাগ করলে ভাগে যা পড়বে, তা নিয়ে তাদের ভাল হবে কি হবে না, তাই নিয়ে  আলাপ আলোচনা চলছে। ঠিক এই সময়েই হঠাৎ করে রফিকের  মৃত্যু হয়। চিকিৎসার সুযোগ নাকি পাওয়া যায় নি। অবশ্য এমন প্রান্তিক গ্রামগঞ্জে চিকিৎসার কীইবা সুযোগ আছে। কিন্তু আসল মুশকিল হলো যে, রফিকের স্ত্রী পিয়ারী তখন আট মাসের গর্ভবতী।  

শোক ভারাক্রান্ত পিয়ারী কোনো মতে দিনযাপন করে চলছিল। কিন্তু তাদের যৌথ সংসার রফিকের শোক ভুলতে বেশি সময় নেয় নি। আর রফিকের শোক ভোলার সঙ্গে  সঙ্গেই পিয়ারী যে ক্রমে সংসারের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠছিল সেটা পিয়ারী প্রথমে বুঝতে পারেনি। অল্প বয়সের বিধবা, তায় পেটে বাচ্চা—এমন মেয়েছেলে নিয়ে সংসারে নানা বিপদ। ছেলেবউদের মনে একরকম বিপদ আর অবিবাহিত ছেলেদুটোর জন্য মায়ের মনে অন্যরকম বিপদ। এখন ওর দায় দায়িত্ব কে নেবে–এটাই বড় সমস্যা। পিয়ারীর পিতৃকুলের এক দুজন রফিকের মৃত্যুর পর যে এসেছিল—সেই শেষ আসা। কেউ এখন আর এদিকের পথ মাড়ায় না। 

এই অবস্থার মধ্যে পিয়ারী কন্যা সন্তান প্রসব করল। পিয়ারীর কপাল আরেকটু পুড়লো। আঁতুড়ঘরে সেই যে কন্যা সন্তান দেখে গেল বাড়ির মহিলারা, তারা আর পরে কেউ এমুখো হলো না।  কোনো মতে বুকের দুধ খাইয়ে খাইয়ে মেয়েটিকে নিয়ে তিনমাস পার করল  পিয়ারী। এরপর নিজের ভাতের থেকে এক মুট ভাত নিয়ে এসে একটু লবন দিয়ে চটকে কোনোমতে বাচ্চাটার মুখে দেয়। পিয়ারী একদিন শাশুড়ির কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করলো মেয়েটির জন্য একটু দুধের বন্দোবস্ত করার জন্য। কোনো ফল হলো না। বরং শাশুড়ি বললেন কিছুদিন গিয়ে বাপের বাড়িতে থেকে আসতে। মনে মনে ভাবলেন বাপের বাড়িতে একবার পাঠাতে পারলে একটা হিল্লে হয়। বাপের বাড়িতে খবর পাঠালে  তারা সাড়া দেয় না। তারা বোধ হয় আঁচ করে ফেলে পিয়ারীর ভবিষ্যৎ। এই সব দেখে শুনে শাশুড়ি একদিন বললেন—অত খবর ফাডানোর কাম কিতা—তুমি যাও–আমার ছুডু পোলায় গিয়া তুমারে দিয়া আসবনে।

এরমধ্যেই বাপের বাড়ির থেকে খবর আসলো যে বাচ্চা রেখে আসতে পারলে আসুক, বাচ্চার দায়িত্ব আমরা নিতে পারব না। এর অর্থ বুঝতে পিয়ারীর দেরী হয় না। বাচ্চা ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে তাকে আবার বিয়ে দেবে। বাচ্চা থাকলে বিয়ে হবে না। এই বয়সের বিধবার বিয়ে ছাড়া বাঁচার আর পথ নাই। স্বামী বিবাহিত বা আগের পক্ষের বাচ্চাকাচ্চা থাকলেও তাতে কোনো আপত্তি নাই। শুধু  বউয়ের আগের পক্ষের বাচ্চা থাকলে সব বানচাল হয়ে যাবে। শাশুড়িকে বাপের বাড়ি যাওয়ার শর্তের কথা  জানালে শাশুড়ি ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন—- আমার পুলাডারে খাইছ—অহন এই বাচ্চার দায়িত্ব তুমি কার উফরে ফালাইয়া যাইতে চাও—কে লইব এই মাইয়ার দায়—যেহানে যাইবা নিজের বাচ্চা লইয়া যাওন লাগব–কইয়া দিলাম।

এরমধ্যে রাতের দিকে একদিন পিয়ারী শুনতে পেল দরজায় টোকা। অবাক হল। ভয়ও পেল। তবু একবার সাহস করে দরজাটার খিলটা আলগা করে দেখতে গেল কে—। কিন্তু দেখা আর সম্ভব হলো না। ঘরে ঢুকে একটা পুরুষ কণ্ঠ শুধু তার মুখ চেপে ধরে  বলল–এক্কেরে চুপ থাহ—নাইলে কইলাম শেষ কইরালবাম—

রাত কত জানা নেই। একসময় জ্ঞান হারা পিয়ারীর হুশ ফিরল বাচ্চার কান্নায়। বুকের দুধ দিতে গিয়ে দেখে বুক রক্তাক্ত। টের পায় শরীর বিধ্বস্ত । কোনো মতে বিছানা থেকে উঠে জল দিয়ে স্তন ধুয়ে বাচ্চার মুখে দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলো।

এইভাবেই চলতে লাগলো দিনের পর দিন।

এমনও তখন দিন যায় যে, পিয়ারীর ঘুম থেকে উঠতে বেলা হয়ে যায়, বা জ্ঞান ফেরে বাচ্চার কান্নায়। রাতের বিস্রস্ততা গোছাতে বা লুকোতেই তার দিন যায়।

বাড়ির একটা মানুষও তখন তার সঙ্গে কথা বলে না, খোঁজ নেয় না।

বেশ কিছুদিন পর শাশুড়ি একদিন ডেকে পাঠায়, বলেন—আমি কোনো সন্দেহের কথা কইতে চাই না বা তুমার কোনো অজুহাতও হুনতে চাই না—তুমি মানে মানে তোমার বাপের বাড়ি চইলা যাও—না অইলে কইলাম কপালে অনেক দুঃখ আছে।

এই কথা শুনে পিয়ারী ভয় পেয়ে যায়। নিজের উপর যা হচ্ছে তো হচ্ছেই, বাচ্চাটারে নিয়ে মনে তার আশঙ্কা দেখা দেয়। রফিকের মৃত্যু যে তাকে কোন অতলে ঠেলে ফেলে দিয়ে গেল, সে আন্দাজ করতে পারছে না।

সেদিন রাতে সে আর দরজা খুললো না। বাইরে থেকে শ্বাপদের শুধু চাপা গর্জন শোনা গেল। একসময় পিয়ারী চীৎকার করার ভয় দেখানোতে শ্বাপদ চলে গেল বটে। কিন্তু যাবার সময় মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে গেল ।

সেদিন নির্ঘুম রাতে পিয়ারীর মনে হঠাৎ উদয় হলো রফিকের মিতা নকুলের কথা। অনেকটা যেন দুঃস্বপ্নের ঘোরে খুঁজে পাওয়া নাম একটা । রফিকের বউ হিসেবে বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে যদি পরিচয় হয়ে থাকে তবে সে নকুল মাঝি। রফিকের মিতা। তাদের  বাড়িতেও যাতায়াত ছিল তার আর রফিকের। মৃত বন্ধুর বউকে কি সে সাহায্য করবে না—নিশ্চয়ই করবে। আর যদি না করে তবে তো এই বাচ্চা নিয়াই বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠন লাগব।নতুন কইরা আর কি লাঞ্ছনা অইব। যা অয় অইব। আল্লাহ বাঁচাইলে বাঁচব, মারলে মরব। তবু শ্বশুরবাড়িতে আর না। এই বাড়িতে সে মৃত্যুর ছায়া দেখতে পাচ্ছে। এইখানে আর না।

আর সেইমত ভোরবেলা পিয়ারী মেয়েকে কোলে নিয়ে স্বামীর ঘর  ত্যাগ করল। রাতে গুছিয়ে রাখা  একটা  কাপড়ের পুটুলি নিল সঙ্গে। মানুষজন ওঠার আগেই সে বোরকা পরে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। কোলে বাচ্চা নিয়ে ভোরবেলায় সে হাঁটতে হাঁটতে নকুল মাঝির বাড়িতে গিয়ে হাজির। বোরকার ঘোমটা খোলার পর পিয়ারীকে দেখে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা নকুল চমকে উঠলো। এতো পিয়ারী  নয়,যেন পিয়ারীর কঙ্কাল। তাড়াতাড়ি বউ কে খবর দিয়ে পিয়ারীকে ঘরে নিয়ে  গিয়ে বসায়।  নকুলের বউ এসে পিয়ারীকে দেখে  অবাক। কিছু বলার আগে সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে, সেই ছোটখাট মিষ্টি চেহারার মেয়েটি এই পিয়ারী কি না। তেলহীন অবিন্যস্ত চুল,মুখের নানা জায়গায় কালশিটে, চুলে মনে হয় চিরুনিও পড়েনি কতকাল। বাচ্চাটাও  তথৈবচ। পিয়ারীর চোখে শুধু নিঃশব্দ জল, জলের ধারা।  

এরপর দুটোদিন মানুষের মত কেটে গেল পিয়ারীর। নকুলের বাড়িতে বাচ্চা নিয়ে সে সারাদিন শুয়ে বসে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল। দিনের বেলা যেমন তেমন, তবে রাতের বেলা চলে শুধু কথা আর পরামর্শ তাদের তিন জনের মধ্যে। নকুল, নকুলের বউ রাতের খাওয়া দাওয়ার শেষে এসে পিয়ারীর এক চিলতে বিছানার পাশে এসে জড়ো হয়। ভবিষৎ কুল কিনারার সন্ধানে ভাবনা আর কথাবার্তা চলতে থাকে তাদের মধ্যে। নকুল একসময় মাথা নিচু করে শুধু বলে—ভাবী আপনি যেবায় কইবাইন আমি সাইধ্য মত তাই করবাম—হেই নিয়া আফনে চিন্তা করুইন্যাযে। মিতার পরিবারের লাইগ্যা আমার কর্তব্য যা আছে তা করন লাগব, করবামও।

পিয়ারী রাতে ঘুমনোর আগে তার তখনও নাম না দেয়া ঘুমন্ত বাচ্চাটার দিকে তাকায়। ভাবে এই একরত্তি মাইয়াই সব হিসাব, সম্পর্ক কেমন চুরমার করে দিল—হায়, আমার বুকের ধনের লাইগ্যা কি আল্লা এই পৃথিবীতে একটুও জায়গা রাখে নাই—কেউ তারে চায় না—তার বাপের সংসারের কেউ এক নজর তাকাইয়াও দেখল না, কোলে তুইল্যা লইল না—এত অভাগী মা আমার , তরে আমি বাঁচাই কেমনে।

এইসব বলতে বলতে পিয়ারী চোখের জলে ভাসতে থাকে।

শেষপর্যন্ত ঠিক হয় যে বাচ্চাকে রেখে পিয়ারী তার বাপের বাড়ি চলে যাবে। বাড়িতে পিয়ারীর মা নেই। বৃদ্ধ বাবা আর ভাই ভাবীদের  সংসার। বাচ্চা নকুলের বাড়িতে আপাতত থাকবে। সুযোগ যদি হয় পিয়ারী তার বাচ্চা নিয়ে যাবে। সেটা কতদিন!  নকুলের বাড়িতে বাচ্চাকে বেশিদিন রাখা যাবে না। পাশাপাশি গ্রাম। এটা নিয়ে আবার জটিলতা না হয়। তার উপর নকুলেরও বাচ্চাকাচ্চা আছে। সংসারে বাড়তি বোঝা নেওয়ার মত আয় নেই নকুলের। কষ্ট করে চালালেও এরজন্য আবার সমাজ সংসারে ভবিষ্যতে না অশান্তি  হয়।

নকুল এই কদিন একটা ভাবনা ভেবে রেখেছে যে বাচ্চাটির জন্য এমন একটা পরিবার চাই, যেখানে রফিকের এই সন্তানটি বেঁচে যাবে। অনেক চিন্তা করে তার মনে আসে মোহনলালবাবু তথা দাদাবাবুর কথা। অনেক বার তার নৌকায় তাঁদের পরিবার নিয়ে  ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। যার ভেতর দিয়ে সে মানুষগুলোকে যতটুকু চিনেছে তাতে এই ভরসাটুকু করা যায় যে, বাচ্চাটিকে তারা  কাউকে রাখার জন্য দিতে পারে , অন্যথায় অন্যকোনো ব্যবস্থা ঠিক  করে দিতে পারবে। তারা আমাদের জাতপাত ধর্মাধর্ম সম্বন্ধে যথেষ্ট সুবিচার রাখে। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ তারা। দেখা যাক একটা চেষ্টা করে। একান্ত না হলে এই বাচ্চা আমার কাছেই থাকবে। মানুষের সন্তান, অবহেলা করা পাপ।

এই পরিকল্পনার কথা পিয়ারীকে জানানো হয় নি। পিয়ারীকে বলা হলো বাচ্চা এখন নকুলের বউয়ের কাছেই থাকবে।

পিয়ারী একদিন সকালে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে চলে গেল বাপের বাড়ি। যাওয়ার আগে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে যে কান্না কাঁদলো তা দেখলে  বুক ভেঙে যায়। তবু একসময় তাকে রওনা হতে হয়। নকুল তাকে কুন্দা করে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসে। পিয়ারী কুন্দা থেকে নেমে নকুলের হাতদুটো ধরে মিনতি করে বলে—মাঝি ভাই—কুন জন্মে আমার ভাই আছিলেন জানিনা—আমার মাইয়াডারে এই দুনিয়ায় খালি বাঁচাইয়া রাইখেন—বাঁচাইয়া রাখুইনযে— বড় দুঃখী মাইয়া আমার—। আল্লায় সুযোগ দিলে মাইয়ারে নিয়া  যাইয়াম— বলতে বলতে তার গলা বন্ধ হয়ে গেল।  নকুল কোনোমতে তাকে রাস্তায় তুলে দিয়ে ফিরে এল কুন্দায়।

🔅🔅🔅

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সম্পর্ক-সম্পর্কিত সাদাসিধা ভাবনা | অঞ্জন আচার্য

Mon Oct 26 , 2020
সম্পর্ক-সম্পর্কিত সাদাসিধা ভাবনা | অঞ্জন আচার্য 🌱 কেবল ভালোবাসা দিয়ে কোনো একটি সম্পর্ককে চিরস্থায়ী করা যায় না। সম্পর্ক টিকে থাকে কিছু বাস্তব উপাত্তের ওপর। সেই উপাত্তগুলোকে বোঝাতে আমার নিজের তৈরি একটি শব্দ আছে। ওটা দিয়েই বরং সম্পর্কের হিসাব–নিকাশ কষি। ‘ফুস’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় আছে কম–বেশি আমাদের সবার। তুচ্ছ বা অসার […]
Shares